ঝুমকোলতা

@
5
(2)

“বাঁধিনু যে রাখী পরানে তোমার
সে রাখী খুলো না, খুলো না, খুলো না।”

কতবার শোনা গান, তবু এর মূর্ছনা এত গভীর, এত কাছের!
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি সুন্দর করে লিখেছিলেন চন্দননগরে সেই মোরান সাহেবের বাংলোর কাহিনি। আহা, সে আর ভুলতে পারিনা।
জ্যোতিদাদা গেছেন কলকাতায়। ওই বিশাল প্রাসাদে তখন দুটি তরুণ তরুণী, রবি ও নতুন। একদিন তাঁরা বেড়াচ্ছেন বাগানে।
তখন নববর্ষার কৃষ্ণ আকাশ, বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। হঠাৎ করেই ঝমঝমিয়ে শুরু হল বরিষণ। দৌড়ে গিয়ে তাঁরা দাঁড়ালেন একটি কদম গাছের নীচে। রবির কণ্ঠে গান এল –

“এসো নিপবনে ছায়া বীথিতলে,
এসো করো স্নান নব ধারাজলে।
দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ
পরো দেহ ঘেরি মেঘনীল বেশ
কাজলনয়নে যুথীমালা গলে
এসো নিপবনে ছায়া বীথিতলে।”

সে বাগানে ছিল ঝুমকোলতার ফুল। গ্রীষ্ম পেরিয়ে বৃষ্টি ভেজা দিনেও অবিশ্রান্ত ফুটে চলেছে ঝুমকোলতার ফুলগুলি।

ঝুমকো লতার ফুল দেখলেই আমার সেই রাখীর কথা মনে পড়ে। রবি রাখী বেঁধেছিলেন প্রানের পরে।
ফুলটি যেন সত্যিকারের একটি রাখী। সত্যি সত্যিই তাই এর আরেক নাম রাখী ফুল। রাধিকা নাচন, পঞ্চ পাণ্ডব, কৃষ্ণকমল ইত্যাদি আরো অনেক নাম আছে। কিন্তু সেসব নামের পিছনে যে গল্প, সে আমার ভালো লাগেনা। তাই, রাখীই থাক।

সেই রাখী ফুল, সেই লাল ঝুমকোলতা ফুটেছে আমাদের বাড়িতে।
আমি বসে বসে ওদের মুখের দিকে চেয়ে থাকি। কত কথা আসে মনে।
এর ইংরাজি নাম Passion flower, Christ’s crown, Clock flower ইত্যাদি।
বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora racemosa. এর রং রক্তের মত লাল।
এরই একটি কালচে লাল রঙের হয়। সে হল Passiflora coccinea.
আর আছে বেগুনি (Passiflora incarnata), নীল (Passiflora caerulea). এ ছাড়া আছে আরো অজস্র প্রজাতি।

গাছটির আদি নিবাস মেক্সিকোয়। ঝুমকোলতা বহুদিন বাঁচে। মাটিতে বা কোনো অবলম্বন বেয়ে উঠে যায়।
পাতাগুলি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত (lobed) ও pointed. পাতার রং সবুজ। ফুলের কুঁড়ি সবুজ। কিন্তু বৃতির ভিতরের দিক লাল। ফুল ফোটার পরে বৃত্যংশগুলি আলাদা করে চেনা মুশকিল। পাপড়ি ও বৃতি একাকার হয়ে যায়। তবে বৃত্যংশগুলির আগার গঠন একটু আলাদা।সেখানে ইন্টার লকিং চিহ্ন থাকে। কুঁড়ি অবস্থায় তারাই ফুলকে সুরক্ষিত রাখে।
সুগন্ধী ফুলে পাপড়ি পাঁচটি। কেন্দ্রে আছে সবুজাভ হলুদ রঙের পাঁচটি পুংদন্ড, আগায় তাদের পরাগধানী। যেগুলি আবার আশ্চর্য এক পদ্ধতিতে পুংদণ্ডের সাথে এমনভাবে লাগানো থাকে যে সামান্য হওয়ার দোলাতেও তারা নড়াচড়া করতে পারে।
পুংদন্ডগুলির কেন্দ্রে স্থাপিত আছে একটি ঘট। সেটি ফুলের ডিম্বাশয় বা গর্ভ। তা থেকে নির্গত হয়েছে গর্ভদন্ড যা আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রতিটির মাথায় গর্ভমুন্ড।
ফুলের কেন্দ্র থেকে ক্রমশ বাইরের দিকে তিনটি সমকেন্দ্রীয় স্তরে সাজানো আছে ফুলের যত সজ্জা। পরিভাষায় তার নাম করোনা। তার বাহারের তুলনা হয় না। সে যেমন নরম, তেমনি বর্ণাঢ্য।

রাখী হয়ত পতঙ্গভূক। কারণ এর মঞ্জরীপত্রে থাকে আঠা। কোনো পতঙ্গ সেখানে সহজেই আটকা পড়ে মরে যায়। এই কারণেই এ ফুলে পোকা লাগে না। পরাগমিলনের জন্য এর কোনো সাহায্যের দরকার হয় না। গর্ভমুন্ডগুলি নিজেরাই বাঁক নিয়ে পরাগধানীতে পৌঁছায়।

রাখীর ফুল ঝরে গিয়ে সবুজ রঙের ডিম্বাকৃতি ফল হয়। ফলগুলি পাকলে কালো। এবং আঙুরের মতো রস টলটলে। ফলের মধ্যে কয়েকটি বীজ হয়, যা থাকে নতুন চারা হয়।
ঝুমকো কানে পরার শৌখিন অলংকার। কিন্তু ঝুমকোলতার ফুল চড়া রোদ ভালোবাসে। যত রোদ, তত রং, তত তার বাহার।

ফাল্গুনী মজুমদার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বরুণ গাছ ও তার ফুল

5 (2) অপভ্রংশ নাম বর্ণা। ইংরাজি নাম Temple plant, sacred garlic-pear ইত্যাদি। আর বৈজ্ঞানিক নাম ক্রেটিভা রিলিজিওসা (Crateva religiosa). মানুষের বিশ্বাস এই ফুল ফুটলেই বৃষ্টি আসবে, দূর হবে অনাবৃষ্টির কষ্ট। বরুণদেব হলেন বৃষ্টির দেবতা, তাই ফুলটির এই নাম। বরুণ গাছ ভারত, বাংলাদেশ সহ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্বাভাবিক উদ্ভিদ। নদী […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: