প্রোক্যারিয়টদের কোথায় পাওয়া যায়?

@
5
(1)

বর্তমান পৃথিবীতে যত ধরনের কোষ আছে তাদের প্রাথমিকভাবে দুটিভাগে ভাগ করা যায় –প্রোক্যারিয়টিক কোষ ও ইউক্যারিয়টিক কোষ। প্রোক্যারিয়টিক কোষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য —

1) এদের দ্বি-স্তরীয় পর্দা ঘেরা কোষঅঙ্গানু নেই।

2) জেনেটিক বস্তু পর্দাবিহীন নিউক্লিঅয়েড।

3) রাইবোজোম 70 এস প্রকৃতির।

প্রোক্যারিয়ট প্রকৃতির কোষ দেখা যায় একমাত্র ডোমেন ব্যাকটেরিয়া ও ডোমেন আর্কিয়া, এদের অন্তর্গত ফাইলা (Phyla) গুলিতে। মাটি থেকে গভীর সমুদ্র, উদ্ভিদের মূল থেকে মানুষের শরীরের ভিতর, সর্বত্র প্রোক্যারিয়টদের পাওয়া যায়। প্রোক্যারিয়টদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এরা চূড়ান্ত অস্বাভাবিক পরিবেশেও  (Extreme  environment) ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হল।

লবণাক্ত জলে যেসব প্রোক্যারিয়টদের পাওয়া যায় তাদের হ্যালোফাইল  (Halophile) বলে। সাধারণত 0.2 M এর বেশি মোলার কনসেনট্রেসনের লবণাক্ত জলে এদের ভালো বৃদ্ধি হয়। এমনকি ভীষণ লবণাক্ত জলে, যেখানে সোডিয়াম ক্লোরাইডের কনসেনট্রেশন 3 M বা 4 M থাকে, সেখানেও এক্সট্রিম  হ্যালোফাইল (Extreme Halophile) প্রোক্যারিয়টদের পাওয়া যায়।

Image result for Halophile

উদাহরণ — মৃত সাগরে (Dead sea) হ্যালোব্যাক্টেরিয়াম (Halobacterium) নামক আর্কিয়া পাওয়া যায়। এখানকার জলে সোডিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবন প্রায় সম্পৃক্ত অর্থাৎ প্রায় 6.2 M। সম্পৃক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য হ্যালোব্যাক্টেরিয়াম কোষের ভিতরে অতিরিক্ত পটাসিয়াম জমা করে যাতে এদের কোষ পরিবেশের তুলনায় অতিসম্পৃক্ত বা হাইপারটনিক থাকে। কোষের মধ্যে পটাসিয়ামের গাঢ়ত্ব 4 M থেকে 7 M পর্যন্ত হতে পারে। তাছাড়াও এদের কোষপ্রাচীর আর কোষপর্দায় প্রচুর সোডিয়াম আয়ন থাকে। যেখানে লবনের গাঢ়ত্বের জন্য মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী সেখানে এটাই ওদের স্যারভাইভ্যাল স্ট্র্যাটেজি।

 

তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে ভাগগুলি হল —

1) সাইক্রোফাইল (Psychrophile) — এরা 0 ডিগ্রি থেকে 20 ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে বেঁচে থাকে। 15 ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম  তাপমাত্রা এদের বৃদ্ধির জন্য ‘সর্বোত্তম তাপমাত্রা’ বা ‘অপটিমাম টেম্পারেচার’।

উদাহরণ — মিথানোজেনিয়াম (Methanogenium) আর্কিয়া।

এর থেকেও কম তাপমাত্রায়, অ্যান্টার্কটিকার বরফে,  -12 ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পাওয়া যায় সাইক্রোমোনাস ইনগ্রাহামি ( Psychromonas  ingrahamii ) ।

Image result for Psychrophile

2) সাইক্রোট্রফ (Psychrotroph) বা ফ্যাকালটেটিভ সাইক্রোফাইল (Facultative psychrophile) — এরা 0 ডিগ্রি থেকে 40 ডিগ্রি তাপমাত্রাতে  বেঁচে থাকতে পারে। এদের জন্য 35 ডিগ্রি সেলসিয়াস সর্বোত্তম।

উদাহরণ — সিউডোমোনাস ফ্লোরেসেন্স (Pseudomonas fluorescens)  

Image result for Pseudomonas fluorescens

3) মেসোফাইল (Mesophile) — এদের সর্বোত্তম বৃদ্ধি হয় 20 ডিগ্রি থেকে 45 ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।

উদাহরণ — এসচেরিকিয়া কোলাই (Escherichia coli)

Image result for Escherichia coli

4) থারমোফাইল (Thermophile) এদের জন্য পর্যাপ্ত তাপমাত্রা হল ৫৫ ডিগ্রি থেকে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

উদাহরণ — থারমাস অ্যাকোয়াটিকাস (Thermus aquaticus )।

Image result for Thermus aquaticus

5) হাইপারথারমোফাইল (Hyperthermophile) — এদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট  তাপমাত্রা  হল ৮০ ডিগ্রি থেকে ১১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

উদাহরণ — পাইরোকক্কাস অ্যাবিসি ( Pyrococcus abyssi )  ।

Image result for Pyrococcus abyssi

এর থেকেও বেশি তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে আর্কিয়া জিওজিম্মা ব্যারসি  (Geogemma barossii) । সমুদ্রের নিচে হাইড্রোথারমাল ভেনটের কাছে অক্সিজেন বিহীন পরিবেশে 121 ডিগ্রি সেলসিয়াসে এদের খুঁজে পাওয়া গেছে।

Image result for Geogemma barossii

 

হাইড্রোথারমাল ভেন্ট : গভীর সমুদ্রতলের মেঝেতে চিড় থাকে যেখান থেকে  ভূগর্ভস্থ তাপে উত্তপ্ত গরম জল বেরিয়ে আসে। এই চিড়কে বলে হাইড্রোথারমাল ভেনট। এখানে জলের উত্তাপ 250 ডিগ্রি থেকে 350 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে।

সালফাইড চিমনি বা ব্ল্যাক স্মোকার (Black Smoker) : হাইড্রোথারমাল ভেনট থেকে যখন সালফাইড সমৃদ্ধ গরম জল বেরোয় তখন তাকে বলে সালফাইড চিমনি।

 

পরিবেশের আম্লিকভাব বা ক্ষারীয়ভাবের উপর নির্ভর করে ভাগগুলি হল —

1) অ্যাসিডিক পরিবেশ — এদের বলে অ্যাসিডোফাইল (Acidophile)। এদের পর্যাপ্ত বৃদ্ধি হয় pH 0 থেকে pH 5.5 এর মধ্যে।

উদাহরণ — অত্যন্ত অ্যাসিডিক পরিবেশ pH 0 তে দেখা যায় আর্কিয়া  ফেরোপ্লাসমা অ্যাসিডারমানাস (Ferroplasma acidarmanus)

Image result for Ferroplasma acidarmanus

2) ক্ষারীয় পরিবেশ — এদের পর্যাপ্ত বৃদ্ধি হয় pH 8.5 থেকে pH 11.5 এর মধ্যে। এদের বলে অ্যালকালোফাইল।

উদাহরণ — অত্যন্ত ক্ষারীয় পরিবেশ pH 10 ও তার উপরে দেখা যায় ব্যাসিলাস অ্যালকালোফিলাস (Bacillus alcalophilus)

Image result for Bacillus alcalophilus

3) নিরপেক্ষ পরিবেশ — এদের বলে নিউট্রোফাইল (Neutrophile)। এদের পর্যাপ্ত বৃদ্ধি হয় pH 5.5 থেকে pH 8.0 এর মধ্যে, যা না খুব আম্লিক না খুব ক্ষারীয়।

উদাহরণ — এসচেরিকিয়া কোলাই (Escherichia coli)

Image result for Escherichia coli

অক্সিজেনের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে এদের ভাগগুলি হল —

1) বাধ্যতামূলক বায়ুজীবী (Obligate aerobe) — অক্সিজেন ছাড়া এদের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

উদাহরণ — মাইক্রোকক্কাস লুটিয়াস (Micrococcus luteus)Image result for Micrococcus luteus

2) বাধ্যতামূলক অবায়ুজীবী (Obligate anaerobe) — অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এদের মৃত্যু হয়।

উদাহরণ — ক্লসট্রিডিয়াম (Clostridium)

Image result for Clostridium

3) ঐচ্ছিক অবায়ুজীবী (Facultative anaerobe) — অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এদের বৃদ্ধি ভালো হয় তবে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে এদের মৃত্যু হয়, তাও না।

উদাহরণ — এনটেরোকক্কাস (Enterococcus) । 

Image result for Enterococcus

4) বায়ুনিরপেক্ষ অবায়ুজীবী (Aerotolerant anaerobe) অক্সিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এদের বৃদ্ধির উপর কোন প্রভাব ফেলে না।

উদাহরণ —  স্ট্রেপটোকক্কাস পায়োজিনিস (Streptococcus pyogenes)

Image result for Streptococcus pyogenes

5) মাইক্রোএরোফাইল (Microaerophile) — পরিবেশের স্বাভাবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এদের কোষ বিনষ্ট হতে পারে। সর্বোত্তম বৃদ্ধির জন্য এদের খুব কম অক্সিজেন প্রয়োজন; 2 থেকে 10 শতাংশের নিচে অক্সিজেনের পরিমাণ থাকলে এদের বৃদ্ধি ভালো হয়।

উদাহরণ — ক্যামপিলোব্যাকটর (Campylobacter)   

Image result for Campylobacter

যে বায়ুচাপে অন্য প্রাণীদের বাঁচা কঠিন  সেখানেও প্রোক্যারিয়টদের দেখা মেলে। এমনকি বেশি বায়ুচাপেই কিছু প্রোক্যারিয়টদের সর্বোত্তম বৃদ্ধি হয়। এদের ব্যারোফিলিক (Barophilic) বলে।

উদাহরণ — আর্কিয়া পাইরোকক্কাস  (Pyrococcus spp. )

Image result for Pyrococcus

এমনকি যে রেডিয়েশনে উন্মুক্ত হলে অনেক জীবিত কোষ বাঁচে না, কিছু প্রোক্যারিয়ট সেই উচ্চ রেডিয়েশন সহ্য করেও বেঁচে থাকতে পারে।

উদাহরণ — দেখা গেছে ডাইনোকক্কাস রেডিওডুরেন্স (Deinococcus radiodurans)  1500 কিলোর‍্যাডস সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে।

Image result for Deinococcus radiodurans

 বিভিন্ন পরিবেশে প্রোক্যারিয়টদের সহিষ্ণুতার সীমা এতো বেশি হওয়ার কারনে প্যানস্পারমিয়া হাইপোথিসিস অনুযায়ী বলা হয়, অন্য গ্রহ থেকে জীবিত ব্যাকটেরিয়াল এন্ডোস্পোর কোনোভাবে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে, যা থেকেই পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি।

প্যানস্পারমিয়া হাইপোথিসিস (Panspermia hypothesis) অনুযায়ী পৃথিবীতে অজৈব অণু থেকে প্রাণ সৃষ্টি হয়নি। অন্য গ্রহ থেকে প্রাণ পৃথিবীতে এসেছে।

 

AddText_11-08-11.14.50.PNG

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বসন্ত কড়া নাড়ছে।

5 (1) গতকালই লিখব ভেবেছিলাম। অন্য কাজে আটকে গিয়ে সময় বের করতে পারিনি। দায়টা আমার। নানা কারণে যে কোন কাজ করতে সময় বেশি লাগে। চটপট কাজ করতে পারিনা। সকালে তৈরি হয়ে হাঁটতে বেরিয়ে দেখি আকাশ ঝকঝকে নীল। শীত অনেকটাই কম। সূর্য উঠেছে তবে উত্তাপ ততটা নেই। তাই গতকাল রোজকার মত […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: