বাওবাব গাছ ও তার ফুল

জন স্কট (1836–1880) ছিলেন একজন স্কটিশ বোটানিস্ট। 1859 থেকে 1864 সাল পর্যন্ত এডিনবার্গের Royal Botanic Garden কাজ করার পর তিনি ভারতে আসেন এবং 1865 সালে শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে কিউরেটর নিযুক্ত হন। ডারউইন তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদ বিষয়ে তিনি বিশদ গবেষণা করে উদ্ভিদবিদ্যার জগতে অমর হয়ে আছেন।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে গঙ্গার ধারে ওয়ালিচ এভিনিউ-এ উদ্ভিদ গবেষকদের জন্য যে গেস্ট হাউস আছে, তার গা ঘেঁষে চলা রাস্তাটির নাম এই সাহেবের নামে, স্কট এভিনিউ। (আমরা সেই রাস্তার নাম দিয়েছি বুদ্ধ সরণি। কারণ, এই পথের দু’পাশে যত বুদ্ধ নারিকেলের গাছ, সারা বাগানে তেমন আর কোথাও নেই। বাক্স বাদামের মতো সেই ফলগুলি থরে থরে ছড়িয়ে পড়ে থাকে এই পথের সর্বত্র। নতুন বর্ষার জল পেয়ে শত শত চারা বেরিয়েছে)।
সেই রাস্তায় একটু এগিয়েই বাঁ দিকে লোহার জালঘেরা এক প্রকান্ড বৃক্ষ চোখে পড়ে। যাকে দেখেই চেনা যায়, বোঝা যায় সে সবার থেকে আলাদা, সে বৃক্ষকূলের অধিপতি।
সে একটি আফ্রিকান বাওবাব গাছ। বাংলা ও হিন্দিতে নাম কল্পবৃক্ষ।
ভোরবেলা যাঁরা বাগানে হাঁটতে, ব্যায়াম করতে আসেন তাঁরা অনেকেই এই গাছটির কাছে এসে হাত জোড় করে, মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করেন। অনেকে বাড়ি থেকে ফুল, বেলপাতা এনে গাছটির পূজা করেন। মানুষের কত রকমের অভাব, দুঃখ, রোগব্যাধি। অসহায় মানুষ কল্পবৃক্ষের কাছে নিজের কথা বলে ভার লাঘব করেন, যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে চান। পরপর কয়েকজনকে ওই আত্মনিবেদনের ভঙ্গিতে দেখলে অজান্তে নিজের মাথাটিও নত হয়ে আসে।
সেসব কথা থাক। গাছের কথা বলি।
বাওবাব গাছে এখন ফুল ফোটার সময়। এই প্রথম আমি এর ফুল দেখলাম। উঁচু উঁচু ডালে নানান মাপের কুঁড়ি, ফুল ও ফল ফলে আছে। টুপটাপ করে গোটা গোটা কুঁড়ি ঝরে পড়ছে কত। পাখিতে বোঁটা কেটে ফেলে দিচ্ছে। ফুলও পড়েছে কিছু।
একটি পরিণত আস্ত কুঁড়ি কুড়িয়ে নিয়ে তার পুরু বৃতি আস্তে আস্তে খুললাম। আহা! এ রূপ কোনোদিন দেখিনি। এমন স্পর্শসুখ কোনোদিন পাইনি।
হাজার হাজার পুংকেশর সযত্নে ভাঁজ করে কে যেন সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। কি নরম, কি তুলতুলে!হাত ছোঁয়াতেই রেশম মথের স্পর্শানুভূতি হলো।অজস্র রেণু হাতে মাখামাখি হয়ে গেল। এমন পেলব বুঝি আর কিছু হয় না!
তাদের সবার উপরে পাক খেয়ে শুয়ে আছে গর্ভদন্ডটি। কি অপূর্ব তার বাহার। সেই তো ফুলের মা, সেই তো সৃষ্টির মূল। পাক খুলে তাকে জাগাতে ইচ্ছা করলো না। মনে হলো, ও ঘুমিয়েই থাক।
ক’দিন পরেই বাওবাবের ফল ফলবে। লম্বা লম্বা লাউয়ের মতো ঝুলে থাকবে ডালে ডালে। তার স্বাদ নাকি টকটক, মিষ্টিমিষ্টি। মধ্যপ্রদেশের মান্ডুতে একে বলে বড়ি ইমলি বা খোরাসানি ইমলি।

ফাল্গুনী মজুমদার

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: