পয়সা দিয়ে বিশুদ্ধ বাতাস কিনছেন দিল্লি-বাসী

@
4.2
(9)

এই কিছুদিন আগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটা শর্ট ফিল্ম মুক্তি পেয়েছিল। তাতে স্মাগলিং টাগলিং দেখানো হচ্ছিল, যেটা মুম্বই ফিল্মে খুবই যেমন তেমন ব্যাপার। যেটা যেমন তেমন নয়, সেটা হল ওই মিনিট বিশেকের ছবিটায় একটা ডিসটোপিয়ার মতো ব্যাপার ছিল। আরো মজার ব্যাপার পালঙ্কের পশমে আগুন ধরে গেলেও লেপের ওম মনে করে ঘুমিয়ে পড়লে যে ডিসটোপিয়াটা ধরুন আমার আপনার জীবনেও সত্যি হয়ে যেতে পারে।

এবারে চলুন টপাটপ কয়েকটা খুব জরুরি স্ট্যাটিসটিকসে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক :

১. ভারতে বায়ুদূষণ আপাতত একটা হেলথ্ কনসার্ন বা শারীরিক মাথাব্যথার কারনে পরিণত হয়েছে।

২. সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের হিসাব মতো, ভারতে প্রতি ১০০০০ শিশুর মধ্যে ৮.৫ জন বায়ুদূষণের কারণে মারা যায়।

৩. WHO বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মত ২০১৬ সালে ভারতের এক লাখ শিশু শুধু বায়ুদূষণের কারণে মারা গেছে।

৪. গড় আয়ু কমে গেছে ২-৩ বছর।

৫. গ্রিণপিসের মতো বিশ্ববিখ্যাত এন জি ও র মতে, বিশ্বের সবথেকে দূষিত তিরিশটা শহরের বাইশটা ভারতে।

৬. দিল্লি পৃথিবীর দূষিততম রাজধানী।

৭. এখন দিল্লির বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া আর দিনে বাইশটা সিগারেট খাওয়া সমান ব্যাপার।

একদম শুরুতে যে ছবিটার কথা বলা হয়েছে, তার গল্পটা আগেই বলেছি ডিসটোপিয়া। ডিসটোপিয়া ইউটোপিয়ার ঠিক উলটো, মানে এমন একটা কাল্পনিক পৃথিবী যেখানে সবকিছুই বিশৃঙ্খল, লাগামছাড়া। এই লাগামছাড়া পৃথিবীতে আমাদের গল্পের নায়ক অক্সিজেন স্মাগল্ করে। কারণ ২০৬৭ সালের সেই পৃথিবীতে একটা জিনিসই সহজপ্রাপ্য। কার্বন। ছবির নামও তাই কার্বন।

এবারে একবার আগের পরিসংখ্যানগুলোর সাথে ডিসটোপিয়াটা মিলিয়ে দেখুন। ভাবনাটা সহজ, না?

দিল্লির যমুনা নদী কেমিক্যাল ফেনায় সাদা হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে পারটিক্যুলেট ম্যাটার সাংঘাতিক পরিমাণে। ঠিক এক্ষুণি অক্সিজেন স্মাগল হয়ত শুরু হয়নি, তবে দুষ্প্রাপ্য অথচ জরুরি জিনিস মাত্রই ব্যবসায়িক ভাবে লাভজনক। দিল্লিতেও এটাই হয়েছে। অক্সি পিওর বলে নিউ দিল্লির সাকেতে একটি আউটলেট সদ্য তৈরি হয়েছে, তাদের কাজ অক্সিজেন বিক্রি করা।

আর্যবীর কুমার ও মার্গারিটা কুরিতসায়না নামে দুজন উদ্যোগপতির ব্রেন চাইল্ড হল অক্সি পিওর। আপাতত লেমনগ্রাস, ইউক্যালিপটাস্, অরেঞ্জ, পিপারমিন্ট, সিনামনের মতো সাতরকম ফ্লেভার যুক্ত অক্সিজেন পাওয়া যায় এখানে। বায়ুমন্ডলীয় চাপকে কাজে লাগিয়ে অক্সিজেন তৈরি করছেন অক্সি পিওরের কর্ণধাররা। ক্রেতাদের জন্য আছে ডিজপোজেবল টিউব। প্রতি পনেরো মিনিট বিশুদ্ধ অক্সিজেনের জন্য দাম লাগছে ২৯৯ টাকা। ফ্লেভার অনুযায়ী অবশ্য দামের ওঠানামা আছে। অক্সি পিওরের প্রধান কর্মী বনি ইরেঙ্গবামের মতে, দিনে পনেরো থেকে কুড়ি জন ক্রেতা প্রায় রোজই আসছেন।

অক্সিজেন পার্লারের প্রথম কল্পনাটা আজকের নয়। জোসেফ প্রিস্টলে ১৭৭৪-এ অক্সিজেন আবিস্কার করেন। তখন অবশ্য অক্সিজেন বলা হত না, নাম দেওয়া হয়েছিল ডিফ্লোজিসটিকেটেড গ্যাস। আর ঠিক দুবছর পর ১৭৭৬ সালে থমাস্ হেনরি বলে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলো ভেবে ফেললেন একদিন হয়ত এই নতুন গ্যাসটাই ফ্রেঞ্চ ওয়াইনের মতোই কেতাদুরস্ত হোটেল-সরাইখানায় বিক্রি হবে। এটাই শেষ নয়। ১৮৭০- এর জুল ভের্নের ‘অ্যারাউন্ড দ্য মুন’ নভেলেও একটা অক্সিজেন রুমের কথা বলা হয়েছিল। ভাঙা স্বাস্থ্যের মানুষেরা সেখানে বুক ভরে অক্সিজেন নেবেন। সত্যিকারের অক্সিজেন পার্লার প্রথম শুরু হয় ১৯৯৬ সালে কানাডার টরেন্টোতে। তারপর উত্তর আমেরিকার নানা জায়গায় ছড়িয়ে যায়।

সাধারণ বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ ২০.৯%। তবে অক্সিজেন পার্লারের অক্সিজেন তৈরি করার জন্য ব্যবহার করা হয় অক্সিজেন কন্সেন্ট্রেটর। বাতাসের ওই ২০.৯% -এর থেকে অনেকটা বেশি অক্সিজেন সমৃদ্ধ এই বাতাসের একটা থেরাপিইটিক বা রোগনিরাময়গত ভূমিকা রয়েছে। শরীরের বিষাক্ত পদার্থগুলো নির্মূল করা, স্মৃতি শক্তির বিকাশ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি- এরকম অনেকগুলো উপকার করে অক্সিজেন।

এবার আরো একটা ছোট্টো তথ্য দিই! বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের শতকরা পরিমাণ কত জানেন, ০.০৩৯১%! অক্সিজেন ২০.৯%। কার্বন বলে যে ছবিটার কথা প্রথমে হচ্ছিল সেই পৃথিবীতে অনেক উন্নয়নের পর একটা জিনিসই ফ্রি পাওয়া যায়। কার্বন। অক্সিজেন কিনতে হয়। জলের জন্য মানুষ খুন হয়।

ডিসটোপিয়ার শুরুটা যদি সত্যি না করতে চান, বিকল্প প্লিজ এখন থেকেই ভাবতে শুরু করুন।

লেখক- শুভজিত কর চৌধুরি

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.2 / 5. Vote count: 9

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

গণিতে চিকার নতুন উদ্ভাবন

4.2 (9) চিকা ওফিলি(Chika Ofili) – সম্প্রতি ১২ বছরের এই বালক চমকে দেবার মতো গণিতের একটি নতুন বিষয় উদ্ভাবন করে ফেলেছে। উদ্ভাবনের বিষয়টি নতুন না হলেও পদ্ধতিটি একবারই নতুন। আমরা যখন ছোটবেলায় বিভাজ্যতার নিয়ম শিখেছি বা এখনও যারা শিশুদের এই বিষয়টি শেখানোর দায়িত্ব পালন করেন তারা একটু খেয়াল করে দেখবেন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: