হামিংবার্ডের হজমশক্তি

ভিনদেশী যে কয়েকটি পাখির সঙ্গে মধ্যবিত্ত বাঙালির ছােটবেলা থেকে পরিচয় ঘটে তার মধ্যে হামিংবার্ড অন্যতম। চাক্ষুষ দেখার সাধ্য নেই। ছােটবেলায় কুইজের বই আর বড় হলে টিভির পর্দায় এই ছােট্ট পাখিটার সঙ্গে আমাদের আলাপ ঘটেই যায়।

Image result for হামিংবার্ড
সারা পৃথিবীতে ৩০০টিরও বেশি প্রজাতির হামিংবার্ড পাওয়া যায়। তাদের প্রত্যেকটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল এবং চমৎকার। তারা বর্ণময়, তারা কখনাে প্রজননের সময় বহুগামী, বাসার জন্য ধুন্ধুমার লড়াই করে, আবার খাবারের খোঁজে বহুদূর পাড়ি দেয়। এখানে তাদের শুধু খাবার এবং সেই সম্বন্ধীয় স্বভাবের কথা লিখব।
হামিং বার্ড প্রধানত ফুলের মধু খায়, এবং আশ্চর্যের বিষয় ওদের খাদ্যতালিকায় থাকা ফুলগুলিও হাজার হাজার বছর ধরে ওদের মতাে করে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই বিভিন্ন প্রজাতির হামিংবার্ডের আকার, ঠোটের গঠন, প্রবাসের এলাকা অনুযায়ী ফুলগুলির আকার, রঙ, মধুর পরিমাণ এবং পরাগ মিলন ও নতুন নতুন
প্রজাতির উদ্ভাবন ওতপ্রােতভাবে জড়িত। যেহেতু হামিংবার্ড আকারে ছােট তাই খুব দ্রুত ওড়া বা শূন্যে একই জায়গায় স্থির হয়ে মধুপান করতে পারে। আবার এর ফলে তাদের শরীর থেকে খুব তাড়াতাড়ি তাপক্ষয়ও হয়। এবং সেটা আটকাতে ওদের প্রতিনিয়ত মধুপান করে যেতে হয়। যাতে ওদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

Related image
তবে হামিং বার্ড সারাদিনে কতটা পরিমাণ মধু খাবে সেটা কতকগুলি ব্যাপারের
ওপর নির্ভর করে।
১। তাদের ওড়াউড়ির দ্রুততা।
২। বাতাসের তাপমাত্রা ও আদ্রর্তা।
৩। কী গুণমানের মধু সেখানে উপলব্ধ।
৪। বছরের কোন সময় ইত্যাদি।
হামিংবার্ড যে ধরনের মধু খায় সেগুলিতে ৩০ শতাংশ-এর বেশি চিনি শর্করা (Sucrose) বর্তমান থাকে। সাধারণভাবে এই গুণমানের মধু একটি পাখি সারাদিনে তার দেহের ওজনের দেড়গুণ ওজনের পরিমাণে খায়। বুঝে দেখুন ওদের খাবার ক্ষমতা, যদিও এটা ওদের খেতেই হয়।। এই বিশাল পরিমাণ মধু খুব দ্রুত হজমও করে দেয় তাদের পাকস্থলীর মধ্যে দিয়ে ২০ মিনিটেরও কম সময়ে মধু পার হয়ে যায় এবং তাদের দেহে মধু থেকে সমস্ত চিনি শুষে নেয়। পড়ে থাকা জল দেহ নিজস্ব কাজে ব্যবহার করে বা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাস্পীভূত হয় এবং বাকিটা মূত্রাকারে বের হয়ে যায়। এদের প্রচণ্ড শক্তিশালী কিডনী এই জল শুষে নেওয়ার কাজটি অতি দ্রুততার সঙ্গে করে।তাই হামিংবার্ড সেই মুষ্টিমেয় পাখিদের মধ্যে পড়ে যারা নিয়মিত মূত্রত্যাগ করে।

Image result for হামিংবার্ড

কতটা মূত্রত্যাগ করে শুনবেন? যদি মধুর জোগান ঠিকঠাক থাকে তবে দৈনিক তাদের দেহের ওজনের ৮০ শতাংশ। এই মধু খেতে তারা ফুলের পরাগ মিলন ঘটিয়ে ফেলে অজান্তে। পােকাদের তুলনায় দ্রুততার সঙ্গে তারা এই কাজটি করে। কারণ পােকারা ওদের মত দূর দূরান্তে দ্রুত উড়তে পারে না। কৃতজ্ঞতাবশত
ফুলগুলিও ওদের পরাগ মিলনের রূপকারদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। নতুন নতুন ফুলের প্রজাতি ও নতুন গুণমানের মধু তৈরি হয়। ফুলের রঙ ও হামিংবার্ডদের পছন্দের রঙে রাঙিয়ে ওঠে। যেমন লাল, কমলা বা উজ্জ্বল গােলাপী। এই সমস্ত উষ্ণ (warm) রঙ হামিংবার্ডদের চকচকে রঙের সঙ্গে মিশে যায়। এরা ফুলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, আর বেচারা পােকারা এই লাল গােলাপী রঙ দেখতেই পায় না।
তারা আরও কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের রঙ দেখতে পায়। ফলে ফুলগুলির মধুর ওপর হামিংবার্ডদের একছত্র আধিপত্য গড়ে ওঠে।

Image result for হামিংবার্ড

এ এক পারস্পরিক নির্ভরতার গল্প – ফুল ও হামিংবার্ডদের মধ্যে। তবে ফুলের রঙের থেকে মধুর স্বাদ ও পরিমাণ হামিং বার্ডদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মতই তারা গ্লুকোজ ও
ফুকটোজের তুলনায় সুক্রোজের পরিমাণকে বেশি পছন্দ করে এবং কম চিনি বা সুক্রোজের মধুযুক্ত ফুলগুলি পােকাদের আস্তানা হয়ে ওঠে।তবে হামিং বার্ড শুধু মধুই খায় না। প্রােটিনের চাহিদা মেটানাের জন্য তারা পােকা, মাকড়সা, বিট ইত্যাদি খায়। যেহেতু প্রােটিন মধু থেকে মেলে না। দেখা গেছে ছােট বাচ্চাদের এরা নিয়মিত পােকামাকড় খাওয়ায়।আর এই ব্যস্ত, ছটফটে পাখিটি প্রতিকূল পরিবেশে সম্পূর্ণ অন্যরকমভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখে। দীর্ঘ রাত্রিগুলিতে তারা তাদের হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও
দেহের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। তাদের হজমের হার কমে যায়, খিদে কম পায়, তারপর সূর্যের আলাে ফুটলে আবার এই ফুল থেকে সেই ফুল নিরন্তর মধু খেয়ে বেড়ানাে।

স্বাগতা সরকার

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: