রােবােট সার্জেন ও রসায়নে নবেল প্রাইজ

@
5
(1)

১৯৫৯ সাল। ক্যালিফোর্নিয়া ইনষ্টিটিউট অফ টেকনােলজিতে অ্যামেরিকান ফিজিক্যাল সােসাইটির মিটিং-এ বক্তব্য রাখছেন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান। অসম্ভব মেধাবী এই বিজ্ঞানী তার স্বভাবসিদ্ধ
নাটকীয় উপস্থাপনায় Plenty of Room at the Bottom এই শিরােনামে যে বক্তব্য সেদিন তিনি রেখেছিলেন তাকে অনেকেই ন্যানােটেকনােলজির ধারণাগত ভিত্তি বলে মনে করেন।

Image result for রিচার্ড ফাইনম্যান
ন্যানাে-রােবােটিক সার্জারি ও লােকালাইজড ড্রাগ ডেলিভারির মত দুটি বিষয়ে তিনি আনবিক যন্ত্র বা মলিকিউলার মেশিনের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়ােগের কথা পূর্বানুমান করেছিলেন। দর্শকদের উদ্দেশ্যে ফাইনম্যান বলেন “যদিও এটা ভীষণ খ্যাপাটে ধারণা, তবে শল্যচিকিৎসায় এর ব্যবহার আকর্ষণীয় হতে পারে যদি আপনি শল্যচিকিৎসককেই গিলে খেয়ে নিতে পারেন। যন্ত্র-চিকিৎসককে আপনি আপনার রক্তনালীতে প্রবেশ করালেন। সেটি খুব সহজেই আপনার হৃদযন্ত্রে পৌঁছে যাবে আর চারদিকে তাকাবে। খুঁজে বের করবে হৃদযন্ত্রের ঠিক কোন ভাটিতে গন্ডগােল আছে। তারপর একটি ছােট্ট ছুরি বের করে সেই জায়গাটি মেরামত করে দেবে।” তার এই বক্তব্য থেকে হলিউডের সিনেমাওয়ালারা এক নতুন কল্পবিজ্ঞানের গল্পের রসদ খুঁজে পেয়েছিলেন।
যার চলচ্চিত্রায়ন আমরা দেখি Fantastic Voyage নামে ১৯৬৬ সালের এক সিনেমায়, যেখানে এক সাবমেরিন-নাবিকের ক্ষুদ্র সংস্করণ বিজ্ঞানীর দেহে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়, তাকে রক্ষা করার জন্য।।
জীবদেহের নানারকম জৈব প্রক্রিয়ায় আণবিক যন্ত্রের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। দেহকোষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রােটিন আণবিক যন্ত্রের মত আচরণ করে। পেশী সংকোচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মােটর-প্রােটিন মায়ােসিন এই রকমই একটি জটিল আণবিক যন্ত্র। তবে জীবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আণবিক যন্ত্র সম্ভবতঃ রাইবােজোম, যা প্রােটিন সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে বিজ্ঞানীরা বেশি আগ্রহী সংশ্লেষিত (Synthetic) আণবিক যন্ত্র নিয়ে, যা তাদের নির্দেশানুযায়ী কাজ করতে সক্ষম। কাজের প্রকারভেদ অনুযায়ী আণবিক সুইচ (Molecular switch), আণবিক চিমটা (Molecular tweezer), আণবিক শাটল (Molecular shuttle), আণবিক যুক্তি-দ্বার (Molecular logic gate) প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের আণবিক যন্ত্র হতে পারে।
প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে বিজ্ঞানী ফাইনম্যান যে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র যন্ত্রের কল্পনা করেছিলেন আধুনিক রসায়নবিদগণ ইতিমধ্যেই তার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপনে সফল হয়েছেন। এই সাফল্যকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন
নােবেল পুরস্কার কমিটি। ফ্রেজার স্টোডার্ট-এর সাথে ২০১৬ সালে রসায়নে নােবেল পুরস্কারে সম্মানিত হলেন জা-পিয়ের স্যুভেজ এবং বেন ফেরিঙ্গা।
চেষ্টা চলছিল কিন্তু সেই ষাটের দশক থেকেই। বলয়াকার (ring shaped) বিভিন্ন অণুকে পর পর জুড়ে শৃঙ্খলাকার অণু তৈরি করলেও আণবিক যন্ত্রের জটিল কার্যকলাপ পরীক্ষা করতে সেগুলাে সমর্থ ছিল। অবশেষে ১৯৮৩-তে জা-পিয়ের স্যুভেজের নেতৃত্বে একদল ফরাসী গবেষক কিছুটা সাফল্য পেলেন। একটি কেন্দ্রীয় কপার আয়নকে ঘিরে দুটি অণু এমনভাবে তারা জুড়ে দিলেন যাতে করে শৃঙ্খলের প্রথম অংশ তৈরি হল। স্যুভেজের এই পদ্ধতিকেই আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন ফ্রেজার স্টোডার্ট। তিনি এক ন্যানাে-স্কেল রড বানালেন ও তাতে একটি বলয়াকার অণু গলিয়ে দিলেন।Image result for nanoscale rod by fraser stoddart

ইলেকট্রন আদান-প্রদানের মাধ্যমে এই বলয়াকার অণুটি ন্যানাে-স্কেল রডের দুই প্রান্তের মাঝে সামনে-পেছনে চলাচল করতে পারে। তার সহকারীদের বানানাে এই ধরনের অণুকে “রােটাক্সেন” নামে ডাকা হয় যা আণবিক যন্ত্র তৈরির প্রথম পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। এভাবে বানানাে রােটাক্সেন যেন একটি ক্ষুদ্র কৃত্রিম পেশী যা পাতলা সােনার তৈরি স্তরকে ভূমি থেকে ০.৭ ন্যানােমিটার উপরে তুলতে সক্ষম। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জিম হিথ-এর সঙ্গে যৌথ গবেষণায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফ্রেজার এমন একটি কম্পিউটার চিপস বানিয়েছেন যাতে মলিকিউলার সার্কিট ব্যবহার করা হয়েছে।স্টোর্টের দলের তৈরি তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণযােগ্য রােটাজেনের চলন

rotoscan
তবে নােবেলজয়ী তৃতীয় ব্যক্তি বেন ফেরিঙ্গার সাফল্য বিজ্ঞানের এই শাখায় যুগান্তকারী হিসাবে গণ্য হতে পারে। সাধারণভাবে যেকোনাে অণুর গতি অনেকগুলি সম্ভাবনার ফল হিসাবে পরিলক্ষিত হয়। ধরা যাক ঘূর্ণন গতির কথা। কোনাে অণুর ক্ষেত্রে ঘড়ির কাটার দিকে এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে এই দুই প্রকার গতির সম্ভাবনাই উল্লেখযােগ্য। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ফেরিঙ্গা ও তার সহকারীরা কতগুলি বুদ্ধিদীপ্ত আণবিক কৌশল ব্যবহার করে এমন একটি অণু ডিজাইন করলেন যার ঘূর্ণন হবে কেবল একটি নির্দিষ্ট দিকেই। আর ২০১১-তে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওরা বানিয়ে ফেললেন চার চাকার এক ন্যানােগাড়ি, যেখানে একটি আণবিক কাঠামাের সাথে চারটি আণবিক মােটর যুক্ত। এই আণবিক মােটরগুলােই গাড়ির চাকা হিসাবে কাজ করে।
Image result for nano car
গত কয়েক দশক ধরে বেশ কয়েকজন মেধাবী গবেষকের হাত ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তের গবেষণাগারে বিজ্ঞানের এই শাখা প্রভূত সাফল্যের সাক্ষর রেখেছে। ২০১৩ সালে ডেভিড লেই-এর নেতৃত্বে ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন এক ন্যানাে-রােবােট বানাতে সক্ষম হয়েছেন যা অ্যামিনাে অ্যাসিডকে আঁকড়ে ধরতে পারে।আর এই অ্যাসিডই তাে প্রােটিনের গঠন একক। প্রােটিন সংশ্লেষণের
সময় নির্দিষ্ট অ্যামিনাে অ্যাসিডকে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় যুক্ত করে। এই ন্যানাে-রােবােট ঠিক সেই কাজটিই করে যা রাইবােজোম বিভিন্ন কোষে করে থাকে। আধুনিক গবেষকদের গবেষণাগার-ঋদ্ধ এইসব প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়ােগ হয়তাে বাস্তব পৃথিবীতে একদিন যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

ডঃ অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

এক অদৃশ্য আলোক

5 (1) ১৮৯৫ সালের ৮ই নভেম্বর। অস্তগামী সূর্যের আলােয় লালাভ পশ্চিম দিগন্ত। হিমেল বাতাস চারদিকে। অন্ধকার গবেষণাগারে গবেষণায় মগ্ন রনটজেন। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেম কনরাড রনটজেন। তিনি ব্যস্ত ছিলেন একটি হিট্টোফ টিউব চালানাের কাজে। টিউবটির পুরােটাই ছিল কালাে কার্ডবাের্ড দিয়ে ঢাকা। টিউবটির কাছে টাঙানাে ছিল একটি পর্দা। পর্দাটি বেরিয়াম প্লাটিনােসায়ানাইড মাখানাে। […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: