পায়ে পায়ে মাথেরনে

@
0
(0)

শহরটা এখনাে আলসেমিতে জড়ানো ঘুম ভাঙেনি ভালো করে।রাজপথে অল্প কটা
সরকারি বাস, মােড়ের মাথায় চায়ের দোকানে কেটলিটা সবে মাত্র হাল্কা আঁচে বসানো,
মর্নিংওয়াকারদের ঘাম ঝড়ানো-এইসব দেখতে দেখতে জহুরী বাজার ছাড়ছি।
মুম্বাইয়ের গহনা বাজার। আরাে একবার বারবার শহরের ছবিটা মাথায় তুলে নিতে
চেষ্টা করছি। আজই শেষ দিন, বরং বলা ভালো শেখ ভাের এই মুৰাই শহরে।
একটু পরে সিএসটি স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এই অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্যটি
আবার চাক্ষুষ করলাম। সার্থক। এই স্থাপত্যের প্রতিবিদ উনিও ধন্য, সার্থক ।
এখান থেকেই কর্জট লােকাল ধরলাম। আমাদের গন্তব্য মুম্বাই-পুনে রেলপথের
মরল জংশন। হ্যা ওখান থেকেই শৈলশহর মাথেরন পৌছব। ফার্স্ট ট্রন ধরলাম।
একটার পর একটা শহর শহরতলীর স্টেশন পিছনে ফেলে ছুটে চলেছি। ভিড় বাড়ছে,
মছে। যেন মানুষের জোয়ার ভাটা। এইভাবে ঘণ্টা দুয়েক পর নরল নামলাম। মন
নিজস্ব গতিতে এগিয়ে গেল আমরা ব্রডগেজ ছেড়ে ন্যারােগেজ লাইনের পাশে দাঁড়ালাম।
ওমা! গাড়ি নাকি চলবে না! কি হবে? বৃষ্টির জন্য সব গাড়ি বাতিল! রাস্তা
মেরামত হবে বােধহয় ? অথচ দুর্গোপুজো লক্ষ্মীপুজো সেরে আমরা দীপাবলির দিকে
এগােচ্ছি? অথচ এই সময়…?
অগত্যা স্টেশন ছেড়ে ট্যাক্সিতে চড়ে বসলাম শেয়ারে। নরল ছেড়ে একটু
এগােতেই পশ্চিমঘাট পর্বতমালা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে শুরু করল, আমরাও জড়িয়ে
পড়লাম সঙ্গে উন্মুক্ত হতে থাকল পশ্চিমঘাট পর্বত।।
ইতিমধ্যেই শুরু হয় ছােট রেলপথের উকিঝুঁকি। এই আসে তাে ফের হারায়।
এইভাবেই দেখা দেয় প্রথম স্টেশন ঝুম্পপট্টি। রেলপথের প্রাতরাশ বিরতি হলেও
আমাদের ট্যাক্সি সব ছেড়ে এগিয়ে চলে ক্রমশ উপরে উঠতে থাকি। খুব ঠাণ্ডা নেই
তবে শীতল হাওয়া গায়ে লাগে। অনুভবের স্পর্শ পাই পাহাড়ে চলার।।

Related image
এই পথে ট্রেন চালানাে ১৯০৪ সালে শুরু হয় মাথেরন ট্রিম লাইট ট্রামওয়ে
কোম্পানি দ্বারা। ওরাই মাপজোক করে পাহাড় ঘুরে লাইন পাতে স্টেশন বানায়।
বিদেশ থেকে দার্জিলিং ক্লাসের স্টিম ইঞ্জিন কেনে প্রথম। তবে প্রথম যাত্রা শুরু হয়
প্রায় ১৯০৭ সালে। কিন্তু ট্রাম কোম্পানি কেন লাইট রেল চালায় তা ঠিক বুঝলাম না।
জানলাম না!
এর ২য় স্টেশন ১১ কিমি দূরে ওয়াটার পাইপ নামে। কিন্তু সড়কপথ থেকে
দৃশ্যমান নয়। তারপরই ১৮ কিমি দুরে আমনলজ। আমাদের ট্যাক্সি যাত্রাও দস্তুরি নাকা-
তে শেষ হলাে। এরপাশেই আমন লজ স্টেশন। এরপর আমাদের পদযাত্রা, সামনের
৩ কিমি টিকিট করে ঢুকে পড়লাম। মাথেরনের উন্নতিকল্পে বাইরের আগতদের থেকেই
এই টিকিট ব্যবস্থা। খানিক কর ব্যবস্থা বলা চলে।
এখান থেকে আর কোনও যন্ত্রচালিত গাড়ি ভিতরে চলবে না, অনুমতি নেই।
একমাত্র ওই নেরল ছেড়ে আসা দেশলাই বাক্স মতাে ট্রয় ট্রেন ছাড়া। ইচ্ছুক ব্যক্তিরা
ঘােড়ায় চলেছে। আমরা রেলপথ ধরে জঙ্গল রাস্তায় পাকদণ্ডী পথে এগিয়ে চললাম ।

Related image
সঙ্গে নানা পাখির কলতান, ঝিঝি-র ডাক আর লুকোচুরি খেলতে থাকা পাহাড়ি পথ ।
গ্রামের লােকজনও সঙ্গে চলেছে। রয়েছে কিছু লাইনে কর্মরত রেলকর্মী। রেল
সার্ভিস যেহেতু নিয়ন্ত্রিত সুতরাং ওই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজে সমাপ্তি আশা
দরকার। চলছে জোরকদমে কর্মযজ্ঞ।
আর একটা বাঁক ঘুরলেই মাথেরন। হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল। দাঁড়িয়ে পড়ি, পাহাড়ের
কোণা থেকে উকি মারেন ছােটবাবু। হুক হুক করতে করতে তিনি এগিয়ে আসেন,
পেটে ভরে অতিথিদের। কি ব্যাপার…! পর্যটকদের জয় রাইড-এর স্বাদ দিতে আমনলজ
পর্যন্ত ২/৩ টে ট্রেন নাকি চলছে অবস্থা বুঝে। টপাটপ কটা শাটার মেরে দিই। ট্রেন
চলে যায় নিজস্ব গন্তব্যে। আমরা এসে ঢুকি স্টেশন চত্বরে তথা মাথেরন শহরে আমাদের
কাঙ্খিত গন্তব্যে।।
স্টেশনের বাইরেই বাজার, ব্যাঙ্ক, পােস্টঅফিস, প্রয়ােজনীয় নানা দপ্তর এখানেই
যা একটু কর্মব্যস্ততা। একটু এগােলেই সব বিচ্ছিন্ন শান্ত। এক কোণে দাঁড়ালে সামনে
সাজানাে খেলনার সেট বলেই মনে হবে সবটা। এক দোকানে কাঁধের ব্যাগ জমা রেখে
এগিয়ে চললাম নিস্তব্ধতার মাঝে মাথেরন সফরে। শহরের মত বাইক-মােটর গাড়ির
উৎপাত নেই। পরিবহন ব্যবস্থা বলে যেন সবাই অনেকটা প্রাক শিল্প বিপ্লবের জীবন
কাটাচ্ছে। বেশ মজাদার ভালােলাগা দৃশ্য। বাচ্চারা নিজেরাই ঘােড়া চালিয়ে চলাচল
করছে। হাতে টানা রিকশা ও চলেছে মধ্য কলকাতার মত খানিকটা। অনেকটা ছবিতে
দেখা চিনা রিকশার কথা মনে করায়।।

Neral-Matheran-Horse-ride
এ হেন শৈল শহরটির প্রতিষ্ঠাতা বা আবিষ্কারক ১৮৫০ খ্রিঃ থানের তদানীন্তন
ব্রিটিশ কালেক্টর হুজ পেইনথ মালেট সাহেব। বাজার অঞ্চল চোখের আড়ালে চলে।
গেলেই তুমি একা আবার ঠিক একাও নও। টগবগ করে চলাচল বাহন চলেছে।
ট্যুরিস্টরাও অল্পবিস্তর নিজের মনে চলেছে ব্যক্তিগত মতে। কিছু কিছু তােমার একাকীত্ব
বা ভালােলাগাকে বিঘ্ন করবে না। চলতে চলতে রাস্তা দুভাগে বিভক্ত হল। একটিতে
বেছে এগিয়ে চললাম আপন খেয়ালে। সত্যি কথা বলতে হলে, মাথেরনে আলাদা
করে উল্লেখযােগ্য বলবার কিছু নেই। সবটাই নিজের মত করে সুন্দর। ফলে পর্যটনের
প্রয়ােজনে বেশ কিছু জায়গা প্লেসেস অফ ইন্টারেস্ট নামের পালকটি মাথার মুকুটে
লাগানােই যায়। তবে অন্যস্থানের পালকগুলােও বথা বা মুকুটটির অবস্থানও খালি থাকবে।
বর্তমানে এই স্থানটি মহারাষ্ট্র সরকার ও ভারত সরকার উভয়ই পর্যটনকেন্দ্র
র চালালেও এক সময়ে এ চড়ুইভাতি কেন্দ্র বা মুম্বাই-পুনে নিবাসীদের সপ্তাহ।
অন্তে বিশ্রামস্থল, এছাড়াও ফিল্ম শুটিং-এর স্থান হিসাবেই মূলত খ্যাত হত।
বাজার থেকে ২ কিমি ব্যবধানেই ইকো পয়েন্ট। হ্যা যেখানে জোরে আওয়াজ
করলে নিজের কাছেই ফিরে আসে। যা সাধারণত সব পাহাড়ি জায়গায় খাদের ধারে
হয়ে থাকে। তবে শ্যামল সৌন্দর্য দর্শনীয়।
ফের এগিয়ে চলা সামনে অন্য নামের কোনাে পয়েন্ট, সবস্থানই তাে এক একটি
পয়েন্ট এক একটি পালকরত্ন।
মাথেরন উন্নয়ন কমিটি পর্যটকদের সাহায্যে বা সুবিধার্থে রাস্তার ধারে বসার
ব্যবস্থা বা ডাস্টবিন-এর ব্যবস্থাগুলাে করে দিয়েছে।
পিকনিক স্পট, ফোর্ট পয়েন্ট, প্যানােরমা পয়েন্ট, শার্লট লেক টি টপ এসব স্পট
ও দর্শনীয় ।

Image result for matheran hill station
এখান থেকে শিবাজীর কেল্লা অঞ্চল নাকি ট্রেক করে চলা যায় সঙ্গে তার ব্যবহৃত
সিঁড়িটিও নাকি দেখা যায়। অত্যুৎসাহীদের পথ বলা চলে।
আমরা পৌছলাম ওয়ান ট্রি টপ পয়েন্ট। মাথেরন অঞ্চলে পাহাড়ের বিশেষত্ব
হল এটা পশ্চিমঘাট পর্বতমালা-র অংশ যা চিরহরিৎ বলা চলে। কিন্তু এ অঞ্চলটা
একটা টেবিল-ল্যাম্পের মত যা আবার সম্পূর্ণ প্রায় ন্যাড়া। সবুজ ঘাসে মােড়া, ঘােড়া
চড়ে বেড়াচ্ছে। অনেক দূরের মুম্বাই-পুনে রেলপথের কর্জট শহরটা দিব্যি লাগছে।
কিন্তু হেথায় কোনাে গাছ নেই, জঙ্গল নেই। পাহাড়টিতে শুধুমাত্র একটি গাছ দণ্ডায়মান
বাকি প্রায় শূন্যমাঠ। বুঝলাম না, এ শুধুই কি প্রকৃতির খেয়াল না এর পিছনেও মানুষের
বুদ্ধি কার্যকর।

Related image
দেখলাম একদল ছেলেমেয়ে এসেছে। ফিল্ম শুটিং হবে তারই সাজসজ্জা। হঠাৎ
আবদার এখানে কারাে ছবি তােলা নিষেধ। কোথাও কোনও নােটিশ ছাড়াই এক অন্যায়
জেদ যেন! যদি অন্যকেও বা পর্যটকরা ছবি চুরি করে এই শঙ্কায়! বেশ মজা না!
দিলাম ওদের মুখের ওপর পরপর কটা শাটার মেরে। দেখ কেমন লাগে!
একটু ঘুরে অন্যপথে পা বাড়ালাম। মূল দ্রষ্টব্য মােটামুটি ৪/৫ কিমির মধ্যে
সীমাবদ্ধ। যদিও ট্রেকিং রুট-এর বাইরের অংশ। পায়ে পায়ে প্যানােরমা পয়েন্ট, সানরাইজ
পয়েন্ট, সানসেট পয়েন্ট দেখে নিলাম। প্যানােরমা পয়েন্ট হল – এখানে প্রায় ৩৬০
ডিগ্রির ছবি চোখের সামনে ধরা পড়ে। এইরকম দৃশ্য নাই বা বর্ণনা করলাম। সবটাই
মনে মনে কল্পনা করে নিলে কেমন হয় ?

Image result for matheran panorama point
এরপর এলাম শালট লেক। নিশ্চয় কোনও ব্রিটিশ ভদ্রমহিলার নামেই এমন
নামকরণ। চলমান পথ থেকে একটু ধার বেয়ে নেমে যেতে হল। অবস্থানগত ভাবে
মনে হয়, পাহাড়ের গড়িয়ে যাওয়া জলকে ধরে রাখতেই যেন এ ব্যবস্থা। গাছগাছালিতে
ঘেরা আর হাওয়ার সঙ্গে খেলা করা এই হ্রদ মানুষের নিজের চেষ্টায় তৈরি হলেও
আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সবটাই দেখার উপর নির্ভর করে। এমন মত সঠিক নাও
হতে পারে।

Image result for matheran lake point
বেলা অনেকটাই গড়িয়েছে। এসব পাহাড়ি প্রান্তরে রােদ-মেঘের সখ্যে দিন কাটে।
ফলে অনেক সময় বেলা ১২/১ টা নাগাদই দিন ঢলে পড়ে। যা আমাদের শহুরে
জীবনে চিন্তা করার দরকার হয় না।
ফের মাথেরন বাজার অঞ্চলে এসে পৌছলাম। স্টেশনে একখানা ফাঁকা গাড়ি
দাঁড়িয়ে অন্যমনস্ক হয়ে। আমাদের তাে এ যাত্রায় টয় টুর হলােই না। তাই কিছু ছবি
তুলেই মনকে বােঝালাম। এরপর ফেরার পালা। তাই আবার রেল লাইন ধরেই চলতে
শুরু করলাম।

Related image
বলে রাখা ভালাে, স্টেশন চত্বরে একটি পুরানাে ইঞ্জিন সাজানাে রয়েছে আবার
মাথেরন রেল পথের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও তুলে ধরা আছে। ফের লাইন ধরে আমন
লজ তথা দস্তুরি নাকা পর্যন্ত নেমে এসে বাস ধরলাম কর্জট পথে। সেখান থেকে ট্রেনে
লােনাভালা।

Image result for lonavla images

স্বর্ণেন্দু সাহা

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ওখরে বার্সে থেকে বুড়িয়া খােপ

0 (0) জোরথাং এমনই একটা জায়গা যাকে প্রথম দর্শনেই ভালাে লেগে যায়। বাজার, জনবসতি, দোকান সব মিলিয়ে মেল্লির পরেই দ্বিতীয় বড়াে শহর। সামনের ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে দু-দিকে তাকালে যেন ভুটান বলে ভ্রম হয়। আমরা চলেছি জোরথাং থেকে ওখরের পথে। পাহাড়ি পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে, প্রকৃতির অনবদ্য শােভা উপভােগ করতে করতে যখন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: