হিমালয় প্রাঙ্গণে … দেব সেনাপতির অঙ্গনে।

@
0
(0)

ভাের ৫টা ১৫ মিনিট, দুন এক্সপ্রেস হরিদ্বারে আমাদের নামিয়ে চলে গেল দেরাদুন
অভিমুখে। রিটায়ারিং রুমে ঢুকলাম তরতাজা হবার তাগিদে। ঠিক ৬টায় গাড়ি হাজির।
মালপত্তর তুলে পথ চলা শুরু হােল সকাল ৭টায়। নীল আকাশ, ঝলমলে রােদ আর
বেশ হিলহিলে ঠাণ্ডা। মার্চের শেষ সপ্তাহে আমাদের গন্তব্য কনকচৌরী গ্রাম, উদ্দেশ্য
কার্তিক ঠাকুরের মন্দির দর্শন।

Image result for কনকচৌরী গ্রাম

যুগ যুগ ধরে সদা বহতা গঙ্গাকে পাশে রেখে একে একে ঋষিকেশ, দেবপ্রয়াগ,শ্রীনগরকে পেছনে ফেলে
ভর দুপুরে পৌছালাম রুদ্রপ্রয়াগ।মধ্যাহ্নভােজ সেরে ধরলাম তিলওয়ারা হয়ে অগস্ত্যমুনিগামী পথ।
দুধারে সবুজ বনানী,ওক-পাইনের সারি। গাছ আলাে করে ফুটেছে গােলাপী, লাল রডােড্রেনডন।
চঞ্চলা ষােড়শীর মতাে উঁকি দিচ্ছে তুষারাবৃত হিমশৃঙ্গের সারি। ক্যামেরায় ধরা পড়ছে ইউরােশিয়ান জে,
হিমালয়ান বুলবুল, ব্ল্যাক থ্রোটেড টিটের মতাে রঙিন পাখিরা। বিকেল ৪টে নাগাদ ক্লান্তিহীন আমরা এসে পৌছালাম কনকচৌরী গ্রামে।

Image result for কনকচৌরী গ্রাম

ছােট্ট জনপদ দু-চারটি বাড়িঘর, দোকান, হােমস্টে নিয়ে।আমরা ঠাই নিলাম হােটেল রূপস্বর্ণ হােমস্টেতে
,মায়াদীপ হলিডে হােমে স্থান সংকুলান না হওয়ায়, অতি সাধারণ মাথা গোঁজার আস্তানাও পরিপূর্ণতা পায়নি। কিন্তু মালিক রঞ্জিত সিং (তাউজী)-র আন্তরিকতা সব অভাব পূর্ণ করে দিল।
বৃদ্ধ মানুষটি যে স্নেহে দুই খুদে সহ আমাদের সাত জনকে বেঁধে বেড়ে খাওয়ালেন তাকে পিতৃস্নেহ ছাড়া আর কিই বা বলব। এদিকে সন্ধে হতেই আকাশ আলাে করে ভেসেছে আগামী চৈত্রপূর্ণিমার কুহকিনী চাঁদ।
গায়ে কামড় দিচ্ছে উত্তরে বাতাস।চাঁদনী উপছে পড়ছে ওই দূরে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ে,
সমগ্র চরাচরে পরদিন আভযান শুরু হলাে ভাের ৩টেয় হাড় কাপানাে ঠাণ্ডাকে সঙ্গী করে।
এ পথে গাইডের দরকার পড়ে না, পথও কঠিন নয়। মাত্র তিন কিলােমিটার। তবে পুরােটাই চড়াই পথ।

Image result for kanakchauri
কিন্তু সে কষ্ট ভুলে গেছি রূপসী আকাশকে দেখে। সেখানে যে তারার মেলা!ভােররাতের চাঁদ যেন আরও সােহাগী,ঢলে পড়তে চায় প্রেমিকের বুকে। হাঁটছি, থামাছি আর হাপ নিচ্ছি।
আকাশে দেখা যাচ্ছে মৃদু আলাের বার্তা। জেগে উঠছে পাখাীরা,ছড়িয়ে পড়ছে কুজন,
অনুরণিত হচ্ছে পাহাড়ে। রাতের অন্ধকারেই প্রণাম জানিয়েছি বনদেবীকে।
একটি গাছ ঘিরে গড়ে ওঠা গাড়ােয়ালী মিথ। বনদেবীর পূজা না করে কার্তিক স্বামীর দর্শনে পুণ্যতা প্রাপ্তি হয় না।মহিলারা শাঁখা-সিঁদুর, লালচেলী, আয়না,চিরুণী দিয়ে আরাধনা করেন দেবীর অর্থাৎ
ওই গাছটিকে, বিগ্রহ বা মন্দির বলে কিছু নেই। উল্টোদিকেই আছে একটি বিশ্রামস্থল।
সেখানে দু-দণ্ড জিরিয়ে, দূর থেকে আলাে ঝলমলে রুদ্র প্রয়াগকে দেখে আবার এগিয়ে চলা।
এবার দেখতে পাচ্ছি মন্দির চূড়া,সেখানে জ্বলা সােলার ল্যাম্প। মন্দিরের দেড় কিলােমিটার আগে পুরােহিতজীর বাসস্থান।

Image result for kanakchauri
এখান থেকে রাস্তা একেবারে চড়াই। বিশাল প্রস্তরখণ্ডগুলিকে কেটে, ভেঙে চলার সিঁড়িতে
রূপান্তরিত করা হয়েছে। ট্রি-লাইন হঠাৎই যেন থমকে গিয়েছে। শুধুই ঘাস-গুল্ম।
অনেকটা নীচে সবুজ উপত্যকা বা জনবসতির আভাস। আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি
প্রায় ২৫৪৫ মিটার উচ্চতায়। পাথর কোঁদা সিঁড়ি উঠে গেছে একেবারে পাহাড়ের মাথায়।
৮০-৮২টি সিঁড়ি ভেঙে যখন প্রথম সূর্যের আলােতে মন্দির প্রত্যক্ষ করলাম,
মনে হল এ পথশ্রম মানুষের সাজে, মানুষকেই সাজে। পূবের ছটায় উদ্ভাসিত চৌখাম্বা,
নীলকণ্ঠ, ত্রিশূল, কেদারশৃঙ্গ সহ আরও গিরি সমুদয়। শ্বেতশুভ্র শরীরে স্বর্ণখচিত রাজমুকুট
মস্তকে অভ্রংলিহ, উদ্ধত। আর ততােধিক বিনীত, শান্ত দেবসেনাপতির চত্বর। চতুর্দিকে
পতপত করে উড়ছে হলুদ রঙা পতাকা, বাতাসের তীব্রতায় বেজে উঠছে মন্দিরের
ঘণ্টাগুলি, জলদ গম্ভীর নাদ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে-বাতাসে-ভুলােকে হয়তাে বা দেখতে
পাওয়া দেবলােকেও! এমন স্থানেই বুঝি স্বর্গ তৈরি হয়। মাথার ওপর নীল আকাশ,
চোখের সামনে ধবল শৃঙ্গরাজি, পায়ের তলায় সবুজ পাহাড়ি অরন্যানি, তার মাঝে
জ্যোর্তিময় স্বামী কার্তিকের দেবালয়। যদিও দেবসেনাপতি এখানে আমাদের অতি পরিচিত।

Image result for kanakchauri
সদর্শন, সৌম্যকান্তি কোনও পুরুষ নন। গাড়ােয়ালি প্রথানুযায়ী হলুদ ভেষজ রঙ চর্চিত।
পাথরের বিগ্রহ মাত্র। কিন্তু মন্দিরের স্থান মাহাত্ম্য মনকে অভিভূত করে। ঢাক নেই,
ঢােল নেই, শঙ্খ-কাসর নেই, করতাল নেই আছে শুধুই মৌন হিমালয়ের বাত্ময় নিস্তব্ধতা।
প্রাচীন পুঁথি-পুরান অনুযায়ী দ্রুত পৃথিবী পরিক্রমণ প্রতিযােগিতায় ভাই গণেশের বুদ্ধির।
কাছে পরাস্ত হয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কৈলাসধাম ত্যাগ করেন কার্তিক। প্রতিজ্ঞা করেন নির্জনে শক্তি সাধনার এবং নারীসঙ্গ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখার। দীর্ঘকাল মহিলাদের
জন্য এ মন্দিরের প্রবেশদ্বার রুদ্ধ ছিল। অবিবাহিত দেবতা নারীমুখ দর্শন করবেন না।
এমনটাই ছিল রীতি। ফলে মহিলারা বনদেবীর মন্দিরে পূজা দিয়ে কনকটৌরীতে ফিরে
যেতেন। পুরুষকুল দ্বারাই পূজিত হতেন স্বামী কার্তিক। কালের স্রোতে সে সব প্রথা ভেসে গেছে।
এখন নারী-পুরুষ সবার জন্যই মন্দির দ্বার অবারিত। তবে কথা রেখেছিলেন কার্তিক।
প্রবল তপস্যায় অমিত বলে বলিয়ান হয়ে সমগ্র দেবজগত এস্থানে এসে, অনেক অনুনয় বিনয়
প্রার্থনা করলে তবেই তিনি তারকাসুর বধে উদ্যত হন। পিতা- বা মাতার আদেশে গ্রহণ করেন
দেবতাদের সেনাপতি পদ। তপস্যারত অবস্থায় বনদেবীই ও প্রথম বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে
যান কার্তিকের কাছে যা তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখান করেন। এ পরবর্তীকালে কার্তিক অসুর বধ করে স্বর্গে বিরাজমান হলেও কঠোরভাবে পালন করেন ব্রহ্মচর্য ব্রত, ওই বনদেবীর কথা স্মরণ করে, তাকে সম্মান জানানাের প্রয়ােজনে।
এ সবই শুনলাম পূজারীজির মুখে। শাস্ত্র, ন্যায়, তর্ক-বিতর্ক দূরে সরিয়ে মনােরম একটি
সকালে সবই বিশ্বাসযােগ্য বলে মনে হয়েছে। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছি লােকগাথা বা
গালগল্প যাই বলি না কেন। কোনও প্রকার আড়ম্বরহীন, ধ্যানমগ্ন, তপস্বীসুলভ মন্দির।
কোনও প্রকার পূজা বিধি নেই। নীচে থেকে বয়ে আনা ডালি বা ফলমূল নিজেই বিগ্রহের পাদস্পর্শে
প্রসাদি করে নেওয়া যায়। প্রসাদ হিসাবে পাওয়া যায় হলুদ ফুলের রেণু।
ঘণ্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে সময়ের অনুশাসনে পদযুগল এবার স্বাভাবিকভাবেই নিম্নগামী।
সেই জঙ্গল, রােদ ছায়া ঘেরা পথ। আর একটু চেনা পথের মায়া কাটাতে না পেরে মাঝে মাঝে  ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা কার্তিকস্বামী মন্দির এবং চিরকালের সমুজ্জ্বল শাশ্বত হিমালয়কে।
কনকচৌরীতে নেমে এলাম বেশ দ্রুতই। অবেলায় প্রাতঃরাশ সেরে সওয়ার হলাম গাড়িতে।
ছুটে চলেছি হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা অন্য আর এক সৌন্দর্য খনি চোপতা ভ্যালির উদ্দেশ্যে।
এই পথ চলা যেন কখনও শেষ না হয় এই কামনা বুকে নিয়ে।

Image result for chopta valley

প্রয়ােজনীয় তথ্য
কীভাবে যাবেন?
ট্রেনে হরিদ্বার বা ঋষিকেশ। সেখান থেকে গাড়িতে ২০৫/২১০ কিলােমিটার।
কম বেশি। অথবা বাসে রুদ্রপ্রয়াগ গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে। গাড়ি পুরাে ভাড়া নেওয়াই ভালাে।
বাস বা শেয়ার গাড়ি অপ্রতুল এখানে। গাড়ির জন্য মহাবীর সিং,৮৮৫৯১৯১৮৯৪

কোথায় থাকবেন?
কনকচৌরীতে মায়াদীপ হলিডে হােম, ৯৯০৩৫২৫০৪০
অবশ্যই আগে বুকিং করে নেওয়া উচিত। একান্তই জায়গা না পেলে একটু এগিয়ে এসে
কার্তিক স্বামী রূপস্বর্ণ হােটেল ৯৯২৭৮১০২৬৪, ৯৫৩৬৪৪৬৯৪৪ এছাড়াও
বেশ কিছু আশ্রয়স্থল নির্মিয়মান।
কখন যাবেন?
বর্ষাবাদে যে কোনও সময়। তবে সেরা সময় মার্চ থেকে মে। ঠাণ্ডা এবং ফুলের
বাহার দুটিই পাবেন। শীতে কনকচৌরীতে বরফ পড়ে। গাইডের দরকার পড়লে
কনকচৌরীতেই পেয়ে যাবেন। প্রতিবছর কার্তিক মাসের চতুর্থীতে মন্দিরে উৎসব হয়।
জুন মাসের প্রথম ১১দিন ধরে চলে কৈলাস কার্তিক যাত্রা। স্বাভাবিক ভাবেই এ দুটি
সময়ে পুণ্যার্থীদের ভিড় বাড়ে। কনকচৌরীতে মেলাও বসে এ সময়। উত্তরাখণ্ড সরকার
কার্তিকস্বামী মন্দির উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। পাথরের ফলকে যে ভবিষ্যতে
এ মন্দিরের ছবি তুলে ধরা হয়েছে তা অনন্য সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হােল উন্নয়নের
কোপ সবার আগে গিয়ে পড়ে প্রকৃতির ওপর। তাই দেরী না করে বেরিয়ে পড়ুন স্বামী
কার্তিকের পদধুলি নিতে।

অমিত কুমার দাস।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

শীতের এক সকালবেলায়, চুপিচরে পাখির মেলায়...

0 (0) জানুয়ারির এই হাড় হিম ঠাণ্ডায় সকাল ছটায় ট্রেন ধরবে? তাও আবার পাখি দেখার জন্য? কোথায়, চুপিচরে?সে কোন চুলােয় ? বেড়াতে যাবার আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় বয়ােজ্যেষ্ঠ এক শুভানুধ্যায়ীর এহেন জ্বালাময়ী প্রশ্ন বানে জর্জরিত হলাম। কিন্তু তিলমাত্র হতােদ্যম না হয়ে প্রবল উৎসাহে ছ-সদস্যই গিয়ে পৌছালাম হাওড়া-কাটোয়া শাখার পূর্বস্থলী রেল স্টেশনে। […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: