সাপের কামড়ে-কী করণীয়

@ 1
4.1
(15)
সাপের কামড় নিয়ে গত এগারাে বছরে অসংখ্য আলােচনা সভা, প্রশিক্ষণের ক্লাসে বলা, জন সচেতনতা ইত্যাদি করতে গিয়ে দেখেছি এই বিষয়টি প্রায় সর্বস্তরের মানুষজনের কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। এই স্বচ্ছ
ধারণার অভাবটা কিন্তু মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক, নতুন পাশকরা ডাক্তারবাবু, উচ্চ পদাধিকারী কর্মচারী, শিক্ষক, ছাত্র, আপামর জনগণ সবার ভেতরেই দেখেছি। এমনকি বিজ্ঞান আন্দোলন করা লােকজনও এর মধ্যে পড়েন। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের প্রথমেই, ব্যারাকপুরের বিজ্ঞানকর্মী অনুপবাবুর দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাপের কামড়ে মৃত্যু সমস্যাটিকে আবারও সামনে আনল।
হাসপাতালের ডাক্তারকে চিকিৎসা করতে দিন।
ক’দিন আগেই একটা ক্লাসে স্কুলের শিক্ষক আর কয়েকজন বিদ্যালয় পরিদর্শককে এই সাপের কামড়
নিয়ে বলেছিলাম। একজন শিক্ষক বলছিলেন, ওনারা অনেক বছর ধরে বিজ্ঞান আন্দোলন করছেন, সাপের কামড়ের বিষয়ে সচেতনতার কাজও তার মধ্যে আছে।
উনি এক ঘন্টার ওই ক্লাসের শেষে নিজেই বললেন
যে, এতদিন অনেক ভ্রান্ত ধারণা ছিল। আমারও গত বেশ কয়েক বছর এই সাপের কামড়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে দেখেছি, সাধারণ তাে বটেই, শিক্ষিত লােকজনের বহুযুগ ধরে জেনে আসা ভ্রান্ত ধারণা কাটিয়ে চিকিৎসা করাটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এজন্যই সাপে কামড়ালে কী করব আর কী করব না— এ নিয়ে বলতে হলে প্রথমেই বলি,
যুগ যুগ ধরে প্রচলিত ধারণাগুলি নিয়ে বসে থাকবেন না। যেটা করতে হবে, তার
প্রথম পদক্ষেপটিইহল,হাসপাতালের ডাক্তারবাবু, যে চিকিৎসাটা করতে চাইছেন,, সেটা করতে দিন।
আপনার রােগীকে সুস্থ করে তােলাটাই যে কোনও চিকিৎসকের প্রথম লক্ষ্য। আপনার রােগীর ক্ষতি করার
জন্য কোনও ডাক্তারবাবু কোনও পুরস্কার পাবেন না।
সাপ ধরে বা মেরে আনার দরকার নেই।
এবার এক এক করে বলি কাউকে সাপে কামড়ালে কী করবেন, আর কী করা যাবে না।
কাউকে বা আপনাকে নিজেকেই যদি সাপ বা অজানা কিছু কামড়েছে মনে হয় তবে আশেপাশের কাউকে ডেকে ব্যাপারটা জানান। অন্ধকারে থাকলে, তাড়াতাড়ি একটা টর্চ আনতে বলুন। যাকে কামড়েছে, উনি স্থির হয়ে বসে থাকবেন। অন্যরা এক দু-মিনিট আশেপাশের জায়গায় কোনও সাপ আছে কিনা দেখার চেষ্টা করবেন।
সাপ খোঁজা বা মেরে ধরে আনার জন্য সময় নষ্ট করবেন না।বলে রাখি, এখনকার চিকিৎসা পদ্ধতিতে সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য সাপ চেনার কোন সাপটিকে খোঁজাখুঁজি করে সময়
দরকার নেই। যে সাপেই কামড়াক, চিকিৎসা হয় রােগ লক্ষণ দেখে। এজন্য সাপটিকে খোঁজাখুঁজি
নষ্ট না করাই ভালাে। সাপ যদি দেখতে পান, যদি কোনও সর্পবিদ উপস্থিত থাকেন, তার কাছে
সাপটির সঠিক পরিচয় নিন। সাপ মেরে বা ধরে, কখনই হাপাতালে আনবেন না। অনেক সময়ই তাতে বিপরীত হয়েছে। বাঁধন দেবার দরকার নেই।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঁধন দেওয়ার কোনও দরকার নেই। বাঁধনে বিষ আটকায় না। এতেও অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়েছে।
কাটা জায়গা ধােওয়া বা ওষুধ লাগানাে অপ্রয়ােজনীয়।
কামড়ের জায়গায় কোনও রকম ধােওয়া বা ওষুধপত্র দিয়ে পরিষ্কার করার দরকার নেই। কুকুরের কামড়ে জায়গাটা ভালাে করে সাবান দিয়ে ধুতে বলা হয়। তার থেকেই ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে যে সাপকামড়ালেও বােধ হয় ধুয়ে দিতে হয়। এটা একেবারে ভুল ধারণা। ধােওয়া বা ঘষাঘষি করলে বিষ আরও দ্রুত ছড়িয়ে যায়। দংশানাে হাতের আংটি, চুড়ি খুলে ফেলুন।
হাতে কামড় হলে, তাড়াতাড়ি ওই হাতের আংটি, চুড়ি, বালা ইত্যাদি খুলে ফেলুন। একটু পরেই হাত বা
আঙুল ফুলে উঠলে ওই সব গয়না কেটে বসতে পারে।
snake-bite-diffrences
যদি সম্ভব হয় (আমরা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে উচ্চতর হাসপাতালে পাঠানাের সময় এটা করে ভালাে ফল পেয়েছি) হাসপাতালের কাউকে ফোনে জানিয়ে রাখুন যে একজন সাপ কামড়ের রােগী ওখানে যাচ্ছে।
দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছান— অযথা বিলম্বে প্রাণনাশ হতে পারে।
যদি খুব কাছাকাছি অ্যাম্বুলেন্স থাকে, ডেকে নিন। বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকলে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য দেরী না
করে, মােটর বাইকেও আহতকে বসিয়ে নিকটবর্তী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে রওনা দিন।
এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্যাপারটি সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষের ধারণা পরিষ্কার নয়। প্রথম কথা হল, ওই
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চব্বিশ ঘন্টা ডাক্তার থাকতে হবে। ওখানে রােগী ভর্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও প্রাথমিক স্তরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র যেখানে ওই দুটি ব্যাপারে নিশ্চয়তা আছে, সাপের কামড়ের চিকিৎসা।
সেখানে হবেই। অন্য যে কোনও রােগের ক্ষেত্রে শহরের বড় হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা ভালাে থাকতে পারে। কিন্তু এই একটি মাত্র ক্ষেত্রে গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসাই সব সময় ভালাে। কারণ সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে প্রতিটা মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। শহরের বড় হাসপাতালে যেতে যদি পনের মিনিট বেশি সময় লাগে সেটাও প্রাণঘাতী হতে পারে। অবশ্য যদি মেদিনীপুর, বাঁকড়া বা বর্ধমানের মতাে গ্রামীণ।
কলেজের দুচার কিমির মধ্যে সাপে কামড়ায় সেক্ষেত্রে ওই সব হাসপাতালেই তাড়াতাড়ি পৌছান সম্ভব।
আক্রান্ত ব্যক্তি শান্ত, স্থির থাকবেন ।
আর একটা বিষয় নিয়ে সাবধান করা খুব জরুরী। কোনও অবস্থাতেই আহত ব্যক্তি নিজে সাইকেল বা বাইকে রওনা দেবেন না। প্রথম অবস্থায় শরীর বশে থাকলেও কোনও কোনও সাপের কামডের পর পনেরো কুড়ি মিনিটেই হাত পা অবশ হয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে বাজে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সাইকেল চালনাের মতাে শরীরচালনার কাজে শরীরে রক্ত চলাচল দ্রুত হয়, তাতে বিষও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
আমাকে প্রায়শই একটা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সাপের কামড়ের প্রাথমিক চিকিৎসা কী? উত্তরটা হল— প্রচলিত অর্থে সাপের কামড়ের কোনও প্রাথমিক চিকিৎসা নেই। কামড়ের পর, আহতকে আতঙ্কগ্রস্ত না করে, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই একমাত্র কাজ।
কাটা-চেরা-বিষ পাথর বা ওঝার কেরামতি নয়।
কি কি করবেন না, সেই তালিকায় আর দুই একটা জিনিস জানিয়ে রাখি। কেটে, চিরে বা বিষপাথর ইত্যাদি দিয়ে বিষ বের করার কোনও চেষ্টাই করবেন না। কামড়ের জায়গায় কোনও রকম ছােপ বা গাছ গাছড়ার প্রয়ােগ করবেন না। কোনও রকম অনুমান বা টোটকা ওষুধ খাওয়াবেন না। কোনও ওঝা, গুণীন জাতীয়
লােকের কাছে নিয়ে গিয়ে এক মিনিটও সময় নষ্ট করবেন না। হাসপাতালের ডাক্তারবাবু ছাড়া আর কারও কোনও পরামর্শে কান দেবেন না। এমনকি হাসপালের অ-ডাক্তার কর্মচারিও আপনাকে বিপথে চালিয়ে বিপদ বাড়াতে পারে।
প্রয়ােজনে রেফার লেটার নিয়ে উচ্চ হাসপাতালে যান।
প্রাথমিক অ্যান্টি ভেনম ইত্যাদির প্রয়ােগের পর ডাক্তারবাবুদের যদি মনে হয় কোনও উচ্চতর
হাসপাতালের বিশেষ চিকিৎসার জন্য রােগীকে শহরে নিয়ে যেতে হবে, তাহলে তার লিখিত রেফার লেটার নিয়েই রওনা দেবেন। ওটি না নিয়ে গেলে, পরের হাসপাতালে চিকিৎসা বিভ্রাট হতে পারে। সাপে কাটা রােগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় বাড়ির বা সাথের লােকের নির্দিষ্ট কয়েকটি কাজ আছে। খেয়াল
রাখবেন রােগী যেন বেশি নড়াচড়া না করে। হাঁটা বা দৌড়ান একেবারেই চলবেনা।রােগীর সাথীরা ক্ষতস্থানের এবং রােগীর অবস্থার পরিবর্তনের খেয়াল রাখুন।
snake bite.jpg
কামড়ের জায়গায় কী কী পরিবর্তন ঘটেছে ভালাে করে লক্ষ্য করে চলুন। চিকিৎসার জন্য ডাক্তারবাবুর
ওই জিনিসগুলি জানতে চাইবেন। যেমন কামড়ের জায়গা থেকে রক্ত বের হচ্ছিল কিনা, জায়গাটা ক্রমশ
ফুলে যাচ্ছে কিনা,কামড়ের জায়গার আশে পাশে চামড়ার রং পাল্টে গেল কিনা ইত্যাদি।
এছাড়া রাস্তায় যাওয়ার সময় রােগীর মনােবল বাড়ানাের জন্য তাকে আশ্বস্ত করে কথা বলতে বলতে চলুন। রােগী কীকী কষ্টের কথা বলছিল, কতক্ষণ আগে পর্যন্ত কথা বলছিল, এগুলিও সঠিক চিকিৎসার জন্য জরুরী। অনেক সময়ই হাসপাতালে পৌঁছানাের আগেই রােগী কথা বলার ক্ষমতা হারায়। সেক্ষেত্রে সঙ্গের লােকজনের বলা কথা শুনেই চিকিৎসা করতে হয়।
সাপে কামড়ালে কী করবেন? এক কথায় উত্তর – যত দ্রুত সম্ভব রােগীকে সব থেকে কাছের
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে চলুন। আর কী করবেন না? ওঝা গুণীনের বাড়ি যাবেন না— একথা সবই
বলি, শহরের বড় হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করে সময় নষ্ট করবেন না।
ব্যারাকপুরের বিজ্ঞান মঞ্চের অন্যতম অভিজ্ঞকর্মী অনুপবাবুর মৃত্যুর পর তার সহকর্মীদের মনে প্রথম প্রশ্নটা এসেছে যে, তিরিশটি এভিএস দিয়েও ওনাকে বাঁচানাে গেল না কেন? অথচ এই ব্যাপারটা নিয়ে
আমার সহযােদ্ধাকিছু মানুষ দুবছরের বেশি হল নানান ভাবে সকলকে বােঝানাের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আমাদের ফেসবুক পেজটি দুবছরের বেশি হয়ে গেল। হাজার দেড়েক লাইক দেখা যাচ্ছে পেজটিতে।
‘পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব এভিএস চাই’ এই দাবিতে অন্তত দেঢ় ডজন সংস্থা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছেন।কয়েকশােব্যক্তি,দিদিকে বলাতে ওই একই দাবি করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে নিজস্ব এ ভি এস তৈরি করা চাই।
এই যে চন্দ্রবােড়া সাপের কামড়ে এভিএস ভালাে কাজ করছে না—এ খবরটা নিয়েই আমাদের পেজ।
বর্তমানে আমাদের ভারতবর্ষে যে পলিভ্যালেন্ট এভিএস পাওয়া যায়, সেগুলি যেখানেই তৈরি হােক –
ওগুলি তৈরির জন্য যে সাপের বিষ লাগে, তা আসে মূলত তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরম থেকে। ওখানকার
চন্দ্রবােড়া সাপের বিষের সাথে আমাদের পশ্চিমবাংলারচন্দ্রবােড়া সাপের বিষের অনেক পার্থক্য আছে। তাই ওই মহাবলীপুরম-এর বিষ থেকে তৈরি পলিভ্যালেন্ট এভিএস,এরাজ্যে ভালােকাজকরছেনা।
এজন্য এ রাজ্যের সকল সাধারণ মানুষ আর বিশেষ করে গণ সংগঠনগুলিকে এগিয়ে আসতে হবে।
‘পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব এভিএস চাই’–এইদাবি নিয়ে।

লেখক – ডাঃ দয়ালবন্ধু মজুমদার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.1 / 5. Vote count: 15

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “সাপের কামড়ে-কী করণীয়

Leave a Reply

Next Post

আতংকের দুই নাম:

4.1 (15) মেডিকেল আর্থপোডোলজি, পতঙ্গ বহু রোগের জীবাণুর বাহক হিসেবে কাজ করে, এবং সেই রোগের বিস্তারে প্রধান ভূমিকা পালন করে ।মানুষ বহু রোগে, এই সব বাহকের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং বাহক পতঙ্গরূপে মশার বেশ নামডাক, বিশেষ করে বলতে হলে স্ত্রী মশার কথাই বলতে হয়, কারণ স্ত্রী মশাই রক্ত খায়, পুরুষ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: