প্র্যাটিনকোল পাখির নাসারন্ধ্র থেকে লবণ নিঃসরণ

@
4.7
(40)

পাখিদের স্বভাব-বৈচিত্র্য লিপিবদ্ধকরণ কখনও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এবং পর্যবেক্ষণভিত্তিক অনুমানের দ্বারা হতে পারে আবার কখনও হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমেও হতে পারে। ব্যাপারটা সহজ করে বললে, পাখিদের কোনো স্বভাব আগে থেকে আন্দাজ করে পরবর্তী মুভমেন্টগুলোকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আবার কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ একটা পাখি এমন কিছু করে বসল যে ঠিকঠাক সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল হয় তার এরকম উদ্ভট আচরণের মানে কি! বলতে দ্বিধা নেই বহুক্ষেত্রে এরকম হয়েছে যেকোনো পাখির সূক্ষ কোনো মুভমেন্ট আমার চোখ এড়িয়ে গেছে আর পরে ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখে সেই ‘মুভমেন্ট’ সম্পর্কে বিষ্ময়কর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।
গত শীতের মরসুমে গেছিলাম ঊড়িষ্যার মংলাজোড়িতে। ভোরবেলার সোনালি আলোতে ছবি তুলছিলাম একঝাঁক ওরিয়েন্টাল প্র্যাটিনকোলদের। ছবি তুলতে তুলতে কখন ওদের খুব কাছে চলে গেছিলাম কে জানে! প্র্যাটিনকোলদের ঝাঁকটা বসেছিল জলার মাঝখানে উঁচু, শুকনো একটি মাটির ঢিপির উপর। একটি প্র্যাটিনকোলকে টার্গেট করে রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই। এই কারণে নয় যে তার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখেছিলাম, পাখিটা আমার সবচেয়ে কাছে ছিল বলে। বহুক্ষণ ধরে সে চুপচাপই বসেছিল। আরো কিছুটা এগোতেই সে একবার জোরে মাথা ঝাঁকালো। কিন্তু উড়ল না। আমি ভেবেছিলাম মাথা ঝাঁকিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে (Threat display)। যেটা প্র্যাটিনকোলেরা প্রায়শই করে থাকে শত্রু খুব কাছে চলে এলে। আমি সঙ্গে সঙ্গে নৌকা পিছন দিকে নিয়ে জায়গাটা ছেড়ে চলে আসি। আমার প্র্যাটিনকোলদের ওড়ার ছবি আর হল না সে যাত্রায়।

প্র্যাটিনকোল পাখি
প্র্যাটিনকোল পাখি

কিন্তু বাড়ি এসে প্র্যাটিনকোলদের সেই ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটা অদ্ভুত ‘মুভমেন্ট’ লক্ষ্য করলাম। সেই মাথা ঝাঁকানোর সময় ঠোঁট থেকে কিছু সাদা তরল বের হয়ে আসছে। ফ্রেমটি ওই অবস্থাতেই ফ্রিজ হয়েছে।

প্র্যাটিনকোল পাখি
প্র্যাটিনকোল পাখি সাদা তরল বের করছে

প্রথমে বেশ অবাক হই পাখিটার এই অদ্ভুত আচরণ দেখে। পাখিটা অন্তত দশ মিনিট ধরে একটা শুকনো মাটির ঢিবির উপর বসেছিল। আমি ওকে সেই দশ মিনিটে জল খেতে দেখিনি অথবা অন্য কিছু খেতে দেখিনি। ওকে স্নান করতেও দেখিনি যে নাসারন্ধ্র দিয়ে ঢুকে পরা জল বের করে দেবে। তবে মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ থেকে কোন তরল পাখিটা বের করল? ইন্টারনেট, বইপত্তর তোলপাড় হল বেশ কিছুদিন ধরে। বিশেষজ্ঞ বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা চলল তুমূল। তারপর এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো গেল। কী সেই সিদ্ধান্ত?
সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে প্রথমে বুঝতে হবে অসমোরেগুলেশন(Osmoregulation) কী?
অসমোরেগুলেশন হল কয়েকটি বিশেষ পদ্ধতির সমন্বয় যার মধ্যে দিয়ে পাখি তার শরীরের জল ও লবণের ভারসাম্য রক্ষা করে বিভিন্ন আবহাওয়ায়। পাখিদের ক্ষেত্রে অসমোরেগুলেটরি (osmoregulatory) প্রত্যঙ্গ প্রধানত চারটি। কিডনি, ক্লোয়াকা(Cloaca), লোয়ার ইন্টেস্টাইন(lower intestain) এবং সল্ট গ্ল্যান্ড (salt gland)। পাখির শরীরের ভেতরের কিছু গঠনগত বৈশিষ্ট্য আছে যা স্তন্যপায়ীদের সঙ্গে মিলবে না। পাখিদের ক্ষেত্রে কিডনি থেকে যে মূত্র বের হয় তা কিন্তু সরাসরি শরীর থেকে নির্গত হয়ে যায় না। সেই মূত্র কিডনি থেকে ureter-এর মাধ্যমে ‘ক্লোয়াকা’ নামক একটি থলি বা কক্ষে (chamber) চলে আসে। পাখিদের পায়ুছিদ্রের ঠিক পেছনেই এই ক্লোয়াকা-র অবস্থান এবং শুধু কিডনি নয় ক্লোয়াকা-র ভেতরে পাখিদের পাচনতন্ত্র (Digestive system) এবং প্রজননতন্ত্রও (Reproductive system) শেষ পর্যন্ত এসে মেশে। কিডনি থেকে ক্লোয়াকার ভেতরে চলে আসা সেই মূত্রের নতুন করে পরিশোধন ঘটে। এই পর্যায়ে মূত্র থেকে লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) এবং তারপর জল শোষিত হয়। যে জল শেষ পর্যন্ত শরীরের কাজে লাগে বিশেষ করে যখন বা যেখানে জলের প্রচন্ড অভাব দেখা দেয়। চড়ুই বা মুনিয়া বা পোষা মুরগিদের ক্ষেত্রে যারা প্রধানত শস্যদানা খেয়ে থাকে তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ‘ক্লোয়াকা’তে আসা মূত্র থেকে ৭০% পর্যন্ত লবণ এবং ১০-২০% পর্যন্ত জল শোষিত হয়। এত কিছুর পরেও পাখি তার শরীরের লবণের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খায়।

প্র্যাটিনকোল পাখি
প্র্যাটিনকোল পাখি

গাল, টার্ন, অউক, পেঙ্গুইন, অ্যালবাট্রস, পেট্রেল, করমোরান্ট, পেলিকান, গ্যানেট, হেরন অথবা হাঁসদের মত নদী বা সমুদ্র-উপকূলের পাখিদের বৃক্ক বা কিডনি অত শক্তিশালী হয় না। কিডনি যে পরিমান লবণ রক্ত থেকে শুষে নেয় তা তাদের শরীরের ভেতর লবণের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাই তারা শরীরে জলের যোগান এবং লবণের ভারসাম্য রক্ষায় একটি অতিরিক্ত একজোড়া গ্রন্থির সাহায্য পেয়ে এসেছে। বলা ভালো তাদের শরীরে তৈরি হয়েছে একজোড়া অদ্ভুত কার্যকারি গ্রন্থি। নাম সল্ট গ্ল্যান্ড(Salt gland)। অবস্থান হল চোখের ঠিক ওপরে (just above the orbit of the eye)। সমুদ্র-উপকূলের পাখিদের অনেককেই বাধ্য হয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত জল পান করতে হয়। কিম্বা সমুদ্র-উপকূলের যে সব প্রানী তারা খায় (যেমন কাঁকড়া, স্কুইড ইত্যাদি) সে সব প্রানী সমুদ্রের জলের মতই লবণাক্ত। আর খাদ্য বা জলের সাথে রক্তে মিশে যাওয়া সেই অতিরিক্ত লবণ অনায়াসে শুষে নিয়ে সল্ট গ্ল্যান্ড শরীরে লবণের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং মহামূল্যবান জল শরীরকে ফিরিয়ে দেয়।
এখন প্রশ্ন হল, শরীর থেকে লবণ বের করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় কেন?
কারনটি মোটের ওপর খুব সহজ। শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে লবণ জমতে থাকলে সেই লবণকে লঘু(dilute) করার জন্য আরো অতিরিক্ত জলের দরকার পড়বে। তাকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জল খেতে হবে। পাখির পক্ষে তা মেটানো অনেকাংশে মুশকিল। তখন সেই অতিরিক্ত জল আসবে তার দেহের টিস্যু থেকে। পাখির শরীর দ্রুত ভেতর থেকে শুষ্ক (dehydrated) হয়ে পড়বে। তাই শরীরের অতিরিক্ত লবণ পাখি দ্রুত তার শরীর থেকে বের করে দেয়।

প্র্যাটিনকোল পাখি
প্র্যাটিনকোল পাখি

এখন অবাক হওয়ার মত ঘটনা হল প্র্যাটিনকোল-এর মত নদী-উপকূল বা মিষ্টি জলের-এর পাখি এভাবে salt secrete করল কেন?
তার খাবার বলতে গেলে নদী বা জলা ভূমির উপর উড়তে থাকা ছোটো পোকা-মাকড়, মাটিতে থাকা কিছু পোকামাকড় যেমন ফড়িং, মথ, পিঁপড়ে, মাছি, মৌমাছি, উচ্চিংড়ে, কিছু অমেরুদন্ডী প্রানী ইত্যাদি। তার খাদ্য তালিকায় সামুদ্রিক লবণাক্ত প্রানী প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে বিজ্ঞানী Technau-র ১৯৩৬ সালের গবেষণা। তিনি ৮৩টি জাতের (species) পাখির ওপর পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে তার মধ্যে এমন ২৪টি পাখির সল্ট গ্ল্যান্ড বড় যারা সমুদ্র-উপকূলবর্তী পাখি (marine bird)। এবং আরো মজার ব্যাপার যে একটি গণ-এর (genus) পাখিদের মধ্যেই salt secretion কম-বেশি হয়ে যাচ্ছে তাদের বাসস্থানগত (habitat) পরিবর্তনের কারনে। বিজ্ঞানী Schildmacher ১৯৩২ সালে তার গবেষণায় দেখিয়েছেন বার্লিন চিড়িয়াখানায় একই প্রাজাতির (species) হাঁস যখন লবণাক্ত জলের কাছাকাছি থাকে তখন তাদের সল্ট গ্ল্যান্ড বড় হয়ে যায় তাদের তুলনায় যারা ফ্রেশ ওয়াটার-এর কাছাকাছি থাকে। অর্থাৎ প্র্যাটিনকোল স্বাভাবিক ভাবে নদী-উপকূলের পাখি হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু পাখিটিকে আমি মংলাজোড়িতে দেখি তাই তার পক্ষে নিকটবর্তী চিল্কা সমুদ্র-উপকূল থেকে লবণাক্ত জল খাওয়া বা লবনাক্ত সামুদ্রিক প্রাণী খাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়।
তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না যে যেসব পাখি শুধু লবণাক্ত আবহাওয়ায় (Saline or maritime habitat) থাকে তাদেরই সুগঠিত সল্ট গ্ল্যান্ড থাকে। কার্যকরি সল্ট গ্ল্যান্ড দেখা যায় মরুভূমিতে বসবাসকারি বেশ কিছু পাখির মধ্যে। যেমন রোডরানার, সাভানা হক-দের সুগঠিত সল্ট গ্ল্যান্ড থাকে। তাদের নাসারন্ধ্র থেকে secretion হয় তাদের উচ্চ-প্রোটিন নির্ভর খাদ্যাভ্যাসের (বিশেষত পোকামাকড়, মেরুদন্ডি প্রানী) জন্য। মরুভূমির পাখি স্যান্ড পার্ট্রিজ অথবা অস্ট্রিচদের ক্ষেত্রে কার্যকরি সল্ট গ্ল্যান্ড থাকে তাদের শরীরের জলের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। প্র্যাটিনকোলদের salt secretion ক্ষেত্রেও এই কারনটি উড়িয়ে দেওয়া যায়না।

প্র্যাটিনকোল পাখি
প্র্যাটিনকোল পাখি

মোট কথা সেই অসমোরেগুলেশন। পাখি লবণাক্ত আবহাওয়ায় থাকুক আর না থাকুক শরীরে জলের ভারসাম্য রক্ষায় তার এই রকম salt secretion-এর ছবি ধরা পড়েছে অজান্তে আমার ক্যামেরায়।

 

WhatsApp Image 2019-11-10 at 7.24.47 PM

লেখা ও ছবি – সম্রাট সরকার, স্কেচ- ইন্টারনেট

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 40

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

গ্রিস থেকে উড়িষ্যা : সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিক আটকাতে পণ করছে বিশ্ব

4.7 (40)   মহাত্মা গান্ধির দেড়শ বছরের জন্মদিন পালিত হবে, তোড়জোড় শুরু হয়েছে জোরকদমে। ২রা অক্টোবর সেই মহাপ্রাণের পরিবেশভাবনার খানিকটা প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেল প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায়। ২০২২ সালের মধ্যে দেশ থেকে সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিকের পাট পুরোপুরি চুকিয়ে দিতে চাইছে সরকার। তারই অঙ্গ হিসেবে গত ২রা অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিকে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: