মানি প্ল্যান্ট

আমি তখন খুব ছোট আমার বড়দি কোথা থেকে একদিন একটুকরো লতানে গাছ নিয়ে আসে। কি সুন্দর পানের মতো পাতা, তাতে আবার ছিটছিট। লতার গাঁটে গাঁটে একটি দুটি কচি শিকড় লেগে আছে।
তার নাম নাকি মানি প্ল্যান্ট। সে গাছ বাড়িতে থাকলে টাকা উপচে পড়বে। আমাদের তখন ভীষণ দারিদ্র। যদি কিছু সুরাহা হয়।
খুব যত্ন করে গাছটি একটি হরলিক্স এর বোতলে জল দিয়ে রাখা হল। জানালার গরাদেতে পেটো দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হলো। না হলে বাড়বে কি করে!
গাছটি অনুকূল পরিবেশে বেশ বাড়তে লাগল। পরবর্তীকালে সে গাছে আমাদের সারা বাড়ি ছেয়ে ফেলে। বাগান ছাপিয়ে পুরানো বাড়ির দেওয়াল বেয়ে উঠতে থাকে। কি বড় বড় পাতা, কি মোটা তার লতা।
যখন এসব চলছে, আমাদের সংসারে দারিদ্র কমা দূরে থাক, আরো প্রকট হয়েছে। শেষটায় অনেক ঝক্কি ঝঞ্ঝাট করে সেই আগাছা নির্মূল করে কেটে ফেলা হয়। সে যাক।

শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে এই গাছটিরও নাম নাকি মানি প্ল্যান্ট বা মানি ট্রি। যদিও এ লতানে নয়, বরং মজবুত একটি বৃক্ষ। সারা পৃথিবীতে এই নামেই পরিচিত। এটি আদতে মধ্য আমেরিকার জলাভূমি অঞ্চলের গাছ।
গার্ডেনের লার্জ পাম হাউস, যার ভিতর সেই দুষ্প্রাপ্য জোড়া নারকেলের ফলন্ত গাছটি আছে, সেই পাম হাউসের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালে সামনেই একটি ঘন সবুজ পাতার মাঝারি একটি গাছ চোখে পড়ে। তাতে অপূর্ব সুন্দর লাল লাল ফুল ফুটে আছে। সেই হল মানি ট্রি। ভালো নাম পাচিরা একোয়াটিকা (Pachira aquatica).
আজ এই গাছটি সম্পর্কে লিখি।

বহুদিন আগে চিন দেশে এক দরিদ্র চাষি ঈশ্বরের কাছে একদিন প্রার্থনা করে, প্রভু, আমার দারিদ্র মোচন করো। সেই দিনই সে একটি নতুন দেখা চারা গাছ খুঁজে পায় এবং সেটি বাড়িতে নিয়ে এসে পুঁতে দেয়। সে গাছের পাতার ভারী বাহার। আমাদের যেমন সপ্তপর্নী বা ছাতিম, সেইরকম।
গাছ একদিন বড় হল, তাতে কুঁড়ি ধরল। বাবা, সে সাংঘাতিক কুঁড়ি। এত্ত বড় বড়, লম্বা কলার মতো দেখতে। তারপর একদিন, সেই কুঁড়ির উন্মোচন হতে লাগল। সে আর এক রূপ। ঠিক যেমন করে কলার খোসা ছাড়ানো হয়, ঠিক তেমনি। তারপর ফুল। সে তো আরো সুন্দর ছোট একটি রঙিন চামর যেন।
গ্রামের লোক এলো চাষির গাছ দেখতে, ফুল দেখতে। মুগ্ধ হলো সবাই। এখন সবার চাই সেই গাছের চারা। তো একদিন গাছের বীজ থেকে অনেক চারা বেরোল। চাষি সেই চারা বিক্রি করে কদিনেই বেশ পয়সা করে ফেলল।
লোকে গাছটির নাম দিল মানি ট্রি।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে গাছটির ফুল দেখে আমরাও মুগ্ধ। গাছের নিচে বৃষ্টির জল পেয়ে চারাও হয়েছে অনেক। কিন্তু আমরা আনিনি। ছোট বেলার মানি প্ল্যান্টের কথা মনে আছে যে।
ফুলের ওই ঝালর গুলি আসলে তার পুংদন্ড, stamen. তাদের মাথায় আছে পরাগধানী।

মানি ট্রির ফলগুলিও দেখার মতো মেহগনির ফলের মতো। যেন শক্ত কাঠের তৈরি।
এই ফলের আবার সুন্দর সব নাম আছে। কেউ বলে মালাবার চেস্টনাট, কেউ বলে ফ্রেঞ্চ বা গিয়েনা চেস্টনাট। সেই বাদাম কাঁচা বা ভাজা বা গুঁড়িয়ে ময়দা করে খাওয়া যায়। খেতে নাকি আমাদের চিনে বাদামের মতো। আমরা খাওয়ার ঝুঁকি নিইনি। কি জানি, কি বলতে কি হয়ে যায়!
আর একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো এর গুঁড়ি। সে দেখতে একদম পাকানো বিনুনির মতো। এবং সেটিই এর বিউটি। লোকে এই গাছ অনেক দাম দিয়ে কিনে টবে বসান বাড়ি সাজানোর জন্য। সে শুধু পাতার বাহার বা ফুলের শোভার জন্য নয়, তার বিনুনির মতো কাণ্ডের শোভার জন্যও।

ফাল্গুনী মজুমদার

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: