মানবজীবনে মাকড়সার ভূমিকা

5
(2)

হানাবাড়ি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘর ভর্তি ধুলাে ময়লা, পােকামাকড়, মাকড়সা আর মাকড়সার জালে ভর্তি ভুতুড়ে বিচিত্র চিত্র। এক ভয়ের পরিবেশ। মাকড়সা দেখলে যেমন বিরক্ত লাগে তেমন ভয়ও করে। কিন্তু মানুষের জীবনে মাকড়সার অন্য ধরনের ভূমিকা আছে। কে না জানে।
রবার্ট ব্রুস আর মাকড়সার গল্প, বিশ্ববিখ্যাত কিংবদন্তী।

Image result for spider and robart brus
রবার্ট ব্রুস জন্মেছিলেন লকমাবের দুর্গে  (Lochmaber Castle) ১২৭৪ সালে।
তিনি যখন স্কটল্যান্ডের লর্ড ও নাইট ছিলেন ১৩০৬ সালে, ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়ে দেশান্তরী হন। একটি অন্ধকার গুহায় আত্মগােপন করেন তিনি। সেখানে নির্জন তিন মাস অতিবাহিত করেন। এই সময়ে
একদিন তার নজরে আসে একটি ছােট মাকড়সা জাল বােনার চেষ্টা করছে। প্রথমে জাল বােনার চেষ্টা করে সফল না হলেও বার বার চেষ্টা করার পর অবশেষে ব্রুস লক্ষ্য করলেন মাকড়সাটি গুহার দেওয়ালে সিল্কের মতাে সুতাে আটকে জাল বােনা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হল। মাকড়সার এই নিরন্তর প্রচেষ্টার সাফল্য, হতােদ্যম ব্রুশকে উদ্বুদ্ধ করে এবং প্রচলিত প্রবাদের বা উক্তিটির সৃষ্টি হয়। যদি প্রথম দিকে কৃতকার্যতা নাও আসে, তবে চেষ্টা, চেষ্টা, চেষ্টা, বার বার চেষ্টা করে যাও, (It is at first don’t succed, try, try, try, try again)শেষপর্যন্ত সফল হবেই।

Image result for spider
এরপর ব্রুস সৈন্য সংগ্রহ করে জয়লাভ করেন ঐতিহাসিক বান্নকর্ণের যুদ্ধ (Battle of Bannockburn)। সেই ১৩১৪ সালে তিনি রাজার মুকুট ধারণ করেন ও সিংহাসনের দাবী প্রতিষ্ঠা করেন এবং ক্রমশ স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা লাভের দাবীর সূত্রপাত ঘটান।
মাকড়সার ধৈর্য অধ্যাবসায় ছাড়াও অন্যান্য অনেক গুণ আছে।তার আগে মাকড়সার জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া যাক।মাকড়সা এমনই দেখতে একটি প্রাণী যাকে দেখলেই কেমন ভয় করে।
মাকড়সাভীতিকে অ্যারাকনােফোবিয়া বলে আর মাকড়সা বিশেষজ্ঞদের বলে অ্যারাকনােপজিস্ট। মাকড়সার বিবর্তন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। কারণ এদের ফসিল বিশেষ পাওয়া যায়নি। মানুষের থেকেও বহু বছর আগে মাকড়সার উদ্ভব ঘটেছে বলে মনে করা হয়।
মাকড়সাদের প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতি আছে। এদের মধ্যে ২০ হাজার প্রজাতির বাস যুক্তরাষ্ট্রে। এদের আকৃতি ও দৈর্ঘ্যের ভিন্নতা ছাড়া এরা নানা বর্ণের হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে নিজেদেরকে অভিযােজিত করতে পারে। ঘরে বাইরে, বনে, জলে, জঙ্গলে সর্বত্রই এদের বাস।
মাকড়সা অমেরুদণ্ডী সন্ধিপদী পর্বের প্রাণী, তবে এরা পতঙ্গ নয়।এরা একলিঙ্গ প্রাণী। পুরুষমাকড়সার আকৃতি ছােট আর স্ত্রীমাকড়সা আকৃতিতে বড় হয়।

Image result for male spider
স্ত্রীমাকড়সা একসঙ্গে অনেক ডিম পাড়ে।ডিম ফুটে বাচ্চা মাকড়সা বের হয়। মা মাকড়সা আর তখন থাকে না। এরা মৌমাছি বা পিপড়েদের মতাে সামাজিক প্রাণী নয়।এরা মাংসাশী। এদের মাথা ও বুক জুড়ে
শিরােবক্ষ গঠন করে। মাথার সামনে থাকে আটটি যৌগিক চোখ। চোখের দৃষ্টি বেশ প্রখর। আর থাকে দু’জোড়া উপাঙ্গ।একজোড়া চেলিসেরা। মাথার নীচে দুপাশে ওপরের দিকে। চেলিসেরার দুপাশে থাকে পেড়িপাল্প।শিরােবক্ষে থাকে চার জোড়া পা। শিরােবক্ষের নীচের অংশে থাকে উদর।
মাকড়সার চেলিসেরার সঙ্গে যুক্ত থাকে একটা করে বিষগ্রন্থি। ঐ বিষে থাকে প্রােটিন বিশ্লিষ্টকারী উৎসেচক। নিঃসৃত এই উৎসেচক শিকারের দেহকে নরম করে হজম সহজসাধ্য করে তােলে। মাকড়সাদের দুটো ভাগে ভাগ করা যায়।
(এক) জালবােনা মাকড়সা আর (দুই) জাল-না-বােনা মাকড়সা। জালবােনা মাকড়সার অঙ্গের গঠন
মাকড়সাদের উদর গহ্বরে সুতাে বােনার জন্য বেশ বড় সিদ্ধ গ্র্যান্ড বা গ্রন্থি থাকে। গ্রন্থি নিঃসৃত আঠালাে রস উদরের পিছন দিকে অবস্থিত একাধিক সূক্ষ্ম সুতাে কাটনি অঙ্গ বা স্পিনারেট (spinneret)।
স্পিনারেটের সাহায্যে রস দিয়ে মাকড়সা সুতাে তৈরি করে। ফাইব্রোইন প্রােটিন দিয়ে প্রস্তুত এই সুতাে অত্যন্ত মজবুত ও স্থিতিস্থাপক।

Image result for net maker spider
মাকড়সার বিষ ও আকৃতি প্রসঙ্গে ট্যারানটুলা জাতীয় মাকড়সা উল্লেখ্য। তবে সব চাইতে বৃহদাকৃতির মাকড়সা চীনদেশে পাওয়া যায়।
প্রায় একটা পাখীর মতাে বড়। অধিকাংশ মাকড়সাই বিষাক্ত। ট্যারানটুলার শরীরে বীভৎস বিষাক্ত রস থাকে। স্পেনে ট্যারানটুলা ডান্স প্রচলিত ছিল। এই মাকড়সার কামড় খেয়ে লােকে হরদম নাচত। দক্ষিণ
অ্যামেরিকার স্প্যানিস সংকর জাতির মধ্যে এই নেশার চলন আছে।বিষ তীব্র হলেও কম মাত্রায় ব্যবহারে শরীরের স্নায়ুমণ্ডলে একটা প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি করে। নিয়মিত ব্যবহারে এর ফল সাংঘাতিক হতে পারে।
ব্ল্যাকউইডাে স্পাইডারও (Lactro dectus) ভয়ঙ্কর রকম বিষাক্ত।এর কামড়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। পুরুষ ব্ল্যাকউইডাে স্পাইডার তার সঙ্গিনীকে ভয় পায়। পুরুষটি তার বাসায় আসে কেবল মিলিত হওয়ার জন্য। পুরুষ মাকড়সাটির আকার স্ত্রী মাকড়সার চাইতে তিন বা তার চাইতে বেশি গুণ ছােট হয়। পুরুষ মাকড়সাটি স্ত্রী মাকড়সার খারাপ মেজাজের সময় বা খিদের সময় জালের মধ্যে যদি থেকে যায় তাহলে আর রক্ষা নেই। পুরুষমাকড়সাটি তখন তার খাদ্য হয়ে যাবে। ব্ল্যাকউইডাে স্পাইডার নামটি তাই স্ত্রীমাকড়সার ক্ষেত্রে যথার্থ।

Image result for male and female spider black widow
বহু মানুষ মাকড়সার জাল থেকে সিঙ্ক তৈরির চেষ্টা করেছেন।বিশেষত ব্ল্যাকউইডাে স্পাইডার থেকে। মাছ ধরার জাল, ব্যাগ,মাকড়সার জাল থেকে তৈরি করা হয়েছিল। এ সিল্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু শক্ত। সােয়া এক ঘণ্টায় একটি মাকড়সায় ১৫০ গজ সুতাে তৈরি করে। কিন্তু ৫০০০ হাজার মাকড়সার প্রয়ােজন পড়ে একটি পােষাক তৈরি করতে। এর অর্ধেক রেশমগুটি থেকে একই সময়ে একই পরিমাণে রেশম পাওয়া যায়। রেশমকীটের গুটি থেকে পাওয়া সিল্ক মাকড়সার থেকে পাওয়া সিল্কের সুতাের মতাে সূক্ষ্ম নয়। যেহেতু মাকড়সার সুতাে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তাই এই সুতাে দিয়ে কাজ করা খুবই অসুবিধাজনক। তাছাড়া এদের একসঙ্গে রাখা বিষম ব্যাপার। এরা পরস্পরকে খেয়ে ফেলে। তাই রেশমকীটই সিঙ্ক সুতাে তৈরির কাজে
ব্যবহার হয়ে থাকে এবং নিরাপদও বটে।
মাকড়সার বিষের ভালমন্দের দিক ছাড়া পরিবেশে এর বন্ধুত্বের কথা বলতেই হয়। মাকড়সা মশা মাছি শিকার করে আমাদের উপকার করে। টুনটুনি, বুলবুলি পাখীরা মাকড়সাদের জালের সুতাে জড়িয়ে
জড়িয়ে বাসাগুলিকে মজবুত করে। বুলবুলি ছানাদের প্রােটিন খাদ্য তালিকায় থাকে মাকড়সা। কুমাের পােকাদের জীবনচক্রে মাটির বাসার মধ্যে থাকা লার্ভাদের একমাত্র খাদ্য মাকড়সাদের নিস্তেজ দেহগুলি।
কৃষি জমিতে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গকে খাদ্য হিসেবে শিকার করে এরা আমাদের শস্যকে রক্ষা করে। ধানের মাজরা পােকাদের মেরে ফেলতে নেকড়ে মাকড়সার জুড়ি নেই। তবে কীটনাশকের প্রভাবে এই জৈব নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা বিপন্ন।

Image result for insects traped in spider net
অতি সম্প্রতি মাকড়সা ও ম্যালেরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ব আফ্রিকা ও মালেয়শিয়ার মশা খেকো মাকড়সা ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার এক যন্ত্র বিশেষ হয়ে উঠতে পারে।
এ তথ্য জানিয়েছেন গবেষকগণ। পূর্ব আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া হ্রদের আশেপাশে এক বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা আছে যার নাম ইভারচা কালিসিলভারা (Evarcha culicivora)। স্ত্রী আনােফিলিস মশা যারা
ম্যালেরিয়া রােগের পরজীবী পরিবহন করে, তাদের ধরার জন্য এই মাকড়সা অভিযােজিত হয়েছে। এটি একটি অসামান্য ব্যাপার। এই মাকড়সা শিকারটিকে নিশানা করে সঙ্গে সঙ্গে উদরস্থ করে।

Image result for Evarcha culicivora
বিশিষ্ট মাকড়সাবিদ ফিওনা ক্রস (Fiona Cross) কেনিয়ায় অবস্থিত কীটপতঙ্গের শরীরবৃত্তীয় ও বাস্তু সংস্থান বিষয়ের কেন্দ্রে এই তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি ‘Study on Spider’ বইটির সহলেখক।
এই মাকড়সা মানুষের রক্ত খেতে ভালবাসে; কারণ এই রক্ত এদের শরীরে এক গন্ধের উৎপাদন ঘটায় যা মাকড়সাকে বিপরীত মাকড়সার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। মানুষের পক্ষে এই মাকড়সা ক্ষতিকারক
নয়। গবেষকগণ বলেন, মানুষের দেহের রক্ত টেনে নেওয়ার মতাে বিশেষ ধরনের কোন উপাঙ্গ এদের মুখে নেই। তাই চর্ম ভেদ করে মানুষের রক্ত টেনে নিতে অক্ষম। মানুষের রক্ত এদের পুষ্টিকর আহার্য।

Image result for mosquito trapped in spider net
এই রক্ত পাওয়ার জন্য, স্ত্রী আনােফিলিস মশাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অফ অ্যারাকনােলজিতে। এই মশা রক্ত খাওয়ার পর বিশ্রামরত অবস্থায় উদরটি উচু ভঙ্গিমায় অবস্থায় করে। এই সময় মাকড়সা এদের সনাক্ত করতে সক্ষম হয় ও উদরস্থ করে।।
ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে এই বিশেষ প্রজাতির মাকড়সার বিস্তার ঘটাতে পারলে, অ্যানােফিলিস স্ত্রীমশা তথা ম্যালেরিয়া আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

সতী চক্রবর্তী।

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

২৫ টি ডায়াবেটিসের খাবার

5 (2) পছন্দের খাবারের ছবিতে click করুন আগামিকাল আবার এই পৃষ্ঠায় ফিরে আসুন পরবর্তী খাবারের জন্য । ডায়াবেটিসহ যেকোন স্বাস্থ্যসচেতনতার আপডেট নিয়মিত ভাবে পেতে নিচের ফিঙ্গার প্রিন্টে নিজের আঙুল দিয়ে টিপুন ডায়াবেটিস নিয়ে নতুন আপডেট পেতে আমাদের লিখুন এই পৃষ্ঠাটি ডায়াবেটিস মুক্ত বাঙালির জন্য সৃষ্টি করেছে পরিবেশ ডট কম ও […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: