পাখি, ঘুড়ি ও আধখানা চাঁদ

poribes news 1
4.8
(11)

সেবার আমার একলা একলা স্নান করার অনুমতি সদ্য মিলেছে। তার আগে পর্যন্ত স্নান বাবা নয়তো মা করিয়ে দিত। আমি তখন ক্লাস ফোর, অতয়েব বুড়ো বয়স অবধি স্নান করিয়ে দিতে হবে নাকি! এই যুক্তিতে বিশেষ করে বাবা স্নান করানোর হাত থেকে পরিত্রান পেলেন। আমার ছোটবেলার বাড়িটা এমনিতেই বন-জঙ্গল অধ্যুষিত ছিল। বিশাল কলপাড়ের মাথায় পেয়ারা আর কাঁঠালগাছের ছায়া পড়তো। কলপাড়ের বহুকালের সিমেন্টের চাতালে অনেক খন্দ। ব্যস্ত কলপাড়ে সেই খন্দগুলো জলে ভরে থাকতো দিনভর। আমার ছোটবেলার কল্পনার পুকুর। জলছবিতে পেয়ারাগাছ, কাঁঠালগাছ, ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত নীল আকাশ। আরেকটু ঝুঁকে পড়লেই নালা দেখা যায়। কলের জল নদীর স্রোতের মত এ খন্দ সে খন্দ হয়ে বয়ে চলেছে ডোবার দিকে। কলপাড়ের পরিধি জুড়ে উঁচু পাঁচিল।  নীচের ফোঁকর দিয়ে নালাটা অবশ্য বেশি দূর দেখা যেতনা। একটু তফাতে গিয়েই গভীর ঝোপঝাড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। নালার ফোঁকরে একগাদা হাঁস জড়ো হয়েছে। নালার মুখে আটকে যাওয়া ভাতের টুকরো খেতে। হাঁস এমনিতে পৃথুল, চিন্তাশীল এবং ধীর-স্থির। কিন্তু খায় বড় দ্রুত। জলস্রোতের ভেতর মেঝে ঘষ্টাতে থাকা ভাতের প্রতিটি অনিচ্ছুক খন্ড নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ পিঠে আলতো টোকা পড়লো। বাবা। কলপাড়ে একঘন্টা হয়ে গেছে। এখনো গায়ে জলই দিইনি। তদুপরি ভেজা, খন্দপূর্ণ কলপাড়ে আধাশোয়া হয়ে রয়েছি অনেকক্ষণ। গঙ্গারামের স্নানের সময় এখন। বাবার আঙুলে আটকানো খাঁচার ভেতর অদ্ভুত ভাবে লটকাচ্ছে আমার ‘নাদিয়া কোমানচি’। হলই বা গঙ্গারাম ছেলে। আমাদের পোষা টিয়াপাখি।

অবশ্য গঙ্গারাম বেশিদিন থাকেনি। তার প্রতি খুব টান, আদেখলেপনা ছিল বাড়ির সকলের, এমনটাও নয়। সামান্য কিছু কথা বলতে পারতো। বাবা পাখি রাখতে ভালোবাসতেন। কিন্তু বেঁধে-ছেঁদে নয়। চিলে কোঠার ছাদে প্রচুর পায়রা ছিল। এক পায়রা গিয়ে অন্য দলের পায়রা ভাঙিয়ে নিয়ে আসতো। কখনো হয়তো খুইয়েও আসতো। কিন্তু বাবা কোনদিন গুনতেন না। চাইতেন ওরা ওদের মত থাক, গৃহস্থও থাকুক। গায়েপড়া যত্নআত্তি করেননি।  দু-একজন বাদে সবাইকে চিনতেনও না। তবে চাইতেন থাক। নির্ভয়ে। বারান্দার ভেতরে শালিক উঠে এলে তাড়াতেনও না আবার বিস্কুট চানাচুর ছুঁড়েও দিতেন না। শালিকের দল প্রাতঃরাশের উদ্বৃত্ত মুড়ির টুকরো, এটা সেটা খেয়ে আমাদের বইখাতার একহাত দূর দিয়ে সদর্পে হেঁটে যেত। চাষ-আবাদের গেরস্থালি, খাবারের অভাব হত না। এহেন বাড়িতে, খাঁচার আড়ালে গঙ্গারাম বেশিদিন থাকেনি। এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় খাঁচার খোলা দরজা পেয়ে বেরিয়ে পড়লো। প্রথমে ধানের গোলার চূড়োয়, তারপর পুবদিকের বাঁশবাগানের ওপর দিয়ে পগারপার। তার ওড়ার ভঙ্গি দেখে বাবার মনেই হয়নি সে বিগত কয়েক বছর বন্দি ছিলো। তাই বাবা খুব বেশি হাহুতাশ করেননি। ছিলো কয়েকদিন! উড়তে পারে, খোলা পেয়েছে, উড়ে গেছে – গেছে। মা ভেবেছিলো গঙ্গারাম ঠিক ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে। তাই খাঁচাটা উঠোনে ঝুলিয়ে রাখতেন। গঙ্গারাম আর কোনদিন আসেনি। গ্রামের কেউ কোথাও তাকে দেখেনি। শৈশবের নাদিয়া কোমানচি-র কি পরিণতি হয়েছিল আমরা কেউ জানিনা। তবে চিরকাল খাঁচার আড়ালে বন্দি-জীবন কাটিয়ে তার মৃত্যু চোখের সামনে দেখতে হয়নি। বাবা কি তাহলে ইচ্ছে করেই দরজার আগল খুলে রেখেছিলেন? তার উত্তর কোনোদিন দেননি। শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে পেয়ারা গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তাঁর শেকড়হীন জীবন, পরিবারের নিশ্চিত ঠাঁই খোঁজার চিন্তার মাঝে এই প্রশ্ন তাঁকে প্রভাত গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা মনে করাতো হয়তো-

“আমাদের বাড়িতে নাকি পাখি বাঁচে না। এইরকম একটা কথা প্রচলিত আছে। আমি এই প্রচলিত কথাটিকে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিয়েছি পাখির মত। সেই নিয়ে অনেকরকম কথা উঠেছিলো। আমি বলেছিলাম, পাখির সঙ্গে পাখির মত আচরণ না করলে পাখি বাঁচে না। অথচ আমাদের সংসারে কেউ কোনদিন পাখা মেলতে পারে নি।“ (‘আমাদের আকাশ’, কাব্যগ্রন্থ – ‘চারণকবি ও নক্ষত্রদল’)

সংসারের কেউ পাখা মেলে কিনা জানিনা, কিন্তু সংসার-ঘরবাড়িটি নিজেই পাখা মেলে, ডালপালা মেলে। তার অগ্রসরের কাছাকাছি আসে পাখ-পাখালি। সভ্যতার শুরু থেকে তাই। গৃহস্থের দুয়ারে আসে শালিক, চড়ুই, কাক, বুলবুলি, দূর্গাটনটুনি, ছাতারে। আবার চলেও যায়। ভাঙাচোরা বারান্দায় পড়ে থাকে প্রদত্ত স্বীকৃতি। মানুষের যাপন, বারান্দা যদি বা হয়ে ওঠে তাদের চারণভূমি। আমরা আশায় থাকি পরদিন সকালে আবার মুড়ির টুকরো খেতে আসবে ছিমছাম শালিক। বাঙালীর পুরনো আটপৌরে সংসারে তখন এক অদ্ভুত নিশ্চিন্তি বিরাজ করতো। অন্তত আমি যা দেখেছি। আশির দশকে। হুটহাট ব্যাস্ততা চেপে বসতো না। প্রায় প্রতিদিন সকালে বাবা চা-এর কাপ আর মুড়ির কৌটো নিয়ে একঘন্টা ধরে সকালের স্নিগ্ধতা পালন করতেন। রোদ্দুর গোলাপ বাগানে উঠে আসলে তবে বাজারের হাঁকপাক শুরু। ততক্ষণে শালিক ঘুরে গেছে ঠাকুরঘরের সামনেটা, বারান্দা, লোহার বালতির কার্নিশ, আমাদের বইখাতার চৌহদ্দি। রোজ সকালের এই এক স্থিরচিত্র। আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে জন লকউড কিপলিং সাহেব (রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর বাবা) তার ‘বিস্ট অ্যান্ড ম্যান ইন ইন্ডিয়া’ বই-এ শালিককে নিয়ে বলেছেন – “…দ্য বার্ড ইজ ওয়ান অফ দ্য হ্যান্ডসামেস্ট অ্যান্ড মোস্ট ভিভাসিয়াস অফ দ্য স্টার্লিংস্‌; উইথ অ্যান এলিগান্ট ট্রিপিং গেইট, লাইক দ্যাট অফ আ নিটলি বিল্ট ব্যালে-গার্ল, অ্যালার্ট অ্যান্ড ব্রেভ ইন ব্রাইট ইয়েলো বুট্‌স”।  অর্থাৎ, শালিক স্টার্লিং গোত্রের পাখিদের মধ্যে ‘কেতাদুরস্ত’, ‘প্রানবন্ত’, ‘সদা সতর্ক’, ‘সাহসী’, ‘উজ্জ্বল হলুদ বুটজোড়া পরে হালকা নৃত্যের ভঙ্গীতে হেঁটে যাওয়া পরিপাটি ব্যালে নর্তকী’। তাদের টহল শেষে উঁচু বারান্দার কিনারা থেকে মৃদু স্বরে ডেকে লাফ দিয়ে নেমে যেত উঠোনে। কালীপিসি তখন উঠোন ঝাঁট দেওয়া শেষ করে নারকেলগাছের গায়ে ঝাঁটা ঠেস দিয়ে রেখে ঢেঁকিরঘরের বড় উনোনটায় ধানসেদ্ধ করতে বসেছে। ধানের খোলস ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা উদ্ধত চাল টুকটাক মুখে নিয়ে সাদা ধোঁয়ার অন্তরালে চলে যাচ্ছে ‘সতর্ক’ ও ‘সাহসী’ শালিকজোড়া।

 

বাড়ির পেছনে পাঁচিলের ওপাশে ছিল বাঁশবাগান। পুবদিকের বাঁশবাগান। রাজকীয় এবং স্নেহবান, বিশদ এবং জটিল। তার নীচে আমাদের বাড়ির ভুতপূর্ব মুসলমান মালিকের কবর। মৃত্যুর পর এমন শুয়ে থাকার জায়গা দ্বিতীয়টি হয় না। নিঝুমপুরী সে বাঁশবাগান জেগে উঠত সন্ধ্যেবেলা। সূর্য ডোবার পর শতাধিক শালিক জড়ো হত পাতা ও কঞ্চির দুরূহ কানাচে। দূর থেকে দেখা যাবে না অথচ কানে ঝিঁঝিঁ ধরে যাওয়া একটানা কিচিরমিচির। জানিনা তখন তারা ব্যারাকপুর বা আসানসোল রেল-স্টেশনকে তাদের বিবেচনার মধ্যে এনেছিলো কিনা! কিপলিং লিখেছেন – “প্রডিজিয়াস ফাস্‌ বিফোর দে সেট্‌ল টু রেস্ট,..”। কি বলে তারা এত কথা? “অ্যাজ ইফ ইচ বার্ড ওয়্যার রিকাউন্টিং দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ দ্য ডে..”। চলে যাওয়া দিনটির স্মৃতিচারণ। আমাদের ঢেঁকিরঘর, পুঁইমাচা, গাভীন গরুর কানে উঁকি দিয়ে দেখার কথা, পাটকাঠিগাদা থেকে পাটসুতো টানার কথা ভেসে আসতো বাঁশবাগানের মাথা থেকে।

 

শালিকের অনায়াস ব্যালে খাঁচার ওপার থেকে দেখতো গঙ্গারাম। নামটা মায়ের দেওয়া। বিয়ের আগে মায়ের একটা গঙ্গারাম ছিলো। বিড়ালও ছিলো একটা। নাম হরিদাস। মায়ের প্রিয় টিয়া মারা যাওয়ার পর বহু বছর বাদে এবাড়ি এসে স্টেশন থেকে নতুন গঙ্গারামকে কিনে আনে। আনলেই তো হলো না, দেখভাল? বাবা শুধু খাঁচা পরিষ্কার আর স্নান করানো। বাকি সব মা। মা খেতে দিতেন ওকে। বাদুরে খেয়ে উঠোনে ফেলা পাকা পেয়ারা, ঝুড়ি থেকে বেছে বেছে পাকা লঙ্কা। আমি আর দাদা ঝোপের ভেতর থেকে পাকা তেলাকুচো নিয়ে আসতাম। মা কথা বলানোর চেষ্টা করতেন। বলতো না। প্রণাম করতে শেখাতেন। করতো না। কিপলিং দেখেছেন দিল্লীর রাস্তায় টিয়াদের হরেক ভেল্কি দেখাতে। তাদের মালিক শিখিয়েছে। এক টিয়া নাকি মুখে করে জ্বলন্ত দেশলাই নিয়ে দিব্য খেলনা কামান দাগছে, তারপর সেই গোলার আঘাতে মরে যাওয়ার ভান করছে এবং পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে মালিকের খাছ থেকে তার প্রাপ্য খাবারের টুকরো খেয়ে নিচ্ছে। যদিও কিপলিং স্বীকার করেছেন যে ভারতীয় টিয়াপাখিদের কথা শেখার স্বাভাবিক ক্ষমতা অন্য দেশের টিয়াপাখিদের থেকে কম। মা এতসব জানতেন না। বিকেলে স্নান-খাওয়া সেরে তার কাজ ছিলো গঙ্গারামকে কথা শেখানো। এইটুকু সময় তার চেহারায় অনাবিল আনন্দ দেখতাম। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ফেলে অজ-পাড়াগাঁয়ের বনেদি চাষিবাড়িতে এসে পড়া, হেঁসেল ঠেলা, বড় পরিবারের অগুন্তি ফাইফরমাশ, তদুপরি তার সন্তানদের ঠাঁই তৈরির চিন্তা এক বিষাদ-বৃক্ষ হয়ে ডালপালা মেলেছিলো তার মনে। গঙ্গারাম ছিলো তার একটুকরো চাঁদ সে বৃক্ষের মাথায়। বশে আনতে চাইতেন আর সে চলতো তার নিজের নিয়মে। তবু তো কাছে এসে দেখা, এক বনের পাখির অন্তর, তার বুকের ভেতর শৈশব, সেই তার আনন্দ। একদিন তার পতিদেবের দৌলতে সে চাঁদ চিরকালের জন্য স্বাধীন হয়ে গেলো, পাখি যেমন হয়, আকাশবাসী। আমাদের মন-খারাপ, দুঃশ্চিন্তাজাল, নিত্যদিনলিপির ভেতর দিয়ে হেঁটে যায় পরিপাটি, সাহসী শালিক, স্পর্শের অদূরে কথা বলে, সন্ধ্যে নামিয়ে আনে, আগল খুলে যায় দরজার। আমরা তাদের ডাকি, খুঁজি, পাই, হারিয়ে ফেলি। কবি প্রভাত গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের উঠোনে দাঁড়িয়ে লেখেন-

 

“কেশববাবুর বাগানে একটা বিশাল দেবদারু গাছ ছিলো। আমাদের বাল্যকাল জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই গাছ। ডালপালা দেখা যেতো না; এতো অজস্র পাতা থিকথিক করতো তার গায়ে। বিশাল তার হৃদয় ও ধারণশক্তি। মেঘ ধরার কানুন জানতো, পাখি ও ঘুড়ি ধরার। মাঝে মাঝে সন্ধ্যেবেলায় তার মাথায় এসে বসতো আধখানা চাঁদ।

 

একদিন বিকালে প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে সে দেবদারু সহসা পাড়া কাঁপিয়ে ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে।………….. যেন শোকদিবস।

 

আমরা ছেলেরা শুধু মৃতদেহ তন্ন-তন্ন করে খুঁজেছি পাখি, ঘুড়ি ও আধখানা চাঁদ।“

 

 

 

 

 

 

 

 

 

লেখক – সম্রাট সরকার

ঠিকানা – গ্রাম-মাজদিয়া, পোস্ট অফিস-মদনপুর, জেলা-নদীয়া, পিন-৭৪১২৪৫।

ফোন – ৮২৪০৬৬৫৭৪৭, ইমেল –samratswagata11@gmail.com

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 11

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “পাখি, ঘুড়ি ও আধখানা চাঁদ

Leave a Reply

Next Post

মহা প্রলয়ের পর

4.8 (11) বুধবার, ২০শে মে ২০২০র দুপুর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটানা ১১০ -১৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টা গতির বয়ে যাওয়া ঝড়ো বাতাসের পর দক্ষিণ বঙ্গের ছয়টি জেলার বিস্তির্ণ অংশে যে লন্ডভন্ড কান্ড ঘটেছে তাকে মহা প্রলয় ছাড়া অন্য কোন ভাবে বাখ্যা করা যায়না। এই অতি প্রবল ক্রান্তীয় ঘুর্ণিঝড়ের সাথে অনেকে ২০০৯ সালের […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: