কী ছিল প্রথম আদি কোষেরও আগে

@
4
(7)

Image result for embryonic-cell

কী করে নিষ্প্রাণ পৃথিবীতে প্রাণ এল? এর উত্তর জানার জন্য মানুষ চিরকাল চেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতেও বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করতে থাকবেন, যতক্ষণ না সর্বজনগ্রাহ্য একটি মতবাদের জন্ম হচ্ছে এবং মতবাদের সত্যতা পরীক্ষাগারে যাচাই হচ্ছে।

আজকের পৃথিবীতে যা কিছু জীবিত তাদের প্রত্যেকের কোষের গঠনে একটি মৌলিক মিল আছে। প্রতি ক্ষেত্রেই ফসফোলিপিডের পর্দা ঘিরে রেখেছে খানিকটা জলীয় পদার্থ যার মধ্যে ভাসমান, নিউক্লিক অ্যাসিড দিয়ে তৈরি জেনেটিক বস্তু। এই জেনেটিক পদার্থটি দায়ি কোষের পুনরুৎপাদন ক্ষমতার জন্য। সকলের মধ্যে এই মৌলিক মিলটি থাকার কারনে বলা হয়, একই আদিম কোষ থেকে সকলের উৎপত্তি।

আজ থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে প্রথম কোষ তৈরি হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর সুতরাং দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর জন্মের মাত্র ৭৫ কোটি বছর পরেই প্রথম কোষের সৃষ্টি হয়।

১৯৫০ সালে প্রথম স্ট্যানলি মিলার দেখিয়েছিলেন কীভাবে বিদ্যুতের শক্তি ব্যবহার করে জলের উপস্থিতিতে অজৈব অণু যেমন হাইড্রোজেন, মিথেন আর অ্যামোনিয়ার মিশ্রণ থেকে জৈব অণু তৈরি হওয়া সম্ভব। অন্য বিজ্ঞানীরা তাদের সফল পরীক্ষায় দেখিয়েছেন কীভাবে সরল জৈব অণু থেকে জটিল বৃহত্তর জৈব অণু তৈরি হয়।

কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোষের পুনরুৎপাদন ক্ষমতা যা একমাত্র জেনেটিক পদার্থ থেকে আসে। সুতরাং কোষ তৈরির আগে দরকার জেনেটিক বস্তু তৈরি যা নিজে নিজেই নিজের প্রতিলিপি গঠনে সক্ষম। আরএনএ(RNA) হল সেই জেনেটিক বস্তু যা নিজে নিজের প্রতিলিপি গঠনের নির্দেশ দিতে পারে এবং প্রতিলিপি গঠনের জন্য যা যা দরকার সেই সব প্রোটিনও তৈরি করতে পারে। পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি ও বিবর্তনের ইতিহাসে এই সময়কে বলা হয় আরএনএ পৃথিবী এবং এই মতবাদকে বলা হয় আরএনএ পৃথিবীর মতবাদ (RNA world theory)। স্বয়ংসম্পূর্ণ আরএনএ কে ফসফোলিপিডের পর্দা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তৈরি করল প্রথম কোষ।

RNA world theory অনুযায়ী আরএনএ তৈরির জন্য দরকার আরএনএ এর একক নিউক্লিয়বেস। আগে এই ধরনের জৈব অণু নিউক্লিয়বেস সৃষ্টির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আংশিক সাফল্য এসেছে অর্থাৎ আলাদা আলাদা নিউক্লিওবেসের জন্য আলাদা আলাদা পরিবেশের প্রয়োজন হয়েছিল যেটা বাস্তব পৃথিবীতে সম্ভব নয়। এবারের এক্সপেরিমেন্ট এর সাফল্য এই যে একই পরিবেশে, সম্ভবত যেরকম পরিবেশ প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে ছিল, সবকটি নিউক্লিওবেস তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

Image result for RNA

ক্যারেল এবং তার টিম একই পরিবেশে, একই শর্তসাপেক্ষে সফলভাবে চারটি নিউক্লিয়বেস তৈরি করেছেন। তারা বলেছেন মৌলিক রাসায়নিক উপাদান যেমন জল, নাইট্রোজেন ইত্যাদির বিক্রিয়ায় নিউক্লিয়বেস তৈরি হওয়া সম্ভব। এই পদ্ধতিতে কোটি কোটি বছর ধরে এতো নিউক্লিয়বেস তৈরি হয়েছিল যে পৃথিবীর উপর নিউক্লিয়বেসের মোটা সরের আস্তরন পড়ে গেছিল। তাদের সফল পরীক্ষা আরএনএ পৃথিবীর তত্ত্বকে আরও জোরদার করল।

নেচার পত্রিকার বিবরণ অনুযায়ী এই এক্সপেরিমেন্টের জন্য ক্যারেল আর তার দলের সদস্যরা দুটো পুকুর তৈরি করলেন। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুকুর দুটিকে ক্রমাগত জলীয় থেকে শুষ্ক, গরম থেকে ঠাণ্ডা, অ্যাসিডিক থেকে ক্ষারীয় অবস্থার মধ্যে রাখা হল। সেইসাথে পরীক্ষায় ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলি মাঝে মাঝে এক পুকুর থেকে অন্য পুকুরে প্রবাহিত করা হতে থাকল। প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির পর, প্রথমেই গরম জলে সরল অণুগুলিকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিক্রিয়া করতে দেওয়া হল। তারপর মিশ্রণ ঠাণ্ডা করা হল। ঠান্ডা মিশ্রণের জল শুকিয়ে ফেলা হল। দেখা গেল পুকুরের নিচে পরে আছে দুটি জৈব যৌগের ক্রিস্টালের স্তর। আবার জল মেশানো হল। যে যৌগ জলে দ্রবীভূত হয় সেটা জলে মিশে গেল। এই যৌগ মিশ্রিত জল অন্য পুকুরে পাঠিয়ে দেওয়া হল, পড়ে থাকা অদ্রবীভূত যৌগটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আরও কিছু বিক্রিয়া করল। এরপর উৎপন্ন সব যৌগগুলি আবার একসাথে মেশানো হল, এর ফলে তারা আবার নিজেদের মধ্যে বিক্রিয়া করল। শেষ পর্যন্ত বিক্রিয়াজাত পদার্থ হিসাবে চারটি নিউক্লিয়বেস অ্যাডেনিন, ইউরাসিল, সাইটোসিন, গুয়ানিন পাওয়া গেল। এই এক্সপেরিমেন্ট করে ক্যারেল আর তার টিম পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সব আরএনএ বেস তৈরি করা সম্ভব।

বিজ্ঞানীদের এর পরের এক্সপেরিমেন্টগুলো যেমন সুগার রাইবোস তৈরি, সুগার রাইবোস নিউক্লিয়বেসের সাথে যুক্ত হয়ে নিউক্লিওটাইড তৈরি ইত্যাদি সফল হলে, প্রাণ সৃষ্টির কৃতিত্ব এলিয়ান বা অন্য কেউ নিতে পারবে না। ক্যারেল বলছেন যে এই পরীক্ষা প্রমান করল আরএনএ তৈরি হওয়া আমাদের গ্রহের জন্য, কোন হঠাৎ পাওয়া সৌভাগ্য নয়, উপযুক্ত পরিবেশে যে কোন গ্রহেই এমনটা ঘটতে পারে।

 

মৌমিতা হীরা

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইন্ডেস্ক ২০২০তে পাঁচ নম্বরে ভারতবর্ষ

4 (7) কয়েকটা গোদা স্ট্যাটিসটিকস্ কথা শুরু করবার আগে : ১৯৬০-এর দশকে ভারতে বড় ধরনের ঝঞ্ঝা, বন্যা, খরা হয়েছিল ৩২ টি। সদ্য পার হয়ে যাওয়া ২০১০-এর দশকে ভারতে এইধরনের বিপর্যয়ের সংখ্যা বাড়ল প্রায় চারগুণ, কাঁটায় কাঁটায় বললে ১১০ টি। ১৯০০-এর দশকে জলবায়ু পরিবর্তন নামটাও যখন কেউ শোনেনি, তখনকার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: