দেওরিয়াতালের পাখিরা

@
0
(0)

দেওরিয়াতাল বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি অনিন্দ্যসুন্দর ল্যান্ডস্কেপ। যারা নিজ চোখে দেখেছেন তারা তাে বটেই, শুধুমাত্র ছবি দেখেই মুগ্ধ হয়েছেন এমন মানুষও সংখ্যায় প্রচুর। দেওরিয়ালে বেশির ভাগ পর্যটকই আসেন চোপতা থেকে দুগলভিটা হয়ে অথবা কাকডাগাদ (২০১৩ মন্দাকিনী বন্যায় ধ্বংসপ্রায়)।

Related image
বর্তমানে যশপাল সিং নেগিজীর ম্যাগপাই ওয়াচার্স ক্যাম্প, মকুমঠ থেকে। মকুমঠই এখন তুঙ্গনাথজীর শীতকালীন আশ্রয়। দেওরিয়ালের কেন্দ্রস্থল বা প্রাণকেন্দ্র হলাে সারি গ্রাম। পাহাড়ের পাদদেশে ছােট্ট জনপদ এবং ওই পাহাড় চুড়ােতেই দেওরিয়ালের অবস্থান ৮,২০০ ফুট উচ্চতায়। তিন কিলােমিটার রাস্তা পুরােটাই  চড়াই, কিন্তু দমফাটা নয়। সমগ্র রাস্তাটি গাছ-গাছালিতে ঢাকা, আর কূজনে পূর্ণ।

sari village
টেলিলেন্স যুক্ত ক্যামেরায় ধরা দেয় রুফাস সিবিয়া, হিমালয়ান উডপেকার জাতীয় পাখিরা। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে দেখা মেলে রঙীন ফুল বা সবুজ পাতায় বসা। কমন আরগাস বা কমন পাঞ্চের মতাে বর্ণময় প্রজাপতি। বহু আগে এ জঙ্গলে হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার পাওয়া যেত।

Image result for ব্ল্যাক বিয়ার

ক্রমাগত পর্যটক সমাগম আর পর্যাপ্ত সবুজের অভাবে ভালুক এখন গল্প কথা। তবে মার্চ-এপ্রিলে বন পথটি ঢেকে থাকে লাল-গােলাপী রােডােড্রেনডনে। সবুজের মধ্যে লালের বাহার এক অসাধারণ রঙ মাধুরীর জন্ম দেয়।দিনের বেলাতেও এপথে খেলা করে অসীম নৈঃশব্দ। পথ শেষ হয় একেবারে তাল তালাওয়ের সামনে এসে। প্রথম কয়েক মিনিট মুগ্ধতার আবেশ বাকরােধ করে দেয়। সামনেই উত্তুঙ্গ বরফঢাকা হিমালয়-চৌখাম্বা, কেদারডােম, কেদারশৃঙ্গ, সুমেরু, ভাগীরথী, শৃঙ্গ সমূহ অ্যাম্ফিথিয়াটারের মতাে ঘিরে আছে।

Related image

চতুর্দিকে জঙ্গল ঘেরা সবুজ পাহাড়ী বুগিয়ালের মধ্যে শুয়ে আছে শান্ত-শ্যামল এক দিঘী। তার কাচস্বচ্ছ জলে সারাদিন মুখ দেখে চৌখাম্বা। এ যেন তার আপন আরশি (Mirror of Choukhamba)। সুতীব্র নীল আকাশের বুকে একখণ্ড পাতলা মেঘও ধরা পড়ে আরশিতে। তিরতিরে হাওয়া এসে আলপনা কাটে জলে। দেওরিয়াতালের চারপাশে খাটানাে তাবুতে একটি চাদনী রাত কাটাতে পারলে এ ধূলি ধূসরিত ধরাধাম যে খুবই মলিন-মসিলিপ্ত মনে হবে তা হলফ করে বলা যায়। এ হেন স্বর্গরাজ্যে ঘুম ভাঙে গ্রে উইং গড় ব্ল্যাকবার্ডের সুরেলা কণ্ঠে। একটি নয়, একাধিক এই পাখিগুলি ভােরবেলা যেমন প্রকৃতিকে জাগিয়ে তােলে আবার তেমনই সন্ধেবেলা গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ায় সমগ্র প্রাণী জগতকে। নিজেরা আপন নীড়ে ফেরে সবার শেষে। ডঃ সেলিম আলির মতে ভারতের শ্রেষ্ঠ গায়ক পাখি। ঝাক বেঁধে উড়ে বেড়ায় ইয়ালাে বিলড ব্লু ম্যাগপাই, তাদের বিশাল লম্বা লেজের বাহার নিয়ে। এটি মলত পাহাড়ী ঝাড়দার পাখি | ডি.এফ.ও বাংলাের পিছনে, যেখানে গাছপালা একট কম সেখানে দেখা মিলবে কমলা পেট, নীল ডানাওলা ছােট্ট পাখি রুফাস বেলিড নিলটাভা।

Image result for rufous bellied niltava

বাংলাের পাশের জঙ্গল বেশ গভীর। ওখান থেকে ট্রেকপথে পৌছানাে যায় চোপতা। একটানা ১৯/২০ কিলােমিটার হাঁটা। একান্তই না পারলে তাবুতে রাত্রিযাপন। তবে এ পথে পানীয় জলের সমস্যা বিস্তর। এই ঘন বনের আলাে-আঁধারীতে ক্যামেরা হাতে ধৈর্য্য ধরে নিরীক্ষণ করলে অবশ্যই ধরা দেবে ইউরেশিয়ান জে। হালকা নীলরঙের ডানা, ক্রীমরঙা গায়ে চোখের ঠিক তলায় অর্থাৎ চক্ষুর দু-পাশে কালাে রঙের দাগ দুটি দেখে মনে পড়বে চার্লি চ্যাপলিনের গোঁফের কথা।

Image result for ইউরেশিয়ান জে

এখানেই দেখা পাওয়া যায় ভার্টিটার ফ্লাইক্যাচারের। ইতিউতি উড়ে বেড়ায় ব্ল্যাক থ্রোটেড টিট, রেড ভেনটেড বুলবুলের মতাে পাখিরা। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে হিমালয়ান বুলবুল। বেয়ারডেড ভালচার বা হিমালয়ান গ্রিফনের মতাে পাখিদের বাদ দিলে হিমালয়ে পাখিরা আকারে বিরাট বড়াে হয় না, বরং বেশিরভাগই ছােট। জঙ্গলে খানা-তল্লাশী করলে দেখা মিলবে দুর্দান্ত সুন্দর নীলমাথা, সাদা মােটা পেটের আট্রামেরিন ফ্লাইক্যাচার বা গ্রে হেডেড উডপেকারের মতাে পাখিদেরও।

Image result for গ্রে হেডেড উডপেকার
তবে মনে রাখতে হবে পাখির দেখা পাওয়া বেশিরভাগটাই নিজের ধৈৰ্য্য এবং পর্যবেক্ষণ শক্তির ওপর নির্ভর করে, বাকিটা কপালের জোর। পাখির ছবি করার সেরা সময় হােল ভাের থেকে মােটামুটি সকাল বেলা অব্দি। বেলা বাড়লে দেওরিয়াতালে পর্যটক সংখ্যা বাড়ে, বাড়ে মালবাহী খচ্চরের সংখ্যাও। পাখিরা সরে পড়ে অন্যত্র। বিকালে জন কোলাহল কমলে দেখা পেতে পারেন লং টেলড।

Image result for long tailed
মিনিভেটের মতাে উজ্জ্বল লাল, কালাে মাথার পাখিটিকে। দুস্পাপ্য নয় রেড বিলড ব্লু ম্যাগপাইও। সূর্যের পড়ন্ত আলােয় যেন ঠিকরে বিচ্ছুরিত হয় রঙ পাখিদের পালক-ডানা থেকে। এ অঞ্চলের পাখিদের খাদ্য মূলত বনজ জংলী ফল-ফুল, প্রজাপতি আর কীট পতঙ্গ। শশব্যস্ত হয়ে নিজের বা ছানাদের জন্য পাখিদের খাবার সংগ্রহের চিত্রটিও অত্যন্ত মনােগ্রাহী। সর্বোপরি বলা প্রয়ােজন যদি মনােমত বা পছন্দসই পাখি নাও পান তাতে মন খারাপ না করে দু’চোখ ভরে দেখুন উদাত্ত হিমালয়, ওয়াচ টাওয়ারে উঠে দিনের শেষ আলাে মাখা পর্বতরাজী দর্শন করতে করতে নিশ্চিতভাবেই আপনার চোখ চলে যাবে সুদূর কোনাে প্রান্ত থেকে উড়ে আসা পাখীদের ঝাঁকের দিকে। সমগ্র বগিয়ালকে মুখরিত করে সাঁঝের আলাে মাখা ক্লান্ত পাখিদের ঘরে ফেরার দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করার ব্যর্থ প্রয়াস না করে বরং ধরে রাখুন আপনার চোখের ফ্রেমে। জীব ও জগতের এই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া জলছবিকে বাঁধিয়ে রাখুন মনের মণিকোঠায় চিরকালের জন্য।

সুলুক সন্ধানঃ
সারিগ্রামে থাকার জন্য – রঘুবীর সিং নেগী, ০৯৬৯৯০৯০৫১৫, দেওরিয়াতালে
টেন্টে থাকার ব্যবস্থাও উনি করে দেবেন। ভাল গাইড (পাখি চেনার জন্য) রাকেশ
নেগী, ০৯৪১১৫৩৪৭১৫
মকুনাথে থাকার জন্য – যশপাল সিং নেগী, ০৯৭২০৭০৯৪৯৯ (নিজেই
পক্ষী বিশারদ)
চোপতায় থাকার জন্য – হােটেল নীলকণ্ঠ – ০৭৩৫১৪৪২২০০

– অমিত কুমার দাস

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

মংলাজোড়ির মনােরম প্রকৃতি ও বিহঙ্গ সান্নিধ্যে...

0 (0) উড়িশার চিল্কা হ্রদের উত্তরপ্রান্তে এক অখ্যাত গ্রাম মংলাজোড়ি। চিল্কা বা তার অংশ হিসাবে মংলাজোড়ি এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলি ছিল পাখি শিকারিদের আখড়া। হতদরিদ্র মানুষের এই গ্রামের প্রতিটি ঘরেই পাওয়া যেত অন্তত একটি করে বন্দুক। শীতে পরিযায়ী পাখির আগমনের প্রতীক্ষায় এরা ছিল তৎপর। হাজার হাজার পরিযায়ী পাখিরা যখন দূর […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: