“ভূটান”

poribes news
5
(1)

পুজোর ছুটিতে এবার ঘুরে এলাম স্বচ্ছ, সুসজ্জিত, শান্তিপূর্ণ, পাহাড়ি দেশ ভূটান। বেশিরভাগ বাঙালি যেভাবে ভূটান-ভ্রমণ করে থাকেন, আমরা সেই গতানুগতিক ভ্রমণ সূচির কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে, কুড়িটি জেলা নিয়ে গঠিত দেশটির প্রায় অর্ধেক অংশ ঘুরে বেড়িয়েছি ।

vutan2.jpg

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছাড়িয়ে রেলপথের দু’ধারে বিস্তীর্ণ সবুজ চা বাগিচা আর তরাইয়ের বনভূমির অংশ বিশেষ দেখতে দেখতে এসে পৌঁছালাম হাসিমারা স্টেশনে। পূর্ব পরিকল্পনা মতো জাপানি গাড়িতে চেপে ভারত সীমান্ত পেরিয়ে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ এসে ঢুকলাম Phuentsholing. পারমিট-এর সব কাগজপত্র আগেই তৈরি ছিল বলে অল্প সময়ের মধ্যেই অফিসিয়াল কাজকর্ম সেরে চলে এলাম হোটেলে।স্নান, খাওয়া আর বিশ্রাম শেষে বেড়িয়ে পড়লাম শহরে। ঘুরে এলাম এখানকার Zangtopelri Temple, Zanglo Pelri Musium, Karbandi Monastery. পার্কে আড্ডা মেরেও সময় কাটল কিছুক্ষণ। বেশ ক’টাদিন মাছ ভাত আর কপালে জুটবে না ভেবে, পায়ে পায়ে ভূটান গেট পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জয়গাঁও থেকে ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেলে।

vutan3.jpg

পরদিন সকালে গাড়ি ছুটে চলল থিম্পুর পথে। পুরো দেশটির প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিষয়ের সামগ্রিক চিত্র দর্শনের শুরু এখান থেকেই। নানা রূপে সুবিন্যস্ত পাহাড়ের কোলে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাইন। শুধু পাহাড় আর পাহাড়। যেন ছবির মতো। ঝকঝকে স্বচ্ছ পাহাড়ি রাস্তা। এতটুকুও নোংরা জমে নেই কোথাও। হর্ণ বাজে না কোন গাড়িতে, নেই কোন ট্রাফিক সিগন্যাল। অথচ সকলেই বড় ডিসিপ্লিনড্। সবার মধ্যে বেশ সুন্দর একটা বোঝাপড়া। উঁচু স্বরে কথা বলে না কেউই। অ্যাক্সিডেন্টের ভয়ও নেই বললেই চলে। প্ল্যান মাফিক দর্শনীয় স্থানগুলি কভার করতে করতে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। চতুর্থ রাজা Jigme singye Wangchuck-এর সময়ে নির্মিত সুউচ্চ (54 মিঃ) শাক্যমুনি বুদ্ধ মূর্তির পাদদেশে এক পরম শান্তির ছোঁয়ায় যেন ধন্য হলাম আমরাও। মন্দিরের উপরে স্থাপিত সেই মহান বুদ্ধমূর্তি, থিম্ফুর বিভিন্ন অংশ চোখে পড়ে সহজেই। স্থানীয় মানুষেরা একে বলে ‘বুদ্ধ পয়েন্ট’। মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ অবাধ। সাজানো রয়েছে এক লক্ষ আটটি ছোট ছোট বুদ্ধ মূর্তি।এখানকার শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে বেশ কিছুটা সময় কেটে যায় যেন মনের অজান্তেই। এছাড়াও ওয়াং চু নদীর ধারেই অবস্থিত Tashichho Dzong থিম্ফু শহরের আরও একটি আকর্ষণ। আছে গৃহপালিত পশু টাকিন সংরক্ষণ কেন্দ্র, ফোক হেরিটেজ, মিউজিয়াম, টেক্সটাইল মিউজিয়াম প্রভৃতি। মাঝপথে রেস্টুরেন্টে সেরে নিলাম খাওয়া দাওয়া। খেলাম ‘এমাদাচী’ নামের ভূটানের এক স্পেশাল খাবার আর ‘সুজা’ চা খারাপ লাগেনি। তবে রেস্টুরেন্ট ভেদে এসবের স্বাদ পেয়েছি ভিন্ন ভিন্ন।কোথাও ভালো, তো কোথাও মন্দ।এখানকার যে কোন খাবারের বিশেষত্বই হল বাটার বা পনির। সে চা-ই হোক অথবা চিকেন বা তরকারি। খাবারে তেল মশলার ব্যবহার নেই এখানে। ভাজা খায়না এরা,শুধু সেদ্ধ করা খাবার খেতে এরা অভ্যস্ত। তাই অসুখ বিসুখের প্রকোপ বেশ খানিকটা কম। যে কোন দোকান, শপিংমল, হোম স্টে, বার, হোটেল সব কিছু চালায় মহিলারা এবং তা অতি দক্ষতার সাথে। বাড়ির পুরুষেরা বেশির ভাগ যুক্ত থাকে চাষাবাদ, অফিস বা অন্য কোন পরিশ্রমের কাজে। Phuentsholing থেকে সোজা Thimphu আসতে ঘন্টা চারেক সময় লাগে। আমরা visiting place গুলি cover করে হোটেলে এসে পৌঁছালাম বিকেল পাঁচটায়। ফ্রেস হয়ে, টিফিন খেয়ে ঘুরে দেখলাম রাতের থিম্ফুকে। ইচ্ছে মত টুকিটাকি কেনাকাটাও করল কেউ কেউ।টাকার মূল্যএকই। ভারতীয় নোটও চলে সর্বত্র। তবে ২০০০ টাকার নোট নিতে রাজি হয় না কেউ। সব কিছুর দামই যেন আগুনছোঁয়া। হোটেলে এসে সব পরিবার মিলে একটি ঘরেই জমিয়ে আড্ডা চলল কিছুক্ষণ। পরদিন সকালে আমাদের যাত্রা শুরু হবে Wangdu-র উদ্দেশ্যে।

vutan5.jpg

Thimphu থেকে Wangdu যাবার পথ ঘন্টা চারেক। এ পথ যেন আরো বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ, পাহাড়ি নদী আর ঝর্না রাস্তায় উঁকি দেয় থেকে থেকে। এত মনোরম দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে যে তার সবকিছুকে ক্যামেরা বন্দি করাও বিষম দুরূহ ব্যাপার। পথে যেতে যেতে নজরে পড়ে বেশ কয়টি আপেলের বাগান। ফটো তুলল কেউ কেউ। কিছু দূর এগিয়েছি। Lahola তে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চ’রে বেড়াচ্ছে অনেক চমরী গাই। জানলাম, এ অঞ্চলের লোকেরা চমরী গাই পালন করে।এখানকার মানুষের কাছে এই জীবটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট।

vutan8.jpg

Wangdu তে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ monastery – Gangtey Gonpa, আছে অসাধারণ মন মুগ্ধকর পাহাড়ের কোলে Phobjikha Valley, সূর্যাস্তের রং-এ যা হয়ে ওঠে অবর্ণনীয়। এই সময়ে এখানকার তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। প্রতি বছর তিব্বত থেকে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য ছুটে আসে শ’য়ে শ’য়ে কালো রঙের গ্রীবা যুক্ত সারস।প্রায় মাস তিনেক এরা আশ্রয় নেয় Phobjikhaতে। এই উপলক্ষে স্থানীয় বাসিন্দারা এক মেলারও আয়োজন করে প্রতি বছর নভেম্বর মাসে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ব্ল্যাক নেকড ক্রেন সেজে লোকগীতি আর লোকনৃত্যে অংশ নেয়। ফলে সেই মেলা আরও বেশি উৎসব মুখর হয়ে ওঠে। এরূপ বিরল প্রজাতির প্রাণি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন গ্রামবাসীরা। হোমস্টেতে যাবার আগে আমরা দেখে এলাম বছর চারেক আগে আহত হওয়া এক ব্ল্যাক নেকড ক্রেন, যে কিনা এই উপত্যকায় স্থানীয়দের শুশ্রুষায় ফিরে পায় তার জীবন। ভালোবেসে অধিবাসীরা এর নাম দিয়েছেন ‘কর্মা’। ডানায় ইনজুরির কারণে সে আর ফিরে যেতে পারেনি তিব্বতে।আজ Phobjikha তে সুরক্ষিত। প্রথম প্রথম ওর সঙ্গী সাথীর অভাবে সারা দিন ধরে নাকি খুব চিৎকার করত ‘কর্মা’। শেষে ওর আবাসস্থলের চতুর্দিকে লাগানো হয় আয়না। যেগুলিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ‘কর্মা’ নাকি তার সঙ্গীসাথী বলে মনে করে।

vutan7

এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করলাম হোমস্টেতে এসে। অপূর্ব সুন্দর এক প্রকৃতির কোলে তখন আমরা সকলেই অভূতপূর্ব রূপে মোহিত।চতুর্দিকে পাহাড়ের গায়ে সারি দেওয়া সবুজ বনভূমির মাঝে মধ্যে নাম না জানা সাদা, লাল আর হলুদ ফুলের আভা, অবর্ণনীয় রঙিন ছটায় মাথার ওপর আস্ত একটা আকাশ আর নীচে আমাদের ঘিরে রয়েছে সবুজ ফসলের ক্ষেত। মন আপনা থেকেই ছুটে চলেছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। এরপর এসে পরলাম রেল স্টেশন, বাড়ি ফেরার পালা।

ঘুরে আসুন ভালো লাগবে।

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিচিত্রপুর

5 (1) কাছে দূরে অচিনপুরে (ভ্রমন গাইড) একটু অচেনা, বিচিত্র নামের এ জায়গাটি কিন্তু খুব চেনা দীঘার কাছে। যদিও তা তালসারি, চন্দনেশ্বর শিবমন্দির পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে প্রতিবেশী রাজ্য তাড়শায়। শিব মন্দির থেকে ১৮-২০ কিলােমিটার দুরেই বিচিত্রপুর। কংক্রিটের আঁকাবাঁকা রাস্তার দুধারে আছে সুদৃশ্য পানের বরােজ ,মাঝে মাঝে জলা,কাঁচ বাড়ি, বালিমাটিতে কাজু […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: