উত্তরাখন্ডে পাখি দেখা – পাংগট

@ 1
4.4
(18)

সত্যিই উত্তরাখন্ডের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো পাখির স্বর্গরাজ্য। একটু অভিজ্ঞ পাখি-পর্যটক সেখানে গেলেই বুঝতে পারবেন। তবে আজকাল দেখি পাখি দেখার রীতি এবং মূল সুর অনেকটা পাল্টে গেছে। আজকাল যাতায়াতের, থাকা-খাওয়ার কত সুবিধা। তবু সকলেই ব্যস্ত। এখানে আমার রবীন্দ্রনাথের কথা খুব মনে পড়ে। জীবনে মাত্র দু’বার এরোপ্লেনে চেপেছিলেন। প্রথমবার লন্ডন থেকে প্যারিস। দ্বিতীয়বার পারস্যের শাহেনশার আমন্ত্রণে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, একাত্তর বছর বয়সে। তাও বারবার থেমে থেমে। কলকাতা থেকে এলাহাবাদ, সেখান থেকে যোধপুর ও রাত্রিবাস, পরদিন করাচি। সেখান থেকে জাস্ক। এরোড্রোমেই আবার রাত্রিবাস। আবার পরেরদিন জাস্ক থেকে উড়ে সকাল দশটায় ঝড়বৃষ্টির মধ্যে বুশেয়ার। বাকি জীবনের পুরোটা জাহাজে, মোটরগাড়িতে, ট্রেনে, পালকিতে ভ্রমন করেছেন। এভাবে সারা দেশ এবং বিশ্ব। একবার নয়, কয়েকবার। ঝুড়িঝুড়ি কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি, ছবি, নাটক, শান্তিনিকেতনের মত মহীরুহ, এত রকমের ব্যবসা – “পাট থেকে পশু চামড়া”, ধার-দেনা, জমিদারি, বৃহৎ পরিবারের হাজারো ঝঞ্ঝাট, বলে শেষ করা যাবে না। তার মত শত কর্মে ব্যস্ত এবং সৃষ্টিশীল জীবন গত শতাব্দী কেন এ শতাব্দীতেও কেউ কাটিয়েছেন কিনা সন্দেহ। আমাদের আজকালকার ব্যস্ততা তার কাছে কিছু নয়। তবু আমরা ব্যস্ত।

আমার ছোটবেলার ছবি আঁকার মাস্টারমশাই বলতেন যে আগে নাকি আর্ট-কলেজে ভর্তির সময় একটা ইন্টারভিউ হত। সেখানে ছাত্র বা ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করা হত তার বাড়ির অবস্থা কেমন, বাবা কী করেন। যদি দেখা যেত তার বাড়ির আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল নয় তবে ভর্তি হওয়ার ব্যপারে উৎসাহ দেওয়া হত না। সে যোগ্য হলেও। কারণ ছবি আঁকা শেখার খরচ তখনকার দিনের গড়পরতা বাঙালি পরিবারের কাছে বেশ বেশিই ছিল। পাখির ছবি তোলাও সৃষ্টিশীল কাজ। তবে খরচ-সাপেক্ষ। সবাই সবচেয়ে কম দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখক পাখি দেখে ফেলতে চান। যদি সেটা স্বল্প-পরিশ্রমে হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। আজকালকার সমস্ত জীবন প্রকল্প স্বল্প পরিশ্রমে গাঁথা। সেই সুত্রে পাখি দেখার স্পটগুলো চেনে এমন, বিশেষত ফেসবুক মাতানো বার্ডগাইড খোঁজেন। নতুন পাখি – দুর্লভ পাখি দেখার সংখ্যা বাড়ে। সেইসূত্রে গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠে বার্ডিং ক্যাম্প। তারা ক্যাম্পের উঠোনেই ‘হাইড’ তৈরি করে ফেলেন পর্যটক বা পক্ষী-চিত্রগ্রাহকদের পরিশ্রম কমানোর জন্য। আর কষ্ট করে পাহাড়ি পথ সাতসকালে ঠ্যাঙাতে যাবেন কেন! ক্যাম্পের উঠোনে চা-এর কাপে চুমুক দিতে দিতে পাখির ছবি তুলবেন! হাইডের সামনে ভাত-তরকারি-চাউমিনের থালা, জলের বাটি ইত্যাদির আয়োজনে পাখি হাজির। তাদের নিজস্ব হ্যাবিট্যাট থেকে পাখি বেরিয়ে খোলা জায়গায় এসে পড়ে। নব্য ‘বার্ডার’দের কথায় “ওপেন পার্চ”-এ। পাখিদেখার এই হল নতুন পদ্ধতি। এর ভালো বা খারাপ দুই-ই আছে। সে আলোচনার পরিসর অন্য। তবে পাংগটে এইরকম হাইডওয়ালা কটেজ বেশ কতগুলো আছে। চড়া দাম। হবে না কেন? আপনি যে চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে পাখির ছবি তুলবেন!

আমি পাখি ডেকে এনে ছবি তোলায় উৎসাহী নই। তাদের খুঁজতেইতো গেছি। পাহাড়-জঙ্গলের আনাচে-কানাচে। এইভেবে আমি এমন একটা ক্যাম্প বেছেছিলাম যেখানে ‘হাইড’ নেই আর চারদিকে পাখি দেখতে যাওয়ার বেশকয়েকটা পাহাড়ি রাস্তা থাকবে। সেই বন্ধু ব্যবস্থা করেও দিয়েছিল। ‘হিডেন ভ্যালি ক্যাম্প’। দাম তেমন চড়া নয়। দুপুরে ক্যাম্পে পৌঁছতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু। দেবেশ নামে একটি ছেলে আমাদের সঙ্গে যাবে বলে জেদ ধরেছে। তাকে নিষেধ করার কেউ নেই। মালিক নৈনিতালে থাকে। ম্যানেজার-কাম-কুক তাকে বেশ প্রশ্রয় দেন দেখে বোঝা যায়। দেবেশের বয়স সতেরো-আঠারোর বেশি হবে বলে মনে হয় না। বাড়ি নৈনিতালের কাছে ভাওয়ালিতে। পড়াশোনা না চালিয়ে কাজে ঢুকেছে। পাংগটের দুটো ক্যাম্প ঘুরে ‘হিডেন ভ্যালি’-তে। রান্নার জোগাড়, বাজার-ঘাট, অতিথিদের দেখভাল এইসব তার কাজ। প্রচুর কথা বলতে চায়। প্যান্টের পকেটে কালো মত ফুটখানেকের একটা পাইপ উঁকি দিচ্ছে। হাতে নিয়ে দেখি বাঁশি। এবোনাইট জাতীয় জংধরা কোনো পাইপ কেটে ছ’টা ফুটো করে নিজেই বানিয়েছে। দিব্যি বাজে। তবে কয়েক জায়গায় ফাট ধরায় সুতো দিয়ে আচ্ছা করে জড়িয়েছে। হাতে বিশাল ছাতা। দুপুর থেকে নিজের মাথায় না ধরে আমাদের মাথা বাঁচাতে ব্যস্ত। তার কাজ যে অতিথি দেখভাল। তার খুব উৎসাহ কীভাবে এরকম বড় ক্যামেরা দিয়ে পাখির ছবি ওঠে দেখবে। তার আক্ষেপ কোনো ট্যুরিষ্ট তাদের ক্যামেরার ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। সে আগে থেকেই বলতে থাকে যে তার এই পাহাড়-চত্তর সব চেনা। পাখি নাকি সে ভালো চেনে। আর তার অমোঘ ভবিষ্যতবাণী। বৃষ্টি আধঘন্টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। তার এই শেষ অক্টোবরের বৃষ্টিও চেনা।

কিন্তু বৃষ্টি থামল না। আরো অন্ধকার করে মেঘ ঘিরে ধরল। ক্যামেরা টেন্টে রেখে খালি হাতে দেবেশকে নিয়ে বের হলাম। সে একটু দমে গেলেও বলে যেতে থাকে “বারিশ তো রুখনেহি ওয়ালা থা, ফির কাঁহা সে বাদল আ গ্যায়া। আরে বাদল ক্যা কেয়া, ও তো দিনভর আতে যাতে রাহতে হ্যায়”।

cloudy
এরকম গুবলেট করায় দেবেশ আমার কাছে আত্মবিশ্বাসহীন ও প্রিয় হয়ে ওঠে। একটু অগোছালো, ছড়িয়ে ফেলে সামাল দেওয়া মানুষ আমার ভালো লাগে। প্রায় দেড় দশক আগে এরকম এক অগোছালো মানুষকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। আজও সে আমার সঙ্গে হাঁটছে। সঙ্গে নতুন একজন বন্ধু জুটে গেছে এবং সেও একই রকম অগোছালো হয়ে উঠছে আজকাল।

বৃষ্টি প্রায় থামে অতএব, প্রায় আসে। আমরা নিতান্ত অপারগ হয়ে পড়লে সেই বড় ছাতার নিচে ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে পড়ি। সুতরাং দেবেশ ভেজে। ভিজতে থাকে। শেষে ছাতা আমাদের হাতে দিয়ে দেয়। দিয়ে বাঁচে। এবং বিচ্ছিন্ন ধারাপাতের মধ্যে নিরন্তর ছাতা ছাড়াই হেঁটে চলে। বোঝা যায় ক্যাম্প থেকে তার বিশেষ বের হওয়া হয় না। দেবেশ আমাদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়। নির্বাচনের সময় এখন। ঝিমধরা ভেজা পাহাড়ি পথে লোকজন নেই। একটা গাড়ি বহুদুরে চলে যাচ্ছে। গাড়ি থেকে আওয়াজ আসছে, “কুলহারি…কুলহারি”। কেউ কুড়ুল চিহ্নে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে ভোট দেওয়ার আবেদন। গাছপালা আর পাহাড় শুনছে। রাস্তার ধারে দেখলাম বড় পাথরের ওপর ভোটের পোস্টার ঢিল চাপা দিয়ে রাখা। আশপাশ জনবসতিশূন্য। আমরাই বোধহয় একমাত্র পাঠক। সেই পাথরটার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দমকা হাওয়া আরেকটু শক্তি জোগাড় করতে পারলেই কাগজের খন্ডটাকে খাদে ফেলে দেবে। এমনিতেই জলে ভিজে প্রায় মন্ড পাকিয়ে গেছে। সত্তরোর্দ্ধ ভারতীয় গণতন্ত্রের এমন নিস্তেজ অনুশীলন বড় একটা দেখিনি।

পাখি দেখব কী, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে কুমায়ূন হিমালয় দেখছি। ঝরনার জল পথের ওপর দিয়ে বয়ে ঝাঁপ দিয়েছে খাদে। জলের ধারে স্লেটি-ব্যাকড্‌ ফর্কটেইল লেজ নাচিয়ে যাচ্ছে। একটু দূরে এক দোকান। পাহাড়ে যেমন হয়, দোকানে গেরস্থালির সব পাওয়া যায়। বৃষ্টিটা ধরেছে। একটু চা খাব বলে ভাবলাম। এবং এগিয়ে যেতেই দেখলাম দোকানের সিঁড়িতে দেবেশ বসে। ও যেন জানত ‘গেস্টলোগ’ তাকে দেখতে না পেয়ে দোকান পর্যন্ত আসবেই। যদি ফিরেই যেতাম অনেক দূর অব্দি দেবেশ কে না দেখতে পেয়ে? তাহলে কী হত? আবার গুবলেট! এবার ওর হাতে ছাতার ভার তুলে দেওয়াই যায়। দোকানের সামনের দেওয়ালে কোনো অংশ ফাঁকা নেই। হরেক দলের ভোটপ্রার্থী পোস্টার সেঁটেছে।
ফেরার সময়টা কিন্তু বৃষ্টি ছিল না। পূর্ব হিমালয়ের মত পশ্চিমে দিনের আলো অত তাড়াতাড়ি নিভে আসেনা। আমরা হাঁটতে থাকি টেন্টের দিকে এবং বিভিন্ন পাহাড়ি বাঁকে দেবেশকে আবিষ্কার করি। কখনো পাথরে হেলান দিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে, কখনো ঝুপ করে উপর থেকে নেমে এলো, কখনো তরতর করে খাদের ঝোপঝাড় ভেদ করে উঠে এলো। টেন্টে ফেরা ব্যতিত তার পাহাড়ের উপরে ও খাদের নিচে কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমাদের অজানা থেকে যায়। আমি আমার পুত্রের মুখের দিকে তাকাই, হেসে ফেলি আর হাঁটি। এভাবে আমাদের সঙ্গে তার দূরত্বের তারতম্য ঘটে এবং দেবেশের আগেই আমরা টেন্টে পৌঁছে যাই।

ফিরে ঘন্টাখানেকের মধ্যে যা হওয়ার ঠিক তাই হল। দেবেশ ফিরল এবং ম্যানেজারের কাছে তুমূল বকুনি খেল। ভাবছিলাম ওর জন্য অপেক্ষা করে সঙ্গে নিয়ে ফেরাই ভালো ছিল। তাকে উদ্ধারের জন্য টেন্টের ভেতরে ডেকে নিলাম। কাল? কাল কোথায় যাব পাখি দেখতে? ঠিক হল কিলবারি ফরেস্ট রেস্ট হাউসের দিকে যাব। বিকেলে বিনায়কের দিকে। দেবেশকে সাথে নিয়ে।

কাকভোরের চা দেবেশ নিজে হাতে করে পৌঁছে দিয়ে গেল টেন্টে। মনমরা দেখাচ্ছে তাকে। জানা গেল কিলবারির দিকে যাওয়ার পথে কিছুদুরে সে অপেক্ষা করবে। তার ভালো শীতপোশাক নেই। কিছুদুরে আত্মীয়বাড়ি। তার কাছে জ্যাকেট চাইতে যাবে। তার কথামত নির্দিষ্ট দোকানের নিচে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সময় চলে যায়। দেবেশ আসেনা। বস্তুত আর তার সাথে দেখাই হল না। সেই যে দেবেশ জ্যাকেট চাইতে পাহাড়ের উপরে বাড়িঘরের মধ্যে অদৃশ্য হল, আর তাকে দেখলাম না। দেখা হবে আবার কী করে বলি? আমি যে কোথাও ফিরে আসিনি দুবারের জন্যে!

কিলবারির দিকে যেতেই জঙ্গল গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। গাড়ি থেকেই চোখে পড়ল হোয়াইট-থ্রোটেড লাফিংথ্রাশের ঝাঁক।

white throted lughingthrush

তাদের দলেই ঘুরছে ইউরেশিয়ান জে।

Euresian jey
ক্যামেরায় চোখ রাখতেই বুঝলাম দলটি কম বড় নয়। কিছু উডপেকারও আছে। সব মিলিয়ে পঞ্চাশটার কাছাকাছি তো হবেই। তারা নির্ভয়ে কাছে চলে আসছে। পূর্ব-হিমালয়ের মতো নয়, পশ্চিম-হিমালয়ে পাখি মানুষের অনেক কাছাকাছি আসা-যাওয়া করে। পূর্ব-হিমালয়ে পশুপাখির ব্যাপক চোরাশিকারের ইতিহাস রয়েছে। এখনও বিস্তর হয়ে চলেছে। হতে পারে, তাই হয়ত পূর্ব-হিমালয়ের পক্ষীকুল মানুষ দেখলে ডরায়।

দুপুরে যখন ফিরলাম টেন্টে দেখি আরো অনেক নতুন পাখি আমার ক্যামেরা বন্দি হয়েছে। খাবার টেবিলের কাছে এক-ঝাঁক ব্ল্যাক-হেডেড জে চলে আসছে। তারা জানে উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকে এখানে, নির্ভয়ে খাওয়া যায়। একটি আবার বিপুল উদ্যম এবং সাহসে একেবারে পাশের টেবিলে।

বিকেলে ড্রাইভার মনোজভাইয়ের ঘুম ভাঙাতে হল। বিনায়ক যাব। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আবার শুরু। এবার আর ভবিষ্যৎবাণী করার লোক নেই। বিনায়ক পাংগট থেকে আরো উঁচুতে। দুরত্ব কুড়ি কিলোমিটার। পাইন-কনিফারের জঙ্গল। ব্ল্যাক-লোর টিট, স্ট্রীকড্‌ লাফিংথ্রাশ দেখতে পেলাম। ঘুরে দেখার ইচ্ছে ছিল প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন বিনায়ক ফরেস্ট রেস্ট হাউসটা। ঘন অরণ্যের ভেতর। ব্রিটিশদের পছন্দের তারিফ না করে পারা যায় না। চওড়া আর শ্যাওলাসংকুল কংক্রিটের রাস্তা। পাশে সুনসান কোয়ার্টার। দীর্ঘ অ্যাপ্রোচ রোড পেরোলে রেস্ট হাউসের লন। এক চৌকিদার সতর্ক করেছিলেন “গাড়ি নিয়ে উঠুন, হেঁটে পারবেননা”। দেখব বলে হেঁটেই উঠতে গেলাম। লনে পৌঁছে ওই ঠান্ডায়, কুয়াশায়, বৃষ্টিতেও ঘেমে নেয়ে একশা।

forest rest house
সব নতুন জায়গাতে গেলে যেমন হয় – জঙ্গলে, পাহাড়ে পাড়াগাঁয়ে – কোনো কুঁড়েঘর বা অট্টালিকা – ভাবি যদি জন্মাতাম এখানে – সংসার হত – পুত্র হেঁটে নেমে যেত একশ বছরের পুরনো রাস্তা দিয়ে – ফায়ার প্লেসের সামনে বসে আলো আর উষ্ণতার যুগপৎ অধঃপতন দেখতাম – অগোছালো চাদর গুছিয়ে দিতাম অগোছালো মানুষের আর ব্লু-হুইসলিং থ্রাশ ধেয়ে আসত ১৯২৫ সালের সন্ধ্যায়।

বৃষ্টিতে প্রায় ধুয়ে গেল বিনায়ক। আগবাড়িয়ে অন্ধকার দখল নিল পাহাড়ের। পাথরের ওপর এসে দাঁড়ায় – বাঁশিতে শিস দেয় অন্ধকার, ওপর থেকে নেমে আসে অন্ধকার, খাদের থেকে উঠে আসে অন্ধকার। এবার সঙ্গে সঙ্গে ফেরে। টেন্টের নরম আলোয় বিষাদের নাম হয় দেবেশ চৌহান।

আমি যে দেবেশকে খুঁজতে এখানে আসিনি বুঝতে পারলাম পরদিন ভোরে।

রাস্তা আটকে একদল রেড-বিলড্‌ ব্লুম্যাগপাই।

red build bluemagpai

কত কাছে স্ট্রীকড্‌ লাফিংথ্রাশ।

streaked lughingthrush
মরা গাছের ডালে দিনের প্রথম আলোয় শরীর সেঁকে নিতে চলে এসেছে ব্রাউন ফ্রন্টেড উডপেকার।

brown fronted woodpecker
তার পেছনে চলে এসেছে গ্রেট বারবেট।

great barbet
এবং পেছনে চলে এসেছেন মনোজভাই। তাগাদা দিতে। আর একটু পরে বেরিয়ে পড়তে হবে। মোরাদাবাদ থেকে ফেরার ট্রেন। তাই টেন্টে গিয়ে গোছাতে আদেশ হয়েছে। টেন্টে একজন স্থানীয় ইন্সট্রাক্টর এসেছেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। ঝটতি পরিচয় সারতে হল। উত্তরাখণ্ডের জীব-বৈচিত্রের ওপর একটা বই দেখতে দিলেন। পাখি, স্তন্যপায়ী, সাপ, প্রজাপতি, কুমির – অনেক কিছুর দলিল। বেশ গুছিয়ে লেখা। পাখির কয়েকটা ছবির ওপর পেন দিয়ে টিক দেওয়া। আমি টিক দেওয়া ছবিগুলো মন দিয়ে দেখছি দেখে ইন্সট্রাক্টর বললেন দেবেশের কাজ। যে পাখিগুলো দেখেছে চিহ্ন দিয়ে রেখেছে। জানতে চাইলাম সে কই। জানালেন গতকাল কাজ ছেড়ে দিয়ে ভাওয়ালি ফিরে গেছে। তার বাবা বলে রেখেছিলেন সেই আত্মীয় বাড়িতে। অনেকদিন ধরেই নিয়ে যেতে চাইতেন। দেবেশ পালিয়ে বেড়াত। কাল জ্যাকেট চাইতে এসে ধরা পড়ে গেছে। বই বন্ধ করে ফেরত দিয়ে দিলাম। আমার তো সব জায়গায় ঘর। জঙ্গলে, পাহাড়ে, পাড়াগাঁয়ে। সেসবের মানুষ আমার আত্মীয়। সেসবের পাখি আমার স্বজন। তাদের চিহ্ন আমার স্মৃতি। ‘হৃদয়’ যার ‘একমাত্র বাহক’।

লেখকঃ-           সম্রাট সরকার

 

 

 

 

 

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 18

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “উত্তরাখন্ডে পাখি দেখা – পাংগট

  1. খুব সুন্দর হয়েছে।কী ভাবে যাবো যদি আপনি বলেন তো ভালো হয়

Leave a Reply

Next Post

বায়ুদূষণ থেকে শুধু দেওয়ালে নয়, মস্তিষ্কেও কালি পড়ছে

4.4 (18) আমরা নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই পড়েছি। মানে আমরা ট্র্যাপে পড়েছি। ট্র্যাপ মানে TRAP অর্থাৎ Traffic Related Air Pollution। যদিও এখানে ট্র্যাফিক সম্পর্কিত দূষণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, তার মানে এই নয় যে অন্যান্য উৎস থেকে আসা ক্ষতিকর বস্তুকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM) আমরা উপেক্ষা করব। বায়ুতে ভাসমান বস্তুকণা চিরকালই […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: