মাঠের সারপ্রাইজ, গোপন উপহার

@
4.2
(11)

“নার্স কে পছন্দ হলে অর্ধেক অসুখ সেরে যায়
শূন্যতা, ডেটলগন্ধ, ভাতে মাছি – সব ভালো লাগে

পুরোপুরি সেরে উঠলে ডিসচার্জড –
সেই ভয়ে ভয়ে

বাকিটা জীবন তাই
অর্ধেক অসুখ নিয়ে হাসপাতালে থেকে যেতে হয়”
– ( কবি রণজিৎ দাশ, কাব্যগ্রন্থ ‘জিপসীদের তাঁবু’) তাই আমরা থেকে যাই অনন্ত হাসপাতালে। বড় জোর এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর ঘটে। রোগ যখন স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, কারো তোয়াক্কা করে না, নিজেই যাতায়াত করে শিরায় ধমনিতে, তখন উন্নততর এবং গভীর হাসপাতালে যাই। পৃথিবীর কোনো হাসপাতাল নার্স বর্জিত নয়। তা সাময়িক ডাক্তারশূন্য হতে পারে, নার্সশূন্য নয়। গভীরতর হাসপাতালেও ডেটলগন্ধ থাকে আর থাকে বিষন্ন করিডোর। উৎকণ্ঠায় নীল। এই বুঝি রক্ত-গজ-আর্তনাদমাখা মৃত্যু উঠে এলো সিঁড়ি বেয়ে। মৃত্যু করিডোর দিয়ে আমাদের চৌকাঠে আসে। অবশ্য সব সময় মৃত্যু নয় নতুন প্রাণও আসে। তারা আসে সেই সব নার্সদের হাসিমুখের রেশ ধরে, তাদের ছুটি হওয়ার একটু আগে। নার্স তো হাসপাতালে থাকেই, তবে অনন্তকাল থাকে না। নিরবিচ্ছিন্ন যত্ন অনেক সময় কাতর করে ফেলে। তাই নার্স বাড়ি যান। বাড়ি ফিরবার আগে বিরক্ত সন্তানদের রেখে যান ক্লান্ত মায়েদের পাশে – ঠান্ডা সবুজ ট্রে-র ওপর। সাময়িক বিরক্তি ও ক্রোধের আবসান হলে সন্তান শুয়ে থাকে – পার্সেল বক্সে যেমন শুয়ে থাকে সারপ্রাইজ, গোপন উপহার।
যে উপহার শুয়ে আছে পার্সেল বক্সে – সে উপহার শুয়ে আছে মাঠে প্রান্তরে। আমাদের বন-জঙ্গলের প্রতিটি ডালপালার মধ্যবর্তী শূন্যে যাই থাক, আদতে আকাশ রয়েছে। সেই আকাশ বৃদ্ধ, পুরনো। তাই ধোঁয়ার কালিমা লেগে থাকে মুখে। তা সে যতই কালিমালিপ্ত হোক, সে বৃদ্ধ। এই আসীম সৌরমন্ডলের প্রপিতামহ,অভিভাবক। নীচে যে পৃথিবী রাখা আছে সে তো হাসপাতালের মতই। একেবারে না ডিসচার্জড হয়ে যেতে হয় সেই ভয়ে বেঁচে আছি। ‘অর্ধেক অসুখ নিয়ে’। কিন্তু হাসপাতালের প্রতিটি গাঁথুনির বিশদে রক্ত-কফ ঝেড়ে – বেধড়ক হ্যামারে চূর্ণ ক’রে তার জীর্ণ হাল করে ছেড়েছি। তবু আমাদের পৃথিবী। আর সে যদি হাসপাতাল হয় তার ওপর নেমে আসা ছ’টি ঋতুর নার্স না হয়ে উপায় থাকে না।
এসব প্রিয় কবির কবিতা পড়ে অলস ভাবনা অথবা পৃথিবীতে থেকে যাওয়ার যুক্তির চালাকি। কবিতা কত ভাবে না আমাদের ভাবায়। তবে এই কল্পনার নির্মানে পাখি কোথায়? আমি বলি পাখি সেই গোপন উপহার। প্রাথমিকে বা ভূমিকায় কিছু বিরক্তি ও ক্রোধ আর শীতলতা থাকলেও পাতার চাদর সরিয়ে তাদের দেখি। কবি সুবীর সরকার লিখেছেন “অপরিচয় সরিয়ে তুমি রোজকার/ পাখি”।
প্রাশ্চাত্যের কবি ম্যাথু আর্নল্ড লিখেছেন –
“Birds, companions more unknown
Live beside us, but alone;
Finding not, do all they can,
Passage from their souls to man.
Kindness we bestow, and praise,
Laud their plumage, greet their lays;
Still, beneath the feather’d breast,
Stirs a history unexpress’d.”
“আমাদের সঙ্গ-সখ্যতা অপেক্ষা খানিক দুরাবস্থান, পাখিদের…
অথচ সহযাপন, সহাবস্থান! তবু ওরা নির্বান্ধব!!!
শুধু একটি পথেরই নির্নিমেষ অন্বেষণ, ওদের;
যে পথের অন্ত্যমিলে ওদের আত্মা মানবচেতনায় মিশতে চায়।
আর মানুষের প্রশান্তিরা, সম্ভাষণেরা নবজন্ম পায়।
ওদের পালকে এই যে রঙের সমারোহ। সে অনুভবেরই তো বন্দনা! জয়গান!!
তবু ওই রঙিন পালকেরই নিচে কোনো হৃদয়-গহ্বরে,
অগোচরে ডানা ঝপটায় এক অনুভূতিহীনতার ইতিহাস।“ (অনুবাদ- সব্যসাচী ব্যানার্জী)
এ তো অনুভূতিমালা। জাগতিক ইতিহাস বলে এই বাংলার জলাভূমি তাদেরই ছিল। হাজার হাজার বছর আগে। যখন মানুষ বসত গ’ড়ে তোলেনি। উচ্চকোটি হাভাতে পেট ঠেসেঠুসে ভরিয়ে, উপচানো ধান নিয়ে ব্যবসা করে, চাষের নিবিড়ে উচ্চফলনশীলতার সন্ত্রাস আমদানি হয়নি যখন – তখন পাখিদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র ছিল নিম্ন-গাঙ্গেয় সমভূমির ওয়েটল্যান্ড। অনেকে বলেন বড্ড বেশি ইতিহাস চেতনা জাগতিক পরিবর্তনকে মেনে নেওয়ায়, তাকে বিশ্লেষনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। শোধ, প্রতিশোধ শেষ হয় না। এই যুদ্ধ মন চায়না। একদিন ভোরবেলা দেখি প্রধানত জলাভূমির এক পাখি ধানমাঠে এসেছে ধান চুরি করে খেতে। পাখিটার বাংলা নাম ‘ডাহুক’। ইংরেজিতে White-breasted Waterhen।

Image 1

আমাদের গ্রামের চাষের মাঠগুলোতে অনেক দেখি। গ্রামে বহু বছর আগে যমুনা নামে এক নদী ছিল। কালের নিয়মে তা খালে রুপান্তরিত হয়েছে। তারপর বাঁধালের খপ্পরে পড়ে ক্রমে নয়ানজুলি ও ছোটো পুকুরে খন্ডিত। এককালের পাশের জলা জায়গাগুলোর মৃত্তিকাস্ফীতি ঘটিয়ে প্রবল চাষ হচ্ছিল। আজকাল সীমাহীন লোভ-হিংসা ছাড়া মানুষের সব কিছুতে মন্দা। সাধের চাষেও মন্দা। তাই বিকল্প হিসেবে কারখানা-বাড়িশিল্পের বুদ্ধি এসেছে গুরুদেবদের মাথায়। চাষ উঠিয়ে ঘুনপোকার মত বিকল্প এগোচ্ছে। বিকল্প কায়েম হচ্ছে। মধ্যিখানে জল কমে – জলের খাবার কমে ডাহুক ধানক্ষেতে।

তার আসা আমি রোজ দেখতাম। সময় ধরা বাঁধা। তাই একটু চেষ্টা করতেই পরিচিত হয়ে গেলাম। এসে ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখে আমি প্রতিদিনের অবস্থান থেকে একচুলও নড়েছি কিনা। অপরিচয়ের আড়াল সরে।

Image 2

নিশ্চিত হয়ে ধানের ঝুলে পড়া শিষের দিকে তার নজর যায়।

Image 3

গ’লাটা প্রাণপনে উঁচু করে মরিয়া ঠোঁট ধরতে চায় ধানের শিষ।

Image 4

তারপর অনেক আয়াসে একটি কি দু’টি ধান ঠোঁটের আয়ত্তে আসে।

Image 5

সেটুকুই তার জীবন বাজি রাখার প্রাপ্য মূল্য।

Image 6

বহুকাল আগে সম্ভবত গমচাষ নিয়ে একটা প্রবচন ছিল। “One for the rook and one for the crow, one to rot and one to grow”। চারভাগের তিনভাগ ফেলে একভাগ ঘরে উঠতো। এখন আর সে আয়েশ নেই, সহিষ্ণুতা নেই। পাখি যে চাষের ক্ষতি করে তা প্রতিষ্ঠা করা গেছে। ‘পেস্ট বার্ড’-এর কলঙ্ক মাথায় নিয়ে চড়ুই, বাবুই, মুনিয়ারা ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা অনেক কাজ করেছেন পাখিরা ফসলের কতখানি শত্রু তা নিয়ে। সে সমস্ত কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে হাতে এলো সত্তরের দশকের একটা পেপার। ‘The Common Baya: A problem bird of cultivatorin in West Bengal. By A. K. Mukherjee and B. C. Saha। ‘কমন বায়া’ মানে আমাদের বাবুই। চার বছর ধরে (১৯৭২ থেকে ১৯৭৬) সার্ভে করা হয়েছিলো নদীয়া, ২৪-পরগনা, বাঁকুড়া ইত্যাদি জেলায়। ফলাফল? বাবুই-এর দল দিনে গড়ে পনেরো থেকে কুড়িবার ধানক্ষেতে আসে। প্রতিটি পাখি দিনে গড়ে ৭.৫গ্রাম ধান খায়। একটা বাবুই-এর দলে যদি দু’শো পাখি থাকে আর তারা যদি এক বর্গকিলোমিটার এলাকা ঘুরে বেড়ায় তবে একদিনে ধানের ক্ষতির পরিমাণ পনেরো কেজি। এই হিসাবে সেই ক্ষতি যথেষ্ঠ চিন্তার। এবার এই হিসেবে আজকের দিনে যদি দেখি তাহলে বলবো ধানের উৎপাদন সত্তরের দশকের তুলনায় কমপক্ষে চল্লিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি বাবুই আমাদের নদীয়া, ২৪-পরগনাতে প্রচুর পরিমানে হ্রাস পেয়েছে গত পঞ্চাশ বছরে। আজকের নবীন প্রজন্মের অনেকে বাবুই-এর বিখ্যাত বাসা বা নিতান্ত পাখিটাকে চোখেই দেখেনি। তাহলে কি বাংলার চাষিরা বন্দুক দিয়ে, জাল দিয়ে শয়ে শয়ে বাবুই নিধন করেছে গত পঞ্চাশ বছর? যেহেতু তারা ধানের শত্রু? আমার উত্তর, না। ইতিহাস চেতনা বলবে বাবুই এত ধান ধংস করেও সার্ভাইভ করতে পারছে না, পারবে না। তাহলে বাবুইপাখিকে ‘প্রবলেম বার্ড’ বলা হবে কেন! তার নষ্ট করা ধানের হিসেব ধ’রে নিয়েই উৎপাদন বাড়ানোর নকশা তৈরি করুক না আজকের গুরুদেবরা!
অবশ্য ‘ডাহুক’-এর কপালে ‘পেস্ট’ তকমা এখনো জোটেনি। আমার অবাক লাগে এটা দেখে যে,আমাদের চেতনার অগোচরে একটা জলাভূমির পাখি তার খাদ্যাভ্যাস পাল্টে ফেলছে চাষের ওপর ভিত্তি করে। পাখি ভীষন স্মার্ট। তাহলে আমি যে লিখেছি একটু আগেই – পাখি ক্লান্ত মাঠের পাশে শুয়ে থাকা সারপ্রাইজ, গোপন উপহার? মায়ের পাশে শুয়ে থাকা নম্র শিশুসন্তান? শিশুরা কি আমাদের উচ্চতার তুলনায় অনেক স্মার্ট? পাখি আর শিশুরা কি সব ভুলে যায়? তাদের ইতিহাস চেতনা কি খুব কম? তাই তারা বিশ্বাস করে? জাগতিক পরিবর্তন মেনে নেয়? নির্লিপ্ত ভেসে যেতে থাকে এক সুর্যোদয় থেকে এক সুর্যাস্তের দিকে? প্রিয় কবি রণজিৎ দাশ লিখছেন –
“শিশুরা বিশ্বাস করে সবকিছু, এমনকি পক্ষীরাজ ঘোড়া,
তাদেরকে যদি বলি –
‘তোমারা কি পাখি চেনো? আমিও চিনি না
শুনেছি মনুষ্যকুলে কিছু ছদ্মবেশী পাখি আজও টিঁকে আছে,
তাদের সন্ধান করি, চলো’
হৈ হৈ করে তারা আমার দুহাত ধরে
পাখি খুঁজতে ছুটে যাবে অফিসে, বাজারে
খুঁজে তো পাবো না কিছু, দুঃখ নেই, ফিরতি পথে
নিঃশব্দে সবাই মিলে ছোলাভাজা খাবো,
তখনই সন্দেহ হবে, সুর্যাস্তের পথে যারা ছোলাভাজা খায়, তবে তারাই কি পাখি?
নির্বাক পাথরে বসে সমস্বরে হেসে উঠবো –
আবার বিশ্বাসকাকু, আবার চালাকি!”

লেখকঃ-  সম্রাট সরকার

 

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.2 / 5. Vote count: 11

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিন্দু থেকে সিন্ধু!

4.2 (11) কথায় বলে বিন্দু বিন্দু মিলে তৈরি হয় সিন্ধু! দূষকের ক্ষেত্রেও অনেকটা অনুরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।যে সকল পদার্থ দূষণ ঘটায় সামগ্রিকভাবে তাদেরকেই দুষক বলে । যার মধ্যে অন্যতম হল ভারী ধাতু। ভারীধাতু বলতে সামগ্রিকভাবে বলা যেতে পারে, যে কোনো ধাতব রাসায়নিক পদার্থ যাদের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি, কিন্তু কম ঘনত্বে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: