প্রবাল প্রাচীর

@
5
(1)

বেড়ানাে এখন আর কোনাে দেশের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নেই ছড়িয়ে পড়েছে গােটা বিশ্ব জুড়ে। এমনি এক অসাধারণ বেড়াবার জায়গা হল মহান প্রবাল প্রাচীর বা Great Barrier Reef। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম রয়েছে ভারত মহাসাগর আর পূর্বে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটা অংশ প্রবাল সাগর। প্রবাল সাগরে রয়েছে প্রবাল প্রাচীর ও প্রবাল দ্বীপ। ২৯০০টি প্রবাল প্রাচীর ও ৯০০টি প্রবাল দ্বীপ মিলিয়ে পুরাে প্রবাল প্রাচীর অঞ্চল গঠিত। ২৩০০ কিলােমিটার দীর্ঘ আর ৩,৪৪,৪০০ বর্গ কিলােমিটার জুড়ে প্রবাল দ্বীপ ও প্রবাল।প্রাচীর মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। লক্ষ লক্ষ কোটি অতি ক্ষুদ্র প্রাণী।প্রবাল কীট প্রবাল প্রাচীরের নির্মাতা। পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের একটি।১৯৮১ সালে প্রবাল প্রাচীর World Heritage Site বলে স্বীকৃতহয়েছে অসংখ্য প্রজাতির জীবের আশ্রয় স্থল বলে।

Image result for Great Barrier Reef
প্রবাল প্রাচীরের একটি বড় অংশ Great Barrier Reef Marine Park-এর অন্তর্গত। পর্যটন ও মৎস্য ব্যবসা যে কোন স্থানের সামুদ্রিক জীব জগতের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। তাই মেরিন
পার্কের আওতায় এনে মৎস্য ব্যবসা ও পর্যটন খানিকটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বছরে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটককেই এখানে আসতে দেওয়া হয়। মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে যেমন জলের বয়ে যাওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন, বিশ্ব উষ্ণায়ণ ইত্যাদি প্রবাল প্রাচীর নষ্ট করছে। প্রবাল প্রাচীরের ব্লিচিং বা প্রবাল সমুহের উপর থেকে এককোষী এলগি বা শেওলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া কিছু সময় পর পর স্টার ফিশ বা তারা মাছের একটি বিশেষ প্রজাতি Crown of thorns starfish সংখ্যায় অনেক গুন বেড়ে যায় যা প্রবাল এবং প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি করে। এই সমস্ত কারণে ১৯৮৫ সালের পর থেকে প্রবাল প্রাচীরে প্রবাল কাট অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।

Image result for Great Barrier Reef
অস্ট্রেলিয়ার জন জাতিদের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে প্রবাল প্রাচীর জড়িয়ে আছে। পর্যটন ব্যবসা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে আছে। বছরে প্রায় ৩০০ লক্ষ কোটি ডলার আয় হয় শুধ প্রবাল
প্রাচীর পর্যটন ব্যবসা থেকে। দক্ষিণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে, উত্তরে পাপয়া নিউগিনি থেকে দক্ষিণে লেডি ইলিয়েট ও ফ্রেজার দ্বীপ পর্যন্ত প্রবাল প্রাচীর ও প্রবাল দ্বীপের অবস্থান। টেকটনিক প্লেট থিওরি মতে
সিনজয়িক সময় অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে অস্ট্রেলিয়ান প্লেট বছরে সাত সেন্টিমিটার হারে উত্তরের দিকে সরতে থাকে। এই সময় কুইন্সল্যান্ড অঞ্চল সমুদ্রতল থেকে কিছুটা উপরে উঠে যায়।
ঘটতে থাকে একের পর এক অগ্ন্যুৎপাত। বেশ কয়েকটি দ্বীপ ভূমির উদ্ভব হয়। প্রবাল দ্বীপগুলির জন্ম এই সময়। আড়াই হাজার কোটি বছর আগেও কুইন্সল্যান্ড অঞ্চল নাতিশীতােষ্ণ অঞ্চলে ছিল। সমুদ্রের জল ঠান্ডা থাকার জন্য প্রবাল কীটের বৃদ্ধি স্তিমিত ছিল। ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়া প্লেট ক্রান্তিয় জল সীমায় চলে আসার পর প্রবাল প্রাচীরের বৃদ্ধি শুরু হয়। সমুদ্রজলের ১৫০ মিটার নীচ পর্যন্ত তার অবস্থানের কারণে সূর্যের আলাে তার চেয়ে গভীরে যায় না। সূর্যের প্রবল উত্তাপের জন্য প্রবাল কীট জলের উপরেও থাকতে পারে না। প্রতি বছর প্রবাল প্রাচীর প্রস্থে ১ থেকে ৩ সেন্টিমিটার আর উচ্চতায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিভিন্ন রকম টাল মাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাল দ্বীপ ও প্রবাল প্রাচীর তৈরি হয়েছে।

Image result for Great Barrier Reefবর্তমান প্রবাল প্রাচীর সম্পূর্ণ রূপ পেয়েছে ৬ লক্ষ বছর আগে। তবে ৪ লক্ষ বছর আগে আন্তঃহিম
যুগ উষ্ণ সময়ে সমুদ্র জলের তাপ মাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায় ফলে প্রবাল কীটের বৃদ্ধি কমে যায়। দু’লক্ষ বছর আগে আবার প্রবাল কীটের বৃদ্ধি শুরু হয়। প্রবাল প্রাচীরের বর্তমান অবস্থা ছয় থেকে
আট হাজার বছর আগে শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রঙের জীবন্ত প্রবাল ফুলের মতাে ছড়িয়ে আছে প্রবাল প্রাচীর ও প্রবাল দ্বীপ অঞ্চল জুড়ে।প্রবাল প্রাচীরের বিশ্ব জোড়া খ্যাতি তার জীব জগতের বৈচিত্র্যের জন্য। তিমি, শুশুক বা ডলফিন এবং জলজ স্তন্যপায়ী মিলিয়ে প্রায় ৩০টি প্রজাতির সামুদ্রিক জীবের বাস প্রবাল প্রাচীরে।

Image result for Great Barrier Reefএদের মধ্যে রয়েছে বামন আকারের তিমি, পিঠে কুজ যুক্ত ডলফিন ও তিমি। আর আছে ডাগগন নামে জলহস্তীর মতাে প্রাণী। ১৫০০ প্রজাতির মাছ।মাছেদের কয়েকটি বিশিষ্ট প্রজাতি হল ক্রোন ফিশ, রেডবাস, লালমুখাে এমপারার আর কয়েক রকমের প্রবাল ট্রাউট (Coral Trout)। আছে ১৭ রকমের সামুদ্রিক সাপ যারা প্রায় ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিচরণ করে। ছয়টি প্রজাতির কচ্ছপ প্রবাল প্রাচীর এলাকায় আসে ডিম পাড়তে। এদের মধ্যে অলিভ রিডলের মতাে নজর কাড়া প্রজাতির কচ্ছপও রয়েছে। ১৫টি প্রজাতির সামুদ্রিক ঘাস আছে জলের নীচে যা মাছেদের আশ্রয় স্থল। প্রবাল প্রাচীর ও প্রবাল দ্বীপের প্রান্তে সুন্দরী গাছের জঙ্গলে আছে মিষ্টি জলের কুমীর, সুন্দরবন অঞ্চলের মতাে। ১২৫টি প্রজাতির হাঙ্গর রয়েছে এখানে। ২২৫টি প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এখানে প্রতি বছর বাসা বাঁধে ডিম পাড়তে ও বাচ্চা ফোটাতে।
এদের মােট সংখ্যা এক লক্ষ চল্লিশ হাজার থেকে এক লক্ষ সত্তর হাজার। প্রবাল প্রাচীরের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে এই পরিযায়ী পাখিরা আসে। এছাড়াও আছে ২২০০টি প্রজাতির গাছ পালা লতা গুল্ম ইত্যাদি।

Image result for Great Barrier Reefকিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন এবং সময় সময় তীব্র এলনিনাে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য্য ধীরে ধীরে নষ্ট করে দিচ্ছে। প্রবাল কীট বেচে থাকে অত্যন্ত কম মাত্রায় তাপমানের হের ফেরের মাধ্যে। অধিক উষ্ণতা বা অধিক শীতলতা সহ্য করতে পারে না। তাই এলিমিনাে বা লানিনা তীব্র হলে প্রবাল কটি ও প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি হয়।পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের জলের তাপমাত্রা কখন কখন বেড়ে যায়। না কমে যায়। তাপমালার বৃদ্ধি ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে তাকে বলা হয় এলনিনাে, একই মাত্রায় তাপমান কম হলে বলা হয় লানিনা। জলের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি বেড়ে গেলে বলা হয় তীব্র এল নিনাে। আবার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি কমে গেলে বলা হয় তীব্র লা নিনা।জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থেকে এল নিনাে আবার স্বাভাবিক, তা থেকে লা নিনা হয়ে আবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার একটি চক্র সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে কম বেশি চার বছর।

Image result for Great Barrier Reef elnino episode
এলনিনাে বা লানিনা সাধারণত শুরু হয় বছরের শেষে। অধিকাংশ সময় এলনিনাে সাত থেকে নয় মাস স্থায়ী হয়। আবার কখন দেড় থেকে দু’বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। সাত থেকে নয় মাস স্থায়ী হলে বলা হয় এলনিনাে অবস্থা। কিন্তু তার চেয়ে বেশি সময় স্থায়ী হলে হয় এলনিনাে এপিসােড। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এলনিনাে শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তা অতি তীব্র আকার দেয়। চলে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত। মার্চ মাস থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। জুন মাসের মধ্যে জলে তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
এটি হল এল নিনাে এপিসােড। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে জলের তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। ২০১৪-১৬র এল নিনাে এপিসােড গােটা বিশ্বে প্রভাব ফেলেছে। বিশ্ব উষ্ণায়ণ ও জলবায়ুর
পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এল নিনাে ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছিল।ভারতে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালের বর্ষায় (জুন থেকে সেপ্টেম্বর)বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম ছিল। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মের দাবদাহে ২৫০০র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ভারতে।মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছিল।এলনিনাের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি হয়। ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৬-এর এল নিনাে প্রবাল প্রাচীরের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। ২০১৫-১৬-র এল নিনাের জন্য মারাত্মক ক্ষতি না হলেও খানিকটা ক্ষতি অবশ্যই হয়েছে। এল নিনাে সম্পূর্ণ ভাবে প্রাকৃতিক তাই আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু জলকে নানা ভাবে দূষিত করা, কীট নাশকের ব্যবহার, আবহাওয়া মণ্ডলে বেশি বেশি পরিমান গ্রীণ হাউস গ্যাস উৎক্ষেপণ, সবটাই মানুষের জন্য।

Image result for Great Barrier Reef elnino episode
মনে হতে পারে প্রবাল প্রাচীর অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ব্যাপার তার জন্য আমরা ব্যস্ত হব কেন? কিন্তু বর্তমান সময়ের উন্নত প্রযুক্তির যুগে আমরা সবাই এক বিশ্ব জোড়া গ্রামের বাসিন্দা। We live in a global village তাই এক জনের ঘরে আগুন লাগলে তার আঁচ আমাদের গায়েও লাগবে।

অজয় নাথ

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

জেনে নাও কিছু আজানা তথ্য

5 (1) কাঠঠোকরার মাথাব্যথা হয় না কেন? এমন তােমরা অনেকেই দেখেছ যে কাঠঠোকরা গাছের ডালে তার লম্বা ঠোঁট দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করছে। যার ঠক্ ঠক্ আওয়াজ অনেক দূর থেকেও শােনা যায়। কাঠঠোকরা এক সেকেন্ডে কুড়ি বার ডালে আঘাত করতে পারে। অথচ তার মাথায় কোন ক্ষতি হয় না। এর কারণ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: