ম্যান্ডেভিল

১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেব যখন মারা গেলেন, ভারতবর্ষের রাজকোষ তখন প্রায় শূন্য। সেনাদলের মাইনেও দেওয়া যায় না। কেন্দ্রের দুর্বলতার সুযোগে রাজ্যে রাজ্যে শুরু হয়েছে বিদ্রোহ, আগ্রাসী বিদেশি বণিক ক্রমাগত সম্প্রসারিত করে চলেছে তার হাত। সেসব দমন করার জন্য ঔরঙ্গজেব-পরবর্তী সম্রাটদের না ছিল সামরিক শক্তি, না প্রশাসনিক দক্ষতা। একমাত্র ফারুকশায়ার কিছুটা হাল ধরেছিলেন। তবে তাঁর আমলেই ১৭১৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশে কলকাতাসহ ৩৮ টি গ্রামের খাজনা আদায়ের অধিকার পেয়ে যায়। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল হাওড়ায় (বেত্তর, শালিখা ইত্যাদি। এই গ্রাম ক’খানি ঔরঙ্গজেব কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাননি। শুধু বাণিজ্যিক কারণে নয়, সামরিকভাবে এগুলি ছিল গুরুত্বপূর্ণ)।

Entrance to Ballygunge Calcutta ( Kolkata ) - Mid 19th Century.jpg

১৭৫৭ সালে সিরাজের মৃত্যুর পর ১৭৫৮ সালে মির জাফর ওই ৩৮ টি গ্রাম কোম্পানিকে পাকাপাকিভাবে বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিনে নেওয়ার পরেই কোম্পানি এগুলির পুনর্বিন্যাস করে। মারাঠা খালের ঠিক বাইরে তখন ছিল জমজমাট একটি গঞ্জ, নাম বালিগঞ্জ। মস্ত বালির হাট বসতো সেখানে। কি কারণে কি জানি ওই জায়গাটি কোম্পানি কর্তাদের ভারী পছন্দ হয়ে গেল। বালির ব্যবসা তুলে দিয়ে সেখানে শহর গড়তে লাগল তারা। বিখ্যাত লোকেরা বিশাল বিশাল জমি নিয়ে বাড়ি করলেন। বাড়ি ঘিরে রইল প্রকান্ড বাগান। জায়গাটি হয়ে দাঁড়ালো একটি গার্ডেন সিটি। সেই বাগান-শহরের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন জর্জ ম্যান্ডেভিল নামে জনৈক কালেক্টর। তাঁর বাড়ির নাম হলো ম্যান্ডেভিল গার্ডেন্স।

pink.jpg

এই ম্যান্ডেভিলের এক ভাই ছিলেন ইংল্যান্ডে। তাঁর নাম হেনরি ম্যান্ডেভিল। তিনি একাধারে একজন কূটনীতিক, আবার একজন পুষ্পপ্রেমী। রকট্রাম্পেট (Rocktrumpet) নামে মেক্সিকোর একটি প্রজাতির ফুলের গাছের নামকরণ করা হয় তাঁর নামে, Mandevilla sanderi.
ম্যান্ডেভিল বা রকট্রাম্পেট বেশ মজবুত ও কিছুটা লতানে ধরণের গাছ। বাড়ির দেওয়ালে, গেটে তুলে দিলে দারুন বাড়ে। ফুলে ফুলে গাছ ভরে যায়।

bandicam 2019-11-29 12-18-47-900.jpg

চার রঙে ফুল হয় :- লাল, সাদা, গোলাপি ও হলুদ। ফুলের কুঁড়ি অনেকটা গন্ধরাজের কুঁড়ির মতো। পেন্সিলের সিস যেমন হয় তেমনি। আর ফুল অনেকটা এলামন্ডার মতো। তবে আকারে ছোট, কিন্তু হালকা গন্ধযুক্ত। ফুলে পাপড়ি পাঁচটি। পাপড়ির রং আগার দিকে ফিকে, গোড়ার দিকে গাঢ়। সাদা ফুলটিতে কেন্দ্রের রং হালকা হলুদ।
গ্রীষ্মেই এর ফোটার সময়। তবে এখন সারা বছরই ফোটে।

mandevilla-fb-1-1280x720.jpg

মজার কথা, ওই সুন্দর বাগান-শহর পরবর্তীকালেও তার আভিজাত্য বজায় রেখে চলেছিল। শরৎচন্দ্র, মেঘনাদ সাহা, প্রণব মুখার্জি, সত্যজিৎ, সুনীল, শংকর, সুচিত্রা, হেমন্ত, শচীনদেব, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ইত্যাদি বিখ্যাত বাঙালির বাস ছিল বা আছে এই গঞ্জেই। তবে সেই সব বাড়িতেই যে ম্যান্ডেভিল আছে, তেমন নয়।

IMG-20191119-WA0023.jpg
লেখকঃ- ফাল্গুনি মজুমদার

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: