ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়

5
(1)

১৬৩৩ সাল। দেশ ইটালি, স্থান বিচার কম। বিচার চলছে সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর। অপরাধ বাইবেলে বর্ণিত ধারণার বিপরীতে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছেন যে পৃথিবীকে ঘিরে গ্রহ, নক্ষত্র,
সূর্য সহ তাবৎ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের আবর্তন করে চলার প্রচলিত গল্প সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কল্পনা প্রসূত। পৃথিবী হল সৌরজগতে সূর্যকে ঘিরে প্রদক্ষিণরত একটি গ্রহ মাত্র। এভাবে বাইবেলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার দায়ে আজ বৃদ্ধের হাতে শৃঙ্খলি। চরম অত্যাচার-বঞ্চনার মুখে দাড়িয়েও আর মাথা নত করেননি তিনি। গৃহবন্দি হয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের শেষের সেই দিনগুলি, যতদিন তার দুর্বল চোখে আলাে আর অন্ধকারের ফারাকটুকু ধরা পড়ত।
সত্যকে প্রতিষ্ঠার তাগিদে গ্যালিলিও গ্যালিলি’র মত এই মরজীবনকে ফুৎকারে অস্বীকার করেছেন এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে কম নয়।এমনকি আমাদের কলকাতা শহরও সাক্ষী আছে এমনই একটিঘটনার।
১৯৩১ সালের ১৬ই জানুয়ারি হাজারীবাগে জন্ম হয় সুভাষ মুখােপাধ্যায়ের। পরবর্তী সময়ে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে পড়াশুনা সমাপ্ত করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ছাত্ররূপে যােগ দেন তিনি। ১৯৫৫
সালে গায়নােকোলজি বিভাগে প্রথম হয়ে হেমাঙ্গিনী স্কলারশিপ নিয়ে পাস করেন এম.বি.বি.এস.। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজ শুরু হয় অধ্যাপক সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। রিপ্রােডাকটিভ ফিজিওলজি বিষয়ে পি.এইচ.ডি.’র কাজ শেষ হয় ১৯৫৮ সালে।Image result for dr subhas mukhopadhyay"
১৯৬০ সালে ডঃ সুভাষ মুখােপাধ্যায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় নমিতা দেবীর সাথে। ইতিমধ্যে এন্ডােক্রিন ফিজিওলজি বিষয়ে পড়াশুনাের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন ইংলন্ডে। সেখানে Clinical Endocrinology Research Institute থেকে অধ্যাপক জন এ. লােরেনের সাথে হরমােন সংক্রান্ত তার গবেষণা ১৯৬৭ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে পি.এইচ.ডি. সম্মান এনে দেয়।
ইঁদুর প্রতি মনুষ্যেতর প্রাণীর উপর হরমােনের প্রভাব সংক্রান্ত তার এই হাতে কলমে গবেষণা ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তাকে আরো  তীক্ষ্ণ ও উপযুক্ত করে তােলে। এডিনবরার Royal Infirmary-তেও তিনি এসময়ে কাজ করেছিলেন।
দেশে ফিরে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে শিক্ষক রূপে যোগ দেন সুভাষ মুখােপাধ্যায়। hcg বা হিউম্যান কোরিওনিক গােনাডােট্রপিন হরমােন-এর উৎস, কার্যকারিতা, প্রভার
প্রভৃতি বিষয়ে চলতে থাকে গবেষণার কাজ। hcg এর উৎস সম্পর্কে নতুন দিকদর্শন করেন সুভাষবাবু। নারীদের ক্ষেত্রে প্রজননগত সমস্যায় টেস্টোস্টেরন হরমােনের প্রয়ােগ বিষয়ে গবেষণা তার মৌলিক
প্রমাণ করে। ১৯৭৭ সালে প্যারিস শহরে আয়ােজিত International Conference of Physiological Sciences-এ সুভাষ মুখােপাধ্যায় নারীদের প্রজননগত সমস্যার ক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও অস্থিরতার গুরুত্ব
বিষয়ে নিজের অমূল্য মতামত রাখেন। তখনকার দিনে এইরূপ ধারণা অনেকটাই অজানা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে প্রমাণিত।
১৯৭৮ সালের ৩রা অক্টোবর মাসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন ক্রায়ােবায়ােলজিস্ট ডঃ সুনীত মুখােপাধ্যায় এবং গায়নােকোলজিস্ট ডঃ সরােজ কান্তি ভট্টাচার্যের সহযােগিতায় ডাঃ সুভাষ মুখােপাধ্যায় কলকাতায় এশিয়ার প্রথম টেস্ট টিউব বেবি ‘দুর্গা’র জন্মের কথা ঘােষণা করেন।

Image result for dr subhas mukhopadhyay and namita mukhopadhyay" মাত্র ৬৭ দিন পূর্বে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম টেস্ট টিউব বেবি লুইস জয় ব্রাউস-এর জন্মকথা ঘােষিত হয়েছে ইংলন্ডে। সেই গৌরব লাভ করেছে R. G. Edwards এবং Patric Steptoe। এমত সময়ে এশিয়া তথা ভারতবর্ষের প্রথম টেস্ট টিউব বেবির জন্মকথা ঘােষণা করলেন ডঃ সুভাষ মুখােপাধ্যায়। বিস্ময়ে হতবাক হল বাংলা তথা ভারতবর্ষের চিকিৎসক সমাজ। সময়ের চেয়ে বহুদূর পথ এগিয়ে থাকা এই আবিষ্কারের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন জাগল অনেকের মনে। এই নব্য চিকিৎসক-গবেষকের এহেন কীর্তিফলক স্থাপনের কথা মেনে নিতে
গিয়ে কোথাও কোথাও পুঞ্জিভূত হল পেশাগত ঈর্ষা ও অসূয়া।

রাজদীপ ভট্টাচার্য

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

পৃথিবীর দ্বিতীয় নলজাত (Test tube baby) শিশুর আবিষ্কারক ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়

5 (1) ল্যাবরেটরি গল্পে আমরা দেখতে পাই রেবতীকে, তার পিসিমার কথায় বারবার বিজ্ঞানচর্চা থেকে পিছু হটতে। আর্যভট্ট, বরাহমিহির, চরক, সুশ্রুতের দেশ ভারতবর্ষে এ ভারি আশ্চর্যের বিষয়! এক ডাক্তার কি মত, এই হিন্দি চলচ্চিত্রটি ডঃ সুভাষ মুখার্জির জীবনের ঘটনার উপর নির্মিত । সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে জানতে গেলে সবার আগে জানতে হবে, আই.ভি.এফ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: