সাপ কালচার

poribes news
4.5
(6)

 

সাপ নাম টার মধ্যেই হয়ত ভয় আছে বা ভয় নয় একটা আতঙ্ক। কিন্তু এই সরীসৃপ প্রাণী প্রজাতিটি সরীসৃপদের মধ্যে সবচেয়ে নিরীহ l এরা আমাদের নিজের থেকে আক্রমণ করে না,আত্মরক্ষার জন্য বা ভয় পেয়ে আক্রমণ করে l অধিকাংশ সাপেরা আগ্রাসীও হয় না l

পৃথিবীতে প্রায় ৩০০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে, তার ১০% এরও কিছু কম সংখ্যক সাপ ভারতে পাওয়া যায় l সংখ্যাতত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে ভারতে ২৩৬ টি প্রজাতির সাপ পাওয়া যায়, এছাড়াও এদের কিছু উপপ্রজাতি রয়েছে যার বেশিরভাগই বিষহীন l

সত্যজিৎ বাবুর ‘খগম’ হোক বা শ্রীদেবীর ‘নাগিন’, সাপ নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে অদ্ভুত কিছু ফ্যান্টাসি রয়েছে, বহু চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং লেখক বহুভাবে সাপ কে ব্যবহার করেছেন l ভারত একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ, ফলে ধর্মান্ধতা, বিজ্ঞান চেতনার অভাব মানুষকে সাপ সম্পর্কে অজ্ঞ করে রেখেছে l এই সাপ সংক্রান্ত ভ্রান্তিগুলি সাফ হওয়া প্রয়োজন, যেমন সাপ দুধ খায়, সাপ শীতল রক্তের প্রাণী এবং সাপের দেহে এমন উৎসেচক নেই যার সাহায্যে সাপ দুধ হজম করতে পারে l সাপ ছোট প্রাণি যেমন ইঁদুর,পাখি, ব্যাঙ ইত্যাদি প্রাণিদের খাদ্য-এর জন্য শিকার করে l

snakes 3rd

সাপের কান নেই অর্থাৎ মশলাদার ছবিতে যা দেখা যায় যে সাপ বিণ শুনে চলে আসছে তা হয় না l সাপ যে অঙ্গের সাহায্যে দেখে সেটা চোখ নয়, অরগ্যান অফ জেকোবাসন একটি কেমোরিসেপ্টার, অর্থাৎ আমাদের মতো দৃষ্টি শক্তি সাপের নেই, ওরা শিকার কে দেখে তাপে বা উষ্ণতার নিরিখে l আর প্রতিোধের বিষয়টিও মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনার ফল l

অন্য আর একটি মিথ হল সাপের শঙ্খ লাগা যার সাথে কোনো অলৌকিকতার সম্পর্ক নেই কারণ এটি হল, সাপের প্রজননের সময় যৌন সঙ্গম l

মাম্বা বা অ্যানাকোন্ডা কিছুই ভারতে পাওয়া যায় না, তবে আলিপুরে চিড়িয়াখানায় কিছু অ্যানাকোন্ডা আনা হয়েছে,ইচ্ছা হলে দেখে আসতে পারেন l

ভারতের সাপের অধিকাংশই নির্বিষ,কিন্তু বিষযুক্ত ও বিষহীন সাপ চেনার বিষয়ে বেশ কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে l সব সময় এত সময় থাকে না, যে বৈশিষ্ট্য ধরে ধরে পার্থক্য করা যায় l সাধারণ কিছু পার্থক্য যা খালি চোখে দেখা যায়, যেমন বিষাক্ত সাপের মাথা ত্রিকোণাকার ও ফণা যুক্ত হয় কিন্তু নির্বিষ সাপ ফণা বিহীন ও গোলাকার যদিও অনেক নির্বিষ সাপ পেশির সাহায্যে কিছুক্ষণের জন্য ফণার মতো গঠন অনুকরণ করে তৈরি করতেই পারে l বিষাক্ত সাপ রঙেও কিছুটা উজ্জ্বল হয় l ভারতে চারটি প্রজাতির সর্বাধিক বিষাক্ত সাপ পাওয়া যায়, তাদেরকে একত্রে ‘বিগ ফোর’ বলা হয়,তারা হল কোবরা বা গোখরো, (যাদের ফণায়, ‘u’ অক্ষরের বা গোরুর ক্ষুরের মতো দাগ দেখা যায় ) রাসেল ভাইপার বা চন্দ্রবোরা (গায়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি দাগ থাকে), স্বস্কেলড ভাইপার ( উত্তরবঙ্গে বেশি পরিমানে পাওয়া যায়), ক্রেইট বা বন্ডেড ক্রেইট l সাপের দেহে আঁশে আবৃত থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর এরা খোলস  ত্যাগ করে l ভারতে অধিকাংশ সাপের আক্রমণের ঘটনা এই চারটি প্রজাতির দ্বারাই হয় l

anaconda image

সাপের বিষ নিয়েও অনেক অপপ্রচার রয়েছে, সাপের বিষকে ভেমান বলা হয়, যা উন্নত প্রকৃতির  স্যালাইভা বা লালা l এটি সাপের আত্মরক্ষায় এবং শিকার করাা খাদ্য কে পরিপাকে সহায়তা করে, সাপের বিষ অত্যন্ত প্রোটিনধর্মী l আমার সাপের বিষ সরাসরি খেতে পারি, যদি না আমাদের পৌষ্টিকতন্ত্রে কোনো ক্ষত বা আলসার না থাকে l স্নেক বাইট একটি বিলাসবহুল নেশা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং  আফ্রিকার বহু দেশে সাপ খাওয়ার প্রচলন আছে l সাপের সারা দেহে বিষ থাকে না এবং বিষ শুধু মাত্র রক্তে মিশলেই শিকার আক্রান্ত হয়

সাপের দেহে বিষ ডেলিভারি সিস্টেমটি তিনটি অঙ্গ নিয়ে তৈরি, বিষগ্রন্থি অর্থাৎ যেখানে বিষ সংশ্লেষিত হয় l বিষনালি যা বিষ বহন করে দাঁত পর্যন্ত নিয়ে আসে এবং এই নালির একটি মুখ দাঁতে উন্মুক্ত হয় l তৃতীয় অঙ্গটি হল ফ্যাং বা সাপের দাঁত, এটি তিন প্রকারের হয় l সংখ্যায় এক জোড়া এবং এরা কৃন্তক প্রকৃতির l দাঁত দুটি হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জের মতো কাজ করে এবং দাঁতের ভিতরে পাইপের মতো খাঁজ থাকে l যার ফলে দংশনের সাথে সাথে সাপের বিষ সরাসরি রক্তে মেশে l

snake anatomy

দংশনের ফলে ক্ষত স্থানে যন্ত্রণা রক্ত ক্ষরণ, বমি, লালা ক্ষরণ হতে পারে, রোগী অনেক ক্ষেত্রেই সংজ্ঞা  হারায়, চোখের তারারন্ধ্র অসংবেদনশীল হয়ে পড়ে l ক্ষত স্থানে দুটি দাগ দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষত স্থান ফুলে ওঠে l কিছু সাপের দংশনের ফলে কোনো রোগ লক্ষণই প্রকাশ পায় না, তখন সমস্যা বাড়ে l সাপের প্রধানত বিষ তিন ধরণের হয়, যথা  নিউরোটক্সিক (যা স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে), হিমোটক্সিক (যা সংবহন তন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং রক্ত দেহের মধ্যেই জমাট বেঁধে যায়, এই বিষ কিডনির খুব ক্ষতি করে), সাইটোটক্সিক(যা ক্ষতস্থানীয় কোষ গুলিতে কাজ করে)l এদের মধ্যে নিউরোটক্সিক সবচেয়ে ক্ষতি কারক হয় l তবে মনে করা হয় যে দাঁড়াশ-এর লেজে বিষ আছে এবং লেজের আঘাত লাগলে ক্ষত স্থানে পচন ধরে, এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত l সাপের থুতু ছিটানোর ব্যাপারটিও অসম্ভব তবে স্প্লিটিং কোবরা থুতু ছিটাতে পারে শুধু মাত্র l সবচেয়ে বড়ো সাপ সংক্রান্ত মিথ, যে লখিন্দরকে কাল নাগিনি এক ছোবলে মেরে ফেলে, আদতে কাল নাগিনি কিন্তু সম্পূর্ণ নির্বিষ সাপ l

antivenom

সাপে কামড়ালে রোগীকে তৎক্ষণাৎ নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে, কারণ এন্টিভেনাম সময় মতো প্রয়োগ করলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব l সাপের বিষ থেকেই এই এন্টিভেনাম তৈরি করা হয় l সাপের কামড়ে শতকরা ৪৫ ভাগ লোক অজ্ঞতার কারণে এবং ৬৫ ভাগ লোক আতঙ্কে মারা যান l ক্ষত স্থানে কোনো বাঁধনের প্রয়োজন নেই, সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীকে অনতি বিলম্বে নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে আর যে সাপ কামড়েছে তাকে জীবিত বা মৃত ধরে নিয়ে যেতে পারলে খুবই ভালো হয়, সেক্ষেত্রে সাপের শনাক্তকারণ করে, রোগীকে প্রয়োজনীয় এবং সঠিক এন্টিভেনাম দেওয়া যায় l চিকিৎসকেরাও দ্রুত  চিকিৎসা করতে পারবেন l একবিংশ শতাব্দী মনে রেখে কোনো ওঝা, গুনিন বা so called godman-এর দয়ার ভরসা না রাখাই শ্রেয় এবং ওই পথটি অবলম্বন করা অনুচিত l বাংলায় বর্ষা কালে সব থেকে বেশ আক্রমণের কথা শোনা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রমনের হার দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় l ২০১৩ থেকে পশ্চিমবাংলায় সাপের দংশনে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার প্রতি বছরই ধীরে ধীরে কমছে l

russel viper
একটু সজাগ দৃষ্টি ও সাবধান চলাফেরা অনেকক্ষেত্রে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে এবং গ্রামে যারা জঙ্গলে, জলাভূমিতে ও কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করেন তাদের আক্রান্ত হবার সম্ভবনা বেশি থাকে। সাপ আমাদের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের  গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, তাদের দেখে ভয় পেয়ে আক্রমণ না করে বরং জীবের ও মানুষের শান্তিপূর্ণ  সহাবস্থান -এর সম্পর্ক বজায় রাখলেই আক্রমণের ঘটনা অনেক কমে যাবে l আক্রমণ ঘটলে একটু বিজ্ঞানমনস্কতা দেখালে এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করলেই মৃত্যু হারও কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকবে l

লেখকঃ সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 6

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

SAMSUNG GALAXY S10 series. #Article 1 ft. SAMSUNG GALAXY S10E

4.5 (6) মানুষের মনের মণিকোঠায় বরাবরই এক strong position বানিয়ে এসেছে SAMSUNG, এবং তার সাথেই বেড়ে চলেছে তাদের গ্রাহকসংখ্যা, এবং তাই আজ আমরা SAMSUNG Galaxy S10 seriesএর একটি ফোন নিয়ে আলোচনা করব| এই মডেলটি হল SAMSUNG GALAXY S10E, এবং এর দাম কোম্পানি রেখেছে 47,480 টাকা| ডিসপ্লেঃ- এই ফোনটিতে ব্যাবহার করা […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: