পিরানহা বনাম অ্যারাপাইমাঃনতুন প্রযুক্তির সন্ধানে

@
0
(0)

পিরানহা। মাছটার নাম শুনলেই বুকের ভিতরটা কেমন শিউরে ওঠে।দুই চোয়াল জুড়ে ত্রিভুজের মতাে ছুঁচলাে দাঁত; নিমেষে আস্ত একটা গরুকে সাবাড় করে দিতে পারে। ব্রাজিলে এসে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিওডাের রুজভেল্ট এসব ঘটনা নাকি নিজের চোখে দেখেছেন। 1914 সালে ‘থু দি ব্রাজিলিয়ান ওয়াইল্ডারনেস’ বইতে তার এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে রুজভেল্ট লিখলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মাছ পিরানহা।Image result for পিরানহা

কয়েক বছর আগে সেই ব্রাজিলের অ্যামাজন উপত্যকায় একটা অভিযান চালানাে হয় ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকবক্স স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অধ্যাপক মার্ক মেয়ার্স-এর নেতৃত্বে।এ অঞ্চলের হদগুলােতে থিকথিক করছে ভয়ঙ্কর সব পিরানহা। তাদের ভয়ে সেখানে অন্য কোনাে প্রাণীই থাকতে পারে না।

Image result for পিরানহাকিন্তু মেয়ার্সের দল দেখলেন ৩০০ পাউন্ডের অকুতােভয় অ্যারালাইমা মাছগুলাে দিব্যি সহাবস্থান করছে পিরানহাদের সঙ্গে। এর মূল রহস্যটা কী সেটা খুজতে গিয়ে মেয়ার্স আর তার সহকর্মীরা বুঝলেন যে পিরানহার মারাত্মক আক্রমণ থেকে অ্যারাপাইমাদের বাচাচ্ছে তাদের গায়ের আঁশ। এক বা একটা আঁশ প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা। আর এরাই অ্যারালাইমাদের বর্ম।এদের আঁশের ওপরের স্তরটা ভারী খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি, আর আর | সেটা বসে রয়েছে নরম মাংসপেশির উপরে।

Image result for arapaima
ব্যাপারটাকে সরেজমিনে দেখার জন্য মেয়ার্স বানিয়ে ফেললেন একটা যন্ত্র। যন্ত্রটা আসলে একটা পাঞ্চিং মেশিন। মেশিনের উপরের অংশে লাগানাে হল একটা পিরানহার দাঁত। নীচের অংশে রাবারের নরম প্যাডের উপরে আঠা দিয়ে লাগানাে হল অ্যারাপাইমার একটা আঁশ। এবারে চেষ্টা করা হল পাঞ্চিং মেশিনে চাপ দিয়ে পিরানহার দাঁতকে অ্যারাপাইমার আঁশে গেঁথে দেওয়ার। অবিশ্বাস্য! পিরানহার দাঁত আঁশের ভেতরে কিছুটা ঢুকলেও নরম পেশিতে ঢােকার আগেই দাঁতে ধরল ফাটল। মেয়ার্সের মতে ঘটনাটা তাক লাগানাের মতাে হলেও প্রকৃতিতে বিরল নয়। বাইরের আস্তরনটা শক্ত, কিন্তু সেটা নরম কোনাে একটা পদার্থের উপরে বসে আছে এরকম অনেক কিছুই আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশে দেখতে পাই। এই ডিজাইনটাই তাকে বেশ পােক্ত করে তােলে। কিন্তু আমাদের পরিবেশের কোনাে কিছুই এককভাবে খুব একটা শক্তপােক্ত নয়; প্রকৃতি সেগুলােকে এমন একটা অ্যারাপাইম বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে সাজিয়ে গুছিয়ে নেয় যে আমরা একটা শক্ত কাঠাম পেয়ে যাই। অর্থাৎ মেয়ার্সের কথা অনুযায়ী পিরানহার কামড় থেকে
অ্যারাপাইমার বাঁচার আসল কেরামতিটা হল তার আঁশের গঠনে।

Image result for arapaimaএকটা শক্ত জিনিস আর একটা নরম জিনিসের সঠিক সমন্বয়ে।প্রত্যেকটা আঁশের ওপরের অংশটা খনিজ পদার্থে ভরপুর। এই স্তরের ঠিক তলায় রয়েছে কোলাজেন নামের ফাইবারের স্তর। এই ফাইবারের স্তরের প্রায় দ্বিগুণ শক্ত বাইরের ওই খনিজ পদার্থের স্তর। প্রকৃতি কী অদ্ভুতভাবে শক্ত আর নরম জিনিসের একটা সঠিক সমন্বয় ঘটিয়েছে।
এই অ্যারাপাইমার শরীরে। তার সঙ্গে আছে আরও একটা গ্র্যান্ড ডিজাইনিং। কোলাজেনের স্তরগুলাের একটা যদি পূর্ব-পশ্চিম মুখে থাকে, তার উপরেরটা আছে উত্তর-দক্ষিণ মুখে। তার উপরেরটা আবার
পূব-পশ্চিম মুখে। ঠিক যেমনভাবে অনেকগুলাে পাতা প্লাইউড পরপর পেতে একটা শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়, সেরকম। ফলে পুরাে সিস্টেমটা সবদিকে একইরকমের শক্তপােক্ত হয়।
এবারে আসি অ্যারাপাইমার শরীরের টেক্সচারের কথায়। অ্যারাপাইমার আঁশগুলাে একটা উপরে আরেকটা উঠে থাকে। ফলে শরীরটা খুব একটা মসৃণ নয়। সাঁতার কাটতে কাটতে এরা যখন শরীরটাকে
আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে নিয়ে চলে, ওই এবড়াে-খেবড়াে টেক্সচারের জন্য আঁশের খনিজ পদার্থের স্তরটার বিশেষ কোনাে বিকৃতি ঘটে না; বেশ আঁটসাটই থাকে। ফলে খুব সহজেই তারা এদিক-ওদিক ঘুরতে পারে,
আর আঁশগুলােতেও কোনাে ফাটল ধরে না। নানা কাজে আমরা যেসব সেরামিক ব্যবহার করি তারা এরকম এবড়াে-খেবড়াে নয়। ফলে সেগুলােকে যদি কোনাে আঁকাবাঁকা পথে চলতে দেওয়া হয় তাহলেই
সেগুলােতে ফাটল ধরে যায়। এই ব্যাপারটাকে লক্ষ্য করেই মেয়ার্সের দলবল ফ্লেক্সিবল সেরামিক তৈরির কাজে অ্যারাপাইমার শরীরের এই টেক্সচারটাকে কাজে লাগাতে চাইছেন। অ্যারালাইমার আঁশ যেমন
শক্তপােক্ত, তেমনি নমনীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকেরা যে বর্ম পড়েন তার ক্ষেত্রে এই দুটো বৈশিষ্ট্যই খুব দরকারী। Image result for arapaima

মেয়ার্সের সহযােগীরা এব্যাপারটা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা চালাচ্ছেন। ভবিষ্যতে উড়ােজাহাজের নকশাতে অ্যারাপাইমার আঁশের এই গঠনকে কাজে লাগানাের কথা ভাবা হচ্ছে। আশা করা যায় প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টি থেকেই অদুর ভবিষ্যতে নতুন এক প্রযুক্তির ধারা গড়ে উঠবে।

আনিন্দ্য দে

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

প্রোক্যারিয়টদের কোথায় পাওয়া যায়?

0 (0) বর্তমান পৃথিবীতে যত ধরনের কোষ আছে তাদের প্রাথমিকভাবে দুটিভাগে ভাগ করা যায় –প্রোক্যারিয়টিক কোষ ও ইউক্যারিয়টিক কোষ। প্রোক্যারিয়টিক কোষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য — 1) এদের দ্বি-স্তরীয় পর্দা ঘেরা কোষঅঙ্গানু নেই। 2) জেনেটিক বস্তু পর্দাবিহীন নিউক্লিঅয়েড। 3) রাইবোজোম 70 এস প্রকৃতির। প্রোক্যারিয়ট প্রকৃতির কোষ দেখা যায় একমাত্র ডোমেন ব্যাকটেরিয়া ও […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: