আবহাওয়ার পূর্বাভাস।

আজ আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কথা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে লিখতে হবে। যে কোনো বিষয়ে আগাম কিছু বলতে হলে সবার প্রথমে সেই বিষয় সম্পর্কে বিশদে জানতে হবে। যেহেতু আমাদের বিষয় আবহাওয়া তাই সবার আগে জানতে হবে আবহাওয়া বলতে আমরা কী বুঝি। তার একটা সাধারণ সংজ্ঞা আছে। আমাদেরকে অর্থাৎ পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডলে প্রতিদিন যা ঘটে, যা আমরা প্রত্যক্ষ করি ও অনুভব করি তাই হল আবহাওয়া । যেমন বৃষ্টিপাত, ঘুর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ ইত্যাদি।

Image result for ঘুর্ণিঝড়তারপর জানতে হবে কেন ও কীভাবে হয়? তার উৎস কোথায়? পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা আসে সূর্য থেকে তাপশক্তি রূপে। সূর্য থেকে আসা তাপশক্তির প্রভাবে পৃথিবীর কোথায় কখন কী ঘটছে সেই তথ্য সংগ্রহ করা সবার আগে প্রয়োজন। সেই জন্য আবহাওয়া সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য গোটা বিশ্ব জুড়ে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে বিগত ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে। গোটা বিশ্বজুড়ে যে তথ্য সংগ্রহ হয় প্রতিদিন তা সুসংহত ভাবে নির্দিষ্ট সময়ে আদান প্রদান করা হয়। এভাবে যে তথ্য আমরা পাই তাকে নানা ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এই বিশ্লেষণ বা এনালাইসিস করে যে ইনফারেন্স বা পরিনামে পৌঁছান যায় তার উপর ভিত্তি করে আগামী সময়ে আবহাওয়া কী হবে তা বলা হয়। এটাই সাধারণ নিয়ম।

Image result for weather analysis

কিন্তু আবহাওয়ার কার্য্য কারণ সম্পর্ক এত সহজে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আবহাওয়া কোন একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই আবহাওয়াকে অনেকগুলি স্কেলে ভাগ করা হয়েছে। মাইক্রো স্কেল যা খুব ছোট জায়গায় সক্রিয় থাকে, মেস স্কেল যা ১০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, সিনপটিক স্কেল যা বিস্তৃত থাকে হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত। এরপরেও আছে প্ল্যানেটারি স্কেল আবহাওয়া ব্যবস্থা যা গোটা বিশ্বকে বেস্টন করে গতিশীল থাকে। Image result for planetary scale

এরপর যে বিষয়টি দেখা হয় তা হল আবহাওয়ার গতি প্রকৃতি। আবহাওয়া দুই দিকে গতিশীল থাকে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে ও পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। সাধারণত ক্রান্তীয় আবহাওয়া ব্যবস্থা বা ট্রপিক্যাল ওয়েদার সিস্টেম পূর্ব থেকে পশ্চিমে গতিশীল থাকে। উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আবহাওয়া পশ্চিম থেকে পূর্ব মুখে চলমান থাকে। এবার দেখতে হবে যে অঞ্চলের জন্য পূর্বাভাস দেওয়া হয় সেই অঞ্চলটি কী ধরনের আবহাওয়া ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে ক্রান্তীয় অথবা উপক্রান্তীয়? আমাদের মূল কনসার্ন ভারতীয় উপমহাদেশ অঞ্চলের আবহাওয়া পূর্বাভাস। আবহাওয়া ব্যবস্থা অনুসারে ভারতকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই অঞ্চলে বিভাজন করা যায়। ২০ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের উত্তরে ভারতের যে অংশ রয়েছে, রাজস্থান থেকে উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি, সেখানে ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় দুই ধরনের আবহাওয়া ব্যবস্থাই সক্রিয় থাকে। ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের আবহাওয়া ব্যবস্থা সাধারণত ক্রান্তীয় আবহাওয়া। সময়ের সাথে আবহাওয়া তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গুলি থেকে যে তথ্য সংগ্রহ হয় তার সাথে যুক্ত হয়েছে উপগ্রহের সাহায্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা। তথ্য আদান প্রদান ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি দ্রুত হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণের জন্য উন্নতমানের কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। উন্নত মানের আবহাওয়া মডেল তৈরি হয়েছে যেমন জি এফ এস, ডব্লিউ আর এফ ইত্যাদি।

 

Image result for WRF

এখন প্রতিদিন রিয়েল টাইম অনুসারে যে তথ্য পাওয়া যায় কম্পিউটারে সেই তথ্যের যোগান দিয়ে মডেল আউটপুট সংগ্রহ করা হয়। তাছাড়া আগে চার্টের উপর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য বসিয়ে বিভিন্ন চার্ট তৈরি হত যা থেকে আবহাওয়া ব্যবস্থা কোথায় কী আছে বা কী গতিতে চলাচল করছে তা অনুমান করা হত । এখন কম্পিউটারের সাহায্যে সেই সমস্ত চার্ট তৈরি হয়। তাই আবহাওয়া ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি খুব কম সময়ে জানা সম্ভব হচ্ছে। সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দিল্লির পূর্বাভাস কেন্দ্রের সথে অন্যান্য আঞ্চলিক কেন্দ্রের মত বিনিময় হয়। সবাই মিলে সহ মতের মাধ্যমে আবহাওয়া পূর্বাভাস দেওয়া হয়। আঞ্চলিক কেন্দ্র যেমন আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর থেকে পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জন্য পূর্বাভাস দেওয়া হয়। অন্যান্য আঞ্চলিক কেন্দ্র তাদের নিজেদের অঞ্চলের জন্য পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। দিল্লি থেকে গোটা দেশের জন্য পূর্বাভাস দেওয়া হয়। পূর্বাভাস দেওয়া হয় চার রকমের। তাৎক্ষণিক – কয়েক ঘন্টার জন্য, সর্ট রেঞ্জ – দুই থেকে তিন দিনের জন্য, মিডিয়াম রেঞ্জ- সাত থেকে দশ দিনের জন্য ও লঙরেঞ্জ – কয়েক মাস থেকে বছরের জন্য। ভারতে লঙ রেঞ্জ ফোরকাস্ট করা হয় শুধু বর্ষার চার মাসের জন্য। এখন শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন পূর্বাভাসও আলাদা ভাবে দেওয়া হয়। সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করার ফলে আবহাওয়াবিদরা গোটা বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থার গতি প্রকৃতি সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন। স্বল্প সময়ের জন্য অনেক বেশি সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আগে আবহাওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে পারসেপশনের কিছু ঘাটতি ছিল বলে আমার ধারণা। আবহাওয়া ব্যবস্থার চলাচল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে কখনই সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। আগে পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য যে সমস্ত ফোরকাস্টিং টুল ছিল আবহাওয়াবিদের হাতে তা সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য অপ্রতুল ছিল। ফলে পূর্বাভাস ভূল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল। এখন পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য অনেক বেশি টুল আছে আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের হাতে। তাই আবহাওয়া পূর্বাভাস সঠিক হবে সেটাই স্বাভাবিক।

Image result for weather analysis long range forecast
অজয় নাথ

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: