গণ বিলুপ্তির মাঝে দাড়িয়ে

poribes news
4.9
(8)

 

এরকম বলার কারণ অনেকগুলো দিক থেকে আমাদের উপর বিপদ নেমে আসছে। তবে অন্য কাউকে দোষ দেওয়া যাচ্ছে না, আঙুল তুলতে হচ্ছে নিজেদের দিকে। ইন্টারন্যাশানাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেসন অফ নেচার এর ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী ৯৯.৯% ভীষণ বিপন্ন প্রজাতি আর ৬৭% বিপন্ন প্রজাতি সামনের ১০০ বছরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

গণ বিলুপ্তি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা বলেন এটি তখনই ঘটে যখন একই সময়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে বিপর্যয় নেমে আসে। “একই সময়ে” কথার মানে পৃথিবীর বয়সের হিসাবে যেন, চোখের পলক ফেলতে যেটুকু সময় কিন্তু মানুষের হিসাবে লক্ষ কোটি বছর। একদিনে কেউ বিলুপ্ত হয় না। গণ বিলুপ্তি ৫০ হাজার বছর থেকে ২ কোটি ৫০ লক্ষ বছর ধরেও চলতে পারে। গ্ৰ্যাপ্টোলাইট (Graptolite) নামের প্রাণীগুলো চিরতরে লুপ্ত হওয়ার আগে, ১০ লক্ষ বছর পৃথিবীতে টিকে ছিল।

গণ বিলুপ্তির মাঝে দাড়িয়ে

পৃথিবীতে সবসময়ই কোন না কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে আর সেই খালি জায়গায় নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে। জীবমণ্ডলের সৃষ্টিকাল থেকেই এমন হয়ে আসছে। এই নির্দিষ্ট হারে বিলুপ্তিকে বিজ্ঞানীরা বলেন “ব্যাক গ্রাউন্ড রেট”। যখন প্রজাতির বিলুপ্তির হার অনেক গুণ বেশি বেড়ে যায় তখন শুরু হয় গণ বিলুপ্তি। যেমন এখন হচ্ছে, প্রজাতি মৃত্যু ১০০ গুণ বেশি বেড়ে গেছে। ইউনাইটেড নেশনস এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১০ লক্ষ প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে দাড়িয়ে আছে। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ৭৫% ভূভাগ, ৪০% সমুদ্র আর ৫০% নদীর জল শুধুমাত্র মানুষের কারনে অবক্ষয়ের এবং দূষণের সম্মুখীন।

বিজ্ঞানীরা যেটিকে প্রথম গণ বিলুপ্তি বলেন, সেটি ঘটেছিল অর্ডোভিশিয়ান এর শেষে, আজ থেকে ৪৪ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগে। প্রথমে সমুদ্রের জলে বরফের স্তর অনেক বেড়ে গেল, ফলে সমুদ্র স্রোত গুলোর অভিমুখ বদলে গেল, ফলে নিরক্ষরেখা আর ক্রান্তীয় অঞ্চলের আবহাওয়া খুব শীতল হয়ে গেল। ঠান্ডায় কিছু প্রাণী লুপ্ত হল। যে সব প্রাণীরা শীতল আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে বেঁচে গেল তাদের জন্য দ্বিতীয় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। শীতের অভিযোজন কাজে লাগল না, হঠাৎ বরফের স্তর গলতে থাকল, আবহাওয়া আবার উষ্ণ হয়ে উঠল, সমুদ্র স্রোত আবার এলোমেলো হয়ে গেল। বহু প্রজাতির মৃত্যু হল। তখনকার ৮৬% প্রজাতি পৃথিবী থেকে মুছে গিয়েছিল।

তারপরের গণ বিলুপ্তি আজ থেকে ৩৬ কোটি থেকে ৩৮ কোটি বছর আগের ঘটনা। এই গণ বিলুপ্তি ঘটেছিল ২ কোটি বছর ধরে ডিভোনিয়ান এর শেষে। সাইবেরিয়ার আগ্নেয়গিরিগুলিকে এর জন্য দায়ী করা হয়। ৭৫% প্রজাতি লুপ্ত হয়েছিল। ভার্টিব্রেটরা বেঁচে গেছিল। টেট্রাপড বা চতুষ্পদী ভার্টিব্রেট ডাঙায় উঠে এসে জন্ম দিল উভচর, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বসূরীদের।

গণ বিলুপ্তির মাঝে দাড়িয়ে

এরপরের গণ বিলুপ্তির জন্যও সাইবেরিয়ার আগ্নেয়গিরিগুলির অগ্ন্যুৎপাত দায়ী। পার্মিয়নের শেষে, আজ থেকে ২০ কোটি ৫১ লক্ষ বছর আগে, সেই যুগের ৯৬% প্রজাতি শেষ হয়ে গেছিল। এবারের ঘটনা ৫০,০০০ বছর ধরে ঘটেছিল। বায়ুমন্ডলের ওজন স্তর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি এসে পড়েছিল জীবমণ্ডলের উপর। এই পিরিয়ডে চারকোল গ্যাপ দেখা যায়। এই ব্যাপারটা হল দাবানলে পুড়তে পুড়তে যখন পৃথিবীতে পোড়ার মত আর কোন জঙ্গল বাকি রইল না তখন জিওলজিকাল টাইম স্কেলে চারকোল গ্যাপ তৈরি হল। ঐ সময়ের চূড়ান্ত খাদক ছিল সাইন্যাপসিড নামে এক সরীসৃপ ধরনের প্রাণী। ওদের বিলুপ্তির ফলে ডাইনোসরদের পথ পরিষ্কার হল। সাইন্যাপসিডদের বেঁচে যাওয়া অখ্যাত, ক্ষুদ্র এক শাখা থেকে স্তন্যপায়ীদের পূর্বসূরীর জন্ম হল।

 

তারপর ২০ কোটি ১০ লক্ষ বছর আগের কথা। এখন যেখানে অ্যাটলান্টিক মহাসমুদ্র সেখানে তখন আগ্নেয়গিরি ছিল। তাদের অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এই গণ বিলুপ্তি হয়েছিল। এটি ছিল চতুর্থ গণ বিলুপ্তি যাতে তখনকার ৮০% প্রজাতি হারিয়ে গেল। তবে ডাইনোসরদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছিল।

গণ বিলুপ্তির মাঝে দাড়িয়ে

ডাইনোসরদের কাল ঘনিয়ে এল আজ থেকে ৬ কোটি ৫৫ লক্ষ বছর আগে ক্রিটেশিয়াসের শেষে। একটা ব্যাপারে সব বিজ্ঞানীরা একমত মেক্সিকোতে একটা গ্ৰহাণু এসে পড়েছিল। তার সঙ্গে ভারতের ডেকান ট্র্যাপে যে সব আগ্নেয়গিরি ছিল সেগুলো থেকে প্রচন্ড অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছিল। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ যেমন বেড়ে গেছিল তেমন সমুদ্রের জলে অক্সিজেনের পরিমাণও কমে গেছিল। ডাইনোসরদের সাথে সাথেই সেই সময়কার ৭৬% প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। বেঁচে যাওয়া স্তন্যপায়ী আর পাখিরা এই নতুন পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে পৃথিবী দখল করল।
একটা গ্রহাণু পৃথিবীর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা আছে ২৬ শে ডিসেম্বর। ধাক্কা লাগবে না, অনেক দূর দিয়ে যাবে। এসব নয়, আমাদের গণ বিলুপ্তির কারণ হব আমরাই। মানুষের অপরিণামদর্শী কাজকর্ম, তরান্বিত করছে “ক্লাইমেট চেঞ্জ”। ইউনাইটেড নেশনস এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ৪০% উভচর, ৩৩% সামুদ্রিক জীব আর অন্তত ১০% কীট পতঙ্গ বিপদের মধ্যে আছে। ইতিমধ্যেই ৫,০০,০০০ ডাঙার প্রাণীর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্য ও বাসস্থান অবশিষ্ট নেই। সমুদ্র উষ্ণ হয়ে উঠছে। সমুদ্র তল বাড়ছে। দাবানলে জঙ্গল শেষ হয়ে যাচ্ছে। জমা বরফ গলে যাচ্ছে। ক্লাইমেট বদলে যাচ্ছে।

উৎপন্ন তেল না খেয়ে শরীর তাৎক্ষনিক ভাবে বেঁচে যাবে কিন্তু পৃথিবী বাঁচবে কি? খাদ্য সংক্রান্ত ব্যবসা ছাড়াও অন্য ব্যবসায় এই তেলের বহুল ব্যবহারের ফলে এর উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাস্তবে আফ্রিকান অয়েল পাম উদ্ভিদ প্রজাতিটি সবথেকে কম খরচে, কম সময়ে, কম জায়গায় সবথেকে বেশি তেল উৎপাদনে সক্ষম। সুতরাং একরের পর একর জঙ্গল কেটে পাম তেলের গাছের এক ফসলি চাষ অর্থাৎ মোনোকালচার হচ্ছে। মোনোকালচার একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা। এতে প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধবংস হয়ে যায় এবং তার বদলে জন্ম নেয় একটি অস্বাভাবিক, কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্র। কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্রে স্থানীয় প্রজাতির প্রাণীদের খাদ্য থাকে না, সঠিক বাসস্থানও থাকে না ফলে স্থানীয় প্রজাতির মৃত্যু অবধারিত হয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রেনফরেস্টে যে সব এন্ডেমিক (endemic) এবং বিপদগ্রস্থ (endangered) প্রাণীরা আছে, খাদ্য ও বাসস্থান হারিয়ে, তারা (যেমন বাঘ, গণ্ডার, হাতি ইত্যাদি প্রাণীরা) আরো বিপদে পড়ছে। যাদের সংরক্ষণ দরকার উল্টে তারাই প্রায় বিলুপ্তির সম্মুখীন।  আর জঙ্গল পুড়িয়ে ফেলার ফলে বাতাসে গ্রিন হাউস গ্যাস আরও বেড়ে যাচ্ছে। বাতাসে ভাসমান কণার (particulate matter) পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। জল ও মৃত্তিকা দূষণ হচ্ছে সে তো বলাই বাহুল্য। যখন যখন জঙ্গল পোড়ান হচ্ছে তখন ওখানে কৃত্রিম কুয়াশার বা হেজের সৃষ্টি হচ্ছে। একে “হেজ এপিসোড” বলা হচ্ছে। এই কৃত্রিম কুয়াশা কিন্তু এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। হেজ এপিসোডের সবথেকে বেশি প্রভাব পড়ছে গর্ভস্থ ভ্রূণ, সদ্যজাত শিশু আর ছোট ছোট বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের উপর। পরিণত বয়সের মানুষও নিস্তার পাচ্ছে না। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ সালে ঐ অঞ্চলের প্রায় ১ লাখ লোকের অকাল মৃত্যু হয়েছে যার কারণ বাতাসের দূষণ এবং তার ফলে হওয়া শ্বাসযন্ত্রের অসুখ, চোখ আর ত্বকের রোগ আর হার্টের অসুখ।  পাম তেল আমাদের স্বাস্থ্যের এবং যে পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে তা পৃথিবীর স্বাস্থ্যের ভয়ানক ক্ষতি ডেকে আনছে। ভারত সরকার পাম তেল আমদানির উপর অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করলে আমরা এই বিশেষ তেলের ব্যবহার বন্ধ করার দিকে এক ধাপ এগোব।

 

 

লেখিকা – মৌমিতা হীরা

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 8

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ভারতীয় শকুনরা বিলুপ্তির পথে, প্রকৃতির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নড়বড়ে

4.9 (8) এক্কেবারে ডোডো হয়ে যাবার আগে ভারতীয় জিপস্ শকুনরা ভাগাড় থেকে খবরের কাগজে একটুখানি জায়গা পেয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় সম্প্রতি লোকসভায় লিখিত জানিয়েছেন, শকুনদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রাশিয়া আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলেও দেশের তস্য নগণ্য আত্মীয়রা সময়ের উল্টোদিকে চলে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: