ছােট্ট পাখি টুনটুনি

@
0
(0)

‘পাখি সব করে রব রাতি পােহাইল’, ‘তারা পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে পাখির ডাকে জাগে।’
বাঙালির জীবনে সংস্কৃতিতে পাখির উজ্জ্বল উপস্থিতি বহুবর্ণে রঞ্জিত। জীবন রসের হাজারাে বৈচিত্রে পাখি আমাদের পরম আদরের। প্রকৃতির গহনে ভালবাসার অকৃত্রিম সঙ্গী।Image result for টুনটুনি
আমাদের দেশে প্রায় ১২৫০ প্রজাতির পাখি আছে। আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশকে এক অপার সৌন্দর্যে সাজিয়ে রেখেছে বিচিত্র প্রজাতির পাখি। এদের মধ্যে কিছু পাখি ছােটো, কিছু মাঝারি এবং কিছু বেশ বড়সড়। সব পাখিই সুন্দর। তবে সব পাখিকে সব সময় দেখতে পাওয়া যায় না। সব পাখি সব জায়গায় থাকেও না।
সবাই সব সময় ডাকেও না। বিভিন্ন পাখির আচার-আচারণ স্বভাব চরিত্র ও জীবন যাপনেও রয়েছে ভিন্নতা। এ নিবন্ধে আমাদের আলােচ্য বিষয় অতি ছােট্ট পাখি টুনটুনিকে নিয়ে। টুনটুনি আকারে খুবই ছােট কিন্তু বােধ বুদ্ধি বা শিল্পকর্মে মােটেই পিছিয়ে নেই। যে কোনাে ঝােপঝাড়ে যেখানে কিছু ফুলের গাছ আছে, সে আঙ্গিনাই হােক বা ছােটো খাটো পুষ্প কাননই তােক তিড়িং-বিড়িং করে নাচছে যে পাখিটি সে আর
কেউ নয় ছােট্ট পাখি টুনটুনি। Image result for টুনটুনি

আকার অনুপাতে এদের গলার জোর খুব। নিঃস্তব্দ দুপুরে এদেরই টুইট-টুইট ডাক পরিবেশের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে। মানুষের সান্নিধ্যেই এরা থাকতে পছন্দ করে, দূরে, নির্জন বনভূমি বা পথহীন প্রান্তর এরা খুব একটা পছন্দ করে না। এরা মানুষের খুব কাছে থাকলেও এদের অবয়বের ক্ষুদ্রতার জন্য প্রায় চোখেই পড়ে না। আর তাছাড়া ঘন ঝােপযুক্ত গাছেই এরা উড়ে-নেচে বেড়ায়। সেজন্য খুব কষ্ট স্বীকার করে দীর্ঘক্ষণ নজর না করলে টুনটুনির দেখা মেলে না। তবে টুনটুনির শিল্পকর্ম কিন্তু বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। অসাধারণ বাসা বানানাের সুক্ষ্ম কৌশলে পারদর্শী এই পাখি ইংরেজি ভাষায় টেলর বার্ড এবং বাংলায় দরজি পাখি নামে পরিচিত। কবি কিপলিং তাহার শিশু সাহিত্যে এই পাখিকে অমরত্ব দান করে গেছেন।
আমাদের বাড়ির দোতলার ঝুল বারান্দা থেকে মাত্র ৬-৭ ফুট দূরেই রয়েছে বেশ পত্রবহুল দুটি রঙ্গন গাছ। সেখানে প্রায় সারা বছর রঙি এই গাছটিতে বেশকিছু টুনটুনিকে দেখতে পাওয়া যায়। অত্যন্ত ব্যস্ত এই পাখি এ গাছে সে গাছে তিড়িং-বিড়িং করে নেচে চলেছে। তবে সকালের দিকেই এর উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।

Image result for টুনটুনি
বাসা বানানাের সুক্ষ্ম কৌশলে বাবুই পাখির পরেই এর স্থান। বড় পাতাতে ফুটো করে সেই ফুটোগুলােতে মাকড়সার রেশমের মতাে তন্তু দিয়ে সেলাই করে বেঁধে দেয় এবং পাতার মাঝে গােল বাটির মত বাসা বানিয়ে ফেলে। বাসাটির গােলাকৃতি দেওয়ালটি তৈরি করে সরু সরু নমনীয় কাঠির মতাে অংশ দিয়ে যেমন তালচোঁচ।এগুলি সরু হলেও মজবুত। বাসার ভেতরে নীচের দিকে বিছানাে থাকে শিমূল তুলাে,
পশু লােমের মতাে নরম কিছু উপাদান। বাসার উপরে পাতাগুলাে ছাতার মত এমনভাবে বিছানাে থাকে যাতে বৃষ্টির জল না ঢােকে।

Image result for টুনটুনি
বাসা বানানাের আগে বাসা প্রস্তুতের জন্য উপকরণ ও বাচ্চার খাবার সহজে কোথায় পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে বাসা বানানাের জন্য স্থান নির্বাচন করে। আকারে অবয়বে ছােট হলেও টুনটুনি বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পগুণে বেশ দক্ষ। অবশ্য বাসা নির্মাণে স্ত্রী-পাখির ভূমিকা লক্ষ্যণীয়।
জলপাই সবুজ রঙের এই ছােট্ট পাখিগুলাে সদাচঞ্চল। চালচলনে অত্যন্ত ক্ষিপ্র।অনবরত তার কাকলিতে বনভূমি মুখরিত হয়। ঝােপঝাড় থেকে পােকামাকড় তাদের ডিম ও লার্ভা খেয়ে আমাদের অনেক উপকার করে। টুনটুনির দেহে খুব বেশি জৌলুস লক্ষ্য করা যায় না। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫ ইঞ্চি মতাে হয় তবে তার মধ্যে প্রায় ৩ ইঞ্চি লেজ।লেজটি প্রায়ই খাড়া করে রাখে। মাথাটি মরিচা ধরা রঙের মততা, পিঠ হরিদ্রা ও ফিকে
সবুজ, নিম্ন দেহ ঘােলাটে সাদা। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির লেজটি আরও দুই ইঞ্চি দীর্ঘ হয়ে যায়। এই দীর্ঘ পুচ্ছের অবিরত নৃত্য ও কলকাকলির মধ্য দিয়ে এরা স্ত্রী পাখির মনােহরণ করে। শীতকালে আবার লেজটি ঝরে ছােট হয়ে যায়। এরা যখন গলা ফুলিয়ে ডাকে তখন ঘাড়ের পাশের কালাে পালকগুলি দেখা যায়। সু-উচ্চ ডাক আর কালাে পালকের বাহার দ্বারা স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করে।

Image result for tailor bird
এরা সাধারণত কীটভুক পাখি তবে ফুলে ফুলে বিচরণ করে বলে ফুলের মধুও পান করে বলে মনে হয়।
পরিবেশ দূষণ এবং নগরায়নের কারণে পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।গ্রামাঞ্চলেও কাক, চড়ুই, বাবুই-এর মত পাখি নিশ্চিহ্নের পথে। বাসা বানাবার স্থানের অভাবই এর মূল কারণ। পাখিরা চিরকাল আমাদের সঙ্গে প্রতিবেশীর মত থেকেছে অথচ আমরাই আজ পাখিদের জীবনকে বিপদগ্রস্ত করে তুলছি। আসুন আমরা সকলে মিলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী, পরিবেশ বান্ধব আমাদের ঘরের কাছের এই
ছােট্ট পাখিটিকে সংরক্ষণে ব্রতী হই। হয়তাে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের শিশুরা ছবিই দেখবে – এই পাখিটিকে দেখতে পাবে না।

– পথিক বসু

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

হালিসহরের পক্ষী জগৎ

0 (0) বড় সুরেলা কণ্ঠে ডেকে যাচ্ছিল দোয়েলটা। বস্তুতঃ ওর ডাকেই ঘুম ভাঙলাে।প্রতিদনের মত ঐ প্রেীঢ় আমগাছটির ছিন্ন শাখাটিতে কিংবা সামনের ইলেকট্রিক তারে বসে।এবার নিশ্চয়ই যেন কিছুটা কাছে এসে বসলাে মরা বেলগাছটায়, ঠিক জানালার কাছ ঘেঁসে । মেয়ে দোয়েলটিও কি ওখানেই আছে বসে?তার একটু ধূসর শরীরে লেগে আছে হেমন্তের হিম […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: