এই দশকের প্রথম চন্দ্র গ্রহণ

 

আগামি ১0ই জানুয়ারি এই দশকের প্রথম চন্দ্রগ্রহণ হতে চলেছে।যা নিয়ে আকাশপ্রেমী মানুষের আগ্রহ চরম। রাতের আকাশে চাঁদকে ভাল লাগে না এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। আর সেই চাঁদ যদি পূর্ণিমার চাঁদ হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই, পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে যে অনাবিল আনন্দের উদ্রেক ঘটে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আজকে আলোচনা করব চন্দ্রগ্রহণসহ চাঁদের নানা রূপ তথা ব্লু মুন, সুপার মুন, ব্লাড মুন নিয়ে।সেই সাথে জেনে নেব এবছরে কোথায়, কবে হতে চলেছে চন্দ্র গ্রহণ।

▪ চন্দ্র গ্রহণ :-

২০২০ সালে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে একথা বলার প্রয়োজন নেই যে গ্রহণ মানে রাহু-কেতু খেলা নয়, এটি হল আলো-ছায়ার খেলা। বিষয়টি সকলের জানা তাও আরো একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। আলোর চলার পথে কোনো অস্বচ্ছ বস্তু(যার মধ্যে দিয়ে আলো চলাচল করতে পারে না) এসে পড়লে তার ছায়ার সৃষ্টি হয়। আর তখন ছায়াবৃত্ত অঞ্চল থেকে মূল আলোক উৎস কে দেখা যায় না।আবার আমরা অনেকেই অন্ধকার ঘরে টর্চ জ্বালিয়ে সেই আলোর সামনে হাত দিয়ে হাতের ছায়া দেওয়ালে ফেলেছি। তবে এই দেখতে না পাবার বিষয়টি সর্বত্র এক নয়।তোমরা অনেক সময় দিনের বেলায় মাঠে খেলতে গিয়ে দেখেছো আকাশে ছোট ছোট মেঘ ভেসে বেড়ালে কোথাও রোদ ও কোথাও ছায়া দেখতে পাও। কারণ যে অংশে সূর্য মেঘ দিয়ে ঢাকা পড়ে সেই অংশে ছায়া হলেও ঠিক পাশেই সূর্য মেঘ দিয়ে আড়াল না হবার কারণে সেখানে রোদই থেকে যায়। চাঁদের কোনো নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলো চাঁদের ওপর পড়লে তা প্রতিফলিত হবে পৃথিবীর যে অংশে আসবে সেই অংশ থেকেই কেবল মাত্র চাঁদকে দেখা যাবে। অন্য স্থান থেকে নয়।
তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল পৃথিবী নিজ অক্ষে পাক খেতে খেতে নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্য কে প্রদক্ষিণ করছে, সেইসাথে পৃথিবীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করছে চাঁদ। কখনও কখনও সূর্য ও চাঁদের মধ্যিখানে পৃথিবী চলে আসে। প্রতি পূর্ণিমায় এমন ঘটনা ঘটলেও প্রতি পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণ হয় না তার কারণ তারা একই সরলরেখায় বা একই তলে আসতে পারে না, যখন তারা একই সরলরেখায় আসে তখনই হয় চন্দ্র গ্রহণ। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথ এর মধ্যবর্তী কোণ ৫ ডিগ্রির একটু বেশি।

এই চন্দ্রগ্রহণ আবার দুই প্রকার যথা – i)পূর্ণগ্রহণ ii) আংশিক গ্রহণ। এই দুই প্রকার গ্রহণ বুঝতে গেলে আমাদেরকে ছায়ার উৎপত্তি অঞ্চল টি বুঝতে হবে। আগেই বলেছি আলোর চলার পথে অস্বচ্ছ বস্তু এসে পড়লে তার ছায়া উৎপন্ন হয়। আর এই ছায়ার উৎপত্তি বিষয়টিকে ভালো করে লক্ষ্য করলে মূলত দুটি বিষয় লক্ষ্য করব। প্রচ্ছায়া(umbra) বা আলোহীন অঞ্চল। এই অঞ্চলে আলোক উৎস(সূর্য)থেকে আলো এসে চাঁদের ওপর পড়বে না। ফলে চাঁদ একদম দেখতে পাওয়া যাবে না, এক্ষত্রে হবে পূর্ন চন্দ্রগ্রহণ। অন্যদিকে দ্বিতীয়টি হল উপচ্ছায়া(penumbra) অঞ্চল বা আলো ছায়া মেশানো অঞ্চল। এই অঞ্চল থেকে দেখা যাবে আংশিক চন্দ্রগ্রহণ।
▪ব্লু মুন :-

blue moon

প্রথমেই বলি এই ব্লু মুন বিষয়ের সাথে চাঁদ কে নীল দেখানোর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি ঘটনা মাত্র।একই মাসের দ্বিতীয়বার পূর্ণিমা হওয়ার ঘটনাকে ব্লু মুন বলা হয়। এই ব্লু-মুনকে অনেকটা সাদা ছাইয়ের মতো দেখতে লাগে।
▪ সুপারমুন :-

super moon

পৃথিবী যেমন সূর্যকে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার দরুন কখনো সূর্যের কাছে আসে আবার কখনো সূর্যের দূরে অবস্থান করে। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে অপসুর ও অনুসুর অবস্থান বলা হয়। ঠিক এমনভাবেই চাঁদও উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় কখনো পৃথিবীর কাছে আছে আবার কখনো পৃথিবীর দূরে চলে যায়। যখন পৃথিবীর কাছে চলে আসে তখন স্বভাবতই চাঁদকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বড় লাগে।একেই বলে সুপারমুন। এই সময়টা চাঁদের উজ্জ্বলতা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়। সাধারণ পূর্ণিমার চাঁদ থেকে সুপারমুনে চাঁদের কৌণিক ব্যাস ৭% বৃদ্ধি পায়। সুপারমুনকে দেখার আনন্দই আলাদা।
▪ব্লাড মুন :-

blood moon

 

এবার আসি ব্লাড মুনের প্রসঙ্গে। অনেক চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে লাল বা রক্তিমদেখায়। একেই বলে ব্লাড মুন। এখন প্রশ্ন হল, এমনটা হবার কারন কী? আমরা আগেই আলোচনা করেছি চাঁদের কোন নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলো চাঁদ দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে এলেই তবে চাঁদকে আমরা দেখতে পাই। এখন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ ও সূর্যের মধ্যেখানে পৃথিবী চলে আসার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ঘেষে সূর্যের আলো চাঁদে পড়লে শুধুমাত্র লাল রঙের বৃহৎ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোর বিক্ষেপণ কম হওয়ার দরুন আমাদের চোখে এসে পড়ে। তাই চাঁদকে লাল দেখায়। আর এই ঘটনার জন্য চাঁদকে বলা হয় ব্লাড মুন।

ঠিক যেমনভাবে সূর্যের উদয় ও অস্ত কালেও সূর্যকে লাল দেখায়।
আকাশপ্রেমী মানুষের কাছে খুশির খবর এ বছর সর্ব মোট চারটি চন্দ্রগ্রহণ হতে চলেছে। যার প্রথম টি হতে চলেছে ১০ই জানুয়ারি। দেখা যাবে ইউরোপ,আফ্রিকা, এশিয়া, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম অংশ থেকে। দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ জুন মাসের ৫ তারিখ। দেখা যাবে ওই একই স্থানে থেকে। তৃতীয় চন্দ্রগ্রহণটি জুলাই মাসের ৫ তারিখ।দেখা যাবে নর্থ ও সাউথ আমেরিকা, প্যাসিফিক ওসেন সহ নানা মহাসাগর থেকে। বছরের সর্বশেষ চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে ৩০ নভেম্বর, উত্তর আমেরিকা, প্যাসিফিক ওসেন ও এশিয়া উত্তরপূর্ব অংশ থেকে। তবে এবারের চন্দ্র গ্রহণের সবগুলি penumbral চন্দ্রগ্রহণ।

১০ই জানুয়ারি গোটা ভারত থেকেই এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে। ভারতীয় সময় রাত ১0টা ৩৭মিনিটে গ্রহণ শুরু হবে। ৪ ঘণ্টা ৫মিনিট এই গ্রহণ চলবে। আংশিক গ্রহণে নির্দিষ্ট পরিমাণ সূর্যের আলো পৃথিবী টপকে চান্দ্রপৃষ্ঠে পড়বে। চন্দ্রগ্রহণের চরম মুহূর্তে পৃথিবীর ছায়ায় চন্দ্রপৃষ্ঠের ৯০ শতাংশ ঢেকে যাবে। এই সময় অনান্য দিনের থেকে চাঁদের ঔজ্জ্বল্য অনেকটা কমে যাবে। তবে চন্দ্র গ্রহণ দেখতে কোনো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে না। খালি চোখে দেখা যাবে এই গ্রহণ।

 

 

20190510_090401-removebg.png

 

 

 

শুভাশিস গড়াই

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: