মংলাজোড়ির মনােরম প্রকৃতি ও বিহঙ্গ সান্নিধ্যে…

@
5
(1)

উড়িশার চিল্কা হ্রদের উত্তরপ্রান্তে এক অখ্যাত গ্রাম মংলাজোড়ি। চিল্কা বা তার অংশ হিসাবে মংলাজোড়ি এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলি ছিল পাখি শিকারিদের আখড়া। হতদরিদ্র মানুষের এই গ্রামের প্রতিটি ঘরেই পাওয়া যেত অন্তত একটি করে বন্দুক। শীতে পরিযায়ী পাখির আগমনের প্রতীক্ষায় এরা ছিল তৎপর। হাজার হাজার পরিযায়ী পাখিরা যখন দূর দেশ থেকে উড়ে আসত এই জলাশয়ের উদ্দেশ্যে। শিকারী মানুষগুলাে তখন দিনভর র্যস্ত, উদ্দেশ্য পরিযায়ী পাখি মেরে তার মাংস বিক্রি করে মাসে অন্তত ২৫০০০ – ৩০০০০ টাকা আয় করতে। হ্যা, পরিযায়ী পাখি শিকারই ছিল তখন ঐ অঞ্চলের মানুষর মূল জীবিকা। এইভাবেই হয়ত চলত এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা কিন্তু হঠাৎ এ অঞ্চলে আবির্ভূত হলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব,কন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সংগঠন ওয়ার্ল্ড উড়িশা’র ভাইস চেয়ারম্যান এন কে ভূজবল।

Image result for mangalajodi
তিনি ১৯৯৭ সাল নাগাদ নিত্য এ অঞ্চলে যাতায়াত শুরু করেন এবং গ্রামের চোরা শিকারিদের সঙ্গে আলাপ, আলােচনা এবং সভা করে বােঝাতে চেষ্টা করেন যে এভাবে নিয়মিত পাখি মারতে থাকলে কিছুদিন পরে মারবার মত পাখি এ অঞ্চলে আর অবশিষ্ট থাকবে না। পাখি শিকার বন্ধ হলে দেখা যাবে যে পাখি নিয়মিত মারা হচ্ছে, সেই পাখি দেখতেই সারা দেশ থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসবে। তার ফলে পর্যটনের প্রসার হবে এবং তাদের স্থায়ী জীবিকার ব্যবস্থা হবে। চোরা শিকারিদের মধ্যে কিছু মানুষ তার প্রস্তাবে রাজি হলেও ১৯৯৭ সালে মাসিক ২০-২৫ হাজার টাকার মােহ অনেকেই উপেক্ষা করতে পারছিলেন না। চলছিল ভয়ঙ্কর মানসিক দ্বন্দ্ব।তবে নিয়মিত প্রচেষ্টা এবং তার সম্মােহিনী শক্তি বলে তিনি একদিন অঞ্চলের মানুষকে বােঝাতে সমর্থ হলেন যে প্রতিটি পাখির নাম জেনে তাদের বিচিত্র স্বভাবের সুলুক সন্ধান পক্ষীপ্রেমী পর্যটকদের জানিয়ে তারাও প্রচুর পয়সা উপার্জন করতে সমর্থ হবে।

Related image
তিনটি বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে তৈরি হল শ্রী মহাবীর পক্ষী সুরক্ষা সমিতি। এমনকি এক সময়ের নামকরা পাখি শিকারিরাও এই সমিতির সঙ্গে যুক্ত হলেন। তারা আজ দেশি নৌকোয় চড়ে সুবিশাল ঐ জলাভূমিতে ঘুরে বেড়ান যে কোনাে মূল্যে পাখিকে বাঁচাতে।শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির ব্যস্ততা দেখতে যারা ভালোবাসেন বর্ষাকালে হাজার হাজার স্থানীয় পাখির বাসা বাঁধার, সংসার পালনের, বাচ্চা ফোটানাের কর্মকাণ্ড উপভােগ করতে যাদের মন চায়, তাদের জন্য মংলাজোড়ির আদিগন্ত জলাভূমি ঘাস, হােগলা, নলখাগড়ার বন আর তার মধ্য দিয়ে নৌকো চলার সরু খাড়িপথের এই পটভূমি পক্ষীপ্রেমী পর্যটকের কাছে মংলাজোড়িকে করে তুলেছে যথেষ্ট আকর্ষণীয়।
মংলাজোড়ির প্রাণপুরুষ শ্ৰী নন্দকিশাের ভূজবলের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণের আলাপচারিতায় আমারও কিছুটা সম্মােহিত হয়ে পূর্বঘাট পর্বতমালার কোলে শীতের কুয়াশামাখা, মেঘের চাদরে ঢাকা ছােট, সুন্দর স্টেশন বালুগাওতে এসে পৌছলাম।

Image result for balugaon
বালুগাও স্টেশন থেকে মংলাজোড়ি ইকোট্যুরিজমের পাঠানাে অটোতে এগিয়ে চললাম।এন.এইচ-৫ ধরে টাঙ্গি হয়ে মংলাজোড়ির পথে। প্রায় সকাল ১০-৩০ নাগাদ পৌছে গেলাম উঁচু পাঁচিল ঘেরা অতিথি নিবাসে। পরিচ্ছন্ন, সুন্দর পরিবেশ বান্ধব পরিবেশে দ্রুত স্নান খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম মংলাজোড়ির জলাভূমির উদ্দেশ্যে।মংলাজোড়ির জলাভূমি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিযায়ী পক্ষী নিবাস। মূলত চিল্কা হ্রদের অংশ। পাহাড় ঘেরা দিগন্ত বিস্তৃত এ জলা কচুরীপানা, হােগলাপাতা,নলখাগড়া ও পাতাঝাঝির জঙ্গলে পরিপূর্ণ। রয়েছে হাজারাে ভাসমান জলজ উদ্ভিদ ও শ্যাওলা। অসংখ্য বিভিন্ন নামের খাঁড়ি পথ। যে পথ কোথাও কোথাও অত্যন্ত সংকীর্ণ।দুহাতে আগাছার জঙ্গল সরিয়ে এগােতে হয়। এই জল-জঙ্গলের পথে পাখি দেখতে প্রতি মুহুর্তে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয় চোখ আর মনকে সজাগ রেখে। যাইহােক,ডিঙ্গি নৌকো নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম খাড়ি পথ ধরে পাখিদের রাজত্বে।মংলাজোড়ির রূপের তুলনা হয় না। হাজার হাজার পাখি এক সঙ্গে জল ছেড়ে ওঠার আওয়াজ, হ্রদের জলে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছিটেকে ওঠা কোটি কোটি জলবিন্দ রাশি, মাথার উপর দিয়ে হাজারে হাজারে পাখির উড়ে যাওয়ার সময় একত্রে ডানা ঝাপটানাের শব্দ। আকাশের বুকে চরাচর জুড়ে তাদের পাক খাওয়া এমন আরও কত কি? হ্রদের কোথাও হাঁটুজল, কোথাও গলা পর্যন্ত, তারই মধ্য দিয়ে লগি ঠেলে কাঠের ছােট ছােট নৌকোয় এগিয়ে চলা। জলের নীচে জলজ উদ্ভিদের অপূর্ব উদ্যান,কোথাও ছােটো ছােটো শালুক ফুলে ভরে আছে জলতল, সেখানে নীল, কমলা,লাল ফরিং-এর উড়াউড়ি। দূরে অস্পষ্ট নজরে আসে তরঙ্গায়িত পূর্বঘাট পর্বতমালা।
আমরা ধীরে ধীরে এক অপরূপ পাখি রাজত্বে অনাহুত অনুপ্রবেশ করছি। জলাশয়ের ঝােপে ঝােপে পার্পল হেরণ, লাল কাক, ওপেন বিল স্টর্করা (শামুকখােল) তাদের পরিবার সহ মাতামাতি করছে। অসংখ্য ব্ল্যাক উইংড স্টিল্ট দের (লালঠেঙি) জলের মধ্যে এক পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।

Image result for black winged stilt

জলের আশেপাশের ঝোপে জল যেখানে অনেকটাই কম সেখানে হােয়াইট ব্রেস্টেড ওয়াটার হেন (ডাহুক)। ইন্ডিয়ান পার্পেল, মুরহেন (কায়েম)-রা পরিবার সহ সংসার পালনে ব্যস্ত। দেখলাম বেশকিছু মাছরাঙার মাছ ধরবার কৌশল। হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে জলে ঝাপিয়ে পড়ে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে জল থেকে মাছ তুলে নেওয়ার কৌশল। গাইডের কাছ থেকে জানলাম ভারতে।প্রাপ্ত ১২টি মাছরাঙা প্রজাতির মধ্যে কমপক্ষে ৬টি প্রজাতি চিল্কার স্থায়ী বাসিন্দা এবংএই জলাভূমিতে তাদের বিপুল সংখ্যক উপস্থিতি। বর্ষায় দেখা যায় ব্রোঞ্জ উইংড জাকানা (জলপিপি) স্পটবিল ডাক মেটে হাঁস দের দল নরম তুলতুলে বাচ্চাদের নিয়ে জল সাঁতরে বেড়াচ্ছে। শীতে ভিড় বাড়ে স্বভাবতই পরিযায়ী পাখিদের। গােল্ডেন পভলার, রেডশাঙ্ক, উডস্যান্ড পাইপার, কাদাখোঁচা, জাউরালি, বালিহাঁস, সদাই যুগলে থাকা চখাচখি। ভাগ্য সহায় হলে পাওয়া যেতে পারে শােভেলার ডাকের মত বর্ণময় পাখিও। মংলাজোড়ি পক্ষী বিক্ষণ কেন্দ্রে ঢােকার পথে মনে হবে এ বুঝি বাঁকুড়া,পুরুলিয়ার কোনাে প্রান্তিক গ্রাম। লাল শক্ত, কঁকুড়ে মাটি বাবলা গাছের ঝােপ বােগেনভেলিয়া ফুল দেখে আন্দাজ করা কঠিন এই সুবিশাল জলাভূমির অবস্থান।

Image result for chilka
ভােরবেলা হাল্কা-ঠাণ্ডা কুয়াশা মেখে সারাদিন নৌকোয় পাখিদের জীবনচরিত ক্যামেরা বন্দি করে যখন ঘরে ফিরবেন তখন অবশ্যই অবাক হয়ে দেখতে হবে সমুদ্রের ঢেউ-এর মতাে গর্জন তুলে ঝাকে ঝাকে পাখির দল রওনা দিয়েছে নীড়ের খোঁজে। তাদের।প্রসারিত ডানায় লেগে থাকবে অস্তগামী সূর্যের আলাের প্রতিফলন যা আপনার মুগ্ধতার আবেশ দীর্ঘায়িত করবে।

যাতায়াত  দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনে চেপে বালুগাঁও স্টেশন। সেখান থেকে
গাড়ি বা অটোতে ৪৫ কিমি পথ পেরিয়ে টাঙ্গি বাজার হয়ে মংলাজোড়ি।।
থাকা-খাওয়া  মংলাজোড়ি ইকো ট্যুরিজম সেন্টারে আগে বুকিং করে যাবেন।
পিক আপ ড্রপিং এর ব্যবস্থা আছে। নৌকোয় ৬ জনের বেশি নেওয়া হয় না (গাইড
সহ)। উগ্র সুগন্ধি বর্জন করতে হবে। ধুমপান, মদ্যপান নিষিদ্ধ। পরিবেশ বান্ধব এলাকা।
তাই প্লাস্টিক নিষিদ্ধ। যে কোনাে সহায়তার জন্য –
১। নন্দ কিশাের ভুজবল, মােঃ ০৯৯৩৭১৫৩৮৫৭
২। সন্তোষ কুমার মহাপাত্র, মােঃ ০৮৮৯৫৭৬৩৯৭৯

– প্রবীর বসু

probir bosu

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বড়ি হাঁস

5 (1) মানালির এক হােটেল মালিকের কাছ থেকে গত বছর শুনেছিলাম মান্ডির কাছে পুষ্কর লেকে মে-জুন মাস নাগাদ বড়ি হাঁসের বিরাট কলােনি তৈরি হয়।আর মানালি থেকে যাওয়ার পথে ভাগ্য ভালাে থাকলে রাস্তার ধারে দেখা মিলতে পারে হিমালয়ান মুনাল ও কালীজ ফ্রেজেন্টের। একজন পাখিপ্রেমীর কাছে এ দেখার লােভ কি আর সামলানাে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: