‘নিপাহ’ ছড়াতে ফলাহারী বাদুড় কতটা দায়ী?

@
0
(0)
খবরের কাগজ ও টিভি-র দৌলতে সম্প্রতি জনমানসে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়েছে।অনেকেই ফল খাওয়া এড়িয়ে চলছেন।অথচ এই ফলের মরশুমে বাজারে এখন হরেক রকমের ফল। ফলের ব্যবসায় তাই এই সময়ে ব্যাপক আকারে না হলেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে, বৈকি! অথচ আমাদের এই ফল খাওয়াকে এড়িয়ে চলাটা একেবারেই কিন্তু যুক্তিসংগত ও বাস্তব বুদ্ধিসম্মত নয়।
Image result for bat eating fruit
নিপাহ ভাইরাসের সঙ্গে ফলাহারী বাদুড়-এর একটা যােগ আছে। সেটা সত্যি হলেও ফলের মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমণের তত্ত্ব আজ অবধি কিন্তু সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। বরং নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ বিস্তারের রূপরেখা কোটি, এই প্রশ্নে কিছুটা হতবুদ্ধি ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই রয়েছেন বিশ্বের আপামর বিজ্ঞানীমহল। এর কারণ হল—১৯৯৮-এর সেপ্টেম্বরে প্রথমবার মালেশিয়ায় সংক্রমণের ঘটনা নজরে আসবার পর থেকে আজ পর্যন্ত যে কয়বার সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রতিবারই কোনও বিশেষ‘একটি কারণ দেখা যায়নি। প্রথম ঘটনায় শূকরের সংক্রমণ যেমন নজরে এসেছে, পরবর্তীতে ভাইরাস সংক্রামিত খেজুরের রস ও বাদুড়ের উপস্থিতি দেখা গেছে বাংলাদেশ (২০০১ সালে) ও নদীয়া (২০০৭ সালে)-র ঘটনায়, আবার শিলিগুড়ির ঘটনায় (২০০১ সালে)এগুলাে কিছুই তেমনভাবে নজরে আসেনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মানুষের মধ্যে রােগের সংক্রমণ দেখা গেছে এবং মানুষ থেকে মানুষে তা ছাড়িয়েছে।
Image result for nipah virus
এবারের কেরালার ঘটনায় বাদুড়ের সংযােগ (উপস্থিতি) আপাতভাবে নজরে এলেও, সেই সমস্ত বাদুড়ের দেহে ভাইরাসের উপস্থিতি বা নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরী হওয়া অ্যান্টিবডির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে এবারও রােগ ছড়ানাের নির্দিষ্ট কোনও কারণকে চিহ্নিত করা যায় নি।
নিপাহ ভাইরাসজনিত রােগটির প্রকৃতি আলােচনা করলে বিষয়টা বােধ করি একটু পরিষ্কার হবে। নিপাহ (Nipah)ভাইরাস সম্পর্কে প্রথম জানা যায়।মালেশিয়ার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ‘নেগেরি সেমবিলান’ জেলার ‘ক্যাম্পাঙ্গ সাঙ্গাই নিপাহ’ নামক গ্রামে শূকর খামারীদের অজানা জ্বরে মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের সুবাদে। তখন শূকর ও মানুষের (খামারীদের) দেহে এক নতুন ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়, যা ‘হেন্ড্রা’ নামক ‘প্যারামিক্সো’ জাতীয় একধরনের আর এন এ ভাইরাসের দোসর। ১৯৯৪ সালে এই হেন্ড্রাভাইরাস মিলেছিল।
Image result for hendra virus
অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন’ শহরের অদূরে ‘হস্রা’ নামক জায়গায়। একসাথে ঘােড়া ও মানুষের শরীরে। নতুন ভাইরাসটি ও হো ভাইরাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানালেন, মালেশিয়ায় খোঁজ পাওয়া নতুন
ভাইরাসটি পুরােপুরি হেভ্রা ভাইরাসের মত নয়। এটি একটি নতুন প্রজাতির ভাইরাস। নাম দেওয়া হল—“নিপাহ’ (গ্রামটির নাম থেকে)।
আর ভাইরাসের জেনাস করা হল—হেনিপাহ (হো ও নিপাহ-র সমন্বয়ে)।
নিপাহ ভীষণ মারাত্মক ও মানুষে ছোঁয়াচে রােগ সৃষ্টিকারী একটি ভাইরাস। মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনকেফেলাইটিস) তৈরী করে বলে মাথা।যন্ত্রণা, ঝিমুনী, জ্বরে ভুল বকা, স্মৃতিলােপ পাওয়া, পরের দিকে খিচুনী ও মৃত্যুর আগে কোমায় চলে যাওয়া এই সংক্রমণের রােগ-লক্ষণ।লালারস, ঘাম, মুত্র ও অন্যান্য দেহ-নিঃসৃত জলীয় পদার্থের মাধ্যমে এই ভাইরাস আক্রান্ত রােগীর থেকে বেরিয়ে আসায় তার সংস্পর্শে
থাকা মানুষেরা সহজেই আক্রান্ত হন। এইভাবে দ্রুত রােগ ছড়ায় বলে রােগের মড়ক তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ছোঁয়াচে ও ভীষণ ক্ষতিকর (প্রাণঘাতী) বলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘বায়াে-সেফটি লেভেল ফোর’ রােগজীবাণুর তালিকায় এই ভাইরাসকে রেখেছে। এই তালিকায় এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবােলা, সার্স, জিকা প্রভৃতি উঠতি ত্রাস সৃষ্টিকারী ভাইরাসরা রয়েছে।
Image result for nipah virus
এখন পর্যন্ত জানা তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাস মানুষে রােগবিস্তার করে তার মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে; অথচ বাদুড়সহ বেশ কয়েকটি স্তন্যপায়ী প্রাণী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকে। এমনকি, এদের দেহে কোনও রােগলক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না।গরু, ঘােড়া, কুকুর ও বিড়ালের মধ্যে এই অদ্ভুত বিশেষত্ব চোখে পড়েছে। ফলাহারী বাদুড়ের বেশ কয়েকটি প্রজাতি নিপাহ ভাইরাসের স্বাভাবিক পোষক (ন্যাচারাল হােস্ট)। এদের মধ্যে একটি অদ্ভুত পারস্পরিক সখ্যতা লক্ষ করা গেছে। বাদুড় তার অধিক রােগ প্রতিরােধী ক্ষমতার বলে একদিকে যেমন নিপাহ ভাইরাসকে ঠেকিয়ে রাখে, রােগ সৃষ্টি করতে দেয় না; তেমনি এই ভাইরাসও বাদুড়ের রােগ প্রতিরােধী ক্ষমতাকে (ইমিউন সিস্টেমকে) পাশ কাটিয়ে নিজের অস্তিত্বকে বাদুড়ের দেহে বজায় রাখে ও বংশ বিস্তার করে। এভাবে পারস্পরিক বােঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে দুপক্ষের স্বার্থ চরিত্যর্থ হয়। কিন্তু সবকিছু গােল বাধে বাদুড়ের স্বাভাবিক জীবনে ছন্দ-পতন ঘটলে। বাদুড় খাদ্য ও বাসস্থানের স্বল্পতাজনিত কারণে চাপে (স্ট্রেস) থাকলে তার রােগ প্রতিরােধী ক্ষমতা কমে যায়, ফলে তার দেহে ভাইরাসের সংখ্যা বেড়ে যায়। সংখ্যাবৃদ্ধি হয় বলে ভাইরাস বাদুড়ের দেহ থেকে বেরিয়ে পড়ে অন্য পােষকের খোঁজে। একে পরিভাষায় বলে ‘স্পীল ওভার’ (উপচে পড়া)। এই স্পীল ওভারই যাবতীয় সমস্যার মূলে। বাদুড়ের লালারস, ঘাম ও মূত্রের মধ্যে দিয়ে দেহের বাইরে বেড়িয়ে আসে। এইসময় অন্তবর্তী পােষক (ইন্টারমিডিয়েট হােস্ট) এবং মানুষে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। শূকর হল ইন্টারমিডিয়েট হােস্ট।বাদুড়ের মুখ দেওয়া খেজুর ও তালের রস বা ফল তখন ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যম হতে পারে।উপযুক্ত ওষুধ ও টীকা এখনও না তৈরি হওয়ায় নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে। তবে উপায়?
Image result for nipah virus
ভাইরাস-সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে প্রয়ােজন জন-স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা। যথাসম্ভব ভাইরাসের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে আমাদের।
নুন্যতম কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই তা সম্ভব। গৃহপালিত পশুর পরিচর্যার পর ভাল করে সাবান জলে হাত ধুয়ে নিতে হবে। খেজুর ও তালের রস সরাসরি না খেয়ে অন্তত আধঘণ্টা রৌদ্রে রেখে অথবা ফুটিয়ে তার পরে খেতে হবে। যে কোনও জিনিস খাবার আগে হাত পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে। সেটা সাবান জলে হলেই ভাল। জলে ধুয়ে ফল খাওয়ার অভ্যেস ত্যাগ করতে হবে। মাটিতে পড়ে থাকা ফল বা কিছুটা খাওয়া’ ফল পরিহার করা উচিত। বাজারে থেকে কেনা ফল বা গাছের টাটকা ফলকে ধুয়ে খেতে হবে। খুব ভাল হয়,ফলগুলােকে ৩-৫ মিনিট নুন জলে (১ লিটার জলে আধ চামচ নুন)ডুবিয়ে, পরে সাধারণ জলে ভাল করে ধুয়ে নিলে। তাতে নােনতা-স্বাদ আর থাকবে না। জীবাণু ও ভাইরাস নােনা-জলে বিনষ্ট হয়ে যাবে।
সিদ্ধার্থ    জোয়ারদার

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

সমস্ত মানচিত্রের উপরের অংশ কেন উত্তর দিক হিসেবে চিহ্নিত ?

0 (0) দেওয়ালে টাঙানাে বা বইয়ের পাতায় ছাপা সমস্ত মানচিত্রের উপর অংশ হল উত্তর দিক। ভারতের মানচিত্রে কাশ্মীর রাজ্যকে সব সময় উপর দিকেই দেখি। এই রীতির পেছনে কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। মানচিত্র আঁকার আদিকাল থেকেই এই রীতি চলে আসছে। ইজিপ্টের (মিশর) বিজ্ঞানী টলেমি প্রথম মানচিত্র তৈরি করেন। তিনি বিশ্বাস […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: