পিঁপড়ের ভার বহন ক্ষমতার রহস্য

ভার বহন ক্ষমতার বিচারে প্রাণীসমাজে কে চ্যাম্পিয়ন? উত্তর জানা না থাকলেও এই ব্যাপারে পিঁপড়ে অন্যতম দাবিদার বলেই আমার মনে হয়। বইপত্র ঘেঁটে জেনেছি, প্রজাতিভেদে পিঁপড়ে নাকি পারে নিজের ওজনের ২০ থেকে ১০০ গুণ ভার বহন করতে। প্রাণীবিদ্যায় জ্ঞানগম্যি না থাকায় এই অত্যাশ্চর্য ভারােত্তলন তথা ভার বহন ক্ষমতার রহস্যভেদ করা আমার সাধ্যে কুলােয়নি।
Image result for ant carrying food
তবে জানার খিদেটা রয়েই গিয়েছিল। যাই হােক, একদিন হঠাৎ পিপড়ে রহস্যের সমাধান কীভাবে
হল, এবার বরং সেই গপ্পোটাই বলি।
বেঙ্গালুরুতে সুমিত ও আমার দিন কাটছে পরমানন্দে। দর্জিলদা কাছেই থাকে। আমরা তিন বঙ্গসন্তান একসাথে মিলিত হই ছুটিছাটার দিনে। হৈ চৈ, গল্পগাছা, কাছেপিঠে ঘুরে বেড়ানাে, বাইরে খাওয়া-দাওয়া এসবের মধ্য দিয়ে কখন যে ছুটির দিনটা কেটে যায়, টের পাই না।
স্পষ্ট মনে পড়ে, ঘটনাটা এক রবিবারের। দর্জিলদা সেদিন আমাদের এখানে হাজির হয়েছিল খুব সকালে প্রাতরাশের জন্য নিয়ে এসেছিল আপেল, কলা, কেক, রসগােল্লা আর নলেন গুড়ের সন্দেশ।
কলকাতায় দিনকয়েক কাটিয়ে কাল রাতের ফ্লাইটে বেঙ্গালুরু ফিরেছে দর্জিলদা। বাংলার মিষ্টির আগমন সেই সুবাদেই। সুমিত ও আমি দুজনেই সন্দেশ রসগােল্লা দারুণ পছন্দ করি। অথচ এগুলাে বেঙ্গালুরুতে
পুলভ। তাই দেরি না করে যে হামলে পড়ব, সেটাই স্বাভাবিক। অবশ্য আমরা ছাড়া চুপিসারে ঝাপিয়ে পড়েছিল আরও অনেকেই। সুমিত তাদের আবিস্কার করে চেঁচিয়ে উঠল, “কী সব্বোনেশে কাণ্ড! এত
পিপড়ে এখানে এল কোত্থেকে?”
Image result for ants eating sweets
তাকিয়ে দেখি মাটিতে পড়া কেক-মিষ্টির টুকরাে মুখে নিয়ে আস্তানার দিকে দৌড়ছে গােটাকয়েক পিপড়ে। মনে পুষে রাখা প্রশ্নটা দর্জিলদাকে করার এটাই সুবর্ণ সুযােগ।
প্রশ্ন শুনে দর্জিলদা মুচকি হেসে বলল, “রৰি, তাের কথা শুনে ছেলেবেলায় পড়া একটা কবিতার
লাইন মনে এল—বড়াে যদি হতে চাও ছােটো হও তবে।”
বিরস মুখে সুমিত ও আমি চাওয়া-চাওয়ি করলাম। পিঁপড়ের বিপুল ভার বইবার ক্ষমতার সাথে কবিতার লাইনটার কী সম্পর্ক সেটা মাথায় ঢােকেনি আদপেই। আমাদের অবস্থা দেখে দর্জিলদার বােধহয় করুণা
হল। বলল, “ঠিক আছে। পিঁপড়ের ব্যাপারটা প্রথমে খােলসা করি।
তা হলেই বুঝবি কবিতার লাইনটা হঠাৎ কেন মনে পড়ল।”
এরপর দর্জিলদা যে ব্যাখ্যান দিল তার সারকথা এইরকম :
আশ্চর্যের কথা, প্রাণীবিদ্যা নয়, বিষয়টা পড়ে পদার্থবিদ্যার এক্তিয়ারে।জন্তুর সাইজের সাথে পেশির ক্ষমতার অদ্ভুত সম্পর্কের পেছনে আসলে রয়েছে ‘স্কেলিং ল’-এর কারসাজি। একরত্তি আকারের দরুনই
পিঁপড়ের পেশি তুলনামূলকভাবে বড় জন্তুর পেশির চেয়ে শক্তিশালী।
কেন তা জানতে হলে একটু তলিয়ে বিচার করতে হবে।।
প্রথমে দেখা যাক পেশির ক্ষমতা (স্ট্রেংথ) এবং প্রাণীর ওজন কীভাবে স্কেলিং সূত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পেশির ক্ষমতা নির্ভর করে পেশির আড়াআড়ি ক্ষেত্রের (ক্রস সেকশনাল এরিয়া) ওপর। অন্যদিকে ওজনের সম্পর্ক শরীরের আয়তনের সাথে।এবার জেনে নেওয়া যাক প্রাণীর দেহের মাপের (মানে দৈর্ঘ্যের)
সাথে পেশির ক্ষমতা আর ওজন কীভাবে পাল্টায়। পেশির ক্ষমতার সম্পর্ক মাপের বর্গের সাথে হলেও শরীরের আয়তনের (ও ওজনের)সম্পর্ক কিন্তু মাপের ঘনকের সাথে। সহজ কথায়, মাপ দ্বিগুণ হলে
পেশির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে চারগুণ কিন্তু আয়তন (ও ওজন) বাড়বে আটগুণ। তিনগুণ সাইজওয়ালার পেশি নয়গুণ শক্তিশালী হলেও আয়তন (ও ওজন) অনেকটাই বেড়ে হবে সাতাশগুণ। অর্থাৎ মাপ বাড়ার সাথে প্রাণীর ওজন লাফিয়ে লাফিয়ে যেভাবে বাড়ে, পেশির ক্ষমতা তত দ্রুতলয়ে বাড়ে না। ব্যাপারটা অন্যভাবেও বলা যায় যে যত ছােট, তার পেশির ক্ষমতা তুলনায় তত বেশি। পিঁপড়ের বিপুল ভার বইবার ক্ষমতার রহস্য আসলে লুকিয়ে আছে প্রাণীটির আকারের ক্ষুদ্রতাতেই।
Image result for ant carrying food
নাতিদীর্ঘ ভাষণ শেষ করে দর্জিলদা আমার কাছে জানতে চাইল,পিঁপড়ের ভারােত্তলন সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবটা ঠিকঠাক বুঝতে পেরেছি কিনা।
সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়তেই দর্জিলদা বেজায় খুশি হয়ে বলল, “এবার তাহলে কবিতার লাইনটা মনে কর। কবি অন্য অর্থে বললেও কথাটা খাটে প্রাণীদের সাইজ ও স্ট্রেংথ-এর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। যে প্রাণীর আকার যত ছােট, তুলনামূলক ক্ষমতার বিচারে সে তত বড়,মানে তত বেশি ক্ষমতাবান! বেশ মজার ব্যাপার, তাই না?”
সুজিত কুমার নাহা।

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: