পৃথিবীর দ্বিতীয় নলজাত (Test tube baby) শিশুর আবিষ্কারক ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়

ল্যাবরেটরি গল্পে আমরা দেখতে পাই রেবতীকে, তার পিসিমার কথায় বারবার বিজ্ঞানচর্চা থেকে পিছু হটতে। আর্যভট্ট, বরাহমিহির, চরক, সুশ্রুতের দেশ ভারতবর্ষে এ ভারি আশ্চর্যের বিষয়!

এক ডাক্তার কি মত, এই হিন্দি চলচ্চিত্রটি ডঃ সুভাষ মুখার্জির জীবনের ঘটনার উপর নির্মিত । সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে জানতে গেলে সবার আগে জানতে হবে, আই.ভি.এফ বা ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন-এর কথা এবং এমব্রায়ো ট্রান্সফার।

আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে আমাদের কলকাতা শহরেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন সুভাষবাবু, আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের এক উপায় ।

১৯৭৮ সালের ২৫ শে জুলাই পৃথিবীর প্রথম নলজাত শিশুর জন্ম হয় ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে, নবজাতকের নাম ছিল মেরি লুইস ব্রাউন। প্রথম টেস্টটিউব বেবির জন্মদাতা হলেন রবার্ট অ্যাডওয়ার্ড এবং প্যাট্রিক স্ট্রেপটো, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনন্য নজির সৃষ্টি করার জন্য এনারা 2010 সালে নোবেল পুরস্কার পান।

Image result for first test tube baby"

অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্প্রতি একটি মন্তব্য করেছেন যে, ভারতবর্ষে থাকলে তিনি নোবেল পেতেন না তার প্রধান কারণ হল আমাদের দেশের সিস্টেম। সুভাষ বাবুর ক্ষেত্রে সেই ঘটনাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, তদানীন্তন বহু বিখ্যাত চিকিৎসক এবং তৎকালীন রাজ্য সরকার সুভাষবাবুকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পর্যন্ত দেননি ।

পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবি জন্মের ৬৭ দিন পর, জন্ম হয় ভারতবর্ষের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় নলজাত শিশু দুর্গা বা কানুপ্রিয়া আগারওয়াল। এই গবেষণার প্রধান ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। যার পরিণাম ও পরিণতি ছিল ভয়ঙ্কর।Image result for first test tube baby in india"

 

ভারতবর্ষের প্রথম নবজাতক শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও, অভূতপূর্ব কাজ করেন সুভাষবাবু। তার সহকর্মীদের কথায় তিনি সময়ের থেকে অন্তত 25 বছরে এগিয়ে ছিলেন, আজকের বর্তমান যুগে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন-এর ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করা হয় তিনি সেইগুলোই ওই সময় তার সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই সাধারণ কিছু যন্ত্রের মাধ্যমে করে ফেলেন ।

মূলত যে সমস্ত দম্পতির ক্ষেত্রে সন্তান ধারণের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর দেহের বাইরে অর্থাৎ পেট্রিডিস-এ কৃত্রিম কর্ষণ মাধ্যমের মধ্যে নিষেক ঘটানো হয় এবং উৎপন্ন ভ্রুণটিকে হিমায়িত করে তার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হলে তারপর মাতৃগর্ভে এমব্রায়ো ট্রান্সফার করা হয়।

পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য ল্যাপরোস্কপি প্রয়োজন হয় কিন্তু সুভাষ বাবু কোনরকম ল্যাপরোস্কপির সাহায্য না নিয়েই এই কাজটি করে ফেলেন, তিনি প্রথম গোনাডোট্রপিন নামে একটি ওষুধ ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে ডিম্বাণু উৎপাদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেন এবং শরীরের বাইরে তা এনে, শুক্রাণুর সাথে নিশ্চয়ই ঘটিয়ে জরায়ুতে ভ্রূণ প্রতিস্থাপন এর ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটি গোটা বিশ্ব অনুসরণ করে চলেছে নবজাতক শিশুর উৎপাদনের ক্ষেত্রে।

সুভাষবাবুর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল ভ্রূণ সংরক্ষণ, অর্থাৎ ফ্রজেন এমব্রায়ো। কত বছর আগে তিনি এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তরল নাইট্রোজেনে হিমায়িত করে। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা এই কৃতি চিকিৎসাবিজ্ঞানীর জোটেনি কোনো সম্মান কোনো স্বীকৃতি!

বর্তমান সময়ে অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী দাবি করেন 2010 সালে তিনিও নোবেল পেতে পারতেন, কিন্তু ততদিনে ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় দিকশূন্যপুরের বাসিন্দা।

স্বীকৃতি তো দূরের কথা তার বদলে সুভাষ বাবুর জুটেছিল ব্যঙ্গ আর বিদ্রুপ সাথে লাঞ্ছনা-গঞ্জনাতেও ভাটা পড়েনি। তদানীন্তন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণাটির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি কমিটি গঠন করেন ।

জীববিদ্যার গবেষণার সত্যতা অনুসন্ধান করতে আসা এই কমিটির ওদের মধ্যে অনেকেই জীববিদ্যা বিন্দুবিসর্গ জানতেন না, পদার্থবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি ক্ষেত্রের মানুষদের এই কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের কথা অনুযায়ী সুভাষ বাবুর এই গবেষণা ছিল অসত্য অর্থাৎ তিনি ভ্রান্ত দাবি করছেন।

সুপার সুভাষ গবেষণার গ্র্যান্ট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাকে গ্রামীণ হাসপাতালে বদলি করে দেওয়ার চক্রান্ত চলতে থাকে। এরকম সময় তিনি বারবার বিদেশে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করতে থাকেন, প্রতিবারই কোন অজ্ঞাত কারণে তার ভিসা বাতিল হয়ে থাকে । অপমান এবং হতাশায় 1981 সালে তেসরা অক্টোবর আত্মহত্যা করেন ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শেষ হয়ে যায় এক বিজ্ঞান সাধকের জীবন । তাই প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তেসরা অক্টোবর দিনটিকে সুভাষ বাবুর অনুগামী চিকিৎসকেরা ন্যাশনাল ফার্টিলিটি ডে হিসেবে পালন করতে চান ।Image result for subhash mukhopadhyay"

জন্মদাতার কথা তো এতক্ষণ হল, এবার আসি সেই নলজাত শিশুর কথায় কানুপ্রিয়া আগরওয়াল এখন কানুপ্রিয়া জয়সওয়াল। পুণে নিবাসী কানুপ্রিয়া বর্তমানে একটি বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত এবং কন্যা সন্তানের মা। বন্ধুত্ব বিশেষজ্ঞদের জাতীয় সংগঠন ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন যা সংক্ষেপে ইর্সার নামে পরিচিত, তাঁরা সুভাষবাবুর মরণোত্তর ভারতরত্ন প্রাপ্তির দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বর্তমান রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তারা জানিয়েছেন এ বিষয়ে তাঁরাও সহমত।

২০০২ সালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ সুভাষবাবুর কাজকে স্বীকৃতি দেয়।

২০১০ সালে ইংল্যন্ডের রয়েল সোসাইটি অফ মেডিসিন তাদের ডিকশনারি অফ মেডিকেল বায়োগ্রাফি বিশ্বের সেরা ১০০০ গবেষক এর মধ্যে ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে স্থান দিয়েছেন ।

সম্প্রতি সঞ্জয়লীলা বানসালি ডঃ সুভাষ মুখার্জির জীবন এবং তার গবেষণা নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা প্রতিটি ভারতবাসীর কাছে এই কৃতি বিজ্ঞানীর গবেষণা এবং তার জীবন ও জীবনের ভয়ঙ্কর পরিণতিকে পৌঁছে দেবে ।

Image result for kanupriya agarwal"

লেখকঃ সৌভিক রায়

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: