কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ

নূতন তথ্য জানাচ্ছে যে CO2-এর পরিমাণ যদি 1.2% কমানাে হয় তাহলে পৃথিবীর অর্থনীতিতে এক গভীর সংকট দেখা দেবে। জলবায়ু সংকট রুখতে গেলে যেখানে CO2-এর পরিমাণ কমানাে প্রয়ােজন সেখানে পৃথিবীর CO2 ছাড়ার পরিমাণ আবার বেড়ে যাচ্ছে। ২০১৪-১৫ সালে CO2 ছাড়ার পরিমাণ বাড়েনি। কিন্তু, কয়েক সপ্তাহ আগে যে সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা জানাচ্ছে যে ২০১৭ সালে CO2 ছাড়ার পরিমাণ ৪২ কোটি ৫০ লক্ষ টন বেড়ে গেছে। মােট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭১০ কোটি টন। এই বৃদ্ধিতে চিনের বৃদ্ধি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। প্রায় ১০ কোটি টন। তার পরেই ভারতের ৪ কোটি ৩০ লক্ষ টন। তুরস্ক ৪ কোটি ৩০ লক্ষ টন, ইউরােপ/ই ইউ-২৮ ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টন, ইরান ৩ কোটি ৬০ লক্ষ টন, দক্ষিণ কোরিয়া ৩ কোটি ২০ লক্ষ টন, ইন্দোনেশিয়া ২ কোটি ৩০ লক্ষ টন এবং রাশিয়া ১ কোটি ৯০ লক্ষ টন। জাপান ও ব্রাজিলের একই থাকে ১০ লক্ষ টন করে। জার্মানি ২০ লক্ষ টন, আমেরিকা ৩ কোটি ৯০ লক্ষ টন ও দক্ষিণ আফ্রিকা ৯০ লক্ষ টন কমিয়েছে। এই খবর পাওয়া গেছে ইউরােপিয়ান এমিসন ডেটা বেস ফর গ্লোবাল এটমস্যীয়ারিক রিসার্চ (EDGAR) থেকে যাদের গ্রিন হাউস গ্যাস সম্বন্ধে তথ্য পৃথিবীর
মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযােগ্য। এই সংস্থা ১৯৭০ সাল থেকে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশের তথ্য প্রতি বছর দিয়ে থাকে।
Image result for co2
এবার দেখা যাক ২০১৭ সালের সাম্প্রতিক তথ্য আমাদের কি জানাচ্ছে? এই তথ্য থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে আশান্বিত হবার মতাে কিছু হয়নি। বিশ্ব অর্থনীতি CO2 কমাচ্ছে না। তিন বছর আগে
যখন থেকে CO2 ছাড়ার পরিমাণ প্রায় একই থাকা শুরু হয় তখনাে কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে ৩% বৃদ্ধি ঘটছিল। মিডিয়াতে এবং বৈজ্ঞানিক পত্র-পত্রিকায় আশার আলাের কথা বলা শুরু হয়েছিল। বলা শুরু
হচ্ছিল যে, CO2 কমলেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সম্ভব। কিন্তু, সেই আশা মরীচিকা। আগেই দেখানাে হয়েছে পৃথিবীতে CO2 ছাড়ার পরিমাণ কীভাবে বাড়ছে। চিনের নিঃসরণ মাথাকিছু ৭.৭ মেট্রিক টন যা ভারতের ৪গুণ। ভারতের নিঃসরণ মাথাপিছু ১.৮ মেট্রিক টন। ২০১৭ সালে ইউরােপের মাথাপিছু নিঃসরণ ছিল ৭ মেট্রিক টন।
আমরা এটা জানি যে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমের শিল্পোন্নত দেশগুলাে চিন ও ভারতের চেয়ে বহু বহু গুণ বেশি CO2 ছেড়েছে যুগ যুগ ধরে তাদের তথাকথিত উন্নয়নের জন্য। যা সম্ভব হয়েছিল এবং আজও হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বকে শােষণ করে। আজ, পৃথিবী থেকে উপনিবেশ শেষ হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু অর্থনৈতিক শােষণ আজও চলছে। তৃতীয় বিশ্ব ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, আই এম এফ, এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট
ব্যাঙ্ক ইত্যাদি থেকে নানারকম সাহায্য পায়। তাছাড়া তৃতীয় বিশ্বের মানুষ বিদেশ থেকে ডলার পাঠায়। এই সমস্তের পরিমাণ হল বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার (১ ট্রিলিয়ন সমান ১-এর পিঠে ১২টা শূন্য)। অথচ, তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রতি বছরে বেরিয়ে যায় ৩,৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, নটি ২ ট্রিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যায়। এই বহির্গমনই সব গল্প নয়। ভারত, বাংলাদেশের মতাে বিভিন্ন দেশ তুলাে থেকে তৈরি জিনিস যখন রপ্তানী করি তখন আমরা ভার্চুয়াল জলও রপ্তানী করি। এক কিলাে তুলাে উৎপন্ন করতে প্রায় ২২৫০০ লিটার জল লাগে। তাই যখন রপ্তানি করি তখন আমাদের দেশের মাটির নিচের জলের স্তর নিচে নেমে যায়।
Image result for cotton making
আমাদের উন্নয়নের হিসেবে প্রকৃতির এইসব অক্ষয়য়ের খরচের হিসেব ধরা হয় না। আমরা রপ্তানি করি ডলার রােজকার করার জন্য। ডলার কেন প্রয়ােজন হয় ? বছরে ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি লাগে তেল
আমদানি করতে। তেল কেন আমদানি করি? কেননা ভারতের বাবু-বিবিরা গাড়ি চাপবেন। তার জন্য চওড়া চওড়া রাস্তা, ফ্লাই ওভার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রেট আর রেল করিডর, পাের্ট ইত্যাদি কত কি প্রয়ােজন।
অথচ, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষ বাস করে এই ভারতে, প্রতি দিন সেকেন্ডে একটি শিশু মারা যায় অপুষ্টিতে, লক্ষ চাষি আত্মহত্যা করে ঋণের দায়ে। বড় জ্বালা করে তাই ধান ভাঙতে শিবের গীত গাইলাম।।
ফিরে আসি বিষয়ে। EDGAR-এর যে তথ্য আগে দেওয়া হয়েছে।তা থেকে আমরা বুঝতে পাচ্ছি যে শিল্পোন্নত Annex1 দেশগুলাে তাদের CO2 কমানাের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ করেনি। যদিও
ইংল্যান্ডে, জার্মানি সৌর ও বায়ু শক্তি এবং আমেরিকা প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার কিছুটা বাড়িয়েছে। কিন্তু তা খুবই অপ্রতুল। তা, পৃথিবীর প্রকৃতিকে বিপন্ন না করে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশের উন্নতি করার
জন্য যে শক্তির প্রয়ােজন তার তুলনায় কম।
এছাড়া, আরেকটা বিষয় ভেবে দেখা উচিৎ। বিশ্বায়নের পর উন্নত দেশ তাদের বেশি শক্তির প্রয়ােজন এমন বহু শিল্প চিন ইত্যাদি দেশে স্থাপন করতে শুরু করে। সেইসব দেশে শ্রম সস্তা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়মকানুন কম বলে ।তাই, শিল্পোন্নত দেশের CO2 নিঃসরণ কম দেখায়। শিল্পোন্নত দেশ যে সমস্ত জিনিস আমদানি করে তা উৎপন্ন করার জন্যে যে শক্তি ব্যবহার করা হয় তা যদি হিসেবে নেওয়া হয় তাহলে শিল্পোন্নত দেশের নিঃসরণ ১৩০ কোটি টন বেড়ে যাবে। এর সাথে ধরতে হবে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে শিল্পোন্নত দেশগুলাের ক্রমান্বয়ে CO2 বৃদ্ধির ইতিহাস আর উপনিবেশের দেশগুলাের পিছিয়ে পরা।
এই শতাব্দীর প্রথম দশকে নিঃসরণের যে বিরাট বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ২০১২ সালের পর থেকেই তা কমে প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে ২০১৬ সাল অব্দি। কারণ অর্থনৈতিক মন্দা। আবার বাড়তে থাকে ২০১৭ সাল থেকে। অধুনা নবীকরণযােগ্য শক্তির বৃদ্ধি সত্ত্বেও যে বছরে CO2 বৃদ্ধি উল্লেখযােগ্যভাবে কমে তা হল ২০০৯ সাল। ২০০৭-২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর। ২০০৮ সাল লীপ ইয়ার বলে ১ দিন বেশি ধরলে সে সালে নিঃসরণ একটু বেশি দেখাবে।
এর থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে যদি নিঃসরণ ১.২% কমে যায় তাহলে প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেবে। ২০০৮ সালে যে মন্দা এসেছিল তার প্রভাব এখনাে শ্রমিকদের ওপর পড়ছে। আমেরিকা এবং ইউরােপে তার তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনুভব করছে। কিন্তু, আই পি সি সি-এর সাম্প্রতিক বিশেষ রিপাের্ট আমাদের জানাচ্ছে যে পৃথিবীর CO2 নিঃসরণ আরাে অনেক কমাতে হবে যদি জলবায়ু বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা পেতে হয়।
Image result for co2 will reduce emissions
বর্তমান যে পুঁজিবাদী শিল্প সমাজ তা অনেকটা পাগলা ঘােড়ায় চাপ নামা যায় না। টিকে থাকতে গেলে অর্থনীতিতে বৃদ্ধি ঘটাতে হবে ঘটানাের অর্থ শক্তির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি। সেই শক্তি বৃদ্ধি আসছে জীবাশ্ম জ্বালানী পুড়িয়ে। পৃথিবীর যে শক্তির প্রয়ােজন তা যােগান দেওয়ার মতাে নবীকরণযােগ্য শক্তি উৎপাদন করা এখনই সম্ভব নয়। তা করা গেলেও আজ সমাজ ও প্রকৃতির যে চূড়ান্ত সংকট তাকে ঠেকানাে যাবে না। আজ প্রয়ােজন বিকল্প উন্নয়নের এক নূতন সমাজ সৃষ্টির। কিন্তু, তার আলােচনা আরেক প্রবন্ধের বিষয়।
সমর বাগচী

Published by @

পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলন, দূষণ, গাছ, নদী, পাহাড়, সাগর

Leave a Reply

%d bloggers like this: