তিমি মাছের হারিয়ে যাওয়া

5
(1)

বেশ কিছুদিন থেকে সোলার এ্যক্টিভিটি বা সূর্যের সক্রিয়তা নিয়ে খোঁজ খবর করছিলাম। স্বভাবতই সূর্যের তাপশক্তির উৎস, চৌম্বক ক্ষেত্র, সৌর কলঙ্ক, বিভিন্ন ধরণের বিকিরণ ইত্যাদি বিষয়ে কিছু পড়াশোনা করতে হচ্ছিল। এই পড়াশোনা করতে গিয়ে তিমিদের চলাচল ইত্যাদি নিয়ে একটি গবেষণা পত্রের কথা জানা গেল যা পরিবেশ কর্মীদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।আজ সেই বিষয় নিয়েই লিখছি।
আমরা সবাই জানি যে সমুদ্রের গভীরে বেশ কয়েকটি প্রজাতির তিমি বাস করে। তাদের একটি প্রজাতি হল গ্রে হোয়েল বা ধূসর তিমি। যেহেতু জলজ জীব তাই আমরা তিমিকে মাছ বলি। আসলে তিমি বিশাল আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী বা ম্যামেল। তারা ডিম পাড়ে না তাদের বাচ্চা হয়। গ্রে হোয়েল প্রজাতির তিমিদের নিয়ে পরিবেশ কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। Image result for grey whale

তার কারণ এই প্রজাতির তিমিদের মধ্যে মাঝে মাঝেই সমুদ্র উপকূলে চলে আসার প্রবনতা রয়েছে। শুধু তাই নয় তারা বালুকা বেলায় আটকে থাকে । সমুদ্রের গভীরে ফিরে যেতে পারেনা। বিষয়টি আমাদের কাছে বেশ মজাদার কারণ তারা অসুস্থ নয়, শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন থাকে না। ঠিক যেন কোন দিশেহারা নাবিক পথ হারিয়ে চলে এসেছে কোন অজানা দ্বীপে। অন্য পরিবেশে।পরিবেশ কর্মী ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় বহু চেষ্টায় এই সব আটকে পড়া তিমিদের সমুদ্রের গভীরে ফেরত পাঠান হয় । তার পর তারা আবার তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ফিরে পায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিমিদের মরে যেতেও দেখা যায়।

Image result for grey whale

জীব বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন থেকেই মনে করেন তিমিদের শরীরের কোথাও একটি করে কম্পাস আছে যার সাহায্যে তারা দিক নির্ণয় করে ও চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে সমুদ্রের গভীরে চলাচল করে ঠিক যেমন করে পাখি ও মৌমাছি আকাশে উড়ে। সুতরাং সূর্য থেকে আসা তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ তিমিদের চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রন করে। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা তিমিদের পথ হারিয়ে যাওয়া ও সূর্য থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের বিকিরণ নিয়ে গবেষণা করছিলেন । ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় ও এডলার তারামণ্ডলের একদল বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় তিমিদের পথ হারিয়েফেলার রহস্যের খোঁজ পেয়েছেন বলে মনেকরা হচ্ছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে কারেন্ট বায়লজি পত্রিকায় তাদের গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছে। তিমিরা কোন কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করে সেটা খুব ভালো ভাবে জানা নেই। সাগর মহাসাগরের জলের মধ্যে দৃষ্টি খুব বেশি দূর চলেনা। সুতারাং এটা ধরে নেয়া যায় যে সাগরের নীচে চলাচলকারী প্রাণীরা অন্য কোন সংবেদনশীল অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাহায্যে এক জায়গা থেকে অন্য জয়গায় যাতায়াত করে। যেমন চৌম্বক ক্ষেত্রের ব্যবহারের কথা আগে বলা হয়েছে। এটা মনে করা যেতেই পারে যে চৌম্বক ক্ষেত্র পরিবর্তিত হলে কিছু কিছু তিমি দিকভ্রান্ত হয়ে সমুদ্র তটে চলে আসে। Image result for grey whaleধূসর তিমিদের দিকভ্রান্ত হয়ে তটভূমিতে চলে আসার গত ৩৩ বছরে ১৮৬টি ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষকরা দেখেছেন সৌর কলঙ্কের সংখ্যার সাথে ধূসর তিমিদের বালুকা বেলায় আটকে পড়ার একটি ধনাত্মক (পজিটিভ) সম্পর্ক রয়েছে। সৌর কলঙ্কের সাথে সৌর ঝড় অত্যন্ত গভীর ভাবে সম্পর্ক যুক্ত। সূর্য থেকে হঠাৎ করে বেরিয়ে আসা অতি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কনা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটায়। সুতরাং সৌর ঝড় পৃথিবীর দিকে ছুটে এলে চুম্বক শলাকার দিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। গবেষকরা যে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তা হল পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বেতার তরঙ্গের বিভ্রান্তি ও চৌম্বক ক্ষেত্রের সরে যাওয়া। গবেষকরা আমেরিকার নেশন্যাল ওসেনিক ও এটমোসস্ফেরিক এডমিনিস্ট্রেশনের বা নোয়ার গ্রে হোয়েলের উপর দেওয়া ৩৩ বছরের (১৯৮৫-২০১৮) তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। শুধু গ্রে হোয়েলের তথ্য সংগ্রহ করার কারণ হল এই প্রজাতির তিমি সবচেয়ে বেশি পথ পাড়ি দিয়ে স্থানান্তরে যাতায়াত করে এবং উপকূলের পাশ দিয়ে স্থানান্তরে যাওয়া বেশি পছন্দ করে । দিকভ্রান্ত তিমি যারা অসুস্থ ছিলনা, যাদের গায়ে কোনরকম ক্ষতচিহ্ন ছিলনা সেই সব তিমির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে যে ফলাফল পাওয়া গেছে তা হল তিমিদের দিক ভ্রান্তি পৃথিবীর আবহাওয়া মন্ডলে সৌর ঝড়ের ফলে ঘটে যাওয়া চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন নয়। বেতার তরঙ্গের উপর সৌর ঝড়ের প্রভাব।
গত শতকের ৮০র দশকের শেষের দিকে দূরদর্শনে কসমস নামে একটি ইংরেজি ধারাবাহিক আমরা দেখেছি। জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক কার্ল সেগাণের লেখা কসমস বইটির উপর ধারাবাহিকটি তৈরি হয়েছে(বইটির একটি কপি আমার সংগ্রহে আছে)। ধারাবাহিকের ভাষ্যকার ছিলেন কার্ল সেগান নিজে। ঐ ধারাবাহিকে তিমিদের মধ্যে ভাব আদান প্রদান কীভাবে হয় বা তিমিরা স্থানান্তরে যাওয়ার জন্য যে নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করে সেটা বলেছেন কার্ল সেগান নিজে ভাষ্যকার রূপে।
যেহেতু ধূসর তিমি উপকূল বরাবর স্থানান্তরে যায় তাই তারা একে অপরের সাথে যে ফ্রিকুয়েন্সিতে যোগাযোগ করে তা সামান্য ব্যহত হয় তাহলেই তারা দিকভ্রান্ত হয়ে উপকূলে চলে আসতে পারে। সাধারণত আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ভাগেই ধূসর তিমিদের আটকে পড়তে দেখা যায়। Image result for grey whaleসূর্যের সক্রিয় অবস্থায় সূর্য থেকে যে বেতার তরঙ্গের বিচ্ছুরণ ঘটে তা ধূসর তিমিদের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিচ্যূতি ঘটায়। তারা দিকভ্রান্ত হয়ে উপকূলে এসে আটকে পড়ে। যদি সময়মতো পরিবেশ কর্মীদের কাছে সংবাদ পৌঁছায় তাহলে উপকূলে আটকে পড়া তিমিদের জীবন বেঁচে যায়। এখনোও এই গবেষণা লব্ধ ফল নির্ভূল বলে প্রমাণিত হয়নি। যদি এই গবেষণার ফলাফল সঠিক হয় তাহলে তিমিদের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখা ও তাদের দিক ভ্রান্তি কোথায় কতটা হতে পারে সেটা জানা সম্ভব হবে। এখন প্রতি দিন সূর্য থেকে কি ধরনের বিকিরণ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে তা জানা যায়। কী ধরনের বিকিরণ আসতে পারে তারও পূর্বাভাস দেওয়া হয়। সূর্যের সক্রিয়তা সম্পর্কে সমস্ত খবর মহাকাশ আবহাওয়া বুলেটিনে প্রচার করা হয়। তরঙ্গের বিকিরণ কখন কতটা হচ্ছে তা জানা থাকলে সমুদ্র উপকূলে ধূসর তিমিদের আটকে পড়া কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

অজয় নাথ

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

মানবজীবনে মাকড়সার ভূমিকা

5 (1) হানাবাড়ি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘর ভর্তি ধুলাে ময়লা, পােকামাকড়, মাকড়সা আর মাকড়সার জালে ভর্তি ভুতুড়ে বিচিত্র চিত্র। এক ভয়ের পরিবেশ। মাকড়সা দেখলে যেমন বিরক্ত লাগে তেমন ভয়ও করে। কিন্তু মানুষের জীবনে মাকড়সার অন্য ধরনের ভূমিকা আছে। কে না জানে। রবার্ট ব্রুস আর মাকড়সার গল্প, বিশ্ববিখ্যাত কিংবদন্তী। […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: