: অপারেশন ক্লিন আর্ট: একটা তুলি আর কিছু বেজীদের গল্প

@
5
(1)

কোনো কোনো ছবিতে রৌদ্রস্নাত সূর্যমুখীর দল নীল চাদরের মতো আকাশের কিনারে মিলিয়ে গেছে। কোথাও বিষাদঘন চন্দ্রালোকের ভেতর দিয়ে বরফঢাকা পাহাড়চূড়ার দিকে তাকিয়ে আছে একজন মানুষ। কখনো পৃথিবীর শেষ আগুনের সামনে প্রাণতর্পনের আগে সদ্যবিধবা শেষ হয়ে যাওয়া জীবনের তীরে দাঁড়িয়ে অগ্নিপরীক্ষার ওপারে যাবার অপেক্ষা করছে। যুগ পেরিয়ে যায়, ছবিদের স্বপ্নরা জ্বলজ্বল করে। সেই ঔজ্জ্বল্যের বৃত্তে বেজীদের আসতে মানা করেছে কেউ।

Image result for mongoose

কিন্তু বেজীরা এমন কি করল যাতে ভাবনা- কল্পনার ধাঁচা বদলানো তাবড় তাবড় সৃষ্টিগুলির সাথেও তাদের রোমের মতো সূক্ষ্ম হলেও একটা সম্পর্ক রয়েই গেল ? কারণ পৃথিবীতে লাখ লাখ তুলি তৈরী করা হয়েছে, যার মূল কাঁচামাল বেজীর লোম। শিল্প বা বিজ্ঞানের প্রয়োজনে প্রাণীদের ব্যবহার করার রীতিটা আজকের নয়। ইঁদুর, গিনিপিগ বা বাঁদরদের ডাইসেক্ট বা ইনজেক্ট করাই যেত, মানুষের জ্ঞানের জন্য, ওষুধের জন্য তাদের কমদামী জীবনের দাম আমরা মস্তিষ্ক দিয়ে হিসেব করতাম, কিন্তু ঠিক ঠিক বুঝতে পারতাম না। এমন অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র আছে, যাতে প্রানীদের দেহাবশেষ ব্যবহার করা হত, হয়তো এখনো হয়। যেমন ব্যাঞ্জো, একটা সময় পর্যন্ত বিড়ালের চামড়া ব্যবহার করা হত।

Image result for instrument made by animal skin

তারপর ধরুন, ইথিওপিয়ার ক্রার লায়রা, যেটা নাকি গরুর চামড়া দিয়ে তৈরী। বা, দক্ষিণ আমেরিকার চারাঙ্গো লুট, অনেকটা ছোটোখাটো গিটারের মতো, আরমাডিলোর শেল্ বা খোলস লাগে তৈরী করতে। আজ যেখানে পশ্চিম স্লোভেনিয়া, সেখানকার কতগুলো গুহা থেকে এরকমই একটা বাঁশি পাওয়া যায়। আজকের  নয়, ৬০,০০০ বছর আগেকার নিয়ানডার্থাল মানুষদের তৈরী করা। সেটাও পশুদেহ দিয়েই তৈরী ছিল, গুহা ভাল্লুকের পায়ের হাড়ের টুকরো দিয়ে কোনো আদিম শিল্পীর বানানো। যে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ভাঙা বাঁশিটা খুঁজে পান, তাঁরা সেটার একটা মাটির রেপ্লিকা বানিয়ে এক সুরকারকে দেন বস্তুটা বাজানো যায় কিনা, পরীক্ষা করতে। প্রথমে বুঝতে না পারলেও আচমকা একদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে বাজনার কৌশলটা আবিষ্কার করে ফেলেন সেই শিল্পী। প্রোফেসর শঙ্কুর একশৃঙ্গ অভিযানের কথা মনে পড়তে পারে।শঙ্কুর নৃতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী বন্ধু ক্রোল সেখানে মানুষের হাড় দিয়ে তৈরী একটা বাঁশি বাজান।

Image result for flute made of animal

মানুষের স্বপ্নরা সত্যি সত্যি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। তাদের রঙিন করে তুলতে অনেক রক্ত ও ঘামের প্রয়োজন হয়। বেজীরা কিন্তু কিছু না জেনে বুঝেই রক্ত মাংস দিয়ে বহুযুগ রঙতুলির এই খেদমত খেটে এসছে। এখন যদিও কারখানায় সিন্থেটিক তুলি তৈরী হয়, তবুও কিছু কিছু শৌখিন শিল্পী বেজীর লোম থেকে তৈরী তুলি ব্যবহারের অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। আবার বেশ কিছু শিল্পীরা, ইস্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা যারা অনেকে শখের বসেই ছবি আঁকেন তারা ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগতই নন। কিছুদিন আগেই বেজীর লোম থেকে প্রস্তুত তুলি বাজেয়াপ্ত করার জন্য ভারতবর্ষ জুড়ে অভিযান চালায় ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কনট্রোল ব্যুরো। আপাততঃ তাই আলোচনায় খানিকটাজায়গা নিতে পেরেছে বেজীকুল।

Image result for brush

উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও কেরালা- এই চারটি জায়গায় অভিযান চালিয়েছেন ডাবলিউ সি সি বি’র পদাধিকারীরা। গোটা অভিযানে, যার পোশাকি নাম অপারেশন ক্লিন আর্ট, ৫৪,৩৫২ টি তুলি ও ১১৩ কেজি রোম উদ্ধার করা গেছে। এই রোমের প্রায় সবটাই এসেছে ভারতীয় গ্রে বা ধূসর বেজীদের থেকে। যদিও ভারতে প্রায় ছয় প্রজাতির বেজী পাওয়া যায়, তবে এই ধূসর বেজীদের সংখ্যাই এখানে সবচেয়ে বেশি।

Image result for grey mongoose

যদিও বেজী ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ১৯৭২ অনুযায়ী শিডিউল ২ এর ২ নম্বর পার্টের অন্তর্ভুক্ত এবং এর চোরাচালান বা এদের কোনোরকম দেহাংশের মালিকানা জামিন অযোগ্য অপরাধ, তবুও তুলি বানানোর জন্য প্রতিবছর গড়ে লাখ খানেক বেজী মেরে ফেলা হয়। এই বিপুল চাহিদার পিছনে একটা কারণ হল বেজীদের রোম থেকে যে তুলি তৈরী হয়, তাদের রঙ ধারণ ক্ষমতা সাধারণ তুলির তুলনায় অনেকটা বেশী।

Image result for brush from mongoose skin

বেজীর রোমে তৈরী যেসব তুলি ভারতীয় বাজারে ঘুরে বেড়ায়, তাদের বেশিরভাগটাই তৈরী হয় উত্তরপ্রদেশের শেরকোটে, এই জায়গাটাকে ভারতের ব্রাশ ক্যাপিটাল বলা যায়। এখান থেকে রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড, মহারাষ্ট্র, কেরালা, কর্নাটক, তামিলনাড়ু বা পশ্চিমবঙ্গের দোকানে বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এইসব তুলি।

Image result for indian brush capital

সাধারণতঃ কিছু ভারতীয় উপজাতিরা জাল পেতে বেজী শিকার করে থাকেন। একবার ধরতে পারলে বারংবার আঘাত করতে করতে মেরে ফেলার পর এর মাংসটুকু খেয়ে ফেলা হয় বা বিক্রি করে দেওয়া হয়। রোমটুকু চালান হয়ে যায় তুলির কারিগরদের কাছে। একেকটি বেজী থেকে ২০ গ্রাম মতো রোম পাওয়া যেতে পারে। হিসেব করে দেখলে বোঝা যায়, প্রতি এক কেজি বেজীর রোমের জন্য পঞ্চাশটি বেজীকে শিকার করতে হয়। ২০১৯-এ যেখানে এরকম বাজেয়াপ্ত করা তুলির সংখ্যা ৫৪০০০ কিছু বেশি, ২০১৮ তে সেটার সংখ্যা ছিল ৭৯০০০- এর মতো। সুতরাং ভারতের মতো দেশে শুধু তুলির প্রয়োজনে কি বিপুল  সংখ্যক বেজী শিকার করা হয়, বেশ সহজে বোঝা যায়। আর সেটা হয় কনভেনশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড স্পিসিজ অফ ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা’র আইন কানুনকে তোয়াক্কা না করেই।

Image result for mongoose trap

এবার আসা যাক ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কনট্রোল ব্যুরো’র প্রসঙ্গে অর্থাত যাদের পরিচালনায় এই গোটা অভিযানটা সম্পন্ন হয়েছে। এদের সদর দপ্তর নয়া দিল্লীতে। পাঁচটি আঞ্চলিক অফিস আছে দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই ও জব্বলপুরে। গুয়াহাটি, অমৃতসর ও কোচিনে আছে আরো তিনটি সাব রিজিওনাল অফিস। এছাড়া পাঁচটি সীমান্তেও এদের কার্যালয় আছে। সারা ভারতে বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত যেকোনো সংগঠিত অপরাধ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট অপরাধ সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ, কাস্টম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্মিলিত ভাবে বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত সবরকম চোরাই কারবার বন্ধ করা – এরকম বেশ কিছু দায়িত্ব সামলাতে হয় এই ব্যুরো’কে।

এই ব্যুরোই আপাততঃ বেজীর রোমের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করবার চেষ্টা চালাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। যে উপজাতীয় মানুষেরা বেজীর রোমের ব্যবসার ওপর এখনো নির্ভরশীল, তাদের বিকল্প জীবিকার কথা ভাবাও বাদ নেই। তবে শিল্পী মহলের থেকেও এবার থেকে আরেকটু সচেতনতা আশা করাই যায়।

Image result for stop mongoose killing

শুভজিৎ কর চৌধুরী

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

সৌরকলঙ্ক

5 (1) সূর্য হল সৌরজগতের মূল কেন্দ্র। সূর্যকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে অবিরাম ঘুরে চলেছে গ্রহগুলি। দিনের আকাশে যে সূর্যকে আমরা দেখি সেটিই সূর্যের সবটা নয়। এটি সূর্যের মধ্যের একটি অংশ মাত্র।সূর্যের প্রচন্ড আলাে এবং তাপের উৎস এটিই। সূর্যের দেহভরের অধিকাংশই এখানে স্তুপীকৃত। এই অংশটির নাম আলােকমন্ডল।আলােকমন্ডলের বাইরেও রয়েছে সূর্যদেহের […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: