আজ পৃথিবী মায়ের ত্বক রক্ষা দিবস

কথা হচ্ছে পৃথিবী মায়ের ত্বকের অর্থাৎ মাটির। এই ত্বকের উপর আমাদের জন্ম, মৃত্যু, বসবাস। আমাদের খাদ্য বস্ত্র উৎপাদন সবই এখান থেকে। সেই ত্বককে রক্ষা করতেই প্রতি বছর ৫ই ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হয়। এই বছরের থিম মাটি ক্ষয় রোধ।

ক্ষয় রোধ সম্বন্ধে জানার আগে ক্ষয় সম্বন্ধে জানতে হবে। তারও আগে জানতে হবে মাটি সম্বন্ধে। সুতরাং মাটির প্রোফাইল পিকটা একবার দেখে নেওয়া যাক।

একদম উপরেই আছে হিউমাস অর্থাৎ পচনশীল জৈব পদার্থের স্তর। এখানে থাকে মৃত উদ্ভিদ, প্রাণীর বর্জ্য পদার্থ এবং প্রাণীর মৃতদেহ। তার নিচে টপ সয়েল(topsoil)। এটি গুরুত্বপূর্ণ, এই টপ সয়েল রক্ষার বিষয়ে সাবধান হতে হবে। তার নিচে সাব সয়েল(subsoil)। তার নিচের স্তরটি হল মাটি তৈরির মূল উপাদান (parent material), সবশেষে নিরেট পাথরের স্তর অর্থাৎ বেডরক (bedrock)।

যে পদ্ধতিতে মাটি তৈরি হয় তাকে বলে পিডজেনেসিস (pedogenesis)। ১সেন্টিমিটার মাটি তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ বছর। আর উর্বর মাটি তৈরি হতে তো প্রায় ৩০০০ বছর লেগে যায়। কত সময় লাগবে সেটা নির্ভর করে যে মূল উপাদান থেকে মাটি তৈরি হবে তার উপর এবং সেখানকার আবহাওয়ার উপর।

আবার এই তৈরি উর্বর মাটি ক্ষয় হতে বেশি সময় লাগে না। গত ১৫০ বছরে পৃথিবীর অর্ধেক টপ সয়েল হারিয়ে গেছে। ভালো মাটি মানে ভালো টপ সয়েল। আর ভালো টপ সয়েল সেটাই যেটা প্রাণে পরিপূর্ণ। যেখানে প্রাকৃতিক জৈবিক কর্মকাণ্ড হতে থাকে যেগুলো না হলে মাটি উর্বর হয় না। যেমন মৃত পচনশীল জৈব পদার্থকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সাহায্য করে ফাঙ্গি, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, নিমাটোড, মোলাস্ক, আথ্রপড ইত্যাদি; ফলে হৃত মিনারেল আবার মাটিতে ফিরে আসে উদ্ভিদের মূলের শোষণের উপযোগী হয়ে। কেঁচো মাটিতে হাওয়া চলাচল বৃদ্ধি করে।

এইসব অণুজীব ছাড়া মাটি মৃত মাটি তাতে শুধু অজৈব উপাদান থাকে যেমন বাতাস, জল, হিউমাস ইত্যাদি। হিউমাসকে পুষ্টি পদার্থে পরিণত করতে অণুজীবের উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। টপ সয়েলে সব থেকে বেশি অণুজীব থাকে। সাব সয়েলে অপেক্ষাকৃত কম জৈব উপাদান ও অণুজীব থাকে।

সুতরাং উর্বর মাটি পেতে চাইলে টপ সয়লকে বাঁচাতে হবে। মাটিতে যদি যথেষ্ট পরিমাণে উদ্ভিদের মূল না থাকে তাহলে মাটির কণাগুলো আলগা থাকে, ফলে ক্ষয় হতে সময় লাগে না। ক্ষয়ের পরিমাণ নির্ভর করে মাটিতে উদ্ভিদের পরিমাণ, জমির ঢাল, মাটির প্রকৃতি, আবহাওয়া ইত্যাদির উপর।

মাটি ক্ষয়ের দুটি মুখ্য কারণ হল জল আর হাওয়া। যথেষ্ট পরিমাণ উদ্ভিদ মাটিতে না থাকার কারনে মাটির কনাগুলি বেঁধে রাখার মত শিকড়ের জাল মাটিতে ছড়িয়ে থাকে না ফলে বৃষ্টির জলের তোড়ে আলগা মাটির কণাগুলি ধুয়ে যায়। একইরকম ভাবে হাওয়ার বেগেও মাটির সূক্ষ্ম কণা উড়ে গিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জমা হয়। বৃষ্টির জলের তোড়ে ক্ষয়ের প্রভাব বেশি প্রত্যক্ষ করা যায় পাহাড়ের ঢালে আর হাওয়ার বেগে মাটি ক্ষয় বেশি হয় গাছপালাহীন রুক্ষ প্রান্তরে।

মাটি ক্ষয় রোধের একমাত্র প্রাকৃতিক সমাধান উদ্ভিদ। উদ্ভিদের শিকড় মাটির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণাগুলিকেও একসাথে আটকে রাখে। ঘাস খুব ভালো মাটি বাঁধক। বড় বড় গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে গিয়ে বড় বড় চাঙড়ের আকারে মাটি ধরে রাখে।

আরেকটি উপায় হল জমি থেকে আগাছা তুলে, সেই আগাছাই আবার ঘন করে মাটির উপর বিছিয়ে দিলে, মাটির ক্ষয় কমবে এবং মাটিতে পচনশীল জৈব পদার্থ হিউমাস তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মালচিং।

এছাড়াও অন্যান্য নানা উপায় আছে মাটি ক্ষয় রোধ করার তবে এই বছর ইউনাইটেড নেশনস জোর দিয়েছে গাছ লাগিয়ে মাটি ক্ষয় রোধ করার উপর। এমনকি স্থানীয় প্রজাতির একটি গাছের চারা বা বীজ পুঁতে, ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন অফ দি ইউনাইটেড নেশনসের প্রতিজ্ঞা পত্র বা pleadge card হাতে নিয়ে, সেলফি তুলে সোশাল মিডিয়ায় আপলোড করলে, যাদের সেলফি সবথেকে বেশি লাইক পাবে সেই প্রথম পাঁচ জনকে FAO (Food and Agriculture Organization of the United Nations) এর তরফ থেকে পুরস্কারও দেওয়া হবে।

লেখক – মৌমিতা হীরা

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: