বাঘরোল কিন্তু বাঘ নয় !

@ 1
5
(3)

সরকারি মর্যাদা এবং স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও সে বঞ্চিত! আমাদের রাজ্য প্রাণী! প্রায়ই শোনা যায় বাঘ দেখা গেছে শহরের লোকালয়ে বা শিরোনামে একটি লাইনের দেখা মেলে, বাঘ সন্দেহে পিটিয়ে মারা হল বাঘরোল! কথায় বলে, ম্যান এন্ড এনিম্যাল কনফ্লিক্ট!Image result for বাঘরোল

বাঘরোল বা মেছো বিড়াল মাঝারি আকারের বিড়ালগোত্রীয় একধরনের স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণী। ব্রাজিল, কোস্টারিকা, বাংলাদেশ, ভারত, বলিভিয়া, ক্যাম্বোডিয়া, লাউস, শ্রীলঙ্কায় এরা স্থানীয়ভাবে বাঘরোল নামে পরিচিত। এদের আবাসস্থল থাইল্যান্ড ও এল সালভাদোর। বিগত কয়েক দশকে বাঘরোলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জনবসতি স্থাপন, কৃষিজমিতে রূপান্তর ও অন্যান্য কারণে বাঘরোলের আবাসস্থল জলাভূমিগুলো দিন দিন সংকুচিত ও হ্রাস পাওয়াই এর মূল কারণ। তাই আই.ইউ.সি.এন ২০০৮ সালে মেছোবাঘকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করে। বাঘ নয় তবু নাম তার বাঘরোল৷ গবাদি পশুও নয়, তবু আর এক নাম গোবাঘা৷ পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য প্রাণী’ বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাট৷ উচ্চতা বিড়ালের থেকে বেশি৷ গায়ে ছোপ ছোপ দাগ৷ জাতীয় পশু হিসেবে বাঘের নাম যতটা আলোচিত হয়, রাজ্য প্রাণী হিসেবে বাঘরোল তত চর্চিত নয়৷ রাজ্য প্রাণী হিসেবে যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেই বাঘরোল এখন ‘বিপন্ন’ তালিকাভুক্ত৷ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, কাম্বোডিয়া-সহ মোট ১১টি দেশে বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাটের সন্ধান পাওয়া গেলেও এর আদি বাসস্থান এই বাংলাই৷ হাওড়া জেলার আমতা ২ নং ব্লকের কামারখালি, ঝামটিয়া, খাজুরদহ, সাঁউড়িয়া, কুশবেড়িয়া, শিরোল, নারিট, তাজপুর, মহিষামুড়ি, সারদা-সহ বিভিন্ন গ্রামে দেখা মেলে বাঘরোলের৷Image result for বাঘরোল

পৃথিবীর ১১টা দেশে বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাটের সন্ধান মিললেও তাদের সংখ্যা কমতে কমতে এখন মাত্র তিন হাজারের আশপাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মূলত হাওড়াতেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাঘরোল৷ আবার এই জেলাতেই বাঘরোল নিধনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি৷ গত দশক থেকে অস্বাভাবিক হারে কমতে শুরু করেছে বাঘরোলের সংখ্যা৷ পরিসংখ্যান বলছে ২০১০-১১ সাল ২৭টি বাঘরোল মারা পড়েছে এই এলাকায়৷ এই হারে বাঘরোল নিধন চলতে থাকলে ক্রমে লুপ্ত হয়ে যাবে । গত এক দশকে শিল্পায়ন ও অজস্র ইটভাঁটা তৈরি হওয়ায় অস্বাভাবিক হারে কমেছে হোগলা বন, খড়ি বন৷ ফলে বাসস্থান হারিয়েছে বাঘরোলেরা৷ অন্য দিকে, ওই সব এলাকার ধানজমি ভরাট করে আবাসন বা বাড়ি তৈরি হচ্ছে৷ ফলে কমেছে ইঁদুরের সংখ্যা৷ যা বাঘরোলদের মূল খাদ্য৷ আবার কখনও-কখনও জমির ইঁদুর জমির অভাবে বাড়িতে বাসা বাঁধছে৷ফলে খাবারের খোঁজে গেরস্থের বাড়িতে হানা দিতে দেখা যাচ্ছে বাঘরোলদের৷ Image result for বাঘরোল

ইঁদুরের পাশাপাশি গেরস্থের হাঁস-মুরগি-ছাগলও মারছে তারা৷ সেক্ষেত্রে মানুষের ক্ষোভের শিকার হতে হচ্ছে বাঘরোলদের৷ ধরা পড়লে লাঠির ঘায়ে কখনও বল্লমের খোঁচায় মেরে পর্যন্ত ফেলা হচ্ছে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীটিকে৷ আবার কিছু কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাঘরোলের মাংস খাওয়ার চল রয়েছে৷ কাজেই বাঘরোল শিকার করে তাঁরা ভূরিভোজ করেন৷
এত প্রতিকুলতার মধ্যে বাঘরোলরা বাঁচবে কীভাবে? সচেতনতা প্রসারের উপর জোর দিয়েছে বন দপ্তর৷ এই উদ্দেশ্যে রাজ্য বন দপ্তর ও হাওড়া জেলা পরিষদ যৌথভাবে জনসচেতনতা কর্মসূচি শুরু করেছে৷ হাওড়া জেলা পরিষদের বন ও ভূমি দপ্তরের উদ্যোগে, জেলার প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে ‘বাঘরোল সুরক্ষা কমিটি’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের নেতৃত্বে পাঁচ জনের কমিটি তৈরি হচ্ছে৷ এই কমিটিতে এলাকার পশুপ্রেমী, পরিবেশবিদদেরও রাখা হবে৷ তারা সচেতনতা প্রসারের কাজ করবেন৷ সরকারি আইন অনুযায়ী, যারা বাঘরোল মারবেন, তাদের সাজা তিন বছরের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা৷ সে বিষয়েও সতর্ক করবে কমিটি৷Image result for বাঘরোল

নিরাপত্তা তো বাড়েনি। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে মাঝে মধ্যেই বাঘরোল পিটিয়ে মারার কথা শোনা যায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়েও সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দিন কয়েক আগে কোন্নগরে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছেl চিতাবাঘের গায়ের সঙ্গে বাঘরোলের চেহারার সাদৃশ্য থাকায় অনেকে চিতাবাঘ ভেবে ভুল করেন। যদিও বাঘরোল আদৌ আগ্রাসী স্বভাবের নয়। বরং বেশ শান্ত। সাধারণত জলাভূমি, খাল, বিল এলাকায় এদের দেখা মেলে। সাধারণত মাছ ভালবাসে। কখনও-সখনও গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকে হাঁস-মুরগিও খায় এরা, রাজ্য-প্রাণী তকমা পাওয়া বাঘরোল আজ অবলুপ্তির পথে। ভাঙড়, নিউটাউন-লাগোয়া এই সব এলাকায় আগে প্রচুর জলাভূমি ছিল। সেখানে বড় বড় আবাসন তৈরি হওয়ায় এই প্রাণী তাদের বাসস্থান হারিয়ে ফেলছে। তাই মানুষকে বলি, বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীকে আপনারা মেরে ফেলবেন না বা কোনও ক্ষতি করবেন না। কারণ তারাও বাস্তুতন্ত্রের সদস্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আমাদের কাজ হবে বাঘরোল রক্ষা করা যার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা এবং সামগ্রিক সরকারি সাহায্য।

আমরা এমন একটা পরিবেশ সংস্থার কথা জানব, প্রায় তিনশো বছরের পুরনো একটি প্রাসাদসম ভগ্নপ্রায় বাড়ি, পনেরো বিঘে জমির উপরে বিরাট পুকুর এবং সবুজে ঘেরা এক জমিদারি দালানকোঠা। বেশিদিন হয়নি নতুন দালানটি তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার নির্যাস দেড়শো বছরের পুরনো। মনে হবে, ঠিক উনিশ শতকের মাঝামাঝি।নাম ‘বাঘরোল বাসা’, যা বানিয়েছেন এক দল তরুণ, সংস্থার নাম ‘ফরেস্ট ডুয়েলার’-যাদের মূল লক্ষ্য — হাওড়ার বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং অঞ্চলের বিপন্ন প্রাণী বাঘরোল সংরক্ষণের মহাযজ্ঞ।

Image result for বাঘরোল বাসা

বন্যপ্রাণী আইনে বাঘ ও বাঘরোল— দুটি প্রাণীই প্রথম তফশিল ভুক্ত। অর্থাৎ বাঘ মারা যেমন অপরাধ, বাঘরোল মারাও। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা ভারত সরকারের তরফে এই অতিবিরল প্রাণীটিকে সংরক্ষণ করতে কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এ যাবৎ কালে যত গবেষণা হয়েছে, তাতে গবেষকরা জানিয়েছেন হাওড়ার আমতার অন্তর্গত কালবাস গ্রাম ও সংলগ্ন অঞ্চলে গোটা পাঁচেক বাঘরোল রয়েছে। এই সমীক্ষাগুলিকে নস্যাৎ করে ফরেস্ট ডুয়েলারের অন্যতম কান্ডারি শান্তনুর দাবি, অন্তত ত্রিশটি বাঘরোল রয়েছে কালবাস ও তার আশেপাশের গ্রামগুলিতে। তার দাবি সত্যি হলে, বাঘরোলের সংখ্যার বিচারে এটিই সবচেয়ে বেশি ঘনত্বপূর্ণ অঞ্চল। ‘ফরেস্ট ডুয়েলার’-এর ‘বাঘরোল’ বাসা আসলে তাঁদের অপারেশনের বেসক্যাম্প। কিন্তু তাঁর মূল উদ্দেশ্যটা ঠিক কী? ডুয়েলারদের কথা অনুযায়ী, যে কোনও প্লাবনভূমি তার আশেপাশে জলের রিজার্ভার তৈরি হয়। হাওড়ার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল খাল-বিলে ভরা। প্রতি বছর বন্যা হয়। ফলে এর তলায় বিরাট এক জলাধার আছে। জলজমিনের এই অঞ্চলকে বাঁচাতে পারলে বাঁচানো যাবে কলকাতা মহানগরীকেও। কখনোই কলকাতায় জলের অভাব হবে না হাওড়ার বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে পারলে। আর এই বাস্তুতন্ত্রের ওতোপ্রোতো অঙ্গ বাঘরোল। Image result for বাঘরোল
‘বাঘরোল বাসা’র চারদিকে গোপন ক্যামেরা বসানো আছে, যাতে ধরা পড়া ফুটেজ দেখলে চক্ষু চড়ক গাছে! রাতের অন্ধকারে পুকুর থেকে আড়াই কেজির মাছ অব্যর্থ নিশানায় তুলে নিয়ে যাচ্ছে দেড় হাত সাইজের বাঘরোল। বাঘরোল নিয়ে গ্রাম্য মানুষের নানা কুসংস্কার আছে। তাছাড়া সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে পুকুরের মাছ চুরি, খেতের ফসল চুরি বড় ক্ষতি। আজও তাই রাত জেগে মানুষ বাঁধ পাহারা দেয়। ক্ষেত পাহারা দেয়। প্রয়োজনে মেরেও ফেলেতে পারে।

Image result for বাঘরোল
এইখানেই উল্টো পথে হেঁটে সাফল্য পাচ্ছে, শান্তনুরা। ক্ষতির অনুপাত বুঝে, মাছের চারা দিচ্ছেন গ্রামীণ মৎস্যজীবিদের, যার ৭০ শতাংশ বাঁচলেও লাভ কয়েক গুণ বেশি। গ্রামের সম্পদকে বাঁচাতে সবার আগে সতর্ক হবে গ্রামবাসীদেরই। তাই প্রতিটি গ্রাম্য মেলায় তারা প্রচার করেন, পুকুরে বিষ না ছড়াতে। ইঞ্জিনিয়ারিং সেরে সাধারণ জীবন বেছে নেননি শান্তনু। বন ও বন্যপ্রাণী তথা বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের কাজে লেগেছেন। ‘ফরেস্ট ডুয়েলার’ সংস্থাটি বানিয়েছেন। ‘বাঘরোল বাসা’ শান্তনুদের ড্রিম প্রোজেক্ট। সংস্থার সদস্য বেশিরভাগই এলাকার লোক। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এসে ঘুরে গিয়েছে বাঘরোলবাসায়। এসেছেন পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার বিষয়ে উৎসাহী বিদেশী পর্যটকরাও। ‘ফরেস্ট ডুয়েলার’ ইতিমধ্যে সান্দাকাফুতে রেড পাণ্ডা সংরক্ষণের কাজ করেছে।

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 3

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “বাঘরোল কিন্তু বাঘ নয় !

Leave a Reply

Next Post

সেফটি ট্যাঙ্কের ঢাকনা গােল হয় কেন?

5 (3) সেফটি ট্যাঙ্ক মুখ থেকে ট্যাঙ্কের ঢাকনা একটু বড় মাপের হয় এবংগােল মুখে গােল ঢাকনা চমৎকার ভাবে বসে যায়, ঢাকনা যেমন-তেমন ভাবে রাখি না কেন। কিন্তু ঢাকনা যদি চারকোনা হত তাহলেও তাে ট্যাঙ্কের চৌকো মুখে ভালভাবে বসবে আশা করা যায়। কিন্তু ট্যাঙ্কের মুখ বা ঢাকনা চৌকো হয় না কেন? […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: