অজয় নাথের কক্ষপথে ষষ্ঠ দিন

361e509ce702dbcd1e6518bdaff18a29

কলকাতা খুব প্রাচীন শহর নয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসাপত্র জমে ওঠার সাথে সাথে কলকাতা শহর গড়ে উঠেছে। তারপর ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে আসার পর কলকাতা রাজধানীর মর্যাদা পায়। আমরা চলেছি সেন্ট্রাল বা চিত্তরঞ্জন এভিনিউ ধরে।

খানিকটা এগিয়ে বাঁহাতে মহাজাতি সদন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যা ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুরোধে ১৯৩৯ সালের ১৯শে অগাস্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাজাতি সদন ভবনের শিলান্যাস করেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র দেশ ত্যাগ করায় ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পশ্চিম বঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের ঐকান্তিক চেষ্টায় ১৯৪৯ সালে মহাজাতি সদন ভবনের নির্মাণ সম্পুর্ণ হয়। এর জন্য বিধান সভায় ‘মহাজাতি সদন এ্যক্ট ১৯৪৯’ পাশ করাতে হয়। বাংলার সংস্কৃতির একটি মহামিলন কেন্দ্র হল মহাজাতি সদন। মহাজাতি সদনের প্রায় উল্টো দিকে বলা যায় জোড়াসাঁকো যেখানে রয়েছে ঠাকুরবাড়ি। অবশ্য ঠাকুর বাড়ি সম্পর্কে কিছু বলা বাতুলতা মাত্র। তবুও বলছি। অষ্টাদশ শতকে রবীন্দ্রনাথনাথ ঠাকুরের ঠাকুর্দা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বাড়িটি নির্মাণ করেন। বাড়িটির জন্য জমি দান করেন কলকাতার বিখ্যাত শেঠেরা । কবি গুরুর জন্ম ও মৃত্যু এই বাড়িতেই। আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্মও এই বাড়িতেই। এখন বাড়িটি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ও মিউজিয়াম। আমি কখনও ঠাকুর বাড়িতে যাইনি। সত্যি বলতে কি ঐ বাড়িতে যেতে ভয় পাই।

Nakhoda_Mosque_Night.JPG

 

জোড়াসাঁকো পেরিয়ে একটু এগোলেই নাখোদা মসজিদ। গুজরাটের কচ্ছ এলাকার একটি সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায় হল কুচ্চি মেমন জামাত। মেমন সম্প্রদায়ের আব্দুর রহমান ওসমান, একজন বড় জাহাজ ব্যবসায়ী, এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯২৬ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এটি তৈরি করতে খরচ হয় ১৫ লক্ষ টাকা। মসজিদের ভেতরে একসাথে ১০ হাজার মানুষ জড় হয়ে নামাজ আদা করতে পারেন। মসজিদের বিশেষত্ব হল তার তিনটি গম্বুজ, দুটি সুউচ্চ ও ২৫টি ছোট ছোট মিনার। প্রবেশ পথ ফতেপুর সিক্রির বুলন্দ দরওয়াজার আদলে বেলে পাথরের তৈরি। আমাদের বাস যখন মসজিদের কাছে পৌঁছালো দেখলাম মসজিদের নিচের দোকান বাজার অংশটি সাদা এল ই ডি আলোতে ঝলমল করছে। আশপাশের বাকি আলো খুবই ম্রিয়মান লাগছে সেই আলোর কাছে।

Medical-College-Kolkata-(7).JPG

মহাত্মা গান্ধী রোড পেরিয়ে আরো একটু এগোলেই এশিয়ার প্রাচীনতম মেডিক্যাল কলেজ ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ। লর্ড বেন্টিং এর আমলে তৈরি। অবশ্য এসব কথা নুতন করে বলার প্রয়োজন নেই। দেখতে দেখতে কে সি বা কৃষ্ণ চন্দ্র দাসের মিষ্টির দোকান চলে এল। বাগবাজারের নবীন ময়রার ছেলে কৃষ্ণচন্দ্রের নাম বাংলার মিষ্টি রসগোল্লার সাথে জড়িয়ে আছে। তিনি ১৯৩০ সালে প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেন বলে কথিত আছে।

main-qimg-58f5099cb8f46c2c79cb22ccfc85da8c.jpg

কে সি দাসের দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় ১৯৭৭ সালের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি সেই বছরেই প্রথম কলকাতায় আসি। তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছি। আমাদের কলকাতা বিমানবন্দরের অফিসে ট্রেনিং নিতে এসেছি। থাকি অফিসের ট্রেনিং হোস্টেলে। মাঝে মাঝে ধর্মতলায় আসি আমার কোন অফিস কলিগের সাথে। সেদিন সন্ধ্যা বেলায় এসেছি। তখন কে সি দাসের দোকানে খুব ভালো সিঙ্গাড়া পাওয়া যেত। এখনও পাওয়া যায় হয়ত। আমি ও আমার সহকর্মী কে সি দাসের দোকানের দোতলায় একটি টেবিলে বসেছি সিঙ্গাড়া খেতে। দেখলাম পাশের টেবিলে এক জোড়া ছেলে মেয়ে বসে মিষ্টি খেতে খেতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। পাশাপাশি টেবিল কিছু কথা কানে আসছে। মনযোগ না দিলেও শুনতে পাচ্ছি। সেদিন ময়দানে খেলা ছিল। দুজনেই খেলা দেখেছে। আজ থেকে চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর আগে ফুটবল মাঠে মেয়েদের আসাটা ব্যতিক্রমই ছিল। মাঠেই ওদের প্রথম আলাপ হয়েছে। দুজনেই চাকরি করে। এক সময় মেয়েটি জানতে চায় ছেলেটি কোথায় কাজ করে। মনে আছে ছেলেটি বলেছিল কোথায় চাকরি করি জানতে পারলে লোকে ধরে পেটাবে। তখন পাতাল রেল, শেয়ালদা ফ্লাই ওভারের কাজ চলছে। মানুষের পথচলা দায়। মানুষ সি এম ডি এর চাকুরেদের উপর বেজায় চটা। ছেলেটি সি এম ডি-তে কাজ করে। বুঝলাম একটি প্রেমের গল্প জন্ম নিচ্ছে পরিণতি যাই হোক না কেন।

Babu_Ghat_-_Kolkata_2012-01-14_0544.JPG

আমাদের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। দাম চুকিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। স্মৃতি পেছনে ফেলে আরো একটু এগিয়ে বাস ডান দিকে ঘুরে ধর্মতলার মোড় পেরিয়ে আকাশবাণী ভবনের পাশ দিয়ে চলে এল বাবুঘাটে। এই সময় ভিন রাজ্যে যাওয়ার বাস ছাড়ে এখান থেকে। তাদের দালালরা ডাকাডাকি করে যাত্রী জোগাড় করছে। বছর ২৫ আগে গোটা কয়েক ভিন রাজ্যের বাস ছাড়ত বাবুঘাট থেকে। এখন শতাধিক বাস ছাড়ে। অনেক পরিশ্রম হয়েছে সারাদিন। মনটা চা চা করছিল। বাস স্ট্যান্ডেই একটি চায়ের দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে চলে এলাম চাঁদপাল ঘাটে। ভাবছিলাম লঞ্চে গঙ্গা পার হয়ে হাওড়া যাব কি না। একটা হাওড়া ময়দানগামী ফাঁকা বাস পেয়ে তাতেই উঠে পড়লাম। আর কোন দিকে না তাকিয়ে চলে এলাম হাওড়া ষ্টেশনে। গাড়িও পেয়ে গেলাম সাথে সাথে। অফিস টাইমের ভিড় ঠেলে গাড়িতে উঠে দুজনেই বসার জায়গা জোগাড় করে নিলাম। বাড়ি এলাম পৌনে আটটায়। আটটার আড্ডা সেরে বাড়ি এসে খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। সারা দিনের ঘোরাঘুরির পর নিশ্চিন্ত ঘুম।

লেখকঃ- অজয় নাথ

Leave a Reply

%d bloggers like this: