হীরা ফেলে কাঁচ

poribes news
0
(0)

বিয়ের বাজারে সুপাত্র খোঁজা মেয়ের বাবারা হীরের টুকরাে ছেলেকে গরু-খোঁজা খোঁজে। কাঁচ কাটা হীরে’ তাে গল্প ছাড়িয়ে সিনেমাও হয়ে গেছে।এ ছাড়াও হীরে বহু কাজে লাগে। তবে সাজাগােজার ব্যাপারে এর চাহিদা ও কদর সবাইকে ল্যাং মেরে এক্কেবারে পুরােভাগে। মুঘল সম্রাটের তাজ (মকুট) বা ধনীর দুলালীর সাজ- সর্বঘটেই আছে কাঁঠালি হীরে। এহেন হীরে পরে ধনীরা গরিবদের চোখের সামনে দিয়ে গটগট করে হেঁটে যাওয়ায় গরিবদের মন হু হু দুঃখী হয়ে ওঠে। সেই দুঃখে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদেরও সম্ভবত প্রাণ কেঁদে ওঠেছিল। ব্যস, তাঁরা লেগে পড়েন গরিবের দুঃখমােচনে। আমেরিকান কই,আমেরিকান রুই, আমেরিকান জর্জেট ইত্যাদির পথে বাজার ধাঁধিয়ে চলে আসে ‘আমেরিকান ডায়ামন্ড’। Image result for american diamond

একছড়া আঃ ডাঃ-র হার মানা হার বা একটা লাগসই আংটি পরে উৎসব, অনুষ্ঠানে আড্ডা মারলে ধরে কেডা! জহর-রায় (জহর, বলা ভাল জওহর সম্পর্কিত রায়) দেওয়ার জন্য জহুরি তাে আর সবসময় সর্বত্র হাজির থাকেন না!
হীরের চাকচিক্য নির্ভর করে তার কাটাকুটির ওপর। ঠিকমতাে কাটতে পারলে। তবেই হীরের মতাে হীরে হয়ে ওঠে। সমুদ্র সম্পর্কে লােকোক্তি হল— সে কাউকে গ্রহণ করে না, ফিরিয়ে দেয়। হীরের চরিত্রটাও অনেকটা সে রকমই।আলাে সে যত কমই হােক, লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চুইয়ে যে ভাবেই ভেতরে ঢুকুক
সৎ চরিত্রের হীরে তাকে বিমুখ করবেই। ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা অবশ্য নির্ভর করে তার আলাে যাওয়া-আসার ধর্ম (অপটিক্যাল প্রপার্টি) মানে আলােক প্রতিসরাঙ্ক (রিফ্রাক্টিভ ইনডেক্স) ও বিচ্ছুরণ ক্ষমতার (ডিসপারসিভ পাওয়ার)ওপর। হীরের কাছাকাছি আলােক ধর্মবিশিষ্ট যে কোনাে স্বচ্ছ স্ফটিকই হীরের হয়ে
প্রক্সি দিতে পারে। অবশ্য নকলি হিরাে হীরালালের কদর কাঠিন্য ও রাসায়নিক বিক্রিয়াকর্ম, এই দুটো গুণের ওপরও নির্ভর করে।

Image result for american diamond
চোরবাগানের সঙ্গে চোর বা পটলডাঙার সঙ্গে পটলের যে সম্পর্ক আমেরিকান ডায়ামন্ডের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও তাই। আমাদের দেশে নকল হীরে আমেরিকান ডায়ামন্ড নামে জনপ্রিয় হলেও অন্যান্য দেশে কোথায় ডায়াজেমস (Diagems), কোথায় ব্রিলিয়্যান্টস (Brilliants) ইত্যাদি নাম পরিচিত।এ ছাড়া মালমশলারও রকমফের আছে।

Image result for Brilliants
হীরের হয়ে প্রক্সি দেওয়ার কাজটা পুরাকালে সম্ভবত জারকন করেছিল।জারকন হল দ্বিগুণ অক্সিজেন মেশানাে জারকোনিয়াম ও সিলিকন। জারকন ধাতুর স্বাভাবিক রং একটু বাদামি ঘেঁষা। একটু গরম দেখালেই অবশ্য সুড়সুড় করে স্বচ্ছ হয়ে যায়।অষ্টাদশ শতকে এগিয়ে-যাওয়া বিজ্ঞান ও কারিগরি দৃষ্টিতে জারকন খেলো বলে গণ্য হতে লাগল। হীরের পরিবর্ত হিসাবে একে অনেকেই পাত্তা দিতে চাইল না
এর তখন নাম হল মাতারা (Matara) ডায়ামন্ড। জারকন ছাড়াও মতাে-হীরে হিসাবে কারান্ডাম, স্পিনেল, রুটাইল,ইট্রিয়াম অক্সাইড, হট্রিয়াম অ্যালুমিনেটের স্ফটিকও ব্যবহার করা হত। কিন্তু এগুলাে ছিল হিন্দি সিনেমার বােকা বােকা বাংলা অনুকরণের মতােই রদ্দি। সহজেই ধরে ফেলা যেত আসল-নকল। ফলে
গুডবাই হয়ে যায়।
প্রকৃতির খাঁটি মালমশলা নিয়ে চেষ্টা চরিত্রের পর বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম উপায় অবলম্বনের দিকে ঝুঁকলেন ১৯৬০ সালে। তাঁরা পেলেন ‘কিউবিক জারকোনিয়া’।যাকে আসল হীরের পাশে রেখে দিলে, জুহুরিরাও ফেল মেরে যাবে! এ তৈরির হ্যাপাও অনেক। জারকোনিয়া ওরফে জারকোনিয়াম অক্সাইডের মধ্যে কম করে তিন ধরনের স্ফটিকাকৃতির গঠন বিন্যাস (ক্রিস্টোলােগ্রাফিক স্ট্রাকচার্স) লক্ষ্য করা যায়। সাধারণভাবে এর চেহারাকে বিজ্ঞানীরা মনােক্লিনিক বলেন। একে উত্তপ্ত করতে করতে ১১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে গেলে প্রথমে এটা হয়ে যায় চৌকোনাে (টেট্টাগােনাল) এবং তারপর ২৩৭০ ডিগ্রিতে গিয়ে হয়ে যায় ঘন (কিউবিক)। এর সঙ্গে ৮ শতাংশ ইটিয়াম অক্সাইড মিশেল দিলে কিউবিক গঠনশৈলী অপরিবর্তনীয় রয়ে যায়। ঘরের সাধারণ তাপমাত্রাতেও একই থাকে। এত কাঠখড় পুড়িয়ে যে জিনিসটা দাঁড়াল, তাকে ‘ইট্রিয়াম স্টেবিলাইজড জারকোনিয়া’ (ওয়াইএসজেড) বলে। ওয়াইএসজেড পারতপক্ষে কারও সঙ্গে মিশ খায় না (ফেয়ারলি আনরিঅ্যাক্টিভ), চট করে গোলাবারও পাত্রও নয়। আর চাকচিক্যে? প্রায় হীরেকে ধরেই ফেলে আর কি!Image result for american diamond
কিউবিক জারকোনিয়া পেতে কোনাে কোনাে প্রস্তুতকারক ইটিয়াম অক্সাইডের বদলে হ্যাফনিয়াম অক্সাইডও ব্যবহার করে। ওয়াইএসজেড ছাড়া আমেরিকান ডায়ামন্ড নামে বাজারে চলে আরও দুটো জিনিস গ্যাডলিনিয়াম গ্যালিয়াম গারনেট (জিসিজি) এবং ইটিয়াম অ্যালমিনিয়াম গারনেট (ওয়াইএজি)। ”
এদের মান জারকোনিয়ার মতাে না হলেও দামে সস্তা বলে গরিব দেশগুলােতে খুবই চলে। স্ট্রনশিয়াম টাইটানেটও বাণিজ্যসফল।
আগেই বলা হয়েছে, উন্নত মানের জারকোনিয়া কোথাও লাগানাে হয়ে গেলে সাদা জহুরির জহর-রায়ও ভুল হয়ে যেতে পারে। অবশ্য হীরে আর জারকোনিয়ার প্রতিসরাঙ্ক আলাদা হওয়ায়, এর কোণগুলাে কাটা হয় হীরের চেয়ে সামান্য তন্যভাবে। তবে খালি চোখে সেই কাটা খাঁজের তফাত ধরা সহজসাধ্য নয়। তবে
চোখের নজর কম হলেও রঞ্জন-রশ্মি আছে। রঞ্জন-রশ্মি ওরফে এক্স-রে হীরের মধ্যে দিয়ে গলে যায়, অন্যের বেলা তা হয় না।Image result for american diamond
কারও বন ভাইফোঁটায় যেমন যমের দুয়ারে কাটা ঠুকে ভাইয়ের ভবিষ্যৎ সুদৃঢ় তবে তেমনি কার্বন-এর জোরালাে বাঁধনও হীরেকে সুদৃঢ় করে। কার্বনের এই অটুট প্রেম কাচে পাওয়া যায় না। সেখানে তা ঠুনকো। তাই হীরে সহজেই তাকে ঘ্যাঁচঘুচ করে দিতে পারে। তাতেই তাে ‘কাঁচ কাটা হীরে’ কথাটার জন্ম।
প্রসঙ্গত জানানাে যায়, রুবি এবং চুনীর মতাে রত্ন মানের কৃত্রিম হীরেও তৈরি করা যায়। কিন্তু তাতে যা খরচ পড়ে, তা দিয়ে খানদশেক আসল হীরে পকেটস্থ করা যায়। সে জন্যই বাণিজ্যিক উপযােগিতার ক্ষেত্রে প্রক্সি-হীরে বা মতাে-হীরেরই জয়জয়কার।

সমীরকুমার ঘোষ

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

জলে জল দিও না ঢেলে

0 (0) ‘প্রেমে জল হয়ে যাও গলে’বিখ্যাত গানের কলি। প্রেমে নয় , গোয়ালা দুধে জল হয়ে গলে যেতে চায়। কখন জলে দুধ। এ নাকি তাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। বিজ্ঞানের ভাষায় ধর্মও বলা যায়। ব্যাপারটা খদ্দেররা মোটেও সুনজরে দেখে না। তবে জলে জল মেশালে তা নিয়ে আর আপত্তি কিসের! আপত্তি […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: