অবলুপ্তির পথে মূল্যবান মৌল :

রসায়নের ছাত্রদের কাছে, এ জিনিস অভিধান সমতুল্য! নিদেন পক্ষে বিজ্ঞান যারা পড়েছেন তারা এর স্বাদ বঞ্চিত নন, মেন্ডেলিফের পর্যায়সারণির কথা বলছি। কেমিস্ট্রির এই ঠিকুজির সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, ১৭৮৯ সালে, অ্যান্তনি ল্যভয়সিয়ে ৩৩ টি রাসায়নিক উপাদানের এক তালিকা প্রকাশ করেন। ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী বিজ্ঞানী জন নিউল্যান্ড ১৮৬৪ সালে মৌলগুলোকে তাদের ভর অনুসারে সাজিয়ে মৌলগুলোর প্রতি অষ্টম মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের মধ্যে মিল পান। পরবর্তীকালে ১৮৬৯ সালে রুশ বিজ্ঞানী ম্যান্ডেলিফ এবং জার্মান বিজ্ঞানী লুথার মেয়র মিলে আধুনিক পর্যায় সারণি প্রকাশ করেন। তখন ৬৭ টি মৌল নিয়ে পর্যায় সারণি গঠিত হয়েছিল যার মধ্যে ৬৩টি আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৯০০ সালের মধ্যে আরও ৩০টি মৌল পর্যায় সারণিতে যুক্ত হয় । এভাবেই সূচনা হয় আধুনিক পর্যায় সারণির!

Image result for পর্যায় সারণি

২০১৯ সালটি ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অব পিরিয়ডিক টেব্‌ল’। মেন্ডেলিফের পর্যায়সারণি আবিষ্কারের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ইউনেসকো তাকে এই স্বীকৃতি দিয়েছিল। মানুষ বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃতিকে জানার আগ্রহ দেখিয়ে, প্রাকৃতিক সম্পদকেই নষ্ট করছে নির্বিচারে। ফলে পিরিয়ডিক টেব্‌লের কিছু মৌলও আজ অবলুপ্তির পথে দাঁড়িয়ে, আগামী ১০০ বছরের মধ্যেই পৃথিবী থেকে জলের মতো অনেক কিছুই প্রায় উধাও হয়ে যাবে, হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় থাকবে বেশ কিছু সংখ্যক মৌলও।
অন্য সব অবলুপ্তির কথা প্রচার আলো পেলেও, এই বিষয়টি এখনও ব্রাত্য। অন্ধকারে আজও সেই অবলুপ্তির কাহিনি, মুষ্টিমেয় কিছু বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের সীমিত গন্ডি পেরিয়ে সে আশঙ্কা এখনও স্থান করে নিতে পারেনি সাধারণ মানুষের মনে, কিন্তু আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় নানা ইলেকট্রনিক গ্যাজেট যা আমাদের স্বচ্ছন্দ দিচ্ছে, যার বলে আমরা নিজেদের আধুনিক বলি; তার মধ্যে অন্যতম হলো স্মার্টফোন সেগুলি তৈরি করতে গিয়ে কত মৌল যে অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হয়ে আজ বিলুপ্তির মুখে, সেই নিয়ে আমাদের কোনও ধারণাই নেই।

যেমন – ইন্ডিয়ামের কথায় আসা যাক,যা স্মার্টফোনের একটি অন্যতম উপাদান; টাচস্ক্রিন তৈরিতে ব্যবহৃত ইন্ডিয়াম টিন অক্সাইড, যা সোলার প্যানেল তৈরির কার্যকরী উপাদান, তার মূল ধাতুটি হচ্ছে ইন্ডিয়াম। ধাতু হলেও, তা এতোই নরম যে, তাকে ইচ্ছেমতো বাঁকিয়ে যে কোন আকার দেওয়া যায়। এমন কি নখের আঁচড় পর্যন্ত এর উপর পরে, প্রকৃতি থেকে সামান্য কিছু মিলিগ্রাম ইন্ডিয়াম পেতে হলে প্রায় বিপুল পরিমাণে আকরিক উত্তোলন করতে হয়। খনিতে মূলত দস্তা আর সিসার সঙ্গেই মিশে থাকে ইন্ডিয়াম।

Image result for indium

অতি প্রয়োজনীয় অন্য একটি ধাতু হচ্ছে ট্যান্টালাম। ধাতুটি ফোন, পেসমেকার, হিয়ারিংএড বানানোর জন্য বেশ উপযোগী।

Image result for tantalum
একটি স্মার্টফোনের মধ্যে রয়েছে প্রায় তিরিশ রকমের মৌল। তার মধ্যে অনেকগুলিই বিরল প্রজাতির! এমনকি অতিসাধারণ ধাতু তামাও আর প্রচুর মাত্রায় সঞ্চিত নেই প্রকৃতির ভাঁড়ারে, গ্যালিয়াম, আর্সেনিক, ইট্রিয়াম এমনকিি আমাদের সুপরিচিত রুপোও জায়গা পেয়েছে এই বিপন্ন তালিকায়। মেডিক্যাল থার্মোমিটার, এলইডি, টেলিস্কোপ, সোলার প্যানেল, মাইক্রোচিপ, ট্রানজ়িস্টর, ক্যামেরা লেন্স, আয়না, আতসবাজি ইত্যাদি নানান ক্ষেত্রে রয়েছে এদের ব্যবহার।

Image result for silver
সভ্যতা যত এগোবে, ততই আরও বেশি চাহিদা বাড়বে, আর সেই ক্রমবর্ধমান চাহিদার দাবি মেটাতে গিয়ে প্রকৃতির মৌল ভান্ডার ক্রমাগত নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তাই বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে সোনা তৈরি করতে চাইতেন, খুঁজছেন কৃত্রিম উপায়ে মৌল তৈরি করার পদ্ধতি, অথবা অন্য কোনও মৌল দিয়ে কীভাবে এদের প্রতিস্থাপিত করা যায়, সেই উপায় সুদূর পরাহত!
এক মাত্র পরিত্রাণের পথ ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের রিসাইক্লিং। ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি এবং বিবিসির উদ্যোগে একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। সব থেকে আশ্চর্য ব্যাপার, ওই রূপ উন্নত দেশেও ৮২ শতাংশ বাড়িতেই রিসাইক্লিংয়ের কোন চিন্তাভাবনা নেই। আমাদের দেশের ছবিটিও আলাদা নয় বরং আরও ভয়ঙ্কর। নতুন কিছু কেনার পরে পুরনো ফোন কিংবা ল্যাপটপটি সযত্নে তুলে রাখা আমাদের মজ্জাগত, প্রাণে ধরে সেটা ফেলা হয় না। অনেক সময় পুরনো ব্যক্তিগত তথ্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করেও অনেকে এমনটা করে থাকে।
আমরা জানি না যখন কোনও নতুন গ্যাজেট আমরা কিনি, তখন বিক্রেতা দায়বদ্ধ থাকেন পুরনো গ্যাজেটটি ফেরত নেওয়ার জন্য এবং যথাযথ ভাবে সেটিকে সরকার দ্বারা স্বীকৃত রিসাইক্লিং সংস্থায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে, দায়িত্ববান বিক্রেতা কিন্তু রিসাইক্লিং করানোর সময় ‘ব্যক্তিগত তথ্য’ সুরক্ষার ব্যাপারেও যথেষ্ট সচেতন থাকেন। ভারতে এই বিষয়ে আইনও এসেছে। সুসংবদ্ধ বলতে গেলে একেই বলা হয়, ই-বর্জ্য ম্যানেজমেন্ট এবং এই রিসাইক্লিং শিল্প কিন্তু আগামি দিনে চাকরি জোগানোর ক্ষেত্রে একটি আশাপ্রদ মাধ্যম হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে।

Image result for recycling of e waste
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস-এর ‘ওয়েস্ট অব আ নেশন’, বইটিতে বেশ ভাল ভাবে ধরা আছে ভারতের বর্তমান বাস্তব অবস্থা। রাজধানীর অবস্থাও ভালো নয়, অন্যদিকে মোরাদাবাদকে বলা যেতে পারে ইন্ডিয়ার ই-বর্জ্যর অলিখিত ‘রিসাইক্‌ল বিন’। ২০০৮ সালের মন্দার স্বীকার ভারতের ‘পিতল রাজধানী’ এখন ‘ই-ওয়েস্ট’ প্রক্রিয়াকরণের ব্যবসায় নেমেছে। দৈনিক টাকার বিনিময়ে শ্রমিকরা এখানে প্রতিদিন যে ইলেকট্রনিক বর্জ্য এসে জমা হয়, সেগুলির পুনরুজ্জীবনে নিযুক্ত হন। প্রসেসিং পদ্ধতি অতি নিম্ন মানের। সার্কিট বোর্ডের ধাতুকে প্লাস্টিক থেকে আলাদা করার পরেই মূলত পোড়ানো, গুঁড়ো করা, ধোঁয়া আর অ্যাসিডে ডুবিয়ে নিষ্কাশন করা হয় তামা এবং স্বল্প পরিমাণে সোনা, প্ল্যাটিনাম ইত্যাদি মূল্যবান ধাতু। তার পর বাকি যা পড়ে রইল, সেটি ভেসে যায় নদী অথবা ড্রেনের জলে, জমা হয়ে থাকে মাটিতে। বছরের পর বছর সে সব পদার্থ জমে জন্ম দেয় নতুন বর্জ্যের, দূষিত করে জল আর মাটিকে। বিষাক্ত বর্জ্য নিষ্ক্রমণ এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতার যে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি রয়েছে, সেগুলোর কিছুই মানা হয় না। যে সব শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের স্নায়বিক রোগ, চর্মরোগ, জিনগত সমস্যা এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।তাদের সুরক্ষার দিকটিও দেখা হয় না।Image result for river waste
‘ই-ওয়েস্ট’ শিল্পের পুরো অর্থনীতিটা দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত নিয়মমের উপর। স্থানীয় নিজস্ব মূল্যনীতির ওপর নির্ভরশীল পুরো প্রক্রিয়াটি, কোনো সরকারী নিয়ন্ত্রণ নেই। যার ফলে বেনিয়ম এবং যথেচ্ছ চোরাচালানের প্রকোপ রয়েছে। বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতে ই-বর্জ্য অফুরন্ত!
কী করে কী হবে; না ভেবে আমরা সাধ্যের যেটুকু তা করতেই পারি ! আপাতত বরং তিনটি ‘R’-এর আমরা জব্দ করতে পারি বিরল মৌলের বিলুপ্তির সঙ্কটকে। ‘রিডিউস, রিইউজ় আর রিসাইক্‌ল’। যে ফোনটি এক বছর আগে কিনেছেন, সেটি পরের বছরেই বদলে না ফেলে একটু অপেক্ষা করুন। কোম্পানি তার ব্যবসার লাভের নিত্য নতুন মডেল আনবেই। আপনি যদি বছর বছর না ফোন পাল্টে; একটু অপেক্ষা করেন তাহলেই রিডিউস হল। আপনার পুরনো ফোনটিকে বাক্সে তুলে না রেখে দান করে দিন, কিংবা কারোর বায়না মেটাতে ধরিয়ে দিন তার হাতেই। বিক্রি করে দিন পুরনো ফোন যারা কেনেন, তাদের কাছে কিংবা অনলাইনে। আবার দোকানে এক্সচেঞ্জও করতে পারেন। সেটাও কিন্তু রিইউজ়!
সব শেষে আছে রিসাইক্‌ল। বিদেশের মতো হয়তে রিসাইক্লিং পয়েন্ট পাবেন না এখনই। সে ক্ষেত্রে যেখান থেকে কিনেছেন, তাদের শোরুমে গিয়ে একটু খোঁজ নিন আপনার গ্যাজেটটিকে রিসাইক্‌ল-এ দিতে পারবেন কি উপায়ে ।
একটি সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে, ব্রিটেনের প্রতি ছয় কোটি মানুষের বাড়িগুলোতে প্রায় চার কোটি অব্যবহৃত গ্যাজেটস রয়েছে। এবার ভাবুন, ১৩০ কোটি ভারতবাসীর বাড়ি থেকে কত গ্যাজেট উদ্ধার হতে পারে!
মৌলেরাও হয়ত একদিন বলবে, ‘হারিয়ে গেছি আমি’! কিন্তু বলার আগে আমাদেরকেই সচেতন উদ্যোগ নিতে হবে।
একবার চিন্তা করে দেখুন, আপনি বছরে একাধিকবার ফোন, দু’বছরে একবার ল্যাপটপ বদলে ফেলছেন, আর আপনার বাবা পেসমেকার বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন। সেই আপনিই যদি হঠাৎ, এক দিন দেখেন বাজারে সেই সব পাওয়া যাচ্ছে না আর, কারণ প্রয়োজনীয় সব মৌলই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে, সে দিন কিন্তু আর দূরে নেই ; এই ভাবে চলতে থাকলে। পর্যায়সারণি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যার বাস্তবিক ব্যাবহারিক প্রয়োগ রয়েছে। সেটি যেন আগামিতে ইতিহাসে পরিণত না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখাই এখন আমাদের কর্তব্য, আর এ জিনিস যদি সত্যি হয়, তাহলেই কিন্তু সভ্যতার সংকট আর দূরে নয়!
সৌভিক রায়

Leave a Reply

%d bloggers like this: