শালগ্রাম শিলা – বুজরুকি ও বিজ্ঞান

পর্ব এক

জীব জগৎ বৈচিত্রময়, আর বৈচিত্রের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিস্ময় । আমাদের দেশের মধ্যে যেমন জাতীয় পশু, পাখি, ফুল ও ফল, ঠিক তেমন আমাদের রাজ্যেরও পশু, পাখি রয়েছে, ভারতের প্রতিটি প্রদেশেও নিজস্ব রাজ্য গাছ, পশু, ফুল এবং প্রাণী রয়েছে যা রাজ্য গুলির বৈচিত্র নিদর্শন করে
আমাদের বাংলার রাজ্য পাখি হল – মাছরাঙা(হোয়াট থ্রোটেড),
রাজ্য ফুল হল – শিউলি,
রাজ্য প্রাণী হল – মেছোবিড়াল এবং
রাজ্য গাছ হল ছাতিম ।

এক সময় পশ্চিম বাংলায় ছাতিম গাছের আধিক্য ছিল কিন্তু সংখ্যা বর্তমানে খুবই কমছে । পুজোর সময় আমরা প্রায়ই সন্ধ্যে বেলায় যে মনোমোহিনী গন্ধ পাই, সেটাই হল ছাতিমের গন্ধ । বোলপুর শান্তিনিকেতনের একসময় নাম ছিল ছাতিমতলা, যার কারণ ছাতিম গাছের আধিক্য।
সাদা গলার মাছরাঙা, যদিও সংখ্যা কমছে তবুও শহরতলি-গ্রামে নিয়মিত দেখা যায় ।
মেছো বিড়াল এখন খুবই কম দেখতে পাওয়া যায় এবং এদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে, তার প্রধান কারণ এদের খাদ্য ও বাসস্থান-এর অভাব ।
বাঙালির দুর্গাপুজো আছে বলেই হয়তো শিউলি ফুলের খোঁজ আমরা রাখি।
আজ প্রাণী জগতের কিছু বিস্ময় এই পর্বে আপনাদের চেনাব, এই যেমন ধরুন খাদ্য শৃঙ্খল, আমাদের দূর্গা প্রতিমার মধ্যে পরিবেশের খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বহু প্রাণীর, এক অদ্ভুত সহাবস্থান দেখতে পাই। বাহনগুলিকে দেখলেই আমরা সহজে বুঝতে পারব নবপত্রিকার মধ্যে কলাগাছ সহ ৯টি গাছ, যা উৎপাদক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেl উদ্ভিদ গুলোর মধ্যেও বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন একবর্ষজীবী কলা গাছ আবার কন্দজাতীয় মানকচু, কাষ্ঠল ডালিমগাছ এক পাঁচমিশেলি সমাহার ।
খাদ্য জাল বিরাজ করছে, পেঁচা-ইঁদুর-ময়ূর-সাপ-সিংহ-মহিষ এর মধ্যে!!! এ জিনিস জীববৈচিত্র্য ছাড়া আর কি!!!

শালগ্রাম শিলা - বুজরুকি ও বিজ্ঞান
শালগ্রাম শিলা

শালগ্রাম শিলা বা নারায়ণ শিলা ( Ammonite fossile ) নেপালের মুক্তিনাথ গণ্ডকী নদীর এক বিশেষ প্রকারের জীবাশ্ম পাথর। শিবলিঙ্গ যেমন ব্রহ্মের প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়, ঠিক সেভাবেই ভগবান বিষ্ণুর প্রতীক চিহ্ন হিসেবে শালগ্রাম শিলা পূজিত হয়ে থাকে। শালগ্রামে চক্র চিহ্নিত হয়। আকৃতি ও রং রূপ অনুসারে সাক্ষাৎ ভগবান বিষ্ণুর এই স্বরূপ শিলার বিভিন্ন নাম হয়, যেমন – শ্রীধর, দামোদর, লক্ষ্মী জনার্দন ইত্যাদি। কিন্তু সকল শিলাই শালগ্রাম শিলা বলেই প্রচলিত। শিলার চক্র নষ্ট না হলে শালগ্রাম শিলা, ভাঙ্গা টুকরো ফাটা হলেও পূজা করা চলে। নেপালের মুক্তিনাথ গণ্ডকী নদী ভিন্ন দ্বিতীয় কোথাও শালগ্রাম শিলা পাওয়া যায় না, তাই গণ্ডকী নদীর শিলাই আসল শালগ্রাম শিলা। এই চক্ৰ-এর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে শিলা একচক্রী বা দ্বিচক্রী বা আরো বেশি চক্র হতে পারে, আবার একচক্রী শিলা উনিশ রকমের হয়।
হিমালয়ের উৎপত্তি হয় টেথিসসাগর থেকে এবং সেই সময়ই এই শিলার সৃষ্টি হয় বলে অনুমান করা হয় । ভগবান বিষ্ণুর উপাসনা যারা করেন তাদের কাছে অতি পবিত্র শিলা হল এই শালগ্রাম শিলা যা মুলত কালো বর্ণের জীবাশ্ম বা ফসিল। মোলাস্কা পর্বভুক্ত একপ্রকার সামুদ্রিক প্রানী যাদেরকে বিজ্ঞানীরা বলছেন Ammonite, তারা ভৌগোলিক প্রক্রিয়ায় জীবাশ্মে পরিণত হয়। এই ধরনের Ammonites গুলি কুন্ডলি আকৃতির কিংবা টিউব এর মতো আকৃতির হয়। এই ধরনের শালগ্রাম শিলা বা জীবাশ্ম সাদা এবং কালো দু ধরনের রং এর হয়। কালো শিলা নেপালের কালি গন্ডকি নদীবক্ষে পাওয়া যায়। এছাড়া হিমাচল প্রদেশের স্পিটিতে এবং ইউরোপের কিছু অঞ্চলে এরকম শালগ্রাম শিলা দেখা যায়। ভূ-বিজ্ঞানীরা প্রথম 1908 সালে এই শালগ্রাম শিলা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং নেপালে প্রাপ্ত শালগ্রাম শিলা পরীক্ষা করে দেখেন যে এই জীবাশ্ম গুলি ১৪০ মিলিয়ন থেকে ১৬৫ মিলিয়ন বছর পুরনো। বিজ্ঞানীগণ আরো জানিয়েছেন, এই ধরনের জীবাশ্মে পাইরাইট এবং কোয়ার্টজ এর ক্রিস্টাল পাওয়া গেছে। নেপালের মুক্তিনাথ এর পর থেকে কালি গন্ডকি নদীতে প্রচুর পরিমানে কালো বর্ণের এরকম জীবাশ্ম বা শালগ্রাম শিলা পাওয়া যায়। মনে করা হয় মুক্তিনাথের কাছে একটা বিশাল ক্লিফ ছিল যেখানে এই জীবাশ্ম গুলি ছিল এবং কালিগন্ডকি নদী সেগুলি জলস্রোতের মাধ্যমে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখনো এখানকার ক্লিফে কিছু এরকম জীবাশ্ম পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে,আমরা পুজো করি একটি অমেরুদন্ডীরাণীর জীবাশ্ম যুক্ত শিলা ।

শালগ্রাম শিলা - বুজরুকি ও বিজ্ঞান
শালগ্রাম শিলা

পুরাণে বর্ণিত ব্রজকীটই হল বিজ্ঞানের ভাষায় মোলাস্কা, কারণ আমাদের দেহে অন্ত:কঙ্কাল থাকে কিন্তু মোলাস্কা পর্বের প্রাণীদের দেহে বহিঃকঙ্কাল দেখা যায়l তাই তাদের দেহ খোলক দ্বারা ঢাকা থাকে,যেমন শামুক,ঝিনুক ইত্যাদি। ব্রজকীট দের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, দেহ শক্ত খোলকে আবৃত থাকে ।
এই মোলাস্কা পর্বের প্রাণীদের খাদ্য হিসেবেও জনপ্রিয়তা আছে, গ্রাম বাংলায় হুগলিতে গেড়ি গুগলি খাওয়ার প্রচলন আছে । এখনও বহু আদিবাসী মানুষদের আহার হয় এর জন্য, আর সামুদ্রিক খাবার হিসেবেতো প্রচলন আছেই ।
ঝিনুক থেকে মুক্ত পাওয়া যায়, তাদের ন্যাকার গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত পদার্থ জমা হয়ে তৈরি হয় মুক্ত । প্রবল হল এই মোলাস্কা, দি গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ হল সবচেয়ে বড়ো প্রবল প্রাচীর যা আজ ক্ষতিগ্রস্থ দূষণে, ভারতের দুই উপকূলে, পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূলে রয়েছে দুটি প্রবল প্রাচীর যা ভারতের উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করে, কিন্তু ক্রমাগত সামুদ্রিক দূষণ এবং ২০০৬ এর সুনামিতে প্রবালপ্রাচীর দুটি খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ।
মোলাস্কার আর একটি ভালো প্রচলন মহিলাদের অলংকার হিসেবে, যেমন বিবাহিত মহিলাদের শাখা ও পলা তাছাড়াও বিভিন্ন সৌখিন সৌন্দৰ্য্যায়ন বা ঘর সাজাবার জন্য, এবং আমাদের পৌরাণিক সব দেবতারই কিছু না কিছু শঙ্খ ছিল ও ঠাকুর ঘরের শাঁখটিও যা পুজোতে বা সন্ধ্যে বেলা বাজানো হয়ে থাকে, সেটিও একটি মোলাস্কা । কড়ি যা বহু কাল আছে মুদ্রা পরিবর্তে বিনিময়ে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো বা এখনও মাঙ্গলিক কাজে শুভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়,তাও একটি মোলাস্কা । আমরা না জানতেই, আমাদের পাশে কত কিছুতে বিভিন্ন রকম ভাবে প্রাণীদের ব্যবহার করি । যা সত্যিই প্রাণী জগতের বিস্ময় এবং বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য বহন করে ।

molusca
মোলাস্কা

 

 

 

লেখকঃ সৌভিক রায়

Leave a Reply

%d bloggers like this: