ছুটিতে বেড়ি পাঁচপোতা ভ্রমণ

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে

একটি শিশিরবিন্দু।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, পাঁচপোতা, Panchpota,ছুটিতে বেড়ি পাঁচপোতা ভ্রমণ

কলকাতার ভিড়ে প্রানবায়ু যেন হাসঁফাস করছিল। তাই কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম একদিনের ছুটিতে কোথাও একটু ঘুরে আসব। আমরা একটু প্রকৃতি প্রেমিক গোছের, তাই দীঘা কিংবা বকখালি যেন আর ভালো লাগে না। ক্রমবর্ধমান পর্যটকদের চাপে এরা যেন এদের নিজসত্তা হারিয়ে ফেলেছে। তাই ঠিক করলাম উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম বেড়ি পাঁচপোতা ঘুরতে যাবো। শিয়ালদহ-বনগাঁ লাইনের গোবরডাঙা স্টেশন থেকে মাত্র ১১ কিমি দূরে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সবুজে ঘেরা সুন্দর একটি গ্রাম হল বেড়ি পাঁচপোতা ।গ্রামটির বুকের উপর দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে ছোট্ট একটি অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ, স্থানীয় ভাষায় যাকে বাওড় বলা হয়। এই হ্রদ বা বাওড়টি যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঠিক আবার সেখানেই শেষ হয়েছে। অনেকদিন আগে এটি ইছামতী নদীর অংশ ছিল। তারপর ইছামতী নদী আস্তে আস্তে দিক পরিবর্তন করে একটু দূরে চলে যাওয়াই এটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদে পরিণত হয়েছে। পাঁচপোতার বুকে সুন্দর এই হ্রদ ছাড়াও আশেপাশে আরো কয়েকটি হ্রদ বা বাওড় আছে। যেমন ডুমোর বাওড়, ঝাউডাঙার বাওড়, বলদে ঘাটার বাওড় ইত্যাদি। এরা যেন সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে বসে আছে নিজ সাম্রাজের সম্রাজ্ঞী হয়ে। রূপের ছটায় কেউ কারো কাছে হারতে নারাজ। এ বলে আমি সেরা ও বলে আমি। পর্যটকদের কোনো চাপ না থাকায় প্রকৃতি প্রেমিকদের সেরা গন্তব্য বেড়ি পাঁচপোতা।

পাঁচপোতা,কলকাতা,দীঘা,বকখালি,উত্তর চব্বিশ পরগনা,শিয়ালদহ-বনগাঁ লাইনের গোবরডাঙা স্টেশন. বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী. বাওড়, ইছামতী,,ছুটিতে বেড়ি পাঁচপোতা ভ্রমণ

 

আমরা ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে একটু সকাল সকাল শিয়ালদা থেকে চেপে বসলাম বনগাঁ  লোকালে। ঘন্টা দুয়েকের থেকে একটু কম সময়ের মধ্যে পৌছে গেলাম গোবরডাঙা। সেখান থেকে অটো, বাস বা ট্রেকারে আধ ঘন্টার পথ বেড়ি পাঁচপোতা। এখানে শনি মঙ্গলবার বিশাল বড় হাট বসে। দিনটি শনিবার হওয়াতে প্রথমেই পায়ে হেটে ঘুরে দেখে নিলাম সুবিশাল গ্রাম্য হাটটিকে। প্রায় এক বর্গকিমি এলাকা নিয়ে সীমান্ত এলাকার সব থেকে বড় হাট এটি। দশ থেকে বারোটি গ্রামের প্রয়োজন মেটায় এই হাট। সব্জি থেকে দা-কুড়ুল কিংবা জামা-কাপড় সবই মেলে এখানকার হাটে। এখানকার সব্জি ট্রাকে করে পাড়ি দেয় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে। দেখা গেল চাষীদের সদ্য তুলে আনা সব্জি বিক্রি হচ্ছে এই হাটে।

 

বাজারের কাছেই অনুকুল ঠাকুরের মন্দির। প্রায় এক বিঘা জমির ওপর অবস্থিত এই মন্দিরটি। মন্দিরটির পেছনেই বিশাল আমবাগান। মন্দির দর্শনের পর বাগানের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলাম বাওড়ের দিকে। বাওড়ে পৌঁছে নৌকা ভাড়া করে মুড়ি আর পাঁচপোতার বিখ্যাত তেলেভাজা নিয়ে ভেসে পড়লাম জলে। মাথার উপর নীল আকাশ আর সামনে নিশ্চল জলরাশি, এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভুতি। দেড়-দুঘন্টা যে কীভাবে কেটে গেল তা  বুঝতে পারলাম না। তবে এর থেকে আর বেশি সময় নেওয়া গেল না, কারন এরপর আমাদের আরো কয়েকটি জায়গা ঘুরতে  হবে।

শিয়ালদা,বনগাঁ  লোকালে,গোবরডাঙা, সব্জি থেকে দা-কুড়ুল,ছুটিতে বেড়ি পাঁচপোতা ভ্রমণ

নৌকা থেকে নেমে বাজারে চলে আসলাম। বাজারের কাছেই টোটো স্ট্যান্ড। এখান থেকে টোটো নিয়ে চললাম কালাঞ্চী বর্ডার দেখতে। মনে রাখবেন বর্ডারে খাওয়ার কোন হোটেল নেই। তাই আপনাকে হয় পাঁচপোতা বাজার থেকে খেয়ে যেতে হবে নতুবা বর্ডারে গিয়ে আপনাকে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই জন্য যাওয়ার আগে দুপুরে রান্না করে খাওয়ার জন্য আমরা পাঁচপোতা বাজার থেকে টাটকা আনাজ-পাতি ও অন্যান্য রান্নার সামগ্রী সংগ্রহ করে টোটোয় তুলে নিলাম। রান্নার জন্য গ্যাস বা অন্যান্য বাসনপত্র স্থানীয় ডেকরেটর্সের দোকান থেকে ভাড়ায় পেয়ে গেলাম। আপনারা চাইলে হাটের থেকে দেশি মুরগি কিনে মাংসের দোকান থেকে কাটিয়ে নিতে পারেন। তবে দেশি মুরগি কিনতে গেলে একটু সকাল সকাল আসতে হবে। এছাড়া বাওড়ের সদ্য ধরা টাটকা মাছও বাজারে পাওয়া  যায়।

 

পাঁচপোতা বাজার ছাড়ালে  দু-ধারের দৃশ্য আসতে আসতে পাল্টে যেতে লাগল। দু-ধারে ফাঁকা মাঠ আর মাঝখান দিয়ে পিচ ঠালা কালো রাস্তা। কিছুদুর যাওয়ার পর পুরন্দরপুর থেকে বা দিকে পরপর দুটি রাস্তা বর্ডারে চলে গিয়েছে, একটি গিয়েছে তেঁতুলবেড়িয়া বর্ডারের দিকে এবং অপরটি গিয়েছে কালাঞ্চী বর্ডারে। আমরা প্রথমে গেলাম কালাঞ্চী বর্ডার দেখতে। বর্ডারের রাস্তায় ঢুকে, কিছুদূর গিয়ে দেখা গেল, কাঁধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে BSF টহল দিচ্ছে। BSF কে  পরিচয় পত্র দেখাতে হল। (ভোটার কার্ড, আধার কার্ড অথবা প্যান কার্ড) এরপর BSF এর অনুমতি নিয়ে হাটতে লাগলাম বর্ডারের রাস্তা দিয়ে।  কাঁটা তারের পাশ বরাবর পিচের রাস্তা আর কয়েক হাত অন্তর অন্তর BSF এর টহল দেখে মনে হচ্ছিল আমরা যেন কাশ্মীর সীমান্তে রয়েছি। শুধু নদীর ওপারে পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশ। এই নদীটির নাম হল ইছামতী। এই নদীর অন্যদিকে বাংলাদেশের যশোর জেলার ভুলোট গ্রাম আর এপারে  আমাদের ভারতবর্ষ। ইছামতী নদী হল ভারত-বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমারেখা। এপারে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখা যায় ওপারের লোকজন, বাড়িঘর, দোকানপাট ইত্যাদি।

কালাঞ্চী বর্ডার,পাঁচপোতা,ছুটিতে বেড়ি পাঁচপোতা ভ্রমণ

সুন্দরী ইছামতীর সবুজে ঘেরা ছায়াময় পাড় এক মায়াবি পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এই ইছামতী  টাকির ইছামতীর মতো অত চওড়া নয়, আর স্রোতও খুব বেশি নয়। যার ফলে টোপাপানা, কলমি, শাপলা প্রভৃতি  জংলিগাছ একে অপরকে আলিঙ্গন করে যেন ভ্রাতৃত্বের মতো বসবাস করছে বছরের পর বছর ধরে। মনে হবে ইছামতীর পাড় বরাবর কে যেন সবুজ ঘাসের কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। বর্ডারের নির্জন রাস্তার ধারে প্রকৃতির কোলে ফুটে থাকা বনফুলের গন্ধ আর মাথার উপর নাম না জানা পাখির কুজন আপনার মনকে নিয়ে যাবে কলকাতার ইট-কংক্রিটের  জঙ্গল থেকে বহুদূরের কোন এক মায়াবি জগতে, এ কথা বলা যেতেই পারে।

 

মনে  রাখবেন বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত বর্ডারে ঘোরা যায়। আমরা ফিরে আসার সময় তেঁতুলবেড়িয়া BSF ক্যাম্প হয়ে পুনরায় পুরন্দরপুর চলে এলাাম। অবশ্য তেঁতুলবেড়িয়া BSF ক্যাম্প, পিঁপলি BSF ক্যাম্প হয়ে ঝাউডাঙা আসা যেতে পারে। তারপর সেখান থেকে বেড়ি পাঁচপোতা। রাত প্রায় আটটা পর্যন্ত  বেড়ি পাঁচপোতা থেকে গোবরডাঙা যাওয়ার গাড়ি পাওয়া যায়।

ইছামতী,টাকি,ইছামতী,ইট-কংক্রিটের,বনফুল,বর্ডার,ঘাসের কার্পেট,মায়াবি জগতে,ছুটিতে বেড়ি পাঁচপোতা ভ্রমণ

কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য –

 

১) বর্ডারে যাওয়ার জন্য অবশ্যই  পরিচয় পত্র সাথে রাখতে হবে। পরিচয় পত্র ছাড়া বর্ডারে ঢোকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

 

২) বর্ডারের সব জায়গাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। সুতরাং জরুরি কথাবার্তা পাঁচপোতা বাজার থেকেই সেরে যান।

 

৩) ক্যামেরায় ছবি তোলার আগে অবশ্যই BSFএর অনুমতি নিয়ে নেবেন। কখনোই কর্তব্যরত BSF এর ছবি তুলবেন না।

 

৪) বিকাল ৫ টার পর বর্ডার বন্ধ হয়ে যায়, চেষ্টা করবেন ৪ টা থেকে সাড়ে ৪ টার মধ্যে বর্ডার থেকে বেরিয়ে আসার।

 

৫) পাঁচপোতা বাজার হল সীমান্তবর্তী এলাকার শেষ জনপদ। প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার বা ঔষধ-পত্র পাঁচপোতা বাজার থেকে নিয়ে নেবেন।

 

৬) ফিরে আসার সময় অবশ্যই বেড়ী পাঁচপোতার বিখ্যাত দই আর নরম পাকের নলেন গুড়ের সন্দেশ(কাঁচা গোল্লা বা মাখা সন্দেশ) কিনতে ভুলবেন না।

 

বর্ডারে যাওয়ার জন্য অবশ্যই  পরিচয় পত্র সাথে রাখতে হবে। পরিচয় পত্র ছাড়া বর্ডারে ঢোকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।     ২) বর্ডারের সব জায়গাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। সুতরাং জরুরি কথাবার্তা পাঁচপোতা বাজার থেকেই সেরে যান।     ৩) ক্যামেরায় ছবি তোলার আগে অবশ্যই BSFএর অনুমতি নিয়ে নেবেন। কখনোই কর্তব্যরত BSF এর ছবি তুলবেন না।     ৪) বিকাল ৫ টার পর বর্ডার বন্ধ হয়ে যায়, চেষ্টা করবেন ৪ টা থেকে সাড়ে ৪ টার মধ্যে বর্ডার থেকে বেরিয়ে আসার।     ৫) পাঁচপোতা বাজার হল সীমান্তবর্তী এলাকার শেষ জনপদ। প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার বা ঔষধ-পত্র পাঁচপোতা বাজার থেকে নিয়ে নেবেন।     ৬) ফিরে আসার সময় অবশ্যই বেড়ী পাঁচপোতার বিখ্যাত দই আর নরম পাকের নলেন গুড়ের সন্দেশ(কাঁচা গোল্লা বা মাখা সন্দেশ) কিনতে ভুলবেন না।

 

 

লেখকঃ জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: