জাতকের গল্প

বাদুড়-bat

টুকান, টুবাই আর টুলদের আব্দারে মাঝে মাঝেই গল্প তাে বলতেই হয়—কাজেই অফিস থেকে এসে সেদিন একটু বিশ্রাম নেওয়ার  ফাঁকেই শুরু করলাম গল্প ‘এক যে ছিল রাজা যিনি ছিলেন ধর্মভীরু। তার
নাম ব্রহ্মাণও। সবেতেই ভয় পেতেন। আর এই ভয়াকে কাজে লাগিয়ে পুরােহিতরাও কিছু রােজগার করে নিতেন।
সেদিন মাঝরাতে রাজা প্রথমে বাদুড়, তারপর কাক, এইভাবে গরু,কোকিল, বানর, হরিণ, ঘােড়ার চিৎকার ও একটি মানুষের গান শুনতে পেলেন। রাজার খুবই ভাবনা হল। পরদিন রাজা পুরােহিতদের কাছে এর ব্যাখ্যা শুনতে চাইলেন।

Image result for কাক ও কোকিল
রাজপুরােহিত মাথা নেড়ে বললেন, ‘অশুভ বিষয়। আপনাকে এক মাস যত্ন করে এক হাজার পশু বলি নিয়ে পাপমজ হতে হবে।’রাজা সম্মতি দিলে যাতের আয়োজন শুরু হল। কিন্তু রাজপুরােহিতের এক শিষ্য বললেন, ‘গুরুদেব, কেন রাতারি অপব্যয় করছেন। রাতে রাজা আটটি প্রাণীর কণ্ঠস্বর শুনেছেন। এর কোনাে ব্যাখ্যা তাে শাস্ত্রে নেই।’ পুরােহিত বললেন, ‘আছে। সে শাস্ত্রের নাম স্বার্থশাস্ত্র। মাঝে মাঝে
আমাদের প্রাপ্তিযােগ হয় সেই শাস্ত্রের মাধ্যমে। তুমি যখন সংসারী হবে,তখনি বুঝতে পারবে।’
‘এ তাে ধর্মের নামে বুজরুকি। এর মধ্যে আমি নেই।”কেন, এত পূজা-অর্চনা-এর ফলেও তাে রাজার পূণ্য হবে।‘ভালাে কথা, কিন্তু আমি চললাম।’ শিষ্য বিদায় নিল। পথে এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা হলে তাকে প্রণাম করে শিষ্য সব কথা বলে পরামর্শ চাইল। বলল, আপনি সন্ন্যাসী। আপনি এই স্বার্থশাস্ত্রের ব্যাপারটা রাজাকে বলুন। যজ্ঞে এক হাজার পশু বলি হবে ভাবলেই আমার খারাপ লাগে।’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘রাজা নিজে যদি আমায় জিজ্ঞাসা করেন, তখন বলতে পারি।’
শিষ্য রাজার সঙ্গে দেখা করে জানালাে, ‘বাগানে এক সাধু এসেছেন, মহারাজ, আপনি তাকেও এই বিষয়টা জানাতে পারেন।রাজা বাগানে গিয়ে সাধুকে প্রণাম করে এসবের অর্থ জানতে চাইলেন।
সাধু বললেন, ‘অর্থ আছে। বাদুড় বলছে রাজার বাগানের গাছগুলি জাল দিয়ে ঢাকা থাকলে তারা খাবার পাবে না।’

Image result for বাদুড়

‘দ্বিতীয়ত কাকের কথা হল যে তার বাসা আছে রাজতােরণে উপর। রাজহস্তী যখন তােরণ পার হয় ঠিক তখনই মাহুত অঙ্কুশ দিয়ে আঘাত করে ডিমগুলি ফেলে দেয়। তাই কাক বলছিল— এ রাজ্যে কি বিচার নেই?

Image result for কাক
এরপর গােরু বলছিল, আমায় সব দুধ রাখাল এমনভাবে দুয়ে নেয় যে বাছরটা একটুও দুধ পায় না। রাজার এত গরুর দুধেও পেট ভরে না?

Image result for cow
আপনারই পােষা কোকিল বলছিল, আমায় রাজা বন্দি করে আমার কান্না শুনে ভাবেন আমি গান গাইছি। আমায় ছেড়ে দিলে আমি বনে চলে যাই।

Image result for cuckoo bird singing
এবার হরিণের কথা। সে বলছে আমি বনের মধ্যে সুখে ছিলাম।বাঘের ভয় থাকলেও সেখানে আমার বন্ধুরা ছিল।পাহাড় ছিল, ঝরণা ছিল, মুক্তি ছিল, এমন বেড়া ছিল না।

Image result for হরিণ
বানর বলছে, আমি রাজার কোনাে ক্ষতি না করলেও রাজা আমায় বেঁধে রেখেছেন। সপ্তমে শুনেছেন ঘােড়ার ডাক। সে বলছিল, সহিস আমার দানা চুরি করে, আমি ভালাে করে খেতে পাই না। দুর্বল হয়ে
জোরে ছুটতে পারি না। সবার শেষে আমি গান গাইতে গাইতে ফিরছিলাম। বলছিলাম, দুষ্ট ও লােভীদের হাত থেকে রাজাকে রক্ষা করুন।

Image result for horse
এই ব্যাখ্যা শুনে রাজা অবাক হলেন। বললেন, তাহলে আমার কী করা উচিত?
ভালাে করে চিন্তা করে বিচার-বিবেচনা করে আপনিই সিদ্ধান্ত নিন কী করা উচিত? যাতে কারও ক্ষতি না হয় সেটা দেখুন। কাকের ডিম না ভাঙে। বাছুরেরা যেন দুধ পায়। কোকিল, বানর, হরিণকে ছেড়ে দিন। ঘােড়ার দানা চুরি ও চাবুক মারা বন্ধ করুন। আর যজ্ঞে বলি দেবার জন্য যে সব পশু এনেছেন, তাদের ছেড়ে দিন। যজ্ঞ বন্ধ করে তার অর্থ দিয়ে আতুর-শালা প্রতিষ্ঠা করুন। সত্যিকারের ভালাে কাজ বলে যা মনে হয় তাই-ই করুন।।
রাজা সব বুঝে যজ্ঞ বন্ধ করে দিলেন। ফলে অকারণ ভয় থেকে তিনি মুক্ত হলেন।

নির্মাল্য দাশগুপ্ত

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: