বিন্দু থেকে সিন্ধু!

@
5
(2)

কথায় বলে বিন্দু বিন্দু মিলে তৈরি হয় সিন্ধু! দূষকের ক্ষেত্রেও অনেকটা অনুরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।যে সকল পদার্থ দূষণ ঘটায় সামগ্রিকভাবে তাদেরকেই দুষক বলে । যার মধ্যে অন্যতম হল ভারী ধাতু। ভারীধাতু বলতে সামগ্রিকভাবে বলা যেতে পারে, যে কোনো ধাতব রাসায়নিক পদার্থ যাদের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি, কিন্তু কম ঘনত্বে উপস্থিত থেকে যারা বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। উদাহরণ : পারদ, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড, ক্রোমিয়াম, নিকেল, সেলেনিয়াম ইত্যাদি। মাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া, মাছের লার্ভার বৃদ্ধির হ্রাস পাওয়া ভারী ধাতুর বিষক্রিয়ার অন্যতম প্রধাণ কারন হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

গবেষণার ফলে জানা গেছে, মাছের বৃক্ক ও যকৃতে ভারি ধাতুর সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব দেখা যায়। জলজ পরিবেশের তলদেশে থাকা এর ভিতর বেশ কিছু ক্ষতিকর ধাতব একটি বিশেষ পদ্ধতির দ্বারা বেনথিক প্রাণীদের দ্বারা গৃহীত হয়, যেটি জৈব-সঞ্চয় নামে পরিচিত। আবার যখন জলে বসবাসকারী বৃহৎ মাছগুলি এই ক্ষুদ্রাকার মাছগুলিকে খেয়ে নেয়, তখন এই ছোট প্রাণীদের দেহে জমা বিষাক্ত ধাতুগুলি খাদ্য-জালের পরবর্তী ধাপে প্রবাহিত হয় এবং আরও বেশি ঘনত্ব নিয়ে তাদের দেহে জমতে থাকে। এই ঘটনাটি জৈব-বিবর্ধন নামে পরিচিত। তাই বলা যেতে পারে যে, এই ভারি ধাতুগুলি জৈব-সঞ্চয় ও জৈব-বিবর্ধন এর জন্য অতিসক্রিয় ও উপযুক্ত। জলের উপরিভাগে থাকা কিছু উপাদান (কার্বোনেট, সালফেট, জৈব পদার্থ সমুহ –হিউমিক, ফুল্ভিক অ্যাসিড) ভারি ধাতুগুলিকে খুব প্রভাবিত করে ও লঘুতাপ্রাপ্ত করে। এর ফলে কিছু অদ্রাব্য লবণ তৈরি হয়। এই লবণ ও জটিল পদার্থগুলিকে জলজ প্রাণীদের জন্য কম ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। এদের ভিতর বেশ কিছু অংশ জলে ডুবে গিয়ে নিম্নতলে অবক্ষেপণ তৈরি করে। কিন্তু যখন অম্লবৃষ্টি বা অন্য কোন কারণের জন্য জলের পি এইচ হ্রাস পায়, তখন এই ধাতুগুলি আবার গতিশীল হয়ে ওঠে এবং জলের স্তম্ভের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে এবং জলজ পরিবেশে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।

Image result for acid rain effects on fish"

এছাড়াও এই ধাতুগুলি যখন খুব অল্প ঘনত্বে উপস্থিত থাকে, তখন তা স্থায়ী ভাবে ক্ষতি করে, যা মাছের মৃত্যু না ঘটালেও, তাদের শরীরের আকৃতি ও গঠনগত বৃদ্ধি এবং খাবার ও বাসস্থানের জন্য প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ভারি ধাতু যুক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে মাছ এই ধাতুগুলির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এদের বিষক্রিয়ার প্রভাব মাছের ডিএনএ এর কার্যক্ষমতা এবং গঠনগত আকৃতির ওপর নিরীক্ষণ করা হয়েছে। বিষক্রিয়ার জিনগত প্রভাবগুলিকে চেনার জন্য বিভিন্ন জৈব-নির্ধারক ব্যবহার করা হয়। মাছের ক্ষেত্রে রক্তের লোহিতকণিকাকে জিনগত বিষক্রিয়ার নির্ণায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভারি ধাতুগুলি প্রধানত মাছের লার্ভা ও জুভেনাইলের জন্য বেশি মাত্রায় ক্ষতিকারক এবং এটি একটি মাছের দৈহিক বৃদ্ধিকে কমিয়ে দেয় এমনকি সম্পূর্ণ প্রজাতিটিকে অবলুপ্ত করতে পারে । ধাতুসমূহ মাছের লার্ভার আয়ু ও বৃদ্ধিকে কমিয়ে দেয় এবং আচরণগত পরিবর্তন ঘটায় ও গঠনগত ক্ষতিসাধন করে। বিশেষত, কপারের প্রভাবে মেরুদন্ডের গঠন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং লেড মাছে স্কলিওসিস ঘটায়। আরও গবেষণার ফলে জানা গেছে যে, কমন কার্পের ভারি ধাতুর প্রভাবে রক্তে লোহিতকণিকা, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাটের পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। রক্তে লোহা ও কপারের পরিমাণ বর্ধিত হয়। আবার স্থায়ীভাবে ক্ষতিকারক ভারি ধাতু সমূহে উন্মুক্ত হওয়ার ফলে, ভিটামিন-সি এর কর্ম-ক্ষমতা হ্রাস পায়। এই গবেষণা আরও বলেছে যে, ক্ষতিকারক ভারি ধাতুসমূহ জলজ প্রাণীদের রক্তের বিভিন্ন প্যারামিটারের ওপর তীব্র প্রভাব বিস্তার করে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মাছের ভারি ধাতুসমূহের সঞ্চয়-স্থানগুলিকে চিহ্নিত করেছেন।

ক্যাডমিয়াম : প্রধাণত কোশীয়ও অঙ্গগুলিতে যেমন লিভার, ফুলকা ও পাকস্থলিতে জমা হয়।

কোবাল্ট : কোবাল্টের সবথেকে বেশি ঘনত্ব ফুলকাতে এবং পাকস্থলিতে দেখা যায় ও যকৃতে তুলনামূলক ভাবে কম থাকে।

কপার : পেশিকোষে তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে দেখা যায়, ফুলকা, যকৃত, পাকস্থলি ও ডিম্বাশয়ের তুলনায়।

আয়রন : যকৃতে বেশি মাত্রায় এবং পেশিকোষে অল্পমাত্রায় দেখা যায়।

ম্যাঙ্গানিজঃ পেশিকোষে সবথেকে কম পরিমাণে থাকে।

নিকেল ও লেড : সব থেকে বেশি ঘনত্ব দেখা যায় ফুলকাতে।

যেহেতু মাছ মানুষের একটি প্রধান খাদ্য তাই এই ধাতূ সমুহের প্রভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। এই ভারি ধাতুর প্রভাব থেকে মানুষের স্বাস্থ্যকে কিছুটা হলেও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব, যদি আমরা এই জলজ প্রাণী প্রধানত মাছ খাবার সময়ে কিছু বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকি। বিভিন্ন গবেষণার ফলে জানা গেছে যে এই ভারীধাতুগুলি প্রধাণত মাছের পেশির তুলনায় অন্য অংশগুলিতে মানে যে অংশগুলি আমরা খাই না যেমন ফুলকা, যকৃৎ, বৃক্ক, বায়ুথলি ইত্যাদিতে বেশি পরিমাণে জমে। কিন্তু অনেক সময়ে গ্রামে গঞ্জে মানুষকে এইগুলিকে ভেজে খেতে দেখা যায়। এর ফলে শরীরে বেশি পরিমাণে ধাতব সঞ্চয়ের সম্ভবনা বেড়ে যায়। তাই ভারি ধাতুর ক্ষতি থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে গেলে এগুলি যত সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়াও এগুলি আমার বিভিন্ন খাদ্যের মাধ্যমে সরাসরি গ্রহণ করি এবং সেই সব দূষক আমাদের দেহে সঞ্চিত হতে থাকে । বিজ্ঞানের পরিভাষায় আমরা একে জৈব সঞ্চয়ন বলি । খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে স্তরে এই ভারি ধাতুর পরিমাণ বাড়তে থাকে যাকে জৈব বিবর্ধন বলা হয় । উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইতাই-ইতাই রোগের কারণ হল ক্যাডমিয়াম, বা পারদ থেকে সৃষ্ট মিনামাতা রোগের কথা বলা যেতে পারে ।

আজ আমরা ডিসলেক্সসিয়া নিয়ে আলোচনা করব, যার অন্যতম কারণ হলো লেড বা সীসা ।
‘তারে জামিন পর’ নামের হিন্দি ছবিটির কথা মনে আছে? যারা দেখেছেন তারা অবশ্যই ডিসলেক্সিয়া শব্দটির সাথে পরিচিত। প্রধান চরিত্র ঈশান নামের ছেলেটি পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যে সমস্যায় পড়েছিল তা-ই হল ডিসলেক্সিয়া। আমাদের দেশে অনেক শিশু এই সমস্যায় ভুগে থাকে। এটি একটি স্নায়ুগত সমস্যা যা জন্মগত ভাবেই অনেক শিশুর মধ্যে থাকে। আমাদের আশেপাশে এই রকম অনেক ঈশান রয়েছে ।

Image result for Dyslexia"

ডিসলেক্সিয়া (Dyslexia) বা স্পেসিফিক লার্নিং ডিজেএবিলিটি (শিখনমূলক অক্ষমতা) হল এমন এক ধরনের সমস্যা, যা হলে শিশুর পড়তে অসুবিধা হয়। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ নিউরোলজিস্টের মতে, এটা শিশুদের একটা সমস্যা যেখানে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ঠিক থাকা সত্ত্বেও তারা কোনো কিছু লেখা বা পড়ায় সমবয়সি অন্য শিশুদের মতো সক্ষম হয় না। বিকাশগত ডিসলেক্সিয়া প্রথমবার বর্ণিত হয়েছিল ১৮৮৬ সালে একটি ১৪ বছরের ছেলের ঘটনায়, যে পড়তে শিখছিল না। ১৯৬০ সালের পরেই এটির গবেষণা চিকিত্‍সার ক্ষেত্র থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে সরে এসেছিল, এবং ইউএসএ -তে ৮০ এর দশকে “পড়ার অক্ষমতা” শব্দটির দ্বারা ডিসলেক্সিয়া শব্দটিকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল।

ডিসলেক্সিয়ার কারণ ও শ্রেণীবিভাগ :

(1)আঘাতজনিত ডিসলেক্সিয়া : মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট স্থান থাকে যেটি পড়ালেখার ক্ষমতা কন্ট্রোল করে। শিশুর জন্মের সময় অথবা অন্য কোনো কারণে মস্তিষ্কের সেই স্থানে আঘাত পেলে ডিসলেক্সিয়া হতে পারে। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে বর্তমানে এ ধরনের ডিসলেক্সিয়া খুব একটা দেখা যায় না।

(2) প্রাথমিক ডিসলেক্সিয়া : প্রাথমিক ডিসলেক্সিয়াতেই শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। এ ক্ষেত্রে ব্রেইনের বাম দিকের একটি অংশ কোনো কারণ ছাড়াই ঠিকভাবে কাজ করে না। বয়স বাড়লেও ব্রেইনের ওই অংশ ঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে বড় হয়েও এরা ঠিকমতো লিখতে, পড়তে ও বলতে পারে না। এ সমস্যা বংশ পরম্পরায় ছড়াতে পারে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।

(3)সেকেন্ডারি বা জন্মগত ডিসলেক্সিয়া : শিশু গর্ভে থাকা অবস্থায় হরমোনগত কারণে এ সমস্যা হতে পারে। শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এ ধরনের সমস্যা ছেলেদের ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে।

Image result for Dyslexia"

লক্ষণসমূহঃ

আমরা যেটা দেখি তার আকার-আকৃতি মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। সে কারণে চারপাশের জিনিসগুলো আলাদাভাবে চিনতে পারি। কাউকে না দেখেও শুধু তার কথা শুনে বলে দিতে পারি সেটা কার কণ্ঠস্বর। কিন্তু ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ব্রেইন এ ধরনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে ভালো স্কুল, ভালো শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করালেও এরা পড়াশোনায় পিছিয়ে যায়। বর্ণমালার অক্ষরগুলো ঠিকমতো চিনতে পারে না বা উল্টা-পাল্টা দেখে। এমনকি ক্লাসে বসে শত চেষ্টা সত্ত্বেও শিক্ষকের পড়া ঠিকমতো বুঝতে পারে না। এরা স্কুলে বোর্ড দেখে দেখে খাতায় লিখতে খুব অসুবিধা অনুভব করে। একটি প্রশ্ন করলে অনেক সময় উত্তর করতে সমর্থ হলেও এক সঙ্গে অনেক প্রশ্ন করলে এরা কোনোটিরই উত্তর দিতে পারে না। কানে তেমন সমস্যা না থাকলেও এরা কোনো কিছু শুনে মনে রাখতে পারে না। একটি বাক্য বলার সময় মাঝের কিছু শব্দ তারা ভুলে যায় অথবা হারিয়ে ফেলে। ফলে বাক্যের অর্থ এমন হয়ে যায় যে, অনেকের কাছে তা হাস্যকর মনে হয়। তারা জানে তারা কি বলতে চাইছে  কিন্তু প্রকাশ করে ফেলে ভিন্ন কিছু। যার কারণে এরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়ে। একসময় পরিবার তথা শিক্ষকদের রোষানলে পড়ে। ফলে তারা নিজেদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। সাধারনত শিশুরা ডান কিংবা বাম হাতে শক্তিশালী হলেও এরা দুই হাতে মোটামুটি সমান শক্তি প্রকাশ করে থাকে। যেহেতু সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এই সমস্যাগুলো সারা জীবন থাকে, তাই বড় হলে সে বিষণ্নতায় ভোগে।
অথচ বুদ্ধির দিক থেকে এদের কোনো ঘাটতি থাকে না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এসব শিশুর না আছে কোনো চোখে সমস্যা, না আছে কোনো কানে সমস্যা। এমনকি মানসিকভাবে এরা বিকারগ্রস্ত থাকে না।

Image result for Dyslexia"

▪যদি আপনার শিশু
অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় দেরিতে কথা বলতে শেখে।
▪দিক নির্দেশনা বুঝতে সমস্যা হয়। ডান ও বাম দিকের মধ্যে তফাত ধরতে পারে না।
▪ সাধারনত যে বয়সে জামার বোতাম লাগাতে এবং জুতার ফিতা বাঁধতে পারার কথা তা না পারে বা করতে সমস্যা হয়।
▪অকারণেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়।
▪প্রতিটা শব্দ ধরে ধরে পড়ে কিন্তু মানে বুঝতে পারে না বা বুঝতে দেরি হয়।
▪দাঁড়ি, কমা, প্রশ্নবোধক চিহ্ন ইত্যাদির মানে বুঝতে পারে না।
▪ কোনো কিছু বানান করে পড়তে তারা দুর্বলতা প্রকাশ করে। শুদ্ধ উচ্চারনে সমস্যা ।
▪ পড়া, দেখে বা শুনে লেখা সঠিকভাবে অন্যরা যত দ্রুত পারে, তত দ্রুত পারেনা। তাই তাদের লেখা অসুন্দর হয়।
▪এক পৃষ্ঠায় একই শব্দ বিভিন্ন ভুল বানানে লেখে বা এক বানানের সাথে অন্য বানান মেলেনা।কখনো কখনো উল্টো বা বিভিন্ন প্যাটার্নে শব্দ লেখে।অনেক সময় পড়তে গিয়ে লেখা শব্দের জায়গায় বেশি চেনা অন্য শব্দ ব্যবহার করে।
▪পড়তে পড়তে লাইন বাদ দিয়ে যায়। অনেক সময় নিজের থেকে শব্দে অতিরিক্ত অক্ষর যোগ করে দিতে পারে। আবার অনেক সময় বাদও দিতে পারে।
▪পড়তে পড়তে অন্য দিকে তাকালে যে লাইনটা পড়ছিল সেটা আর খুঁজে পায় না।
▪কোনো কিছুর সঙ্গে এরা তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। এমনকি মিউজিকের তালেও এরা শরীর দোলাতে পারে না।

এই সমস্যার পাশাপাশি এই শিশুদের আরো কিছু উপসর্গও থাকে। যেমন :
● সমষ্টিক কাজে অনগ্রসরতা এবং অমনোযোগ ।
● অতিরিক্ত লজ্জা ও একা থাকার প্রবনতা ।
● গতি ও অবস্থান নির্ণয়ে অসামঞ্জস্যতা কারনে খেলায় অপারদর্শিতা ।
● দিবাস্বপ্ন দেখার প্রবণতা ।
● প্রচণ্ড স্কুল-ভীতি ।

Image result for Dyslexia"

ওপরের লক্ষণগুলো যদি থাকে, তাহলে হতে পারে যে শিশুটি ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকতে পারে। এমনটি হলে যথাশীঘ্র শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এবং সঠিক দিকনির্দেশনা মত চলতে হবে।

চিকিৎসা :

ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুর জন্য প্রথম চিকিৎসাই হল তার সমস্যাকে শনাক্ত করা। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগটি নির্ণয় করা বেশ কঠিন। মা-বাবা কিংবা ক্লাসের শিক্ষক রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরতে পারেন না। তবে মানসিক বিশেষজ্ঞ কিংবা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগটি সহজেই নির্ণয় করতে পারেন। শিশুর ডিসলেক্সিয়া থাকলে তা সাধারণত বোঝা যায় স্কুলে ভর্তি করার পর। তাই এ সময়ে শিশুর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। এর চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ তেমন কার্যকরী ভুমিকা রাখতে সক্ষম হয় নি। ডিসলেক্সিয়ার কোনো নির্দিষ্ট চিকিত্‍সা হয় না। তবে কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করে শিশুদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করে তোলা যেতে পারে।
শিশুর ঠিক কোন জায়গায় সমস্যা তা বোঝার চেষ্টা করুন। সেই অনুযায়ী স্ট্র্যাটেজি ঠিক করুন।
নির্দিষ্ট পড়ানোর স্টাইল ছেড়ে ইন্টারঅ্যাক্টিভ স্টাইলের আশ্রয় নিন। সম্ভব হলে কম্পিউটারের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
ডিসলেক্সিক শিশুরা যেন সহজে পড়াশোনা করতে পারে তার জন্য বড়দের আচরণ ঠিক রাখতে হবে। পড়াশোনা নিয়ে শিশুকে বেশি চাপ দেবেন না। আবার এত বেশি ছুট দেবেন যাতে আর পড়তেই না চায়।
পড়াশুনা একটানা না করে কিছুটা বিরতি দিয়ে করানো উচিত। কোনো পড়া ঠিকমতো করলে শিশুর প্রশংসা করুন। পড়ার সমস্যা কমাতে শিক্ষক-ছাত্র একসঙ্গে বসে পড়লে ভালো হয়। যেটা পড়া হবে সেটার মানে যদি শিক্ষক বুঝিয়ে দেয়, তাহলে বাচ্চার পড়তে সুবিধে হয়। দুজনকেই একসাথে শুরু করতে হবে, যাতে শিক্ষকের গলার আওয়াজ শিশুর কাছে সাপোর্টের কাজ করে। শিক্ষকের গলার আওয়াজ আস্তে আস্তে কমিয়ে দিতে হবে যেন শিশু একাই পড়তে পারে। একটানা ক্লাস না নিয়ে বিরতি দিয়ে ক্লাস করতে হবে। যেসব শিশুরা পড়তে পড়তে খেই হারিয়ে ফেলে তাদের আঙুল ব্যবহার করে পড়তে শেখানো যেতে পারে। এতে লাইন বাদ দেবার প্রবণতা কমে যাবে। অনেক সময় স্পিচ মাসল ঠিকমতো কাজ করে না বলে শিশু ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। অনেক ব্যায়াম আছে যেগুলো স্পিচ মাসল শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। শিশুকে এসব ব্যায়াম করান।
ছোট ছোট খেলাও অনেক সময় উপকারী হয়। যেমন – শিশুর সাথে শব্দের পাজেল বা লুকানো শব্দ খুঁজে বের করার খেলা খেলুন।

ডিসলেক্সিক শিশু ও অভিভাবকের করণীয় :

Image result for Dyslexia"

পৃথিবীতে সব শিশুই সমান মেধা নিয়ে আসে। এরপরও সে-ই ভালো ছাত্র-ছাত্রী হয় যে বেশি চর্চা করে। কিন্তু ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশু চর্চা করার ক্ষমতা হারায়। শিশুর এ সমস্যা কাটাতে মা-বাবার ভূমিকাই প্রধান। শিশুর আশপাশের লোকজনের সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। প্রথমে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে স্কুল শিক্ষকের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। তবে একজন চাইল্ড সাইকিয়াট্রিস্টের সহায়তা নিলে খুব ভালো হয়। শিশুকে তার ব্যর্থতার জন্য কোনোভাবেই গালমন্দ কিংবা মারধর করবেন না। পড়াশোনা না করার জন্য বকুনি শুনতে শুনতে হারিয়ে যায় ওদের ‘আমিও পারি’ বোধটা। তাই ‘ফাঁকিবাজ’রা এড়িয়ে চলতে শুরু করে ভালবাসার জিনিসও। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে ‘কনডাক্ট ডিসঅর্ডার’ বা আচরণের অসঙ্গতি। হয়ে উঠতে পারে আত্মহত্যাপ্রবণও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসলেক্সিয়া অসুখ নয়। অক্ষমতা মাত্র। এই অক্ষমতা পুরোটা সারে না, তবে সচেতনতাই আসল। ফাঁকিবাজি না অন্য কিছু, তা বুঝতে হবে বাবা-মাকে, স্কুলকে, বিশেষত শিক্ষককে। ডিসলেক্সিকদের ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ খুব কম। তবে ডিসলেক্সিক বাচ্চারা খুব প্রতিভাবান হয়। তাদের খুবই ভাল চিন্তাশক্তি/কল্পনাশক্তি এবং কখনো কখনো ভাল গানিতিক প্রতিভা থাকে। বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে তাদের অসাধারন আগ্রহ ও পারদর্শিতা দেখা যায়। ওদের যে দিকে আগ্রহ সে দিকে উৎসাহ পেলে দারুণ উন্নতি করে। ‘স্পেশ্যাল লার্নিং’ ও ‘স্পেশ্যাল কেয়ার’ও এই সমস্যার বেশ খানিকটা সমাধান হতে পারে। অনেক সময়ই দেখা যায়, ওপেন স্কুল ব্যাপারটা ডিসলেক্সিকদের ক্ষেত্রে খুব খেটে যায়। কারণ, সেখানে পছন্দসই বিষয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে। যা প্রচলিত কাঠামোয় নেই। তা ছাড়া উৎসাহ দিয়ে যেতে হবে ওদের ভাল লাগার বিষয়ে। সে দিকে বইতে দিলে সফল হয় ওরা। দেখা গিয়েছে, ওদের পিছনে লেগে থাকলে, অর্থাৎ সমস্যাটা বুঝে ওদের একটু সময় দিলে, সাহায্য করলে ওরা সফল হয়। সুতরাং শিশুর ডিসলেক্সিয়া থাকলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। দরকার ভালবাসা, উৎসাহ আর বোঝার মন। সমস্যা গুলো জন্মগত হলেও বিশেষ ভাবে দেখলে সেগুলো অনেকাংশে দুর করা যায়। আর তাদের গুণগুলো এগিয়ে নিতে পারলে মেধাবী কিছু মানুষ পাওয়া সম্ভব ।

Image result for Dyslexia"

ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত বিখ্যাত ব্যক্তিগণ :
অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন যারা ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তারা হতাশাকে জয় করে, এই সমস্যা থেকে বের হয়ে নিজ যোগ্যতা আর প্রতিভার গুণে বিশ্বে সমাদৃত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন :

▪ পাবলো পিকাসো :
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো ডিসলেক্সিয়াতে আক্রান্ত ছিলেন। প্রাথমিক জীবনে তিনি একাডেমিক লেখাপড়ায় অনেক সমস্যায় পড়েন। পরবর্তীতে তার বাবা এবং আর্ট টিচার-এর অনুপ্রেরণায় তিনি একজন ইতিহাস বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হন।

▪ টম ক্রুজ :
মিশন ইম্পসিবল-এ বিখ্যাত অভিনেতা টম ক্রুজেরও ডিসলেক্সিয়া ছিল। তারপরও তিনি ডিসলেক্সিয়াকে ছাপিয়ে সাফল্যের চূড়ায় উঠেন তার অভিনয় প্রতিভা দিয়ে!

▪ওয়ার্ল্ড ডিজনি :
ওয়ার্ল্ড ডিজনির ডিসলেক্সিয়া থাকা সত্ত্বেও তার অসাধারণ সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে। তিনি তার ভাইকে নিয়ে গড়ে তোলেন ডিজনি এম্প্যায়ার।

এছাড়াও পৃথিবীতে এইরকম আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ আছেন। যারা ডিসলেক্সিয়া থাকা সত্ত্বেও নিজ প্রতিভার গুণে স্বরণীয় হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্টিভেন স্পিলবার্গ, মোহাম্মদ আলী, অ্যান ব্যানক্রফট, বব মে প্রভৃতি।

ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সকলের সচেতনতা অনেক বেশি দরকারি। কারণ আজকের শিশুরাই গড়ে তুলবে আগামী দিনের পৃথিবী। তাই সাবলীল হোক তাদের বিকাশের পথটা। তারা উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আপন আলোয় উদ্ভাসিত করুক এই পৃথিবীকে! মাটিতে নেমে আসুক ছোটো ছোটো তারারা!

লেখকঃ    সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

আত্মকের আগন্তুক…করোনা ভাইরাস

5 (2) চায়নার জিনিস বেশি দিন যায়না, ক্রেতা বাঙালির এই প্রবাদ মিথ্যে প্রমান করে! সারা পৃথিবী জুড়ে বেশ আত্মকের ব্যাটিং করছে করোনা ভাইরাস । যার আর এক নাম ২০১৯-এনসিওভি।বাতাসের বিস্তার লাভ করে এই ভাইরাস স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিরা এর দ্বারা সরাসরি আক্রান্ত হয়।বিজ্ঞানীরা বলছেন, চিনের উহান বাজারের কোনো একটি প্রাণী […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: