পরমানু চুল্লি আমরা কেন চাই না ?

poribes news
3.4
(5)

চারশাে সাতচল্লিশ কোটি বছর লাগে ইউরেনিয়াম ২৩৮ অর্ধেক শেষ হতে। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরােসিমা ও নাগাসাকি শহরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র পরপর দুটি পরমাণু বােমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। দু’লক্ষের অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তেজস্ক্রিয় রশ্মির প্রভাবে হাজার হাজার মানুষের ক্যানসার, লিউকোমিয়া প্রভৃতি দুরারােগ্য ব্যাধি, অসংখ্য বিকলাঙ্গ মানুষের জন্ম হয়েছিল। পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে এই রক্তে ভেজা অংশটুকু নবীন-প্রবীণ প্রতিটি প্রজন্মের মানুষের কাছে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিক্রিয়াশীল, যুদ্ধবাজ তথা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামে শপথ নেবার ডাক দেয়। ৭০ বছর পর আজও এই আহ্বান আরও। বেশি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, যুদ্ধের পরিমণ্ডল ছেড়ে পরমাণু শক্তির তথাকথিত শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের আড়ালে সমগ্র পৃথিবীটাকেই যুদ্ধবাজ দেশগুলি হিরােসিমা-নাগাসাকিতে পরিণত করতে উদ্যত। যুদ্ধবাজ দেশগুলি ইতিমধ্যে প্রায়২০০০ পরমাণু বােমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বলাবাহুল্য এইসব পরমাণু বােমা তৈরির জন্য প্রয়ােজনীয় প্লুটোনিয়াম (এক ধরনের তেজস্ক্রি মৌল) পাওয়া যায় পরমাণু শক্তির তথাকথিত শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পীঠস্থান—পরমাণু বিদ্যুৎ বা পরমাণুচুল্লি প্রকল্পগুলি থেকে। পরমানু শক্তি সমস্যা মেটানাের জন্য ন্যূনতম ভূমিকা পালনেও সমর্থ নয়।বরং সকল মানুষের কাছে এটি একটি সভ্যতাবিরােধী প্রয়াস বলেই আমরা মনেকরি। কেন আমরা পরমাণু চুল্লি চাই না সেই কারণগুলিই আলােচনা করা হল-

nuclear plant poromanu

(১) তেজস্ক্রিয় দূষণ : মানুষ বা কোন জীবের শরীরে যখন তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করে বা তেজস্ক্রিয়তা (আলফা, বিটা, গামা রশ্মি) লাগে তখন মানুষ কিছুই বুঝতে পারে না অথচ জীবকোষের পরিবর্তনের ফলে (জীনঘটিত পরিবর্তন) ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হয় ক্যানসার, লিউকোমিয়ার ভাণ্ডার বা বিকলাঙ্গ শিশুর অঙ্গীকার। তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব শত-শত বছর ধরে চলতে থাকে। পরমাণু চুল্লির মােট ৯টি পর্যায়ের প্রত্যেকটি থেকেই নিয়মিতভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বেরিয়ে পরিবেশে মিশছে। ১৯৮৬ সালে রাশিয়ার চেরনােবিল পরমাণুচুল্লি দুর্ঘটনার ফলে সংলগ্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বৃদ্ধি পায় বিশ্ববিখ্যাত পরমানু বিজ্ঞানী জন গম্যানের হিসেব অনুযায়ী আগামী বেশ কয়েকবছর ধরে ব্যাপক অঞ্চলে ১০-১২ লাখ মানুষের ক্যানসার ও লিউকোমিয়া সহ নানা দুরারােগ্য রােগ বেড়ে যাবে। এছাড়া প্রতিটি পরমাণু চুল্লি থেকে কমবেশি তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। পরমাণু চুল্লিগুলির সাধারণ আয়ু গড়ে ৫০ বছর। এই সময়ের পরে প্রতিটি পরমাণু চুল্লি তেজস্ক্রিয় দূষণ পরিণত হবে। এদের একমাত্র মােটা সিসার মােড়কে মাটির নীচে কবর দেওয়া যেতে পারে।
(২) ক. উৎপাদন খরচ : একই পরিমাণ ক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু চুল্লি বা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ থেকে প্রায় সাড়ে তিনগুণ, এছাড়া পরমাণু চুল্লিগুলি নির্দিষ্ট সময়ের পর নিরাপদ স্থানে রাখার খরচ পরমাণু চুল্লি স্থাপনের খরচের প্রায় সমান।

খ. উৎপাদন ক্ষমতা : পরমাণু চুল্লি বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বার্ষিক নির্দিষ্ট উৎপাদনের মাত্র ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে। এছাড়া ধার্য উৎপাদন ক্ষমতা প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম।
(৩)তাপবিদ্যুৎ:  পরমানু   চুল্লি  জ্বালানি ইউরেনিয়ামকে যখন নিউট্রন কণিকা এম আঘাত করা হয় তখন প্রতিটি ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙ্গে দুটি পৃথক মৌলের পরমাণুতে পরিণত হয়। দুটি পৃথক পরমাণু ও মুক্ত নিউটন মিলে ইউরেনিয়ামের পরমানু ও প্রাথমিক একটি নিউট্রনের একক ভরের চোয় কিছুটা কম। যেটুক ভর কম হয়, সেইটুকু সম্পূর্ণভাবে তাপশক্তিতে পরিণত হয়। এই তাপশক্তি যে কি বিপুল পরিমাণ তা কল্পনা করা শক্ত। এই তাপের খুবই সামান্য অংশ কাজে লাগিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু ব্যাপক তাপই পার্শবর্তী। বায়ু, যােগাযােগকারী জলাশয় বিশেষ করে নদী বা সাগরের জলে মিশে জলাশয়ের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। চুল্লির কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপকে সঙ্গে সঙ্গেই শীতলীকরণ-এর মাধ্যমে যদি ঠাণ্ডা না করা যায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে পুরাে চুল্লিই গলে যাবে।পরমাণু চুল্লি বিস্ফোরণ ঘটাবে, চারিদিকে বাপকভাবে পরমাণু দূষণ ছড়িয়ে পড়বে।

(৪) জৈব বিবর্তনের সঙ্গে অসঙ্গতি : সমগ্র পৃথিবীতে মানুষ সহ গােটা জীবজগৎ দীর্ঘ জৈব বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে—এটা সর্বজন স্বীকৃত। বিবর্তনের পথে জীবজগৎকে প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। জৈববিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল তেজস্ক্রিয়তা গোড়ার দিকে পৃথিবীতে তাপমাত্রা ও তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ বেশি ছিল। সময়ের সাথে তেজস্ক্রিয়তা যত কমেছে।বিবর্তন ততই এগিয়েছে। পরমাণু চুল্পি স্থাপনের ফলে তেজস্ক্রিয়তা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জৈব বিবর্তনের তথা সভ্যতার অস্তিত্বের পক্ষে এক বিপজ্জনকপ্রয়াস। তেজস্ক্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকলে জীবজগতের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে নতুন করে সমস্যা তৈরি হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
(৫) তেজস্ক্রিয় আবর্জনা : প্রতিটি পরমাণু চুল্লির কেন্দ্রে তাপ উৎপাদনের সময় প্লটোনিয়াম সহ ২০০-এর অধিক তেজস্ক্রিয় পদার্থ তৈরি হয়। প্লুটোনিয়ামকে পরমাণু বােমা তৈরির জন্য মূল উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য তেজস্ক্রিয় আবর্জনাগুলি নির্বাহের জন্য কোন বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা নেই। শুধুমাত্র পুরুস্টীলের কক্ষে এই সব আবর্জনাকে সীল করে সমুদ্র গর্ভে ফেলে দেওয়া হয়।শুধুমাত্র আমেরিকাই প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি কক্ষ সমুদ্র গর্ভে ফেলেছে। তেজস্ক্রিয় আবর্জনার দূষণে সমুদ্রও আজ বিপন্ন। এছাড়া অন্যান্য তেজস্ক্রিয়আবর্জনাগুলি পরিবেশে নানা দুরারােগ্য রােগ ছড়ায়। চেরনােবিল পরমাণু চুল্লির। দুর্ঘটনার ফলে সমুদ্রের জলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন। রাজ্যে পরমাণুচল্লিগুলি থেকে নিয়মিতভাবে তেজস্ক্রিয় আবর্জনা পরিবেশকে সামগ্রিকভাবে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
(৬) পরমাণু চুল্লির দুর্ঘটনা : পরমাণচুল্লির দুর্ঘটনার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি, বছরের পর বছর ধরে চলে, যেমন হিরােসিমা-নাগাসাকিতে এখনও বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে সারা বিশ্বে পরমাণু চুল্লির দুর্ঘটনায় সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। কয়েক গুরুত্বপূর্ণ দুর্ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা হল। ১৯৫২ সালের ১২ ডিসেম্বর কানাডার চকরিভার অঞ্চলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ৪০ লক্ষ টন তেজস্ক্রিয় ছড়িয়ে গিয়েছিল ১৯৫৭ সালের ৮ অক্টোবর ইংল্যান্ডের উইন্ডস্কেলে পরমাণু চুল্লির দুর্ঘটনার ফলে সরকার বাধ্য হয়ে চারপাশে পুরু কংক্রীটের দেওয়াল ফিরে কবরস্থ করেন। ১৯৬১ সাল আমেরিকার ইজাহাের চুল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটে।ক্ষয়ক্ষতির পুরাে রিপােট প্রকাশ হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে তেজস্ক্রিয়তা।ব্যাপকভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিল। রাশিয়ায় ১৯৫৮ সালে দক্ষিণ ইউরালে প্রথম। দুর্ঘটনা ঘটে, হাজার হাজার লােককে ওই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল| পৃথিবীর সবচেয়ে নজিরবিহীন ঘটনা হল আমেরিকার থ্রিমাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনা। “WASA-740′ রিপাের্টে বলা হয়েছে বড় মাপের কোনও পরমাণু চুল্লি দুর্ঘটনা ঘটলে কি কি ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। ৩৪০০ মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু, তেজস্ক্রিয়তার শিকার ৪৩,০০০ জন, সম্পত্তি নষ্ট হবে ৭ বিলিয়ন ডলার,১,৫০,০০০ বর্গ কি.মি আবাদি জমি তেজস্ক্রিয়তার শিকার হবে। রাশিয়ার চেরনােবিল দুর্ঘটনায় (১৯৮৬) ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০০৪ সাল পর্যন্ত চেরনােবিলে তেজস্ক্রিয় দূষণে মৃত্যুর সংখ্যা ৯,৮৫,০০০। এখনও চেরনােবিলে তেজস্ক্রিয় দূষণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে| সমগ্র পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত প্রায় কমবেশি ৫০০এর মতাে পরমাণু চুল্লি রয়েছে। কমবেশি ১০০টি বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভারতে মােট ৯টি পরমাণু চুল্লি এখন পর্যন্ত মােট উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারেনি। মাত্র ৫টি পরমাণু চুল্লি কোনও মতে চলছে। ১৯৯০ সালে ‘ওয়াচডগ’ এবং ‘গােপন এজেন্সির খবরে জানা যায় ১৯৯০ সাল। পর্যন্ত ভারতে সবকটি পরমাণু কেন্দ্রে প্রায় ১০০টি ছােটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে। পরমাণু শক্তি কমিশন কোনও দুর্ঘটনারই ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশ করেনি। ১৯৮৮-৯৪ সালের মধ্যে ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কমপক্ষে ২৪টি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে। পরিবেশবাদী আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘গ্রীনপীস’ ও ‘অ্যান্টিঅ্যাটম ইনটারন্যাশনাল’ সংস্থার তথ্যানুযায়ী রাজস্থানের পরমাণু চুল্লির ১ নং ইউনিটে বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটে। ভারী জল লিক, টার্বাইন বিস্ফোরণ সহ বিভিন্ন ধরনের ছােটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। অথচ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তনপ্রধান ২১ অক্টোবর, ১৯৯৯ সালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন ভারতের পরমাণু শক্তি কেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন জোরদার নয়। ১৩০টি ছােটোখাটো ত্রুটির কথা ৯৫ সালে উল্লেখ করা হয়েছিল, যদিও পরমাণু শক্তি দপ্তর সেই রিপাের্ট প্রকাশ করেনি। ২০১১ জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড,ইতালি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, জাপান সহ বেশির ভাগ দেশই পরমাণু চুল্লি বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত ঘােষণা করেন। কোনাে উন্নত দেশেই নতুন করে পরমাণু শক্তির প্রসার ঘটছে না। সুতরাং একথা নিশ্চয়ই বলা যায় পরমাণু চুল্লির দুর্ঘটনা সভ্যতার পক্ষে ভয়ংকর এবং অন্যান্য শিল্পের দুর্ঘটনার থেকে মৌলিকভাবে পৃথক। সারা পৃথিবী জুড়ে পরমাণুচুল্লি বিরােধী আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প ও পুনর্নবীকরণযােগ্য।শক্তির উৎসগুলি নিয়ে গবেষণা ও সঠিক প্রয়ােগের চেষ্টা চালানাে হচ্ছে।

পরমানু চুল্লি

লেখক – জয়দেব দে

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 3.4 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

১০০০ কোটি মানুষের পুষ্টি যোগাতে পারবে

3.4 (5) ফোরবস ম্যাগাজিন বলছে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা ১০০০ কোটি হয়ে যাবে। আর ইউনাইটেড নেশনস বলছে খাদ্য উৎপাদন ৭০ শতাংশ না বাড়ালে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া শুধু খাদ্য যোগালেই তো হবে না। খাদ্যে যথাযথ পুষ্টিগুণ না থাকলে শরীরের সঠিক বৃদ্ধি […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: