একের মধ্যে দুই

@
4.4
(9)

Selftution-Classification-of-Annimal-Kingodm-e1564743614545.jpg

একাধিক জীবের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে জীবজগৎ। উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব ইত্যাদির এক সমাহার হল জীবজগৎ। জীবভাণ্ডারের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে প্রাণীরা। ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিভিন্ন প্রাণীরা মিলে গড়ে তুলেছে প্রাণীজগতের জীববৈচিত্র্য।

shutterstock_221039452.jpg

 

মেরুদণ্ডী,অমেরুদণ্ডী,ছিদ্রাল, অঙ্গুরীমাল, সন্ধিপদী, পতঙ্গ, মৎস্য, উভচর, সরীসৃপ,পক্ষী, স্তন্যপায়ী ইত্যাদি একাধিক শ্রেণির প্রাণীরা প্রকৃতিতে রয়েছে যারা আচরণগত, গঠনগত, অভিযোজনগত বৈষম্য প্রদর্শন করে। পাখির ‘গান’, মাকড়সার জাল বোনা, শুঁয়োপোকা থকে প্রজাপতিতে রূপান্তর, কিউইয়ের পাখি হয়েও উড়তে না পারা, ক্যাঙ্গারুর মারস্যুপিয়ামের মধ্যে তার শাবক প্রতিপালন করা, মৌমাছির ওয়ানোল নাচ, হনুমানের লাঙ্গুল, আর্মি অ্যান্টের গ্রুপ-লিভিং, মোল র‍্যাটের অ্যালটুরিজম আমাদের বিস্মিত করে। এই জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করেছে প্রাণীজগৎকে, যা খুলে দেয় প্রাণীবিদ্যার নতুন এক দিগন্ত। আমাদের এমন কিছু কিছু চেনা জীব রয়েছে যাদের আমরা এক ও অভিন্ন মনে করি। কিন্তু তাদের আকার ও আকৃতি, শারীরবৃত্তীয় গঠন, জীবনযাপন, আচরণগত বৈশিষ্ট্যাদি অনুধাবন করলেই বোঝা যায় যে তারা প্রত্যেকে একে অন্যের থেকে আলাদা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন প্রজাতি এবং এই প্রাণীজগতের বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ। এইরকম কিছু জীবের কথা আজ আমরা আলোচনা করব।

pjimage1.jpg

● হেয়ার এবং র‍্যাবিট :

হেয়ার এবং র‍্যাবিট এই দুটিকেই আমরা খরগোশ বলে চিনি, কিন্তু একটু মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করলেই আমরা বুঝতে পারব যে এই দুটি জীব সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রজাতি। এই দুই স্তন্যপায়ীই একই অর্ডার Lagomorpha – র অন্তর্ভুক্ত। র‍্যাবিট শাবকদের বলা হয় বাপি যারা লোমহীন ও বন্ধ চোখ নিয়ে জন্মায়। সুতরাং তারা সম্পূর্ণভাবে তাদের মায়ের উপর নির্ভরশীল হয়। হেয়ার শাবকদের বলা হয় Leverets যারা পশম সমেত জন্মায় এবং চোখ খোলা থাকে। র‍্যাবিটদের তুলনায় হেয়ার আকারে বড় এবং দ্রুততর বেগসম্পন্ন হয়। হেয়ারদের কান ও পা র‍্যাবিটদের তুলনায় লম্বা দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট হয়। হেয়ারের পশমে কালো দাগ দেখা যায় এবং র‍্যাবিটদের দেহে সাধারণত বাদামি পশম দেখা যায়। হেয়ারের পশ্চাৎপদ তুলনায় লম্বা হয়। র‍্যাবিট সাধারণত গৃহপালিত হয়। খুব সহজেই এদের পোষ মানানো যায়। অন্যদিকে হেয়ার বন্য প্রকৃতির হয়। খাদ্যাভাসগত দিক দিয়ে হেয়ার তুলনায় শক্ত সবজি খাবার পছন্দ করে। কিন্তু র‍্যাবিটের পছন্দ নরম ঘাস ও সবজি। র‍্যাবিট হল সোশ্যাল অ্যানিম্যাল এবং এরা গ্রুপ লিভিং করে। র‍্যাবিট নরম মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করে। অন্যদিকে হেয়ার সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে এবং বড় বড় ঘাস ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে বাসা বানিয়ে বসবাস করে। এই কতকগুলি বৈসাদৃশ্যের সাহায্যে সহজেই বোঝা যায় দেখতে অনেকটা এক হলেও র‍্যাবিট ও হেয়ার দুটি আলাদা প্রজাতির জীব।

I_See_You.jpg
● চিতা এবং চিতাবাঘ বা Leopard :

চিতা ও চিতাবাঘ বা লেপার্ড এই দুটি স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখতে একরকম হলেও সম্পূর্ণ দুটি আলাদা প্রজাতির প্রাণী। চিতা দেখা যায় আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায়। চিতার দেহ হালকা,মাথা ছোট এবং পাগুলি বড় হয়ে থাকে। অন্যদিকে লেপার্ড দেখতে পাওয়া যায় আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব চিনে। চিতা শিকার করে দিনের বেলায়। চিতা প্রথমে শিকারকে লক্ষ্য করে এবং তারপর দু-তিনটি চিতা মিলে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরা মূলত শিকারের গলায় আঘাত করে। অত্যন্ত দ্রুত বেগে দৌড়ানো চিতার একটি বৈশিষ্ট্য। অনেকক্ষেত্রে চিতার গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ মাইলেরও (৯৬ কিমি) বেশি হয়ে থাকে। অন্যদিকে লেপার্ড একা একা এবং খুব ধীরে ধীরে চুপিসারে শিকার করে। এরা হল নিশাচর শিকারি। শিকারের পিছন থেকে ঘাড়ে কামড় দিয়ে মেরে ফেলতে পারে। চিতা গাছে উঠতে অক্ষম। কিন্তু লেপার্ড খুব সহজেই মুখে করে তার শিকার নিয়ে গাছে উঠতে পারে। লেপার্ডের দেহের ওজন ও আকৃতি তুলনায় বড় ও বেশি এবং এদের ক্যানাইনের (কৃন্তক) দাঁতও আকারে বড় হয়। লেপার্ডের পায়ের ছাপও আকারে বড়। লেপার্ডের চোয়াল এত শক্তিশালী যে খুব সহজেই শিকারের হাড়গুলি ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিতে পারে। লেপার্ডের সারা দেহে কালো চাকা চাকা দাগ থাকে এবং চোখের নীচে দুটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি সাদা দাগ দেখা যায়। চিতার দেহেও কালো ছোপ থাকে কিন্তু চিতার দেহে মুখমণ্ডলে দুপাশে দুটি কালো দাগ থাকে যা চোখের পাশ থেকে মুখের কোণা পর্যন্ত বিস্তৃত। চিতা কখনও গর্জন করে না, তার পরিবর্তে মুখ দিয়ে বিভিন্ন রকম শব্দ সৃষ্টি করে ভাব বিনিময় করে। লেপার্ড সিংহের মত গর্জন করতে পারে যদিও তার প্রাবল্য সিংহের থেকে কম।

turtlescanma.jpg
● টর্টয়েস এবং টার্টল :

টর্টয়েস এবং টার্টল এই দুটিকেই আমরা কচ্ছপ হিসাবে চিনি। কিন্তু এই দুটির বিন্যাস-বিধি পর্যবেক্ষণ করলেই আমরা এদের পার্থক্যটি বুঝতে পারব। দুটিই সরীসৃপ। এদের অর্ডার হল Testudines। কিন্তু এদের ফ্যামিলি পৃথক। টর্টয়েস-এর ফ্যামিলি হল Testudinidae এবং টার্টল-এর একাধিক ফ্যামিলি রয়েছে। যথা :- Carettochelyidae, Dematemydidae ও Emydidae। এদের মূল পার্থক্য হল টার্টল জলে থাকে এবং টর্টয়েস মূলত স্থলে থাকে। কিন্তু এরা সকলেই ডিম পাড়ে স্থলে। টর্টয়েস বেশি দেখা যায় এশিয়া ও আফ্রিকাতে। কিন্তু টার্টল আফ্রিকা এবং আমেরিকাতে বেশি সংখ্যায় পাওয়া যায়। ৯০ থেকে ১২০ দিন ইনকিউবেশনের পর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা নির্গত হয় তখন এক বিশেষ আচরণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।টর্টয়েস তার বাচ্চাদের জন্মের পর প্রায় ৮০ দিন পর্যন্ত দেখাশোনা করে। কিন্তু টার্টল-রা তা করে না।টর্টয়েসদের শেল(Shell) ডোম (Dome)–এর ন্যায় আকার বিশিষ্ট এবং ছোটো। আর অপর দিকে টার্টলদের শেল(Shell)টি হল চ্যাপটা এবং তুলনায় কিছুটা হালকা। টর্টয়েস–এর পাগুলি বাঁকানো এবং দেহের সাথে সরাসরি যুক্ত। টার্টল – এর পাগুলি হল লিপ্তপদ এবং লম্বা নখযুক্ত যা তাদের জলে সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। কিছু কিছু টার্টল–এর আবার ফ্লিপার দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণত টর্টয়েসরা তৃণভোজী (Herbivores) হয়ে থাকে। অন্যদিকে টার্টলরা সর্বভুক (Omnivores) হয়ে থাকে। টার্টলদের ডিম অন্যান্য সরীসৃপদের তুলনায় নরম চামড়ার মত হয়। ডিম ফুটে নির্গত বাচ্চাগুলি মায়ের তৈরি করা বাসার মধ্যেই থাকে। অপরদিকে ফিমেল টর্টয়েস-রা বড় বড় গর্ত খোঁড়ে এবং তার মধ্যে ডিম পাড়ে। ডিমগুলি পিংপং বলের ন্যায়।টার্টলদের গড় আয়ু ২০ থেকে ৪০ বছর। কিন্তু কিছু কিছু সামুদ্রিক টার্টল পাওয়া যায় যাদের গড় আয়ু ৬০ থেকে ৭০ বছর হয়। অন্যদিকে টর্টয়েসদের গড় আয়ুষ্কাল ৬০ থেকে ৮০ বছর বা তার অধিক। কিছু কিছু টর্টয়েস পাওয়া গেছে যাদের গড় আয়ু ২০০ বছরেরও অধিক। সুতরাং বলা যায় টর্টয়েস-রা  টার্টল-দের থেকে দীর্ঘজীবী হয়। এই দুটি প্রাণীকেই আমরা পুষতে পারি; কিন্তু টর্টয়েস পোষা টার্টল- দের তুলনায় কষ্টসাধ্য।

maxresdefault.jpg
● ক্রোকোডাইল এবং অ্যালিগেটর :

ক্রোকোডাইল ও অ্যালিগেটর এই দুটি প্রাণী সরীসৃপ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং দেখতে অনেকটা এক হলেও এদের এমন কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা প্রমাণ করে যে এই দুটি সম্পূর্ণ দুই আলাদা প্রজাতি। বিন্যাসবিধিগতভাবে বলা যায় যে এই সরীসৃপদের তিনটি ফ্যামিলি রয়েছে।
প্রথম, Alligatoridae : যার সদস্য হল অ্যালিগেটর।
দ্বিতীয়, Crocodylidae : যার সদস্য হল ক্রোকোডাইল বা কুমির।
তৃতীয়, Gharialidae: যার সদস্য হল ঘড়িয়াল বা মেছো কুমির।

সুতরাং, ক্রোকোডাইল এবং অ্যালিগেটরের মধ্যে বিন্যাসবিধিতে পার্থক্য রয়েছে।

বহিরাকৃতিগত বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে আমরা এদের আলাদা করতে পারি। যেমন অ্যালিগেটরের ‘U’ – আকৃতি বিশিষ্ট চোয়াল দেখা যায়, অন্যদিকে ক্রোকোডাইলদের চোয়ালের আকার ‘V’ – আকৃতি বিশিষ্ট এবং তীক্ষ্ণ হয়। অ্যালিগেটরদের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্ব চোয়াল নিম্ন চোয়ালের থেকে আকারে বড় হয়। যখন অ্যালিগেটর মুখ বন্ধ করে তখন ঊর্ধ্বচোয়াল এবং নিম্নচোয়ালে উপস্থিত দাঁতগুলি একে অন্যের উপর অভিলিপ্ত হয় এবং নিম্নচোয়ালকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে দেয়। সেক্ষেত্রে ক্রোকোডাইলের নিম্নচোয়াল এবং ঊর্ধ্বচোয়ালের আকৃতি প্রায় সমান হয় ফলে মুখ বন্ধ করার সময় দুই চোয়ালের দাঁতগুলি খাপে খাপে খাঁচা বন্ধ হয়ে যায়। ক্রোকোডাইল এবং অ্যালিগেটরের মধ্যে অন্যতম একটি পার্থক্য হল Lingual salt gland। অ্যালিগেটরদের ক্ষেত্রে এই রূপান্তরিত লালাগ্রন্থিটি প্রায় কর্মক্ষমতাহীন লুপ্তপ্রায় অঙ্গ হিসাবে উপস্থিত থাকে। অন্যদিকে ক্রোকোডাইলের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থিটি সক্রিয়ভাবে অভিযোজনে সাহায্য করে। এর থেকে প্রমাণিত হয় বিবর্তনের ধারায় ক্রোকোডাইল অ্যালিগেটরের তুলনায় নবীন প্রাণী। এছাড়া এই দুই প্রাণীর মধ্যে আমরা আচরণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত করতে পারি। যেমন ক্রোকোডাইল অ্যালিগেটরের তুলনায় শিকারের প্রতি বেশি আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী হয়।

fact1-skin-compressor.jpg
● টোড এবং ফ্রগ :

টোড এবং ফ্রগ এই দুই উভচরকে আমরা ব্যাঙ হিসাবে চিনি। কিন্তু এদের মধ্যে সামান্য কিছু পার্থক্য দেখা যায়। একটি প্রচলিত কথা আছে যে সকল টোড-ই হল ফ্রগ, যদিও সকল ফ্রগ কিন্তু টোড নয়।

বিন্যাসবিধি অনুযায়ী টোড–এর ফ্যামিলি হল Bufonidea যাকে আমরা Anura বলে থাকি, যার অর্থ হল লেজহীন। ফ্রগ-এর ফ্যামিলি হল Ranidea। খুব সহজেই বহিরাকৃতির দ্বারা আমরা টোড এবং ফ্রগ-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। ফ্রগ-এর ক্ষেত্রে মাথা ত্রিকোণাকৃতি হয়, অন্যদিকে টোড–এর মাথা অর্ধগোলাকার আকৃতি বিশিষ্ট হয়ে থাকে। গুটি এবং প্যারোটিড গ্লান্ডের ভিত্তিতেও সহজেই এদের চিহ্নিত করা যায়। টোড–এর দেহে গুটি ও প্যারোটিড গ্রন্থি উপস্থিত, কিন্তু ফ্রগ –এর দেহে অনুপস্থিত। ফ্রগ-এর গাত্র-বর্ণ কাঁচা সোনার মত বা হলুদ হয় এবং তার উপর গাঢ় রঙের লম্বালম্বি দাগ থাকে। এদের ত্বক কোমল হয়। অপরদিকে, টোড–এর গায়ের রঙ গাঢ় বাদামি বর্ণের হয় এবং ত্বক খসখসে ও গুটি যুক্ত হয় যা তাদের শুষ্ক স্থানে বসবাস করতে সাহায্য করে।

monkey.jpgজীবজগতে এমন আরও অনেক প্রাণী রয়েছে যাদের আপাত দৃষ্টিতে অভিন্ন মনে করলেও তারা একে অন্যের থেকে আলাদা। এই রকম কিছু প্রাণীর কথা এখানে উল্লেখ করা হল, যারা নিজেদের বৈচিত্র্য দিয়ে গড়ে তুলেছে বিপুল জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার।

লেখকঃ সৌভিক রায়

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 9

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

গলফিমিয়া ফুল

4.4 (9) গল্ফিমিয়া ভোজবাড়িতে দই পরিবেশনের জন্য এখন গোল গোল পাতলা চামচ ব্যবহার করা হয়। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি সেই চামচ ছিল অন্যরকম। তার আগার দিকটা একটু সরু, আর হাতলের দিক ক্রমশ চওড়া হয়ে গেছে। অনেকটা আইসক্রিমের কাঠের চামচের মতো। তাতে সুবিধা ছিল। ছোট ছেলেমেয়ের পাতে দেবার জন্য চামচের আগাটিই ছিল […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: