বড়ি হাঁস

মানালির এক হােটেল মালিকের কাছ থেকে গত বছর শুনেছিলাম মান্ডির কাছে পুষ্কর লেকে মে-জুন মাস নাগাদ বড়ি হাঁসের বিরাট কলােনি তৈরি হয়।আর মানালি থেকে যাওয়ার পথে ভাগ্য ভালাে থাকলে রাস্তার ধারে দেখা মিলতে পারে হিমালয়ান মুনাল ও কালীজ ফ্রেজেন্টের। একজন পাখিপ্রেমীর কাছে এ দেখার
লােভ কি আর সামলানাে যায় আর এছাড়াও বিয়ের মাত্র দুমাস হল তাই হানমুন,সাথে আমার পক্ষীদর্শন। তাতে রথ দেখা কলা বেচা দুইই হল। হােটেল মালিক অভিজিৎ-এর কথামত মানালি থেকে গেলাম মান্ডি। সেখান থেকে পুষ্কর লেক যেমন কথা তেমনি কাজ, যাওয়া মাত্র দেখা মিলল প্রকৃতির এই অসাধারণ সৃষ্টির। দেখে যেন চোখ, আত্মার শান্তি হল।

Image result for হিমালয়ান মোনাল ও কাজ প্রেজেন্ট
মাথা সাদা এবং তার ওপর দুটো কালাে দাগ, ঠোঁট হলুদ, ঠোঁটের ডগা কালাে, গলা থেকে সারা শরীর ছাই রঙের। গলা বেয়ে একটি সাদা দাগ নীচে নেমে এসেছে। ডানার ধার কালাে এবং লেজ কালাে, পা দুটি হলুদ, এরা অত্যন্ত ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও থাকতে অভ্যস্ত। সাধারণত ৭১ থেকে ৭৬ সেমি এদের
দৈর্ঘ্য হয়,ওজন প্রায় ১.৮৭ থেকে ৩.২ কেজি। গ্রীষ্মে এরা সাধারণত হাই অলটিচিউড লেকে চলে আসে যেখানে ছােটো ঘাস থাকে এখানে অন্যান্য হাঁসের সাথে মিশে যায়। এদের পরিযানের সময় দক্ষিণ থেকে তিব্বত কাজাকাস্থান,মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়া পর্যন্ত উড়তে দেখা গেছে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতাতে
উড়তে সক্ষম। প্রায় ২৯,০২৯ ফুট উচ্চতায় মাউন্ট এভারেস্টেও এদের কলােনি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১১ সালের এক গবেষণায় জানা গেছে সাধারণভাবে এরা ৬৪০০ মিটার (২১,০০০) ফুট উচ্চতাতে ঘােরাফেরা করতে স্বাচ্ছন্দবােধ করে।২০১২ সালে ৯১টি বড়ি হাঁসের ওপর করা গবেষণায় জানিয়েছে যে এদের ৯৫ শতাংশ ৫,৭৮৯ মিটার (১৮,৯৭৬ ফুট) উচ্চতাতে দীর্ঘ যাত্রাপথ পাড়ি দেয়।আর ১০টি হাঁস তারা ৬,৫০০ মিটার থেকে ৭,২৯০ মিটার উচ্চতাতে (২১,৩০০ফুট থেকে ২৩,৯২০ ফুট) পরিযানকালে দীর্ঘ যাত্রাপথ পাড়ি দিয়েছে।

Related image
এই পরিযানের পূর্বে পাখিদের শরীরে এক ধরনের মেটাবলিক পরিবর্তন হতে শুরু হয় যা থাইরয়েড গ্রন্থি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পিটুইটারি গ্রন্থি নিঃসত হরমােন তাদের শরীরে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে ও প্রজনন-এর জন্য অস্থির হয়ে ওঠা এই পাখিরা নিজেদের প্রয়ােজনে একটি আদর্শ প্রাকৃতিক পরিবেশের খোঁজ করে। তবে এদের উড়ানের মূল শক্তি আসে এদের শরীরের জমানাে চর্বি থেকে।শরীরের ফ্যাট বা চর্বি ভেঙে এদের কলাকোষে এবং টিস্যতে ক্রমাগত একটি শক্তির প্রবাহ যােগান দিতে থাকে। এক্ষেত্রে বলাবাহুল্য একটি রুবি থ্রোটেট হামিংবার্ড(পৃথিবীর সবথেকে ছােটো পাখি) তার নিজের শরীরে যে পরিমাণ চর্বি জমা করে পরিযানের সময় তা দিয়ে সে ২৬ ঘণ্টা একটানা ও ২৫ কিলােমিটার প্রতি ঘণ্টায় উড়তে পারে। যা থেকে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি যে বড় পাখিদের ক্ষেত্রে এই শক্তির পরিমাণ কতখানি হতে পারে।পরিযানের পূর্বে দেখা গেছে গড়ইটদের শরীরের ওজনের ৫৫ ভাগই হল চর্বি। যাত্রা শুরুর পূর্ব পরিযায়ী পাখিরা নিজেদের শরীরে প্রচুর পরিমাণে চর্বি জমিয়ে নেয় যা যাত্রাপথে তাদের জ্বালানির সাহায্য করে।

Image result for রুবি থ্রোট হামিংবার্ড
পরিযানকালে পাখিরা ৭৪০০ ফুট উচ্চতার মধ্যে উডে। তবে ছােট পাখিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৮০০-১৬০০ ফুট উচ্চতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দিনের বেলা আবার অনেক কম উচ্চতা অর্থাৎ ১০০ থেকে ২০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে এরা পরিযান ঘটায় তবে এক্ষেত্রে বার হেডেড গুজ’ একেবারে অন্যতম পক্ষীবিজ্ঞানীদের মত অনুসারে এটি সর্বোচ্চ উচ্চতায় পরিযানকারী পাখি প্রায় ২৯,৫০০ ফুট উচ্চতায়।
এরা পরিযান করে। মাউন্ট এভারেস্টে একটি অভিযানের সময় পর্বতারােহীরা প্রায় ১৬ হাজার ফুটের একটু বেশি উচ্চতায় অবস্থিত ঘুম্ব গ্রেসিয়ারের কাছে পিনটেল ডাক (বাংলায় যাকে দিক হাঁস বলা হয়) এর মৃত দেহাবশেষ উদ্ধার করেন।

Related image
বার হেডেড গুজ পরিযান করে প্রায় গােটা হিমালয় জুড়ে। তবে শীতে এদের কখনও কখনও চাষের জমিতেও নামতে দেখা যায়। তখন ধান, গম, যব প্রভৃতি খাবার খায়। পশ্চিমবাংলায় বিশেষত কাজিরাঙ্গা অভয়ারণ্য, সুন্দরবন, পশ্চিবঙ্গ ও উড়িষ্যার একেবারে সীমান্তরেখা বরাবর বিচিত্রপুর প্রভৃতি এলাকাতে শীতে এদের দেখা মেলে। মূলত তিব্বত-এর উপত্যাকা অঞ্চলে এদের স্বাভাবিক বসবাস তীব্র শীতে এরা নীচের দিকে নেমে আসে শীত শেষে আবার ফিরে যায় এবং প্রজনন করে। সাধারণত মে-জুন মাসে এরা নীড় নির্মাণ করে। এরা যেমনভাবে শূন্য ডিগ্রি নীচের আবহাওয়াতে মানিয়ে নিতে সক্ষম তেমন ভাবে এরা গরম আবহাওয়াতেও মানিয়ে নিতে সক্ষম।

Image result for বার হেডেড গুজ
বর্তমানে ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এদের সংখ্যা ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। আর দিনে দিনে এরা মানুষের লালসার শিকার হচ্ছে। যে সব পাখিরা শীতে নীচের দিকে নেমে আসছে মাংসের লােভে তাদের অবলিলায় হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে এরা প্রকৃতির বন্ধু এরা যেদিন হারিয়ে যাবে।
সেইদিন থেকেই আমাদের মৃত্যুর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যাবে।

– অনুপ হালদার

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: