সেভেন গোল্ডেন ক্যান্ডলস্টিকস

এই ফুলগুলোর নাম সেভেন গোল্ডেন ক্যান্ডলস্টিকস/এমপারারর্স ক্যান্ডলস্টিকস/খ্রিস্টমাস ক্যান্ডলস্টিকস ইত্যাদি। দাদ জাতীয় চর্মরোগ নিরাময় বা প্রতিরোধ বা প্রতিষেধক গুণের জন্য এর আরেক নাম ringworm shrub, বাংলায় দাদমর্দন।
বৈজ্ঞানিক নাম Senna Alata বা ক্যাসিয়া আলাটা।

এর ফলগুলি শুঁটির মতো, ভিতরে ৫০/৬০ টি তিনকোণা চ্যাপ্টা বীজ থাকে। সাংঘাতিক তাদের জীবনীশক্তি। যেকোনো প্রতিকূল অবস্থাতেও অঙ্কুরিত হয়।
রেল লাইনের ধারে, পরিত্যক্ত ভিজে জায়গায় এই গাছ অপ্রতিরোধ্যভাবে বেড়ে চলে। আর ঠিক তখনই এর আসল রূপ। একদম খাঁটি সোনার রঙ আর পুষ্পবৃন্তের সবচেয়ে লম্বাটিকে মাঝে রেখে পাশে অন্য স্তবকগুলি ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে ফুটে ওঠে, অনেকটা বাতিদান বা victory stand এর মতো। সেই থেকেই এই নাম।
আমাদের national emblem যেমন অশোক স্তম্ভের সিংহ, তেমনি ইহুদিদের দেশ ইসরায়েলের এমব্লেম হল এই সেভেন গোল্ডেন ক্যান্ডলস্টিকস।
এর নামকরণের একটি গল্প আছে।

ইহুদিদের আদি পুরুষ ছিলেন আব্রাহাম। তাঁর প্রবর্তিত ধর্মের প্রথম প্রফেট হলেন মোজেস। তিনি মিশরীয় রানীর দত্তক পুত্র হিসাবে বড়ো হন এবং পরবর্তীকালে হিব্রু ছাড়াও খ্রিষ্টান, ইসলাম, বাহাই ইত্যাদি ধর্মমতের আদি পুরুষ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
তিনি যখন আফ্রিকা মহাদেশ থেকে এশিয়া ভূখণ্ডে এলেন তখন তাঁর সঙ্গী ছিল একটি বাতিদান বা প্রজ্বলিত সপ্তপদী। এশিয়া মাইনরের দুর্গম নির্জনে তিনি এই প্রজ্বলিত অগ্নি স্থাপন করে ঈশ্বরের আরাধনা করতে থাকেন। সেই আগুন একদিন Judaism এর প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁরা অগ্নি-উপাসক।
সে যাক। তার বহু পরে জেরুজালেমে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে সেই সোনার বাতিদান বা তার অগ্নি পূজিত হতে থাকে। শোনা যায় সেই বাতিদান ২৪ ক্যারাট খাঁটি সোনায় নির্মিত এবং তার ওজন ছিল প্রায় ৪৫ কেজি।
হিব্রু বাইবেলে আছে, সেন্ট জন বলছেন, ” And I turned to see the voice that was speaking with me. And having turned, I saw seven lampstands.” অর্থাৎ, সেই বাতিদানই হল স্বয়ং ঈশ্বর।
সেন্ট জন আরো বলেছেন, “…..And I heard behind me a loud voice like the sound of a trumpet, saying, ‘Write in a book what you see, and send it to the seven churches : to Ephesus and to Smyrna and to Pergamum and to Thyatira and to Sardis and to Philadelphia and to Laodicea.”
আমাদের দেশে মহাভারতের যুগে যেমন ষোড়শ মহাজনপদ ছিল, ওদেশে তেমনি ছিল সাতটি রাজ্য যেখানে সমমনস্ক মানুষ যাঁরা একই দেবতায় বিশ্বাস করেন ও একই কর্মে নিযুক্ত থাকেন, তাঁরা বসবাস করতেন। তখনকার দিনে সেই রাজ্য গুলিকে বলা হতো church. যুগে যুগে অর্থ বদল হয়ে আজ আমরা চার্চ বলতে ইট পাথরে গড়া একটি ইমারত বা ভবনকে বুঝি, যেখানে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানানো হয়, তাঁর বন্দনা করা হয়।
সে যাক।

তখনকার দিনে সেদেশে ৭ (সাত) অঙ্কটি ছিল পবিত্রতার প্রতীক, ছিল সম্পূর্ণতার প্রতীক। ঈশ্বর সর্বদাই perfect, সর্বদাই absolute, তাই বাতিদানের অগ্নিশিখা সাতটি।
সোনাও তেমনি শুধু মহার্ঘ্য নয়, সে বিশুদ্ধতারও প্রতীক। তাই বাতিদান হেমময়।
৪৫৫ অব্দে ভ্যান্ডালরা মোজেসের সেই বাতিদানটি লুট করে তাদের রাজধানী কার্থেজে নিয়ে যায়। তারও প্রায় একশ বছর পর বাইজেন্টাইন সৈন্য ৫৩৩ অব্দে তা উদ্ধার করে কনস্টান্টিনোপোলে নিয়ে আসে এবং পরে জেরুজালেমের মন্দিরে ফিরিয়ে দেয়। কথিত আছে, ৬১৪ অব্দে পারস্যের সৈন্যরা সেটি লুন্ঠন করে ধ্বংস করে ফেলে।
তাই আজ আর সে বাতিদান দেখার উপায় নেই। তবে অন্ততঃ দশটি ধর্মমতের মানুষ এই বাতিদানকেই ঈশ্বর মনে করে আজও পূজা করে। তাই সেই সব মন্দিরে আজও তার প্রতিরূপ দেখা যায়।
ভারতে পার্শিরা অগ্নিউপাসক। কলকাতায় তাদের অগ্নি মন্দির আছে। সেখানে সোনার সপ্তবাতিদান আছে।

ফাল্গুনী মজুমদার

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: