মৃগী রোগ / Epilepsy

@
0
(0)

১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমস্-এ একটি আমেরিকান মেয়ে দৌড় প্রতিযােগিতায় ৩টে সােনা ও ১টি রুপাের পদক পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটির নাম ফ্লোরেন্স ডেলােরেজ গ্রিফিথ জয়নার। তাকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বকালের সব থেকে দ্রুতগামী মহিলা। তার গড়া রেকর্ড এখনও অক্ষত রয়েছে। ইনি ফ্লো জো নামে বেশি বিখ্যাত। এহেন একজন অ্যাথলিট ১৯৯৮ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ঘুমের ঘােরে মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ ছিল ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মৃগীর খিচুনি হয়ে শ্বাসরােধ হওয়া। ওনার চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু তবুও উনি এই অসুখটির শিকার হলেন। তবে এমন অনেক মানুষের উদাহরণ আছে যারা মৃগীর অসুখে আক্রান্ত হয়েও, নিজেদের প্রতিভার জোরে গােটা পৃথিবীকে জয় করেছেন, যেমন চার্লস ডিকেন্স, ভান গঘ, নেপােলিয়ান, দস্তয়ভস্কি, আলফ্রেড নােবেল, আলেকজান্ডার, জোয়ান অফ আর্ক প্রমুখ।

Image result for florence delorez griffith joyner"
মৃগীরােগ বা এপিলেপ্সি কথাটা একটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘এপিলেপ্সিয়া’ থেকে এসেছে। প্রাচীন সময়ে এই অসুখটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ভর হওয়া বা ভর আসার মতাে কিছু ধর্মীয় ঘটনা। এপিলেপ্সিয়া কথাটির অর্থ হল কোনাে কিছুকে জাপটে ধরা বা খুব জোরে আঁকড়ানাে। এই অসুখটিকে অনেক সময় ‘পবিত্র অসুখ’ বলা হত। কারণ, ধারণা করা হত যে, এপিলেপ্সির সময় হওয়া কাঁপুনিগুলি আসলে ভগবানের পাঠানাে সংবাদ।পরবর্তীকালে বিভিন্ন জাতির এবং দেশের মানুষদের মধ্যে এই ‘ফিট’ হওয়া রােগীকে একঘরে করে বন্দি করা হতে থাকে। মানুষের অন্ধবিশ্বাসের জেরে, তানজানিয়ায় ‘ফিট হওয়ার সঙ্গে ভূতের ভর এ
হওয়া এবং ডাইনিতে রূপান্তরিত হওয়া কিংবা বিষক্রিয়া হওয়া যুক্ত হয়। ভারতবর্ষে আজকের দিনেও ‘ফিট’ হওয়াকে ছোঁয়াচে বলে অনেক মানুষই ভাবেন।

Image result for epilepsy patient"
এই ধরনের অন্ধবিশ্বাস কিছু মানুষের মধ্যে থাকলেও, অনেকেই আজকাল এই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসছেন। হিপােক্রেটস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০) অনেকদিন আগেই বলেছিলেন যে, ‘এপিলেপ্সি’-কে যেদিন মানুষ ঠিক করে বুঝতে শিখবে, সেদিন থেকে এটি আর ‘পবিত্র অসুখ থাকবে না।
এপিলেপ্সি একটি দীর্ঘকালীন স্নায়ুরােগ যাতে করে কাঁপুনি হয়।গােটা পৃথিবীতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ এই রােগে আক্রান্ত। মৃগীরােগ ছােটো বাচ্চাদের এবং ৬৫ বছরের উপর যাদের বয়স, তাদের হওয়ার সম্ভবনা থাকে। তবে আবার এপিলেপ্সি বিভিন্ন কারণে যে কোনাে মানুষের যে কোনাে সময়ে হতে পারে। যেমন, মস্তিষ্কে সার্জারির পর এই অসুখটি হঠাৎ হতে পারে। মৃগীরােগ ওষুধ দিয়ে একেবারে সারিয়ে দেওয়া হয়তাে যায় না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। দেখা গেছে মাত্র ৩০ শতাংশ রােগীর ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়ােগেও কোনােভাবেই অসুখটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কোনাে কোনাে ধরনের মৃগীরােগ জীবনের বিশেষ একটি সময়ে হয়। যেমন ছেলেবেলায় এই অসুখটি থাকলেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রকোপ কমে যায়। প্রায় ৪০ ধরনের এপিলেপ্সি রয়েছে। মস্তিষ্কের কোন জায়গায় অসুবিধের জন্য এই কাপুনি হচ্ছে, তার ভিত্তিতে এর কিছু ভাগ করা হয়েছে। কিছু এপিলেপ্সি জিনগত ত্রুটির কারণে হয়, আবার লক্ষণজনিত কোনাে টিউমার বা ক্ষত অথবা লুক্কায়িত কোনাে ক্ষতর জন্যও এই অসুখটি দেখা দিতে পারে।
আগেই বলেছি যে, বিভিন্ন জিনের মিউটেশন বা ত্রুটিকে এই রােগটির জন্য অনেকাংশেই দায়ী করা হয়। স্নায়ুকোশের বার্তা সংবহনের জন্য কিছু সােডিয়াম চ্যানেল আছে। এগুলি আয়নের পরিবর্তনের জন্য খােলে বা বন্ধ হয় (ভােল্টেজ গেটেড), অথবা কোনাে লাইগ্যান্ড যুক্ত হলেও খােলে বা বন্ধ হয় (লাইগ্যান্ড গেটেড)।

Image result for epilepsy"
সাধারণভাবে এই চ্যানেলগুলি বন্ধ থাকে। এই চ্যানেলগুলির কার্যকলাপের জন্য যে জিনগুলি দায়ী, সেগুলিতেই মিউটেশনের ফলে এই চ্যানেলগুলি ঠিকমতাে কাজ করতে পারে না। মিউটেশন হলে এই সােডিয়াম চ্যানেলগুলি অনেকক্ষণ খােলা থাকে, যার ফলে গ্লুটামেট ধরনের নিউরােট্রান্সমিটার কোশ থেকে নির্গত হতে থাকে। এগুলি অন্যান্য নিউরােনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, অতিরিক্ত ক্যালশিয়াম বের করতে থাকে। যে কারণে নিউরােনগুলি অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে ও খিচুনি হতে থাকে। অতিরিক্ত ক্যালশিয়াম কোশের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে থাকে। ঠিক একইভাবে অনেকক্ষণ ধরে লাইগ্যান্ড যুক্ত হয়ে থাকলে চ্যানেলগুলি অনেকক্ষণ ধরে খােলা থেকে যায়।
যদি এপিলেপ্সির জিনগত কারণ সুস্পষ্ট হয়, তাহলে এর অনেক উপকারিতা আছে। যেমন, বংশের মধ্যে আক্রান্তদের সহজেই চিহ্নিত করে চিকিৎসা করা যায়। গত কয়েক দশক থেকে এই অসুখটি নিয়ে গবেষণা অনেক দূর এগিয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে যে খুব শীঘ্রই নতুন কিছু ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হবে, যা হবে প্রতিটি আক্রান্ত মানুষের জন্য নিজস্ব বা ব্যক্তিগত।।

ড. আনন্দিতা জোয়ারদার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

একের মধ্যে অনেক

0 (0) ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস ম্যাকাভয় অভিনীত “Split” সিনেমাটি হয়ত আমাদের অনেকেরই দেখা আছে । সিনেমাতে কেভিন চরিত্রে অভিনয় করা জেমস ম্যাকাভয় ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত একজন রোগী; যার মাঝে একটি নয়, দুটি নয়, দশটি নয়, গুনে গুনে তেইশটি ভিন্ন সত্ত্বার বসবাস! অর্থাৎ একই দেহে তেইশটি ভিন্ন মানুষ। […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: