গােপালপুর /তপ্তপানি/চন্দ্রগিরি/হরভঙ্গি /ডারিংবাড়ি – স্বল্প চেনা উড়িষ্যা।

আবহাওয়া বেশ গরম। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ, কিন্তু ট্রেনে দারুণ ভিড়। আসলে
পরীক্ষার পর সকলেই সামর্থ অনুযায়ী বেরিয়ে পড়েছে। আমি টিকিট না পাওয়ায়
শালিমার থেকে বিশাখাপত্তনম যাওয়ার একটি স্পেশাল ট্রেনের টিকিট জোগাড় করে
বেশ গরমেই বেরিয়ে পড়েছিলাম স্বল্প চেনা ওড়িষার পথে। আমাদের গন্তব্য স্টেশন
ব্রহ্মপুর।

Brahmapur_rail_station

সেখান থেকে গােপালপুর, তপ্তপানি, চন্দ্রগিরি, হরভঙ্গি হয়ে ডারিংবাড়ি। প্রায়
সপ্তাহখানেকের সফর। প্রথম চলেছি গােপালপুরে ব্রহ্মপুর থেকে ১৬-১৭ কিমি দূরে
গােপালপুর সমুদ্র উপকূল। বেশ পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম। সমুদ্রের পাড় ধরে মােটামুটি
১ কিমি পথ। প্রথম অর্ধ কিমি হােটেল, দোকান-পাট। তারপর বেশ কিছু বড় বড়
হােটেল বা কোনাে বড় কোম্পানির গেস্ট হাউস। গােপালপুর সমুদ্র বেশ উত্তাল।।

gopalpur odisha

সমুদ্রের পাড়ে দর্শনার্থীদের বসবার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করা। সন্ধ্যায় সেখানে বেশকিছু
বিক্রেতা নানারকম পসরা সাজিয়ে বসে বিক্রয়ের আশায়। নদীর ধারে রাস্তা জুড়ে
নানারকম খাবার দাবারের ব্যবস্থা। গােপালপুরে রয়েছে একটি ঘূর্ণায়মান লাইট হাউস।
বিকেলে এই লাইট হাউস-এ ওঠার অনুমতিও মেলে। ওপর থেকে সমুদ্র সহ চতুর্দিকের।
দৃশ্য বেশ মনােরম বােধ হয়। লাইট হাউস-এর পাশ দিয়ে গােপালপুরে বড় বড় প্রাইভেট হােটেল এবং সরকারি গেস্ট হাউস রয়েছে। গােপালপুরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এখানকার
শান্ত পরিবেশ। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ দিনরাত আছড়ে পড়ার সুমধুর শব্দই এই সমুদ্র
শহরের মূল প্রাপ্তি।
দুটো দিন সকালে-বিকালে ফুরফুরে হাওয়া, আর সমুদ্র পাড়ের সবুজের জলসা
ঘরে প্রাইভেট হােটেলের লনে ঘুরে বাড়ি ফিরে সাগরের টাটকা মাছ সঙ্গে তরি-তরকারী
সহ দুটি দিনের মহাভােজ সেরে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে তৃতীয় দিন সকালে একটি গাড়ি
ভাড়া করে এগিয়ে চললাম ঘণ্টা দুয়েকের পথ পেরিয়ে ঘন জঙ্গল ঘেষা তপ্তপানির
পথে। তপ্তপানি আমাদের বেশ পছন্দের বাংলাে।

taptapani

পূর্বঘাৰ্টের পাহাড়ি ঢেউ চারপাশে শ্যামল বর্ণ। ঘন জঙ্গলে ঘেরা রাত যাপনের ছােট ছােট কটেজ। লাল টুকটুকে টালির ছাদের টোপর পরা ছােট ছােট বাড়ি। রয়েছে বেশকিছু সৌখিন কাঠের বাড়িও। মাঝে
মাঝে জঙ্গলের মাঝে কিছু দোতলা বাড়ি রয়েছে। সেগুলি তিন বা চারজনের উপযােগী।
সমস্ত বাড়িগুলােকে ঘিরে আম, যুঁই, লেবু, দেবদারু, পাতাবাহারের গাছ। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত
বাড়িগুলােকে যুক্ত করেছে সর্পিল এক রাস্তা। পান্থনিবাস চত্বরে সবুজের সমারােহ
চোখ ভরে দেখার মত। মনে হয় যেন পাহাড়ী পথ ঢুকে পড়েছে পান্থনিবাসের অন্দরে।
চারিদিকে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নাতিউচ্চ পাহাড়শ্রেণি। এই সমস্ত কটেজগুলাের
মাঝেই রয়েছে একটি সুসজ্জিত ডাইনিং হল। উড়িষ্যা ট্যুরিজম-এর এই বাংলাে এখন বেশ জনপ্রিয়।
যাইহােক আজ আমরা এগিয়ে যাব চন্দ্রগিরি বা জিরাঙ্গোতে।

chandragiri,

তপ্তপানি থেকে ঘাটরাস্তা হয়ে আমরা এগিয়ে চললাম চন্দ্রগিরির পথে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের পথ।
চন্দ্রগিরিতে তিব্বতী শরনার্থীদের আস্তানা। ছােটদের জন্য স্কুল, শিক্ষার ব্যবস্থা। দূর
থেকে তিব্বতীরা এলে থাকার জন্য রয়েছে একটি সুন্দর অতিথিশালা। মােট পাঁচটি
ক্যাম্প রয়েছে। প্রতিটিতেই বৌদ্ধ গুম্ফা আছে। এখানে তিব্বতীদের হাতের কাজের
জিনিসপত্রও পাওয়া যায়। বিশেষতঃ তিব্বতীদের বােনা কার্পেটের এখানে খুব চাহিদা।
চন্দ্রগিরি অঞ্চল জুড়ে পাঁচটি শরনার্থী শিবির রয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলেই বুদ্ধদেবের মূর্তি
সঙ্গে বিশাল মনাষ্ট্রি রয়েছে। খুবই পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর মনাস্ট্রি অঞ্চল। বিকেলে
তিব্বতিরা ওই বুদ্ধের মূর্তি এবং মনাষ্ট্রি অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মন্ত্রপাঠ করেন। এই সব
অঞ্চলে তিব্বতী হস্তশিল্পের দোকানও রয়েছে। সর্বোপরি এ অঞ্চলগুলি সত্যিই নিরূপদ্রব,
পরিচ্ছন্ন এবং সমস্ত অঞ্চল জুড়ে যেন এক শান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে।
জিরাঙ্গোতে অতি সুন্দর এক অতিথি নিবাস রয়েছে তবে এ অতিথি নিবাসে শুধুমাত্র
থাকবার ব্যবস্থা রয়েছে। খাবার-দাবারের কোনও ব্যবস্থা নেই। জিরাঙ্গো গেস্ট হাউসে
থাকলে প্রায় ৫ কিমি পথ পেরিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাইহােক, আমরা
জিরাঙ্গোতে বুকিং থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৫ কিমি এগিয়ে একটি সুন্দর হােটেল বুদু
ইন্টারন্যাশন্যাল-এ রাতটি কাটালাম। সেখানেও তিব্বতি ক্যাম্প, স্কুল, মনাস্ট্রি সবই
রয়েছে। যাইহােক, পরদিন আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। আজ আমরা হরভঙ্গি
ড্যাম দেখে ডারিংবাড়িতে দুটো রাত কাটাব।

Image result for harangi dam odisha

আমরা হরভঙ্গি ড্যাম-এর পথে আদাবা
ইরিগেশন অফিসে সনৎ মল্লিক-এর সঙ্গে দেখা করলাম। সনৎবাবু হরভঙ্গি ইরিগেশন
প্রােজেক্ট-এর দায়িত্বে আছেন। অনেকদিন সনৎবাবুর সঙ্গে দেখা হয় না। বড় অমায়িক
মানুষ। বেশ কয়েক বছর শীতে আমরা হরভঙ্গি ইরিগেশন প্রােজেক্ট-এর অতিথিশালায়
কাটিয়েছি। এবার আমরা সনৎবাবুর সঙ্গে দেখা করে এগিয়ে চললাম হরভঙ্গির উদ্দেশ্যে।
আদাবা থেকে প্রায় ১৫ কিমি। ঘন জঙ্গল পথে হরভঙ্গিতে চলেছি। মূল রাস্তা থেকে
কিমি পাঁচেক এগােতেই জঙ্গলের মাঝে জলাশয় নজরে এল। ধীরে ধীরে আমরা
ড্যামের ধারে এসে পৌঁছলাম। ড্যাম পেরিয়ে বেশ খানিকটা উপরে টিলার উপর
প্রশস্ত সেচ দপ্তরের মন খুশি করা বাংলাে। দোতলা বাংলাের উপর থেকে চতুর্দিকে শুধু
জল আর জল। বাঁধে বাঁধা পড়ে সে এক বিশাল জলাধার। মাঝে বাঁধ রাস্তা। রাস্তা
ধরে এক থেকে দেড় কিমি পথ এগােলে সুন্দর একটি গ্রাম। বাংলােতে রাত কাটালে।
সামান্য কিছু প্রয়ােজনীয় জিনিসের জন্য ওই গ্রামের মুদিখানাতে যাওয়ার প্রয়ােজন হয়।
অবশ্য ওই গ্রামের বাসিন্দা বাংলােতে কাজে নিযুক্ত রয়েছে। প্রয়ােজনীয় জিনিসটুকু
সেও সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারে। বড় সুন্দর মনােরম পরিবেশে নির্জনে শান্তিতে
দুটি রাত কাটাবার মত এমন পরিবেশ আমি সত্যিই কম দেখেছি। এবার অবশ্য রাত
কাটাইনি, তবে ঘণ্টাখানেক এই নির্জনতা উপভােগ করে আমরা এবার এগিয়ে চললাম
উড়িষ্যার কাশ্মীর বলে পরিচিত ডারিংবাড়ির উদ্দেশ্যে। ডারিংবাড়ি হরভঙ্গী জলাধার
থেকে প্রায় ৭০ কিমি দূরে। যাইহােক, দুপুর ১১-৩০ মিঃ নাগাদ আমরা যাত্রা শুরু করলাম।

Daringbadi-odisha-udayan-sarathi-

জঙ্গলে ঘেরা ঘাটপথ। মনে পড়ল ১৭-১৮ বছর আগে একবার ডারিংবাতি,
এসেছিলাম। সেবার ব্রহ্মপুর থেকে বাসে প্রায় ঘণ্টা সাতেক সময়ে এসে পৌঁছেছিলাম।
ধূ ধূ প্রান্তর ঘন জঙ্গল পথে যাত্রা। তখন সারাদিনে সম্ভবত দুটো বাসই সম্বল।
ডারিংবাড়িতে কোনও হােটেলের বালাই ছিল না। ছিল পিডব্রুডি গেস্ট হাউস আর
মূলকেন্দ্র থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটি পান্থশালা। আমাদের কলকাতা থেকে পান্থশালার
দুটি ঘর বুকিং করা ছিল। রাত আটটা নাগাদ ডারিংবাড়ির বেড়ার চাটাই-এর হােটেলে
কোনক্রমে রাতের খাবার খেয়ে হােটেলের মালিকের বদান্যতায় হােটেলের বাইরে এসে
নিশুতি অন্ধকারের মাঝে বহুদূরের নির্দেশিত পথ ধরে প্রায় আধঘণ্টা সময় নিয়ে এসে
পৌছলাম পান্থশালার দোরগােড়ায়। অনেক ডাকাডাকির পর বহু কষ্টে দরজা খােলা
পাওয়া গিয়েছিল। অতি আয়েসী কেয়ারটেকার-এর পাল্লায় পড়ে পরবর্তী তিনদিনের
সমস্ত রকম রান্না বান্নার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেয়ারটেকারের অসহযােগিতায় বেশ
কষ্টের সঙ্গে দিনগুলি অতিবাহিত করতে হয়। যাইহােক চড়াই-উৎরাই মেঠো পথ।
দেহাতি মানুষজন দু-চারজন পথে, সবই মাটির বাড়ি। অবশ্য পান্থনিবাস পাঁকা এবং
মােটামুটি ব্যবস্থা ভাল ছিল। দু-চারটে অতি সাধারণ খাওয়ার হােটেল ছাড়া থাকবার
জন্য কোনও হােটেল ছিল না। আজ যেখানে জমজমাট পিডব্লউডি অফিস, হাসপাতাল,
বাস টার্মিনাস, অজস্র দোকান পাট। হেঁটো ধুতি ছেড়ে ছেলেমেয়েরা জিনস-গেঞ্জি ধরেছে।
তখন পাকা বাড়ি বলতে পিডব্লইডি গেস্ট হাউস। এখন অবশ্য ঝা চকচকে পিডব্লউডি
গেস্ট হাউসে কিন্তু থাকবার ব্যবস্থা নেই। কারণ পিডব্লুউডি গেস্ট হাউস এখন
ইনস্পেকশন বাংলাে হয়েছে। ফলে সাধারণের বাসের উপযুক্ত নয়। অবশ্য বেশ বড়
বড় ৪-৫টি হােটেল রমরম করে চলছে। ওই দূরে জঙ্গল-পাহাড় ঘেষে হয়েছে নেচার
ক্যাম্প।

Daringbadi-Orissa-Tourism-1.jpg

যেখানে বনদপ্তরের বাংলাে। থাকা খাওয়া সহ ডবল বেডেড রুমের ভাড়া
৫২০০ টাকা এবং ৫৯০০ টাকা। রাস্তাঘাট সব পাকা হয়েছে। ৭-৮টি দর্শনীয় জায়গা
তৈরি হয়েছে দুটি পার্ক, একটি কফি, গােলমরিচ বন, সানসেট পয়েন্ট, লাভার্স পয়েন্ট
ইত্যাদি। সময় সুযােগ হাতে থাকলে ধীরে ধীরে হেঁটে বা অটোতে ঘুরে নেওয়া যায়।
ডারিং বাড়ির মূল বাস স্ট্যান্ড অঞ্চল ছেড়ে প্রায় ১ কিমি দূরে ডিয়ারস ইকো হােম
নামে একটি সুন্দর হােটেল হয়েছে। বেশ সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ। প্রচুর আমগাছে
ঘেরা হােটেল। নির্জনে দুটো দিন কাটানাের জন্য ডিয়ারস ইকো হােম হােটেলটি বেশ
পছন্দসই। তবে সেদিনের আধাে-অন্ধকারের অতি সাধারণ মানের ডারিংবাড়ির নির্জনতা,
জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি সৌন্দর্যপথে দেহর্তি মানুষের উপস্থিতি আজ তার লক্ষ্য করা যায় না।শহুরে আদব কায়দা, রাস্তায় জিনিস্‌ পরা ছেলে-মেয়েদের উজ্জ্বল উপস্তিততে ডারিংবাড়ি যেন তার জঙ্গল-পাহাড়ের আদিবাসী রূপটি হারিয়ে ফেলেছে।পথে পথে আম-কাঠালের ফল ভরা গাছ আজও চোখে পড়ছে, তবে ফলন্ত কাঁঠাল গাছ ভরে পড়ে আছে, কিছুটা যেন বিসদৃশ্য। ডারিং বাড়ি বাস স্ট্যান্ড ছেড়ে দূয়েক কিমি এগিয়ে গেলে অবশ্য পিচ ঢালা ঘাটপথে জঙ্গল্ময় পাহাড়ি রাস্তা আজও মন টানে। তবে
মানুষের চেহারা-চরিত্র রুচির যেন ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। যাইহোক, দিন দুয়েকের
ডারিংবাড়ি ফিরে দেখা সাঙ্গ হল। এখন অনেক রাত হয়েছে। জঙ্গল ঘেরা ডারিংবাড়ি
অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশুতি রাতে হঠাৎ মনে হল ছারিবাড়ি নাকি উড়িষ্যার
কাশ্মীর। এখানে নাকি শীতে বরফ পড়ে।

daringbadi

আমার দূরারের অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে
ডিসেম্বরের শেষে ৰা জানুয়ারির মাঝামাঝি তাপমাত্রা আনেকটা নেমে ভােররাতে হয়ত
৩-৪ ডিগ্রিতে পৌঁছয়। হয়ত কখনও সখনও ভােররাতে ঘাসের উপর বরফের পাতলা
আস্তরণ পড়ে। ডারিংবাড়ির সাধারণ মানুষ এটিকেই তুষারপাত মনে করে এবং কাশ্মীরের
সঙ্গে তুলনা করতে ভালােবাসে। তবে ক্ষতি কি কাশীর থেকে ২০০০-২৫০০ কিমি
দূরের জঙ্গল-পাহাড় ঘেষা স্কন্দমল জেলার এই ছােট্ট গ্রামটিতে যদি কাশ্মীরের আবহাওয়া
ৰা পরিবেশের এই অতুলনীয় সম্পদটুকু কিছুমাত্র খুজে পাওয়া যায়, সেটাও তাে এক
বড় পাওনা। এই ভাবনা নিয়েই এক সময় ঘুমের জগতে হারিয়ে গেলাম।

প্রবীর বসু

probir bosu

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: