সভ্যতার আতঙ্ক : প্লাস্টিক ও থার্মোকল

@
0
(0)
       রােজকার মতাে সেদিন বেরিয়েছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য কোচবিহারের সাগরদিঘির পাড়ে। বিশুদার দাদার হঠাৎই অকাল প্রয়াণ হয়েছে। কি হয়েছে জানতে চাইলে বিশুদা বলল বেশ কয়েক
মাস ধরেই ওর দাদা হৃদরােগে ভুগছিলেন, সঙ্গে ডায়াবেটিস। এটুকু বলেই বিশুদা বেরিয়ে গেল। আজকাল প্রায় প্রত্যেক ঘরেই শােনা যায়,হৃদরােগ, ডায়াবেটিস, কিডনীতে স্টোন, আবার কারও বাড়িতে একজন
ক্যানসারে আক্রান্ত। এসব রােগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পিছনে নির্দিষ্ট একটি কারণ না থাকলেও অন্যতম একটি কারণ প্লাস্টিক ব্যবহার।
Image result for plastic
           সভ্যমানুষ আরাে আধুনিক হতে গিয়ে মাটির পাত্র, কাচের পাত্র ব্যবহার করে না, এমনকি ধাতব পাত্রের ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছে।রান্নাঘরের অনেক জায়গায়ই (যেমন কাপ, প্লেট, থালা, গ্লাস,প্লাস্টিক পেইন্ট, জলের বােতল) প্লাস্টিক দখল করে নিয়েছে। অন্যদিকে শিশুর খেলনা,ঔষধের মােড়ক, গৃহসজ্জার প্লাস্টিক দরজা,প্লাস্টিক সিলিং,প্লাস্টিক ডাইনিং টেবিল)সামগ্রী সর্বত্রই প্লাস্টিক ছাড়া চলে না।
Image result for plastic
         কর্মব্যস্ত মানুষ ব্যস্ততার মাঝে বাজার সারছে প্লাস্টিকের ব্যাগে, যেখানে গরম খাবারই হােক আর কই মাছই হােক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই বিভিন্ন ধরনের পলিমার আবিষ্কৃত হওয়ায় তাদের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কৃত্রিম পলিমার নির্মিত বস্তু দেখতে সুন্দর ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়ছে।কিন্তু প্লাস্টিকের ব্যবহার আমাদের পরিবেশকে দূষিত করে তুলছে বিভিন্ন ভাবে। জৈব অভদ্র হওয়ায় এরা মাটিতে মিশছে না, অর্থাৎ অনুজীব প্লাস্টিককে ভেঙে মাটিতে মেশাতে পারছে না। তাই স্তুপাকারে জমা থেকে জলনিকাশী ব্যবস্থার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। মাটির উর্বরতা শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। আবার এদেরকে পােড়ালে উৎপন্ন হচ্ছে অনেক বিষাক্ত গ্যাস। এখানে কয়েকটি প্লাস্টিকের উপাদান ও তাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলাে আলােচনা করা হল।
Image result for plastic
(ক) পলিভিনাইলক্লোরাইড (PVC):
       দৃঢ় এবং নমনীয় এই পলিমারটি দিয়ে শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে জলের পাইপ অনেক কিছুই তৈরি হয়। PVC এর মধ্যে থাকে থ্যালেট (Phthalate) যাকে বলে DEHP এবং dioctyl phthalate|
এই থ্যালেটের আছে হরমােন অনিয়মিত নিঃসরণের ধর্ম। তাই অনেক দেশেই এটা নিষিদ্ধ। বিকল্প হিসাবে যে রাসায়নিক পদার্থটি আছে সেটি হল DiNP, যার মধ্যেও কিন্তু কিছুটা Hormone Disruption বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে। এছাড়াও আছে, Lead,Cadmium-এর মতাে বিষাক্ত পদার্থ।
Image result for plastic toys
(খ) নিম্নঘনত্ববিশিষ্ট পলিইথিলীন (LDPE) :
          এই পলিমারটি সাধারণত,দুধের কার্টনের ব্যাগ, বেকারি সামগ্রীর প্যাকেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এই
ধরনের পলিমারে বিষাক্ত কিছু না থাকলেও এটা ইস্ট্রোজেনিক (estro-genic chemicals) ক্যামিক্যালস নিঃসৃত করে।
Image result for LDPE
                
             (গ) উচ্চঘনত্ববিশিষ্ট পলিমার (HDPE) : এই পলিমার দিয়ে দুধের বােতল, শ্যাম্পুর বােতল, ডিটারজেন্টের বােতল ইত্যাদি তৈরি হয়। এটার ব্যবহার নিশ্চিন্ত বলা হলেও ইস্ট্রোজেনিক রাসায়নিক নিঃসরণ করে যা শিশু বা কিশােরদের নিঃশব্দে ক্ষতি করে চলেছে। এতে nonyIphenol থাকে যা একটি endocrine disruptor । অর্থাৎ হরমােনের স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
Image result for HDPE
              (ঘ) পলিইথিলীন টেরিথ্যালেট (PET) : বহুল ব্যবহৃত এই প্লাস্টিক খাবার এবং পানীয় দ্রব্যাদি প্যাকেট জাত করতে দেখা যায়।এই প্ল্যাস্টিকে প্যাকেটজাত খাদ্যদ্রব্য বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসতে পারে না। তাই অনেকদিন টাটকা থাকে। কিন্তু এই পলিমার বানাতে ব্যবহৃত হয় পলিএস্টার যা জামাকাপড় থেকে শুরু করে কার্পেট, টায়ার, সেষ্টিবেল্ট সর্বত্রই পাওয়া যায়, তা কিছুদিনের মধ্যেই অ্যান্টিমনি নিঃসরণ করতে থাকে। অ্যান্টিমনি ট্রাইঅক্সাইড একটি কার্সিনােজেনিক (ক্যানসার সৃষ্টিকারী) পদার্থ। তাহলে বােঝাই যাচ্ছে এটা ব্যবহার কতটা নিরাপদ।Image result for pet plastic
             (ঙ) Polypropylene (PP): সস্, জেলি, বাটার, মারজারিন মেডিসিনের বােতল, ঔ, বেবি বােতল, স্যানিটারী প্যাড প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের প্লাস্টিকের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয় Oleamide, যা হাঁপানী (Asthma) রােগের জন্য দায়ী।Image result for pp plastic
(চ) পলিকার্বোনেট (PC): বেবি বােতল থেকে শুরু করে জলের ট্যাঙ্ক অনেক কিছুই বানানাে হয় এই পলিমার দিয়ে। এর অন্যান্য টেড নামগুলাে হল Makrolon, Lexan ইত্যাদি। এই প্লাস্টিকের ভাঙনে উৎপন্ন হয় bisphenol A (BPA) যা অত্যন্ত ক্ষতিকারক একটি পদার্থ।বিশেষ করে বিভিন্ন রকমের হরমােন (estrogen) নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটায়।
Image result for pc plastic
(ছ) পলিস্টাইরিন (থার্মোকল) : ফিনাইল ইথিলীন (stryrene) এর পলিমারাইজেনের মাধ্যমে পলিস্টাইরিন যা থার্মোকল নামে পরিচিত প্রস্তুত করা হয়। আজ আমরা সাধারণ প্লাস্টিক নিয়ে কিছুটা সচেতন হলেও
থার্মোকলের ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন।তাই ডেকোরেশানের কাজ থেকে শুরু করে থার্মোকলের থালা, বাটি গ্লাস ইত্যাদি অনেক জায়গাই দখল করে নিয়েছে এই থার্মোকল। যেকোনাে অনুষ্ঠানে অবলীলায় এর ব্যবহার চোখে পরার মতাে। সাধারণ প্লাস্টিকের মতাে এটাও জৈব অভঙ্গুর।জল, কাদা বা প্যাথােজেনেও এর ভাঙন দেখা যায় না। আবার স্তুপাকারে জ্বালিয়ে দিলে নির্গত হয় প্রচুর বিষাক্ত গ্যাস যা শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে হৃদরােগ সবকিছুর জন্যই অনেকাংশে দায়ী।
Image result for stryrene
           আধুনিক সভ্যতায় জড়িয়ে পরা মানুষ আজ আর প্লাস্টিক ছাড়া চলতেই পারবে না। একদিকে যেমন পাটজাত দ্রব্যাদি মানুষ আর ব্যবহার করতেই চাইছে না, আবার কাচের তৈরি জিনিসের ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা তাই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসাবে বিকল্প প্লাস্টিককেই বেছে নিয়েছে। উন্নততর প্লাস্টিক উৎপাদনের কয়েকটি উপাদানের কথা নিম্নে আলােচনা করা হল— জৈবিনাশী স্টার্চযুক্ত প্লাস্টিক biopol, পলিইথিলীন অ্যাডিলেট-কো-টেরিথ্যালেট, পলি ল্যাকটিক অ্যাসিড (PLA) যা dextrose থেকে উৎপন্ন করা হয়,পলিহাইড্রোক্সি বিউটাইরেট (PHB), পলিগ্লাইকো অ্যাসিড প্রভৃতি পলিমারগুলাে প্রায় জৈব ভঙ্গুর। কিন্তু এদের ভাঙনে বিশেষ কোনাে ক্ষতিকারক পদার্থ উৎপন্ন হয় না বললেই চলে।
Image result for PLA(PLA)
                    তাছাড়া Podegrant Concentrate (PDC) যেমন, কোবাল্ট স্টিয়ারেট, ম্যাঙ্গানিজ স্টিয়ারেট যারা কত জারণ ক্রিয়ার মাধ্যমে  প্লাস্টিককে ভঙ্গুর করে তােলে। তাছাড়া দুধ থেকে প্রাপ্ত মূখ্য প্রােটিন ‘Casein’ দিয়ে তৈরি প্লাস্টিক যা পলিস্টাইরিনের মতােই শক্তও দৃঢ় যা একটি জৈব ভঙ্গুর প্লাস্টিক। এ সমস্ত পদার্থ ছাড়াও মুরগীর পালক থেকে প্রাপ্ত কেরাটিন জাতীয় প্রােটিনও মিথাইল অ্যাক্রাইলেটের সঙ্গে,মিশিয়ে জৈব ভঙ্গুর প্লাস্টিক তৈরি করা সম্ভব। D2W (Degradable to Water) প্রযুক্তি প্রয়ােগের মাধ্যমে প্লাস্টিককে এমন আনবিক গঠনে পরিণত করা সম্ভব যা খুব সহজেই জৈব ভঙ্গুর হবে এবং খুবই সামান্য CO2, H20-এর সঙ্গে হিউমাসে পরিণত হবে। এই পদ্ধতিতে কোনাে বিষাক্ত গ্যাস বা মিথেন উৎপন্ন হয় না।
Image result for Degradable to Water
                সর্বোপরি নিজেদেরকে সুস্থ রাখার লক্ষ্যে বা নিজের পরিবেশকে সতেজ রাখার লক্ষ্যে আমাদের উচিৎ বিকল্প প্লাস্টিককে খুঁজে নেওয়া।প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে চিরাচরিত জিনিসের ব্যবহার বাড়ানাে। পুনঃব্যবহার যােগ্য জিনিসের ব্যবহার করা। আসুন সকলে মিলে পরিবেশকে সতেজ করি। জীবকুলের অস্তিত্বকে রক্ষা করি।
Image result for PLASTIC ban

ডঃ তপন দাস।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বাঘরোল কিন্তু বাঘ নয় !

0 (0) সরকারি মর্যাদা এবং স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও সে বঞ্চিত! আমাদের রাজ্য প্রাণী! প্রায়ই শোনা যায় বাঘ দেখা গেছে শহরের লোকালয়ে বা শিরোনামে একটি লাইনের দেখা মেলে, বাঘ সন্দেহে পিটিয়ে মারা হল বাঘরোল! কথায় বলে, ম্যান এন্ড এনিম্যাল কনফ্লিক্ট! বাঘরোল বা মেছো বিড়াল মাঝারি আকারের বিড়ালগোত্রীয় একধরনের স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণী। ব্রাজিল, […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: